সিঙ্গেল মাদার
মা হওয়ার জন্য বাবা লাগে না। ভালোবাসা লাগে।
১
নাফিসা একা খায়।
না, একা না। আয়না খায়। আয়না তার মেয়ে, পাঁচ বছর। কিন্তু আয়না খেতে খেতে কথা বলে, পারুলের পুতুলকে ভাত দেয়, চামচ ফেলে দেয়, আবার তোলে, আবার ফেলে। তাই নাফিসা মনে করে একাই খায়। কারণ আয়নার সাথে খাওয়া মানে আয়নাকে খাওয়ানো, নিজে খাওয়া না।
সকালের রুটিন: ছয়টায় ওঠা, আয়নাকে ওঠানো, দাঁত মাজানো, জামা পরানো, নাস্তা, স্কুলবাসে তোলা। তারপর ল্যাপটপ খোলা। নাফিসা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। রিমোট কাজ করে, একটা সিঙ্গাপুরের কোম্পানি, ব্যাকএন্ড ডেভেলপমেন্ট। মাসে আশি হাজার টাকা। ভালো বেতন। একা একটা মেয়ে আর একটা ফ্ল্যাট চালানোর জন্য যথেষ্ট।
ফ্ল্যাটটা উত্তরায়। দুই বেডরুম। একটা নাফিসার, একটা আয়নার। আয়নার ঘরে দেয়ালে প্রজাপতির স্টিকার, একটা ছোট বুকশেলফ, খেলনা। নাফিসার ঘরে ল্যাপটপ, বই, আর দেয়ালে একটা ছবি: আয়নার প্রথম জন্মদিন, আয়না কেক ধরে আছে, নাফিসা পাশে হাসছে। ছবিতে দুজন। শুধু দুজন।
২
নাফিসা বিয়ে করেনি।
এটা পছন্দ। এটা বাধ্যতা নয়, ব্যর্থতা নয়, দুর্ঘটনা নয়। নাফিসা বিয়ে করতে চায়নি। কেন চায়নি সেটা নাফিসা নিজেও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিন্তু কিছু জিনিস জানে।
জানে: মায়ের বিয়ে সুখের ছিল না। বাবা ভালো মানুষ ছিলেন, কিন্তু ভালো মানুষ মানেই ভালো স্বামী নয়। বাবা চুপচাপ ছিলেন, কথা বলতেন না, মায়ের কথা শুনতেন না, মায়ের ইচ্ছা জানতেন না, মায়ের স্বপ্ন দেখতেন না। মা সারাজীবন একা ছিলেন, বিয়ের ভেতরে একা, যেটা বিয়ে ছাড়া একা থাকার চেয়ে বেশি কষ্টের। কারণ বিয়ে ছাড়া একা থাকলে মানুষ জানে সে একা। বিয়ের ভেতরে একা থাকলে মানুষ ভাবে সে একা হওয়া উচিত না, কিন্তু একা, আর সেই ফারাকটা কষ্টকে দ্বিগুণ করে।
জানে: বিয়ে মানে আপস। নাফিসা আপস করতে পারে, কিন্তু চায় না। নাফিসা নিজের সময় চায়, নিজের সিদ্ধান্ত চায়, নিজের ঘর চায়, নিজের নিয়মে চলতে চায়। এটা স্বার্থপরতা? হতে পারে। কিন্তু স্বার্থপরতা কি সবসময় খারাপ? একটা নারী যখন নিজের জন্য বাঁচতে চায়, সেটাকে স্বার্থপরতা বলা কি ন্যায্য?
জানে: সে মা হতে চেয়েছিল। বিয়ে ছাড়া। সেটা বাংলাদেশে প্রায় অসম্ভব। প্রায়। কিন্তু পুরোপুরি না।
৩
আয়নাকে দত্তক নেওয়ার গল্পটা দুই বছরের।
নাফিসার বয়স তখন তেত্রিশ। চাকরি ভালো চলছে। ফ্ল্যাট নিজের। সঞ্চয় আছে। শুধু ঘরে ফিরলে ঘর খালি। খালি ঘরে নাফিসা কথা বলে, নিজের সাথে, ল্যাপটপের সাথে, বইয়ের সাথে। কিন্তু কেউ উত্তর দেয় না। নাফিসা চেয়েছিল কেউ উত্তর দিক। একটা গলা, ছোট, যেটা তাকে ডাকবে।
দত্তক প্রক্রিয়া জটিল। বাংলাদেশে দত্তক আইন মুসলিম আইনে সরাসরি স্বীকৃত নয়, কিন্তু কাফালা ব্যবস্থায় অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়। নাফিসা আইনজীবীর কাছে গেল। আইনজীবী বললেন, "আপনি অবিবাহিত?"
"হ্যাঁ।"
"একা?"
"হ্যাঁ।"
আইনজীবী একটু থামলেন। "কঠিন হবে। কিন্তু অসম্ভব না।"
ছয় মাস কাগজপত্র। কোর্ট। সমাজকল্যাণ অফিস। হোম ভিজিট, একজন মহিলা এসে ফ্ল্যাট দেখলেন, জিজ্ঞেস করলেন, "বাচ্চার বাবা কে হবে?" নাফিসা বলল, "আমি হবো। মা আর বাবা দুটোই।" মহিলা একটু অবাক চোখে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না।
আয়না তখন তিন মাসের। একটা এতিমখানায়। মা জন্মের পরেই রেখে গেছে। কে সেই মা, কেউ জানে না। আয়নার জন্মের কোনো গল্প নেই, কোনো নাম নেই, কোনো ঠিকানা নেই। শুধু একটা শরীর, ছোট, লাল, চোখ বন্ধ, হাত মুষ্টি করা, যেন পৃথিবীকে ধরতে চাইছে কিন্তু কিছু পাচ্ছে না।
নাফিসা প্রথমবার আয়নাকে কোলে নিল। আয়না চোখ খুলল। তাকাল। নাফিসার দিকে তাকাল। তারপর চোখ বন্ধ করল। ঘুমিয়ে পড়ল। নাফিসার কোলে, নাফিসার গন্ধে, নাফিসার উষ্ণতায়। সেটাই শুরু। সেটাই সবকিছু।
৪
সমাজ বলে অনেক কিছু।
মা বললেন, "বিয়ে না করেই মা?" নাফিসা বলল, "মা হওয়ার জন্য বাবা লাগে না। ভালোবাসা লাগে।" মা চুপ করে গেলেন। মায়ের চুপ থাকা মানে রাগ না। মানে বোঝার চেষ্টা। মা পরে আয়নাকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন, "সুন্দর।" সেটাই যথেষ্ট।
বাবা বললেন, "লোকে কী বলবে?" নাফিসা বলল, "লোকে বলুক।" বাবা কিছু বললেন না। বাবা পরে আয়নাকে দোলনায় দোলাতে দোলাতে ঘুম পাড়ালেন। বাবার হাতে আয়না নিরাপদ ঘুমাল। সেটাই উত্তর।
ভাই বলল, "দিদি, তুমি সব ভেবেচিন্তে করো, তাই কিছু বলছি না।" ভাইয়ের স্ত্রী বললেন, "আমি তো পারতাম না।" নাফিসা হাসল। সবাই পারে না। সবাইকে পারতে হয় না। নাফিসা পারে, সেটাই যথেষ্ট।
অফিসে কলিগরা জানল। কেউ কেউ বলল, "বাহ, সাহসী।" কেউ কেউ পেছনে বলল, "অবিবাহিত, বাচ্চা নিয়েছে, কিছু একটা আছে নিশ্চয়ই।" নাফিসা শুনল। শুনে হাসল। কারণ মানুষ যেটা বোঝে না সেটাকে সন্দেহ করে। একটা নারী বিয়ে না করে, পুরুষ ছাড়া, নিজের ইচ্ছায় মা হতে চাইতে পারে, এই ধারণাটা এত সহজ অথচ এত অবিশ্বাস্য এই সমাজে।
পাড়ার আন্টিরা জিজ্ঞেস করেন, "বাচ্চার বাবা?" নাফিসা বলে, "নেই।" "মারা গেছে?" "না, নেই।" আন্টিরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন। নাফিসা চলে যায়। কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় নেই। কিছু কৌতূহল খাওয়ানোর দায়িত্ব নেই।
৫
আয়না স্কুলে যায়।
KG-2। ছোট ব্যাগ, ছোট টিফিন, ছোট জুতো। নাফিসা প্রতিদিন সকালে তৈরি করে, বাসে তোলে, বিকেলে নামায়। স্কুলে মা-বাবা দুজনের নাম লেখা হয়। নাফিসা লিখেছে: মা, নাফিসা আহমেদ। বাবা: কাটা।
একদিন আয়না স্কুল থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করল।
"আম্মা, সবার বাবা আছে। আমার বাবা কোথায়?"
নাফিসা জানত এই প্রশ্ন আসবে। প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। কিন্তু প্রস্তুতি আর বাস্তব এক না। প্রস্তুতিতে নাফিসা শান্ত ছিল, যুক্তি সাজিয়ে রেখেছিল, সুন্দর বাক্য ভেবে রেখেছিল। বাস্তবে, আয়নার চোখের দিকে তাকিয়ে, সব প্রস্তুতি উড়ে গেল।
নাফিসা আয়নাকে কোলে নিল। বসল। চোখে চোখ রাখল।
"তোমার মা তোমার সবকিছু।"
আয়না তাকাল। পাঁচ বছরের চোখে যে গভীরতা থাকে, সেটা বড়দের চোখে থাকে না। বড়রা প্রশ্ন করে উত্তর খোঁজে। বাচ্চারা প্রশ্ন করে মানুষ খোঁজে। আয়না উত্তর খুঁজছিল না। আয়না খুঁজছিল: আম্মা আছে তো?
"আম্মা, তুমি যাবে না তো?"
"কোথায় যাবো?"
"জানি না। শুধু যাবে না তো?"
"না, আয়না। যাবো না।"
আয়না মাথা নাড়ল। তারপর নেমে গেল কোল থেকে, খেলতে চলে গেল। বাচ্চারা এভাবেই। প্রশ্ন করে, উত্তর পায়, এগিয়ে যায়। বড়রা প্রশ্ন করে, উত্তর পেয়েও আটকে থাকে।
আয়না আর জিজ্ঞেস করেনি বাবার কথা।
৬
রাতে, আয়না ঘুমালে, নাফিসা কোড লেখে।
ল্যাপটপের আলো মুখে পড়ে। স্ক্রিনে অক্ষরের সারি, ফাংশন, ভেরিয়েবল, লুপ। নাফিসা কোড লেখে যেমন কবি কবিতা লেখে, প্রতিটা লাইনে একটা যুক্তি, প্রতিটা ব্লকে একটা সমাধান। কোডের জগতে সবকিছু পরিষ্কার। ইনপুট দিলে আউটপুট আসে। ভুল থাকলে এরর দেখায়। ঠিক করলে কাজ করে। মানুষের জীবনে এত পরিষ্কার কিছু নেই।
মাঝে মাঝে কোড লিখতে লিখতে থামে। আয়নার ঘরের দিকে তাকায়। দরজা একটু ফাঁক রাখে, যেন আয়না ডাকলে শুনতে পায়। আয়না ঘুমের মধ্যে কথা বলে। "আম্মা... পুতুল... পানি..." ঘুমের কথা, অর্থহীন, কিন্তু নাফিসার কাছে সবচেয়ে অর্থপূর্ণ শব্দ।
নাফিসা ভাবে: এই মেয়েটা আমার নয়। এই মেয়েটা কারো নয়। এই মেয়েটা পৃথিবীতে একা এসেছিল, কোনো ঠিকানা ছাড়া, কোনো নাম ছাড়া, কোনো অপেক্ষা ছাড়া। আর আমি তাকে একটা ঠিকানা দিয়েছি, একটা নাম দিয়েছি, একটা কোল দিয়েছি। এটাই মা হওয়া। রক্ত না। জরায়ু না। কাগজও না। মা হওয়া মানে রাত তিনটায় জেগে থাকা কারণ বাচ্চার জ্বর। মা হওয়া মানে সকালে টিফিনে পরোটা ভাঁজ করতে করতে আয়নার প্রিয় আকার মনে রাখা, তারার আকার, সবসময় তারা। মা হওয়া মানে "আম্মা" ডাক শুনলে পুরো শরীর সাড়া দেওয়া, যেন সেই শব্দটা শুধু কান দিয়ে না, হাড় দিয়ে ঢোকে।
৭
একদিন স্কুলের অনুষ্ঠানে আয়না মঞ্চে উঠল।
কবিতা আবৃত্তি। ছোট কবিতা, চার লাইন। আয়না দাঁড়াল, মাইকের সামনে, চোখ বড় বড়, হাত কাঁপছে। নাফিসা সামনের সারিতে। আয়না নাফিসার দিকে তাকাল। নাফিসা মাথা নাড়ল: বলো।
আয়না বলল। চার লাইন। ভুল করেনি। শেষে সবাই তালি দিল। আয়না দৌড়ে নেমে এলো, সোজা নাফিসার কোলে।
"আম্মা, আমি পেরেছি?"
"পেরেছিস।"
পাশের সিটে আরেক মা বসে ছিলেন। তাঁর পাশে তাঁর স্বামী। দুজনে তাঁদের ছেলের জন্য তালি দিচ্ছিলেন। সেই মা নাফিসার দিকে তাকালেন। একটু সমবেদনার চোখে। নাফিসা বুঝল: এই চোখ বলছে, "বেচারা, একা।"
নাফিসা একা না। আয়না আছে। আয়না থাকলে নাফিসা কখনো একা না। আর আয়না সবসময় থাকবে। কারণ নাফিসা আয়নাকে বেছে নিয়েছে। জন্মের বাধ্যবাধকতায় নয়, সামাজিক চাপে নয়, দুর্ঘটনায় নয়। বেছে। চেয়ে। খুঁজে। পেয়ে।
বেছে নেওয়া ভালোবাসা জন্মগত ভালোবাসার চেয়ে কম কিনা? নাফিসা জানে: না। বেছে নেওয়া ভালোবাসা প্রতিদিন নতুন করে সিদ্ধান্ত। প্রতিদিন নতুন করে "হ্যাঁ।" সেটা আরো গভীর। সেটা আরো সত্য।
৮
একটা রবিবার। নাফিসা আর আয়না পার্কে।
আয়না দোলনায় চড়ছে। "আম্মা, ধাক্কা দাও!" নাফিসা ধাক্কা দেয়। আয়না ওপরে ওঠে, হাসে, চুল উড়ে যায়, হাত ছড়িয়ে দেয় যেন উড়তে চাইছে। নাফিসা দেখে। দেখতে দেখতে ভাবে: এই হাসিটা আমার তৈরি। এই মুহূর্তটা আমার তৈরি। এই মেয়েটার জীবনে আমি না থাকলে সে এখন এতিমখানায় থাকত, দোলনায় চড়ত না, "আম্মা" বলে ডাকত না।
পাশের বেঞ্চে একটা পরিবার বসে আছে। বাবা, মা, দুই ছেলে। বাবা ফোনে আছেন। মা ছেলেদের ডাকছেন, "এদিকে এসো, জুস খাও।" সাধারণ দৃশ্য। সাধারণ পরিবার। নাফিসা তাকায়। ঈর্ষা? না। ঈর্ষা তার নেই। সে যা চেয়েছে তা পেয়েছে। সে চেয়েছিল একটা মেয়ে। পেয়েছে। সে চেয়েছিল মা হতে। হয়েছে। বাকি যা নেই, সেটা সে চায়নি।
আয়না দৌড়ে এলো। "আম্মা, আইসক্রিম খাবো।"
"কোনটা?"
"চকলেট।"
নাফিসা আইসক্রিম কিনল। দুটো। একটা চকলেট, একটা ভ্যানিলা। দুজনে বেঞ্চে বসে খেল। আয়নার মুখে চকলেটের দাগ। নাফিসা টিস্যু দিয়ে মুছিয়ে দিল। এই ছোট কাজটুকু, মুখ মোছানো, এটাই মাতৃত্ব। বড় কিছু না। ছোট ছোট কাজ। প্রতিদিনের। প্রতিমুহূর্তের। সেগুলো জোড়া লাগলে একটা জীবন হয়।
৯
আয়না ঘুমিয়ে পড়েছে। নাফিসা পাশে শুয়ে।
আয়নার শ্বাসের শব্দ। ছোট, ধীর, সমান। নাফিসা চোখ বন্ধ করে শোনে। এই শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত শব্দ। একটা বাচ্চার ঘুমের শ্বাস। সবকিছু ঠিক আছে এই মুহূর্তে। কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো বিচার নেই, কোনো কৌতূহল নেই। শুধু দুজন। একটা মা, একটা মেয়ে। একটা ছাদ। একটা রাত।
নাফিসা জানে, আয়না বড় হলে আরো প্রশ্ন আসবে। "আমি কোথা থেকে এসেছি?" "আমার আসল মা কে?" "তুমি কেন আমাকে নিয়েছিলে?" প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর নাফিসা প্রস্তুত করে রাখবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় উত্তর হবে এটা: আমি তোমাকে চেয়েছিলাম। পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি। আর সেই চাওয়া থেকে তুমি আমার হয়েছো।
বাইরে ঢাকা শহরের শব্দ। গাড়ি, হর্ন, দূরে ট্রেনের বাঁশি। নাফিসার ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে উত্তরার আকাশ দেখা যায়। তারা কম, আলো দূষণে। কিন্তু একটা দুটো আছে।
নাফিসা তারার দিকে তাকায়। আয়নার পাশে শুয়ে।
মা হওয়ার জন্য বাবা লাগে না। ভালোবাসা লাগে।
ভালোবাসা আছে। ছাদ আছে। আয়না আছে। আর কিছু লাগে না।
নাফিসা চোখ বন্ধ করে। ঘুমায়। আয়নার পাশে। দুজনের শ্বাস একটা ছন্দে মেশে। মা আর মেয়ে। শুধু দুজন। কিন্তু পূর্ণ।