পোশাক ডিজাইনার
শখ থেকে শুরু। এখন এটা ৮ পরিবারের আয়।
১
নুসরাতের বুটিকের নাম "সুচিত্রা।"
নামটা তার মায়ের। মা সুচিত্রা বেগম। সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করতেন, পাড়ার মেয়েদের ব্লাউজ, পেটিকোট, বাচ্চাদের জামা। দিনে তিন-চারটা। প্রতিটায় পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা। সেলাই মেশিনটা ছিল জ্যাপানিজ ব্র্যান্ডের, কালো রঙের, পায়ের প্যাডেলে চলত। সেই মেশিনের ছন্দময় ঠকঠক শব্দ নুসরাতের শৈশবের সাউন্ডট্র্যাক। রাতে ঘুমাতে গেলে মায়ের সেলাই মেশিনের শব্দ শুনতে শুনতে ঘুম আসত। সেই শব্দ একটা লোরি, একটা ঘুমপাড়ানি গান, যেটার কথা নেই, শুধু ছন্দ আছে, ঠক ঠক ঠক, সমান তালে, বিরতি ছাড়া।
মায়ের হাত দেখলে বোঝা যেত মা কী করেন। আঙুলের ডগায় সুচের দাগ, তর্জনীতে থিম্বলের ছাপ, তালুতে কাঁচির গোড়ার ক্যালাস। মায়ের হাত ছিল একটা মানচিত্র, সেলাইয়ের মানচিত্র। ত্রিশ বছরের সেলাইয়ের ইতিহাস সেই হাতে লেখা ছিল।
মা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। ক্যান্সার। জরায়ুর ক্যান্সার। ধরা পড়তে দেরি হয়েছিল কারণ মা ডাক্তারের কাছে যেতে চাইতেন না, লজ্জা পেতেন, "মেয়েদের এসব রোগ নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া ঠিক না।" এই লজ্জা মাকে মেরেছে। অসুখ মারেনি, লজ্জা মেরেছে। সময়মতো গেলে হয়তো বাঁচতেন। হয়তো এখনো সেলাই করতেন, ঠকঠক শব্দ হতো, নুসরাত ঘুমাতে পারত সেই শব্দ শুনে।
যখন গেলেন, তখন দেরি হয়ে গেছে। নুসরাত মায়ের শেষ ছয় মাস দেখেছে, শরীর শুকিয়ে যেতে দেখেছে, সেলাই মেশিনের প্যাডেল মাড়ানোর শক্তি চলে যেতে দেখেছে। শেষ দিকে মা শুয়ে থাকতেন, চোখ বন্ধ, কিন্তু আঙুল নড়ত, যেন স্বপ্নেও সেলাই করছেন। মায়ের শেষ কথা: "মেশিনটা রেখে দিস।"
নুসরাত রেখেছে। বুটিকের কোণায়। কাজে ব্যবহার করে না, এখন ইলেকট্রিক মেশিন আছে, চারটা। কিন্তু সেই কালো মেশিনটা রাখে, যেন মা পাশে বসে আছেন। মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে নুসরাত ওই মেশিনের প্যাডেলে পা রাখে, চাপে, ঠকঠক শব্দ হয়, আর মনে হয় মা আছেন।
২
ত্রিশ বছর। অবিবাহিত।
এটা বলতে হয় কারণ বাংলাদেশে একটা মেয়ের বয়স ত্রিশ আর সে বিয়ে করেনি, এটা একটা তথ্য যেটা মানুষ প্রথমেই জানতে চায়। ব্যবসা কেমন চলছে, সেটা দ্বিতীয় প্রশ্ন। বিয়ে হয়েছে কিনা, সেটা প্রথম। কতজন কর্মী, কত আয়, কী ডিজাইন করে, এসব পরে। আগে বলো, বিয়ে হয়েছে?
নুসরাত বিয়ে করেনি কারণ বিয়ে করার সময় পায়নি। এটা ক্লিশে শোনায়, কিন্তু সত্য। মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব এসেছে। বাবা রিকশা চালান, আয় অনিশ্চিত। বাবার হাঁটু ব্যথা করে, বেশিক্ষণ প্যাডেল মারতে পারেন না। ছোট ভাই রাকিব কলেজে পড়ে, তার টিউশন ফি, বই, কোচিং সব নুসরাত দেয়।
নুসরাত মায়ের সেলাই মেশিন নিয়ে শুরু করেছিল, একা, নিজের ঘরে, একটা ছোট টেবিলে। বাতি জ্বালিয়ে, রাত জেগে। প্রথম বছর পাড়ার মেয়েদের জামা বানিয়েছে, মায়ের পুরোনো খদ্দেরদের। তারা আসত, বলত, "সুচিত্রা আপা যেভাবে বানাত, সেভাবে বানাও।" নুসরাত মায়ের ছাঁচ দেখে, মায়ের মাপ দেখে, মায়ের পদ্ধতিতে বানাত। প্রথম বছর নুসরাত মা হয়ে সেলাই করেছে, নিজে হতে পারেনি।
দ্বিতীয় বছর ফেসবুকে পেজ খুলেছে, "সুচিত্রা বাই নুসরাত।" নিজের ডিজাইন দিতে শুরু করেছে। মায়ের ছাঁচের ওপর নিজের কারুকাজ। জামদানি মোটিফ দিয়ে কুর্তির নেকলাইন, কাঁথার ফোঁড় দিয়ে শাড়ির আঁচল, নকশিকাঁথার প্যাটার্ন দিয়ে ব্লাউজের স্লিভ। ঐতিহ্য আর আধুনিকতা মিশিয়ে। মানুষ পছন্দ করেছে।
তৃতীয় বছর প্রথম বড় অর্ডার পেয়েছে, একটা বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য পনেরোটা শাড়ির ব্লাউজ। তিন সপ্তাহে পনেরোটা, একা। রাত তিনটায় ঘুমিয়েছে, সকাল ছয়টায় উঠেছে। আঙুলে সুচ ফুটেছে, রক্ত বেরিয়েছে, কাপড়ে রক্তের দাগ পড়েছে, ধুয়ে আবার শুরু করেছে। পনেরোটা ব্লাউজ সময়মতো দিয়েছে। সেই বিয়ের কনে পরে নুসরাতকে ফোন করেছিল, "আপু, সবাই জিজ্ঞেস করছে কোথা থেকে বানিয়েছি।" সেটাই নুসরাতের প্রথম রিফারেল। সেটাই ব্যবসার শুরু।
চতুর্থ বছর দোকান ভাড়া নিয়েছে, ধানমন্ডির একটা গলিতে। ছোট দোকান, দুইশো স্কয়ার ফুট। ভাড়া বিশ হাজার। সেই টাকা দিতে গিয়ে হাত কাঁপত প্রথম মাসে। পঞ্চম বছর, মানে এখন, আট জন কাজ করে তার সাথে।
আটজন। সবাই নারী। ছয়জন সেলাই করে, একজন কাটিং করে, একজন এমব্রয়ডারি। নুসরাত নিজে ডিজাইন করে, কাপড় কেনে, হিসেব রাখে, ক্লায়েন্ট সামলায়, ডেলিভারি দেয়, সোশ্যাল মিডিয়া চালায়। একজনের কাজ সাতজনের। কিন্তু একজনের শরীর একজনের।
৩
নুসরাতের একটা খাতা আছে।
সেই খাতায় প্রতিটা ডিজাইন আঁকা আছে। প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা। প্রথম পাতায় মায়ের জন্য আঁকা একটা ব্লাউজের ডিজাইন, ক্লাস এইটে, পেন্সিলে। লাইন কাঁচা, প্রপোর্শন ভুল, কিন্তু চেষ্টাটা স্পষ্ট। মাঝখানে কলেজের সময়ের ডিজাইনগুলো, ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে, লাইন সোজা হচ্ছে, প্রপোর্শন ঠিক হচ্ছে। শেষের দিকে এখনকার ডিজাইন, প্রফেশনাল, ক্লিন, কনফিডেন্ট।
এই খাতা নুসরাতের যাত্রার দলিল। কাউকে দেখায় না, কিন্তু রাখে। যখন আত্মবিশ্বাস কমে যায়, যখন কেউ বলে "মেয়েদের ব্যবসা শখের," তখন এই খাতা খোলে। প্রথম পাতার কাঁচা ডিজাইন থেকে শেষ পাতার প্রফেশনাল ডিজাইন, এই পথটুকু দেখে। পথটুকু মনে করিয়ে দেয় সে কোথা থেকে এসেছে।
রাকিব, ছোট ভাই, একদিন খাতাটা দেখেছিল। বলেছিল, "আপু, প্রথম ডিজাইনটা এত খারাপ ছিল?" নুসরাত হেসে বলেছিল, "খারাপ না, শুরু ছিল। শুরু সবসময় এরকমই হয়।" রাকিব ভেবেছিল। তারপর বলেছিল, "আমিও কিছু শুরু করব।" নুসরাত বলেছিল, "করো। শুরু করো। বাকিটা আসবে।"
৪
"মেয়েদের ব্যবসা তো শখের।"
এই কথাটা নুসরাত শুনেছে। কতবার শুনেছে গুনতে পারবে না। কাপড়ের দোকানে গেলে শোনে, "আপনি নিজে ব্যবসা করেন? মালিক কে?" ব্যাংকে গেলে শোনে, "লোন চাই? গ্যারান্টর কে? বাবা? ভাই? স্বামী?" ভ্যাট রেজিস্ট্রেশনের অফিসে গেলে শোনে, "ম্যাডাম, এটা তো আপনার নামে? আপনি একাই?" একা মানে সন্দেহজনক। মেয়ে একা ব্যবসা করছে মানে পেছনে কেউ আছে, কোনো পুরুষ, যে আসলে চালাচ্ছে।
একবার একটা কাপড়ের পাইকারি দোকানে গিয়েছিল। বড় অর্ডার, পঞ্চাশ গজ জর্জেট। দোকানদার বলেছিল, "ম্যাডাম, আপনার সাথে কেউ আসেনি? মালিক কোথায়?" নুসরাত বলেছিল, "আমিই মালিক।" দোকানদার হেসেছিল। সেই হাসি নুসরাত মনে রাখে। সেই হাসির রং মনে রাখে, সেই হাসির গন্ধ মনে রাখে। সেই হাসি ছিল অবিশ্বাসের, করুণার, আর একটু তাচ্ছিল্যের মিশ্রণ। নুসরাত কাপড় কিনেছিল। ক্যাশ দিয়ে। গুনে গুনে। দোকানদারের সামনে।
কেউ চালাচ্ছে না। নুসরাত একাই চালাচ্ছে। রাত দুটো পর্যন্ত জেগে নতুন ডিজাইন আঁকে। খাতায়। পেন্সিলে। ডিজিটাল টুল ব্যবহার করে না। নুসরাতের ডিজাইন হাতে আঁকা। প্রতিটা লাইন, প্রতিটা কার্ভ, প্রতিটা মোটিফ হাতের ছোঁয়ায়। এটা মায়ের শেখানো, হাতে করো, হাতে বোঝো।
সকাল সাতটায় উঠে মার্কেটে যায় কাপড় কিনতে। ইসলামপুর, নিউমার্কেট, চকবাজার। প্রতিটা জায়গায় দরদাম করতে হয়, কাপড়ের কোয়ালিটি বুঝতে হয়, ভেজাল ধরতে হয়। মা শিখিয়েছিলেন, "কাপড় টেনে দেখবি, ভালো কাপড় টানলে ফিরে আসে, খারাপ কাপড় থেমে যায়।" নুসরাত টানে। প্রতিটা কাপড় টেনে দেখে।
দুপুরে কর্মীদের সাথে বসে কাজ দেখে। বিকেলে ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং। সন্ধ্যায় হিসেব। রাতে আবার ডিজাইন। এটা শখ নয়। শখ রাত দুটো পর্যন্ত জাগায় না। শখে ব্যাংক লোনের কিস্তি দিতে হয় না। শখে আট পরিবারের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার চাপ থাকে না।
মাসে তিন লাখ টাকা আয়। খরচ বাদে লাভ এক লাখের কাছাকাছি। কর্মীদের বেতন, দোকান ভাড়া, কাপড়ের খরচ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ফেসবুক বুস্ট, ডেলিভারি চার্জ, সব বাদ দিয়ে। এটা কোনো বিশাল ব্যবসা নয়। কিন্তু এটা একটা মেয়ে শূন্য থেকে তৈরি করেছে, মায়ের একটা সেলাই মেশিন দিয়ে, কোনো পুঁজি ছাড়া, কোনো গডফাদার ছাড়া, কোনো পারিবারিক সম্পদ ছাড়া। এটা শখ নয়। এটা সংগ্রাম।
৫
রুমানা সবচেয়ে পুরোনো কর্মী।
রুমানা তিন বছর আগে এসেছিল। স্বামী ফেলে গেছে, দুটো বাচ্চা, থাকার জায়গা নেই। নুসরাতের বুটিকে এসে বলেছিল, "আপা, সেলাই পারি একটু, কাজ দেন।" চোখ লাল ছিল, কেঁদেছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু মুখে কান্নার চিহ্ন মুছে এসেছিল। এটা নারীদের প্রথম শিক্ষা, কাঁদলে ভেতরে কাঁদবে, বাইরে শক্ত থাকবে।
নুসরাত দিয়েছিল। প্রথম সপ্তাহে রুমানার হাত কাঁপত, সেলাই আঁকাবাঁকা হতো। নুসরাত ধৈর্য ধরেছিল। মায়ের কথা মনে পড়েছিল, "নতুন হাত কাঁপে, পুরোনো হাত চলে। সময় দাও।" সময় দিয়েছিল। দ্বিতীয় সপ্তাহে রুমানার হাত স্থির হয়েছিল। তৃতীয় সপ্তাহে রুমানার সেলাই সোজা হয়েছিল। এক মাসের মধ্যে রুমানা ব্লাউজ বানাতে শিখেছিল।
রুমানা এখন মাসে পনেরো হাজার টাকা কামায়। বাচ্চা দুটো স্কুলে যায়। একটা ছোট ঘর ভাড়া নিয়েছে, মিরপুরে, একটা ঘর, একটা রান্নাঘর, বাথরুম শেয়ার। রুমানা বলে, "আপা, আপনি না থাকলে আমি রাস্তায় থাকতাম।"
নুসরাত এই কথা শুনলে কিছু বলে না। কারণ নুসরাত জানে রুমানার জীবন সহজ হয়নি, শুধু একটু কম কঠিন হয়েছে। পনেরো হাজার টাকায় ঢাকায় দুই বাচ্চা নিয়ে বাঁচা মানে প্রতিদিন হিসেব করে খাওয়া, প্রতিটা টাকা গুনে খরচ করা। কিন্তু রাস্তায় না থাকাটাই একটা জয়। ছোট জয়, কিন্তু জয়।
আটটা কর্মী, আটটা গল্প। শিরিন এসেছে গার্মেন্টস থেকে, বারো ঘণ্টার শিফট সহ্য হতো না, পায়ে পানি জমত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। জাহানারা এসেছে গ্রাম থেকে, স্বামীর অত্যাচার থেকে পালিয়ে, হাতে সেলাই মেশিনের সূচের দাগ আর চোখে ভয়। নাজমা ছিল গৃহকর্মী, মালিকের বাসায় মারধর হতো, পিঠে দাগ আছে এখনো। তাসলিমা ছিল বিউটি পার্লারে, বেতন পেত না নিয়মিত, তিন মাসের বকেয়া নিয়ে চলে এসেছিল। ফারজানা পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি, এসএসসি ফেল, বাবা বলেছিলেন "মেয়ের পড়ে কী হবে?" মুক্তা বিধবা, বয়স পঞ্চাশ, অন্য কেউ কাজ দেয়নি, "বুড়ি দিয়ে কী হবে?" হাসিনা গুলশানের বাসায় রান্না করত, মালকিন চাকরি হারানোর পর ছাঁটাই করেছে।
প্রত্যেকের পেছনে একটা ভাঙা দরজা আছে যেটা দিয়ে তারা বের হয়ে এসেছে। নুসরাতের বুটিক সেই দরজার ওপাশে একটা ঘর, যেখানে তারা নিজের হাতে কিছু তৈরি করে, নিজের নামে মজুরি পায়, নিজের সম্মান রাখে। ছোট ঘর। কিন্তু নিজের।
৬
শখ থেকে শুরু।
এটা নুসরাত অস্বীকার করে না। হ্যাঁ, শখই ছিল। ছোটবেলায় মায়ের সেলাই দেখতে দেখতে নিজেও সেলাই শিখেছিল। পুতুলের জামা বানাত। পুতুলের ছিল না, তাই কাগজের পুতুল বানিয়ে তাকে জামা পরাত। স্কুলের বান্ধবীদের রুমাল সেলাই করে দিত, প্রতিটা রুমালে একটা ফুল, বান্ধবীর নামের প্রথম অক্ষর এমব্রয়ডারি করে। কলেজে উঠে নিজের সালোয়ার কামিজ নিজে বানাত। মায়ের কাছ থেকে শিখেছিল কাটিং, ফিটিং, বডি মেজারমেন্ট। সেটা শখ ছিল। সত্যিই শখ ছিল।
কিন্তু শখ থেকে জীবিকা হতে যে রূপান্তর ঘটে, সেটা শখ দিয়ে হয় না। সেটা হয় নির্ঘুম রাত দিয়ে, ফেরত আসা অর্ডার দিয়ে, অসন্তুষ্ট ক্লায়েন্টের বকুনি দিয়ে, ব্যাংক লোনের সুদ দিয়ে, দোকান ভাড়ার চাপ দিয়ে, কর্মীদের বেতন দেওয়ার দায় দিয়ে। শখে এই ভার থাকে না। ব্যবসায় থাকে। একবার ঈদের আগে বিশটা অর্ডার একসাথে, দশ দিনের ডেডলাইন, কারেন্ট গেছে, ব্যাকআপ জেনারেটর নেই, মোমবাতি জ্বালিয়ে সেলাই করেছে। শখে কেউ মোমবাতি জ্বালিয়ে সেলাই করে না।
৭
নুসরাত রাতে বুটিক বন্ধ করে।
তালা লাগায়। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সাইনবোর্ডের দিকে তাকায়। "সুচিত্রা।" মায়ের নাম। সাইনবোর্ডটা নুসরাত নিজে ডিজাইন করেছে। মায়ের হাতের লেখার স্টাইলে। মা যেভাবে "সুচিত্রা" লিখতেন, সেই হাতের লেখা থেকে ফন্ট বানিয়ে নিয়েছে। সাইনবোর্ডে মায়ের হাতের লেখা জ্বলে, রাতে, নিয়ন আলোতে।
মা সেলাই করতেন পঞ্চাশ টাকায়। নুসরাত সেলাই করে তিন হাজার থেকে পনেরো হাজার টাকায়। পার্থক্যটা দামে নয়। পার্থক্যটা দৃষ্টিতে। মা দেখতেন কাপড়, নুসরাত দেখে ব্র্যান্ড। মা দেখতেন খদ্দের, নুসরাত দেখে মার্কেট। মা দেখতেন সেলাই, নুসরাত দেখে ডিজাইন। কিন্তু মূলটা একই। মায়ের হাত। মায়ের ধৈর্য। মায়ের সেই ঠকঠক শব্দ।
শখ থেকে শুরু। এখন এটা আট পরিবারের আয়। আটটা মেয়ে প্রতিদিন সকালে এই বুটিকে আসে, সেলাই করে, কাটিং করে, এমব্রয়ডারি করে, আর সন্ধ্যায় নিজের কামানো টাকা নিয়ে ঘরে ফেরে। সেই টাকায় তাদের বাচ্চারা খায়, পড়ে, স্কুলে যায়। রুমানার মেয়ে ক্লাস ফোরে ফার্স্ট হয়েছে। শিরিনের ছেলে মাদ্রাসায় হাফেজ হচ্ছে। জাহানারা প্রথমবার নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছে।
নুসরাত ঘরে ফেরে। মায়ের ছবি দেয়ালে। ছবিতে মা হাসছেন, সেলাই মেশিনের পাশে বসে। সেই কালো মেশিন, সেই প্যাডেল, সেই ঠকঠক। নুসরাত ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলে, "মা, আটজন হয়েছে। আরো হবে।"
মায়ের হাসি স্থির। ছবির হাসি বদলায় না। কিন্তু নুসরাতের মনে হয় মা একটু বেশি হাসছেন আজ।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ধানমন্ডির গলিতে পানি জমেছে। নুসরাত জানালা বন্ধ করে, বিছানায় শোয়। কান পাতলে শোনা যায় বৃষ্টির শব্দ, টিনের চালে, ঠকঠক, ঠকঠক। মায়ের সেলাই মেশিনের মতো।
নুসরাত ঘুমায়। সেই শব্দ শুনতে শুনতে।
৮
সকালে বুটিক খোলে নুসরাত।
তালা খোলে, দরজা খোলে, লাইট জ্বালায়। মেশিনগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কাল যেভাবে রেখে গেছে। কাটিং টেবিলে কাপড়ের টুকরো, মেঝেতে সুতোর ছাঁট, দেয়ালে ঝোলানো ফিনিশড ড্রেস।
একে একে কর্মীরা আসে। রুমানা প্রথম, সবসময়। তারপর শিরিন। তারপর জাহানারা। তারপর বাকিরা। প্রত্যেকে এসে নিজের মেশিনে বসে, সুইচ অন করে, কাজ শুরু করে। মেশিনের শব্দ শুরু হয়। একটা, দুটো, তিনটা, চারটা, পাঁচটা, ছয়টা। ছয়টা মেশিন একসাথে চলে। সেই শব্দ মায়ের একটা মেশিনের শব্দ থেকে আলাদা, এটা অনেক মেশিনের শব্দ, এটা একটা কারখানার শব্দ, ছোট কারখানা, কিন্তু কারখানা।
নুসরাত কোণার কালো মেশিনটার দিকে তাকায়। মায়ের মেশিন। চুপ। একমাত্র চুপ মেশিন। বাকি সব চলছে।
মা, দেখো। তোমার একটা মেশিন থেকে ছয়টা হয়েছে। তোমার একটা খদ্দের থেকে শতাধিক হয়েছে। তোমার একটা ঘর থেকে একটা দোকান হয়েছে। তোমার একা হাত থেকে ষোলটা হাত হয়েছে।
শখ থেকে শুরু।
কিন্তু শখ আর নেই। এখন আছে দায়িত্ব। আটটা পরিবারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব নুসরাত বহন করে, প্রতিদিন, মায়ের কালো মেশিনের দিকে তাকিয়ে।