নদীভাঙন নারী
নদী আমার সবকিছু নিয়েছে। শুধু আমাকে নেয়নি। কারণ আমি নদীর চেয়ে জেদি।
১
কুলসুম বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে পদ্মার দিকে তাকায়।
নদী শান্ত আজ। বর্ষা নেই। পানি নিচে। বালুচর দেখা যায়। কিন্তু কুলসুম জানে, এই শান্ত চেহারা মিথ্যা। পদ্মা মিথ্যা বলতে জানে। পদ্মা হাসতে হাসতে গিলে খায়। পদ্মা চুপচাপ আসে, পা ধোয়ার ভান করে, তারপর পা-সহ মাটি টেনে নিয়ে যায়। কুলসুম চারবার দেখেছে। চারবার।
প্রথমবার। ১৯৯৮। কুলসুমের বয়স চৌদ্দ। বাবার বাড়ি, রাজশাহীর চরখিদিরপুর। তিন ঘরের টিনের বাড়ি, উঠান, একটা আমগাছ, পুকুর। বর্ষায় পদ্মা ফুলল। প্রতি বছর ফোলে, কিন্তু সেবার অন্যরকম। পানি উঠতে উঠতে উঠানে এলো। বাবা বলল, "যাবে না, আল্লাহ হেফাজত করবে।" পদ্মা আল্লাহর কথা শোনেনি। এক রাতে, শুধু এক রাতে, বাড়ির সামনের ভিটার মাটি সরে গেল। সকালে উঠে দেখল, যেখানে উঠান ছিল সেখানে পানি। আমগাছটা কাত হয়ে আছে, অর্ধেক শেকড় বাতাসে। দুপুর হতে না হতে আমগাছটা পড়ে গেল। পদ্মা সেটাকেও নিয়ে গেল।
সেদিন কুলসুম শিখল: মাটি স্থায়ী নয়। যেটাকে মানুষ ভিত্তি বলে, যেটার ওপর ঘর বানায়, সেটা একটা নদীর এক রাতের খেলা।
২
দ্বিতীয় বাড়ি।
বিয়ের পরে। স্বামী মোসলেম, জেলে। চরভবানীপুরে ঘর বানাল। এবার ছোট, দুটো ঘর, টিনের ছাদ, মাটির দেয়াল। কুলসুমের বয়স তখন বাইশ। দুই ছেলে, রাসেল আর রবিন। রাসেল তিন, রবিন এক। কুলসুম রান্না করে, ঘর সামলায়, বাচ্চা বড় করে। মোসলেম নদীতে মাছ ধরে। নদী তাদের বাঁচায়। নদীই তাদের মারে। একটা হাতে খাবার দেয়, আরেকটা হাতে ঘর কেড়ে নেয়।
২০০৪ সালে আবার ভাঙন। এবারে সামনে দেখল কুলসুম। ধীরে ধীরে। প্রতিদিন একটু একটু। প্রথমে নদীর পাড় ভাঙে, যেখানে নারকেল গাছ ছিল সেখানে পানি। তারপর পাশের বাড়ি ভাঙে। তারপর রাস্তা ভাঙে। কুলসুম বুঝল, ভাঙন হঠাৎ আসে না সবসময়। কখনো কখনো আস্তে আস্তে আসে, নিঃশব্দে, প্রতিদিন কয়েক ইঞ্চি, আর তুমি দেখতে থাক, জানো আসছে, কিন্তু কিছু করতে পার না।
মোসলেম টিনের চাল খুলে নিল। দেয়ালের কাঠ খুলে নিল। যতটুকু পারা যায়। বাকিটা নদী নিল। কুলসুম রাসেলকে এক কোলে, রবিনকে এক কোলে নিয়ে হাঁটল। কোথায়? জানে না। শুধু জানে, নদী থেকে দূরে। কিন্তু চরে থাকলে নদী থেকে কতদূর যাওয়া যায়?
৩
তৃতীয় বাড়ি। চরমোহনপুর। আরো ছোট। একটা ঘর। টিনের ছাদ, বাঁশের দেয়াল। মোসলেমের আর শক্তি নেই মাটির দেয়াল গাঁথার। কুলসুমেরও নেই। দুজনে মিলে যতটুকু পেরেছে।
এই ঘরটা সাত বছর টিকল। সাত বছর। কুলসুমের জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘ স্থিতি। সাত বছরে রাসেল স্কুলে গেল। রবিন স্কুলে গেল। কুলসুম অন্যের বাড়িতে কাজ করল, ধান সেদ্ধ, মরিচ শুকানো, যা পেল। মোসলেম মাছ ধরল। একটা ছন্দ তৈরি হলো। কুলসুম ভাবল, হয়তো এবার থাকবে। হয়তো নদী এবার ক্ষমা করবে।
পদ্মা ক্ষমা করে না। পদ্মা ভোলে না। পদ্মা ফিরে আসে।
২০১৩ সালে ভাঙন। এবার কুলসুমের ঘর না, পুরো গ্রাম। চরমোহনপুর নদীতে চলে গেল। একটা গ্রাম, তিরিশটা পরিবার, একটা মসজিদ, একটা মাদ্রাসা, দুটো দোকান, একটা পুকুর। সব। এক বর্ষায়। নদী চাইলে মানচিত্র বদলে দেয়। নদী চাইলে গ্রামের নাম মুছে দেয়।
কুলসুম এবার কাঁদল। প্রথমবার কাঁদেনি, ভয় পেয়েছিল। দ্বিতীয়বার কাঁদেনি, রাগ হয়েছিল। তৃতীয়বার কাঁদল। কারণ তৃতীয়বার সে বুঝল: এটা শেষ হবে না।
৪
মোসলেম চলে গেল।
না, মরেনি। চলে গেল। আরেক নারী, আরেক চর, আরেক ঘর। কুলসুমকে বলল, "তোমাকে নিয়ে আর পারি না।" কুলসুম বুঝল: মোসলেম নদীর চেয়ে দুর্বল। নদী ঘর ভাঙে, মোসলেম সংসার ভাঙে। দুটোই ভাঙন। কিন্তু নদীর ভাঙনে কুলসুম দাঁড়িয়ে থাকে, মোসলেমের ভাঙনেও।
দুটো ছেলে। তেরো আর এগারো। কুলসুম একা।
বাঁধের ওপর একটা জায়গা পেল। সরকারি জায়গা, কেউ বলে না কিছু, কারণ কুলসুমের মতো আরো শত মানুষ সেখানে। বাঁধটা লম্বা, পদ্মার পাড় ধরে মাইলের পর মাইল, আর বাঁধের ওপরে সারি সারি টিনের ঘর, পলিথিনের ছাদ, বাঁশের খুঁটি। একটা শরণার্থী শিবির, শুধু শরণার্থীরা বিদেশ থেকে আসেনি, নিজের দেশেই উদ্বাস্তু।
কুলসুমের এখনকার ঘর: দশ ফুট বাই আট ফুট। টিনের দেয়াল, টিনের ছাদ। একটা চুলা, দুটো হাঁড়ি, তিনটা থালা, একটা মশারি। জানালা নেই। দরজা আছে, দরজা মানে একটা পর্দা। এটা চতুর্থ বাড়ি। কুলসুমের জীবনে চতুর্থ। প্রতিটা আগেরটার চেয়ে ছোট। প্রথম বাড়ি তিন ঘর। দ্বিতীয় দুই ঘর। তৃতীয় এক ঘর। চতুর্থ... ঘর বলা যায় কিনা সন্দেহ।
৫
কুলসুম কাজ করে।
ইটভাটায়। ভোর থেকে সন্ধ্যা। মাথায় ইট বহন করে, দশটা বারোটা, একবারে পাঁচটা। ওজন বোঝে না, গোনে না, শুধু বহন করে। প্রতিটা ইটের ওজন কুলসুমের ঘাড়ে, কাঁধে, মেরুদণ্ডে জমা হয়। রাতে শুলে পিঠ ব্যথা করে। সকালে উঠলে হাঁটু ব্যথা করে। কিন্তু ব্যথা আর কুলসুম পুরোনো বন্ধু। চৌদ্দ বছর বয়স থেকে পরিচয়।
দুইশো টাকা দৈনিক। মাসে ছয় হাজার। দুটো ছেলের খাবার, স্কুল, বই, খাতা। রাসেল স্কুল ছেড়ে দিতে চেয়েছিল, কুলসুম মারল। জীবনে প্রথমবার ছেলেকে মারল। "তুই পড়বি। আমি ইট বইবো। কিন্তু তুই পড়বি।"
রাসেল পড়ল। রবিনও।
কুলসুম সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে চুলা জ্বালায়। ভাত চড়ায়। পাশে ছেলেরা পড়ে। কুলসুম ভাতের হাঁড়ি নাড়ায় আর ভাবে: এই ভাত, এই চুলা, এই ছেলেরা, এটুকুই তার ভাঙনের পর বাকি আছে। এটুকু নদী নিতে পারবে না। কারণ এটুকু মাটিতে না, এটুকু কুলসুমের ভেতরে।
৬
বাঁধের ওপরের জীবনটা আলাদা।
এখানে সবাই ভাঙনের মানুষ। সবার গল্প একরকম, শুধু নামগুলো আলাদা। রহিমার বাড়ি তিনবার গেছে। আমেনার দুবার। হালিমার পাঁচবার, কুলসুমের চেয়েও বেশি। হালিমা বৃদ্ধা, দাঁত নেই, চোখ ঝাপসা, কিন্তু হাসে। বলে, "নদী আমার চেয়ে বুড়া হইতে পারবে না। আমি আগে বুড়া হবো, নদী পরে।"
বাঁধের ওপরে একটা সমাজ গড়ে উঠেছে। নিজেদের মতো। কেউ শেখায়নি, কেউ পরিকল্পনা করেনি। আপনা-আপনি। মেয়েরা সকালে একসাথে পুকুরে যায়। বাচ্চারা একসাথে খেলে। কারো চুলা না জ্বললে পাশের ঘর থেকে আগুন আনে। কারো বাচ্চা অসুস্থ হলে সবাই মিলে ওষুধের টাকা জোগায়। এটা দয়া না। এটা বেঁচে থাকার কৌশল। একা একা ভাঙন সামলানো যায় না। একসাথে হলে যায়। হয়তো।
কুলসুম এখানে একটু আলাদা। কারণ কুলসুম কাঁদে না। বাকিরা মাঝে মাঝে কাঁদে, নদীর দিকে তাকিয়ে, পুরোনো ঘরের কথা মনে করে, যে জমি ছিল সেটার কথা ভেবে। কুলসুম কাঁদে না। কুলসুমের কান্না শুকিয়ে গেছে। যেমন নদী শুকায় শীতে, তেমনি কুলসুমের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। এখন শুধু জেদ আছে। শুকনো, শক্ত, পাথরের মতো।
একদিন এনজিওর একটা মেয়ে এলো। ছবি তুলল। জিজ্ঞেস করল, "আপা, আপনার গল্পটা বলুন।" কুলসুম বলল, "কোন গল্প? চারবার বাড়ি গেছে, একবার স্বামী গেছে, এখন বাঁধের ওপর থাকি। এটা গল্প না। এটা জীবন।" মেয়েটা লিখল। ছবি তুলল। চলে গেল। কুলসুম জানে: ছবি পত্রিকায় ছাপা হবে, কেউ দেখবে, কেউ "বেচারা" বলবে, তারপর পাতা উলটাবে। কুলসুমের জীবন একটা পাতা, যেটা মানুষ পড়ে ভুলে যায়। কিন্তু কুলসুম ভুলে যায় না। কুলসুম পাতা না, কুলসুম মানুষ।
৭
বর্ষা এলে কুলসুম ঘুমায় না।
বাকিরা ঘুমায়। ছেলেরা ঘুমায়। কিন্তু কুলসুম জেগে থাকে। কান পেতে থাকে। পদ্মার আওয়াজ শোনে। পদ্মার আওয়াজ বদলায়। স্বাভাবিক সময়ে পদ্মা গুনগুন করে, যেন গান গাইছে। কিন্তু ভাঙনের আগে পদ্মার গলা বদলায়। একটু ভারী হয়, একটু গভীর, যেন কেউ গলা খাকরাচ্ছে কিছু বলার আগে। কুলসুম সেই গলা চেনে। চারবার শুনেছে।
রাতে বাঁধের ওপর দাঁড়ায়। অন্ধকার। পদ্মা দেখা যায় না, কিন্তু আছে। নিচে, কালো, বিশাল, নিঃশব্দ। কিন্তু নিঃশব্দতাটাই ভয়ের। পদ্মা যখন চুপ থাকে, তখন শোনা যায় মাটি ভাঙার শব্দ। খসখস। ছোট ছোট। মাটির টুকরো পানিতে পড়ছে। এক ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি, প্রতি ঘণ্টায়। কেউ শোনে না এই শব্দ। কুলসুম শোনে।
পাশের ঘরের রহিমা জিজ্ঞেস করে, "কুলসুম আপা, ভয় পাও না?"
কুলসুম বলে, "ভয়? ভয় পাওয়ার মতো কিছু বাকি আছে নাকি?"
এটা সাহস না। এটা নিরাসক্তি। চারবার সবকিছু হারালে মানুষের ভেতরে একটা জায়গা তৈরি হয় যেখানে ভয় ঢুকতে পারে না। কারণ সেই জায়গাটা ইতিমধ্যে ভরে আছে হারানোর অভিজ্ঞতায়। আর কোনো কিছু হারানোর বাকি নেই। নদী কী নেবে? টিনের চাল? দুটো হাঁড়ি? পলিথিনের দরজা?
নদী সবকিছু নিয়েছে। শুধু কুলসুমকে নেয়নি। কারণ কুলসুম নদীর চেয়ে জেদি।
৭
রাসেল SSC পাশ করল। রবিন ক্লাস নাইনে।
রাসেল চায় কুলসুমকে ঢাকায় নিয়ে যেতে। বলে, "আম্মা, আর নদীর পাড়ে না। ঢাকায় চলো। গার্মেন্টসে কাজ পাবো।"
কুলসুম তাকায় পদ্মার দিকে। নদীটা এখন শান্ত। বালুচর জেগে আছে। যেখানে কুলসুমের প্রথম বাড়ি ছিল, সেখানে এখন চর। মাটি জেগেছে। নতুন মাটি। নদী যা নেয়, কখনো কখনো কিছুটা ফেরত দেয়। কিন্তু সেটা আগের মাটি না। আগের ঘর না। আগের স্মৃতি না।
"আমি যাবো না।"
"কেন, আম্মা?"
"কারণ... কারণ আমি এখানকার। নদী আমার। নদী আমাকে মেরেছে, কিন্তু আমার। যে জিনিস তোমাকে মারে, সেটাও তোমার হতে পারে। সেটা তুই বুঝবি না।"
রাসেল বোঝে না। রাসেল তরুণ। তরুণরা বোঝে না কেন মানুষ সেই জায়গায় থাকে যেটা তাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু কুলসুম বোঝে। পদ্মা তার শত্রু, কিন্তু পদ্মা তার ঠিকানা। পদ্মার পাড়ে জন্ম, পদ্মার পাড়ে বিয়ে, পদ্মার পাড়ে সংসার, পদ্মার পাড়ে ভাঙন। পদ্মা ছাড়া কুলসুম কে? একটা নদীহীন নারী? সেটা কুলসুম না।
৯
কুলসুমের শরীরে ভাঙনের মানচিত্র আছে।
পিঠে ব্যথা, ইট বহনের। হাঁটুতে ব্যথা, কাদায় হাঁটার। হাতের তালুতে কড়া, কোদাল ধরার। কপালে একটা দাগ, দ্বিতীয় ভাঙনে ছাদের টিন পড়েছিল, কেটে গিয়েছিল, সেলাই হয়নি, আপনি সেরেছে। শরীরটা একটা দলিল, যেখানে প্রতিটা ক্ষতচিহ্ন একটা বছর, একটা ভাঙন, একটা পুনর্নির্মাণ।
কুলসুম ডাক্তারের কাছে যায় না। "ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার বলবে বিশ্রাম নিন। বিশ্রাম নিলে বাচ্চারা খাবে কী?" এটা যুক্তি না, এটা বাস্তবতা। কুলসুমের জীবনে যুক্তি আর বাস্তবতা এক হয়ে গেছে। দুটোই বলে: চলো, থামো না।
রবিন একদিন বলল, "আম্মা, তোমার হাত কেন এত খসখসে?"
কুলসুম হাতের দিকে তাকাল। সত্যিই খসখসে। ইটের ধুলো, রোদ, পানি, এসব মিলে হাতের চামড়া মোটা হয়ে গেছে। রবিন ছোটবেলায় এই হাতে ঘুমাত। এই হাতে ভাত মাখত। এই হাত এখন ইট বইতে বইতে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
"কাজ করলে হাত এমন হয়।"
"আমি বড় হলে তোমাকে আর কাজ করতে দেবো না।"
কুলসুম হাসল। ছেলেরা এমন বলে। ছেলেরা বড় হলে ভুলেও যায়। কিন্তু ভুলুক, সেটা ঠিক আছে। কুলসুম কাজ করবে। কারণ কাজ ছাড়া কুলসুম কে? কাজই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নদী যখন সব নিয়েছে, কাজ বাকি ছিল। দুটো হাত বাকি ছিল। সেই দুটো হাত দিয়ে আবার শুরু করেছে। প্রতিবার।
১০
কুলসুমের একটা স্বপ্ন আছে।
স্বপ্নটা ছোট। একটা পাকা ঘর। ইটের দেয়াল, পাকা ছাদ, যেটা নদী নিতে পারবে না। যেটা বৃষ্টিতে চুইয়ে পড়বে না। যেটায় জানালা থাকবে, কাচের, আর জানালা দিয়ে পদ্মা দেখা যাবে, কিন্তু পদ্মা ভেতরে আসতে পারবে না। এটা স্বপ্ন। কুলসুম জানে স্বপ্ন পূরণ হয় না সবসময়। কিন্তু স্বপ্ন থাকলে সকালে ওঠার কারণ থাকে। ইটভাটায় যাওয়ার কারণ থাকে। মাথায় ইট বহন করার কারণ থাকে।
রবিন একদিন বলল, "আম্মা, তুমি কখনো হাল ছাড়ো না কেন?"
কুলসুম একটু ভাবল। তারপর বলল, "হাল ছাড়লে নদী জিতে যাবে।"
রবিন হাসল। বলল, "নদী তো জীবিত না, আম্মা। নদী জেতে পারে না।"
কুলসুম বলল, "তুই নদীর পাড়ে বড় হয়েছিস, তবু নদীকে চিনিস না। নদী জীবিত। নদী শ্বাস নেয়। নদী রাগ করে। নদী ক্ষমা করে। আর নদী হারায়, যদি তুই না হার।"
এটা কুলসুমের দর্শন। সরল, সোজা, কোনো জটিলতা নেই। নদী আর কুলসুম, দুজনের লড়াই। নদী বড়, শক্তিশালী, বিশাল। কুলসুম ছোট, ক্লান্ত, একা। কিন্তু কুলসুম জেদি। আর জেদ কখনো কখনো শক্তির চেয়ে বেশি কাজ করে।
১১
সন্ধ্যায় কুলসুম বাঁধের ওপর বসে।
পদ্মার ওপর সূর্য ডোবে। জল লাল হয়। আকাশ লাল হয়। কুলসুমের মুখেও আলো পড়ে, ক্লান্ত মুখ, রোদে পোড়া, বয়সের ছাপ, ইটের ধুলো কপালের রেখায়। কিন্তু চোখ দুটো পরিষ্কার। চোখে কোনো আবছা নেই। চোখ দুটো বলে: আমি এখনো আছি।
চারটা বাড়ি হারিয়েছে। একটা স্বামী হারিয়েছে। একটা গ্রাম হারিয়েছে। কিন্তু দুটো ছেলে আছে, দুটো হাত আছে, আর একটা জেদ আছে যেটা পদ্মার স্রোতের চেয়ে শক্তিশালী।
নদী আমার সবকিছু নিয়েছে। শুধু আমাকে নেয়নি। কারণ আমি নদীর চেয়ে জেদি।
কুলসুম উঠে দাঁড়ায়। ঘরে ফেরে। চুলা জ্বালায়। ভাত চড়ায়। ছেলেরা ফেরে। খায়। ঘুমায়।
কুলসুম জেগে থাকে। কান পাতে। পদ্মা কী বলছে শোনে।
পঞ্চম বাড়ি বানাতে হবে কিনা, সেটা পদ্মা ঠিক করবে। কিন্তু কুলসুম ঠিক করেছে: হলে বানাবে। আবারো। আরেকবার। প্রতিবার ছোট হবে, কিন্তু হবে। কারণ ঘর না থাকলেও ঘর বানানোর ইচ্ছেটা থাকে। আর ইচ্ছে নদী নিতে পারে না।