প্রবাসী নারী
বিদেশে গিয়েছিলাম মানুষ হতে। মানুষ হিসেবে গণ্য হইনি।
১
জরিনা বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে ছিল যেদিন, সেদিন তার পায়ে নতুন স্যান্ডেল ছিল।
লাল স্যান্ডেল। একশো বিশ টাকায় কেনা। সিরাজগঞ্জের বাজার থেকে। মা বলেছিল, "নতুন দেশে যাচ্ছিস, নতুন জুতা পর।" জরিনা পরেছিল। পা ফোসকা পড়েছিল বিমানবন্দরের মেঝেতে হাঁটতে হাঁটতে, কিন্তু সেটা কিছু না। ফোসকা সারে। স্বপ্ন সারে না।
ছাব্বিশ বছর বয়সে জরিনা প্রথমবার বিমানে উঠেছিল। জানালার পাশে বসেছিল। নিচে বাংলাদেশ ছোট হয়ে যাচ্ছিল। নদী, মাঠ, টিনের চাল, সব মিশে যাচ্ছিল। জরিনা ভেবেছিল, ওপর থেকে দেখলে সব দেশ একই রকম লাগে। মাটি থেকে দেখলে আলাদা। মাটি থেকে দেখলে কোনো দেশ তোমাকে চেনে, কোনো দেশ চেনে না।
দালাল দুই লাখ নিয়েছিল। বাবার জমি বন্ধক দিয়ে টাকাটা জোগাড় করা হয়েছিল। দেড় বিঘা জমি। সেই জমিতে ধান হতো, পাট হতো, শীতে সরিষা ফুটত হলুদ হয়ে। সেই জমি এখন মহাজনের কাছে। জরিনা জানত, ফিরে এসে টাকা না দিলে জমি আর ফেরত আসবে না। জমি ফেরত আনতেই সে যাচ্ছে। জমি, আর পরিবার, আর ভবিষ্যৎ।
দালাল বলেছিল, "ভালো বাড়ি। ধনী পরিবার। মাসে পঁচিশ হাজার রিয়াল পাবে। খাওয়া-থাকা ফ্রি।" জরিনা হিসাব করেছিল। পঁচিশ হাজার রিয়াল মানে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সত্তর হাজার। মাসে সত্তর হাজার। দুই বছরে সতেরো লাখ। তার মধ্যে দালালের টাকা, জমির টাকা, বাবার ওষুধের টাকা, ছোট ভাইয়ের পড়ার খরচ, সব হয়ে যাবে।
হিসাব। সুন্দর হিসাব। কাগজে-কলমে সব মেলে। জীবনে কিছুই মেলে না।
২
রিয়াদের বাড়িটা বড় ছিল।
এত বড় বাড়ি জরিনা কখনো দেখেনি। সিরাজগঞ্জে সবচেয়ে বড় বাড়ি ইউএনও সাহেবের, সেটাও এই বাড়ির গেটরুমের সমান না। মার্বেলের মেঝে। ঝাড়বাতি। সোফায় চামড়ার কভার। বাথরুমে সোনার রঙের কল। জরিনা প্রথমদিন ভেবেছিল, এত সুন্দর বাড়িতে নিশ্চয়ই সুন্দর মানুষ থাকে।
ম্যাডাম ছিল লম্বা। চওড়া। গলায় সোনার হার। চোখে কাজল। প্রথমদিন ম্যাডাম জরিনার দিকে তাকিয়েছিল যেভাবে মানুষ দোকানে জিনিস দেখে। ওপর থেকে নিচ, নিচ থেকে ওপর। তারপর আরবিতে কিছু বলেছিল। জরিনা বোঝেনি। পাশে দাঁড়ানো এজেন্সির লোকটা অনুবাদ করেছিল: "ম্যাডাম বলছে, তুমি পাতলা। কাজ পারবে?"
জরিনা বলেছিল, "পারব।"
সেটাই তার শেষ পছন্দ ছিল। সেই "পারব" বলার পর আর কোনো পছন্দ ছিল না।
এজেন্সির লোকটা চলে গেল। জরিনার পাসপোর্ট ম্যাডামের কাছে গেল। জরিনা বলেছিল, "আমার পাসপোর্ট আমার কাছে থাকবে না?" লোকটা হেসেছিল। "এখানে এভাবেই হয়। চিন্তা করো না।"
চিন্তা। জরিনা সেই মুহূর্তে বোঝেনি যে পাসপোর্ট মানে পরিচয়, পরিচয় মানে অস্তিত্ব, আর অস্তিত্ব কেউ যখন তালাবদ্ধ করে রাখে, তখন তুমি আর মানুষ থাকো না। তুমি একটা জিনিস হয়ে যাও। ব্যবহারযোগ্য জিনিস।
৩
ভোর পাঁচটায় উঠতে হতো।
নামাজের আগে। বাড়িতে নয়জন মানুষ। স্যার, ম্যাডাম, চার সন্তান, স্যারের মা, আর দুই আত্মীয় যারা মাঝে মাঝে আসত। নয়জনের প্রাতঃরাশ, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার। বাসন ধোয়া। কাপড় ধোয়া। ঘর মোছা। বাথরুম পরিষ্কার করা। বাগানে পানি দেওয়া। বাচ্চাদের দেখাশোনা। ম্যাডামের চা বানানো, ঠিক সেই তাপমাত্রায়, ঠিক সেই পরিমাণ চিনি দিয়ে।
রাত বারোটার আগে ঘুমানো হতো না। কখনো একটায়। কখনো দেড়টায়। জরিনার ঘর ছিল রান্নাঘরের পাশে একটা ছোট খুপরি। জানালা নেই। একটা পাতলা তোশক। একটা বালিশ। দরজায় তালা ছিল, বাইরে থেকে। ম্যাডাম রাতে তালা দিত। জরিনা জিজ্ঞেস করেছিল, "কেন?" ম্যাডাম বলেছিল, "চুরি করবে।"
চুরি। জরিনা সিরাজগঞ্জে কখনো একটা সুই চুরি করেনি। কিন্তু এখানে সে চোর। এখানে সে সন্দেহভাজন। এখানে তার চামড়ার রঙ, তার ভাষা, তার দারিদ্র্য, সবকিছু তাকে সন্দেহভাজন বানিয়ে রেখেছে।
প্রথম মাসে বেতন পায়নি। দ্বিতীয় মাসেও না। জরিনা জিজ্ঞেস করল, ম্যাডাম বলল, "পরে দেব।" তৃতীয় মাসে জরিনা আবার জিজ্ঞেস করল। ম্যাডাম চড় মারল।
প্রথম চড়।
জরিনার গালে ম্যাডামের আংটির দাগ বসে গেল। রক্ত বেরোল না, কিন্তু চামড়া ফুলে উঠল। জরিনা কাঁদেনি। কাঁদলে আরেকটা চড় আসবে, এটা সে বুঝতে পেরেছিল।
৪
চড় থেকে লাথি।
লাথি থেকে চুলে ধরে টানা। চুলে ধরে টানা থেকে গরম পানি ছুড়ে দেওয়া। গরম পানি থেকে ইস্ত্রি ছোঁয়ানো।
ধাপে ধাপে। যেভাবে সিঁড়ি ওঠা হয়, তেমন করে নির্যাতনও বাড়ে। প্রতিটা ধাপে জরিনা ভাবত, এটাই শেষ। এর চেয়ে বেশি আর কী হতে পারে। তারপর পরের ধাপ আসত, আর জরিনা বুঝত, মানুষের নিষ্ঠুরতার কোনো সিঁড়ি শেষ হয় না।
বাম হাতের কবজিতে ইস্ত্রির দাগ এখনো আছে। গোলাকার। চামড়া পুড়ে সাদা হয়ে গেছে। সেদিন জরিনা ম্যাডামের শাড়িতে ইস্ত্রি করছিল, একটু ভাঁজ বেঁকে গেছিল, ম্যাডাম ইস্ত্রিটা নিয়ে জরিনার হাতে চেপে ধরেছিল। জরিনা চিৎকার করেছিল। ম্যাডাম বলেছিল, "চুপ। নইলে পুলিশ ডাকব। তোকে জেলে পাঠাব। তোর ভিসা আমার নামে। আমি বলব তুই পালিয়েছিস।"
পুলিশ। জেল। ভিসা। প্রতিটা শব্দ একটা দেয়াল। জরিনা সেই দেয়ালগুলোর মধ্যে বন্দি ছিল। বাইরে রিয়াদের রোদ, গাড়ির শব্দ, মানুষের হাঁটাচলা। ভেতরে জরিনা, একটা খুপরিতে, তালাবন্ধ।
ফোন করার অনুমতি ছিল না। ম্যাডাম জরিনার মোবাইল কেড়ে নিয়েছিল দ্বিতীয় সপ্তাহেই। "ফোনে কথা বললে কাজ হয় না।" জরিনার মা ফোন পেত না। বাবা ফোন পেত না। ছোট ভাই ফোন পেত না। তারা ভাবত, জরিনা ব্যস্ত। কাজ করছে। টাকা জমাচ্ছে। জমি ফেরত আনছে।
ছয় মাস কেটে গেল। বেতন পেল না। একটা টাকাও না।
৫
একদিন ম্যাডাম বাইরে গেল। বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও। বাড়িতে শুধু জরিনা আর স্যারের মা।
বৃদ্ধা। আশি পার। হুইলচেয়ারে বসে থাকে। কথা বলে কম। কিন্তু সেদিন বৃদ্ধা জরিনাকে ডাকল। আরবিতে কিছু বলল। জরিনা ততদিনে একটু একটু আরবি বুঝত। বৃদ্ধা বলল, "তুমি কেন কাঁদো রাতে?"
জরিনা চমকে গেল। রাতে সে কাঁদে, এটা কেউ জানে, এটা সে ভাবেনি।
বৃদ্ধা একটা পুরোনো মোবাইল ফোন দিল। নিজের। "এটা দিয়ে ফোন করো। কিন্তু আমার মেয়েকে বলো না।"
জরিনা ফোনটা হাতে নিয়ে কাঁপছিল। আট মাস পর। প্রথমে মায়ের নম্বর ডায়াল করল। রিং হচ্ছে। একটা। দুটো। তিনটা।
"হ্যালো?"
মায়ের গলা।
জরিনা কথা বলতে পারল না। গলায় কিছু আটকে গেল। আট মাসের সব কথা, সব ব্যথা, সব চড়, সব লাথি, সব ক্ষুধা, সব অন্ধকার, সব একসাথে গলায় এসে জমা হলো, আর কিছুই বেরোল না।
"হ্যালো? কে?"
জরিনা বলল, "মা।"
মা কাঁদতে শুরু করল।
জরিনাও।
দুই মিনিট। দুজনে কাঁদল। তারপর মা বলল, "তুই ভালো আছিস?" জরিনা বলল, "হ্যাঁ, মা। ভালো আছি।"
মায়ের মিথ্যা মেয়েও শেখে।
৬
জরিনা বাংলাদেশ দূতাবাসের নম্বর যোগাড় করল। কীভাবে, সেটা একটা আলাদা গল্প। ইন্দোনেশিয়ান একটা মেয়ে ছিল পাশের বাড়িতে, সেও গৃহকর্মী, সে দিয়েছিল। দুজনে বাড়ির ছাদে দেখা হতো, যখন কাপড় শুকাতে দিত। পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। দুটো মেয়ে, দুটো দেশ, একই কাহিনি।
জরিনা দূতাবাসে ফোন করল।
রিং হলো। কেউ ধরল না। আবার করল। আবার ধরল না। তৃতীয়বার করল। কেউ ধরল। একজন পুরুষ। বাংলায় বলল, "বাংলাদেশ দূতাবাস।"
জরিনা সব বলল। বেতন পায়নি। মারধর করে। পাসপোর্ট নিয়ে গেছে। ফোন কেড়ে নিয়েছে। ঘরে তালা দিয়ে রাখে।
লোকটা শুনল। তারপর বলল, "ঠিক আছে, আমরা দেখছি। আপনার নাম আর পাসপোর্ট নম্বর দেন।"
জরিনা দিল।
"আমরা যোগাযোগ করব।"
যোগাযোগ কেউ করল না। এক সপ্তাহ। দুই সপ্তাহ। এক মাস। কেউ করল না।
জরিনা আবার ফোন করল। এবার অন্য কেউ ধরল। আবার সব বলল। আবার বলল, "দেখছি।"
দেখল না।
দূতাবাস। নিজের দেশের দূতাবাস। নিজের পতাকার নিচে বসে থাকা মানুষ। তারাও দেখল না। জরিনা ভাবল, যদি সে ধনীর মেয়ে হতো, যদি সে মন্ত্রীর আত্মীয় হতো, যদি তার কণ্ঠস্বর টেলিভিশনে পৌঁছাত, তাহলে কি কেউ দেখত?
গরিবের চিৎকার শোনা যায় না। গরিবের চিৎকারের কোনো ফ্রিকোয়েন্সি নেই যেটা ক্ষমতাবানদের কানে পৌঁছায়।
৭
দুই বছর।
সাতশো ত্রিশ দিন। জরিনা গুনেছে। প্রতিটা দিন গুনেছে। খুপরির দেয়ালে আঁচড় দিয়ে গুনেছে, যেভাবে সিনেমায় বন্দিরা দিন গোনে। শুধু এটা সিনেমা না। এটা রিয়াদের একটা বড় বাড়ির রান্নাঘরের পাশের ছোট ঘর।
বেতন পেয়েছিল শেষ পর্যন্ত। পুরোটা না। দুই বছরের বেতন ছিল ছয় লাখ। ম্যাডাম দিয়েছিল তিন লাখ। "বাকিটা তোর খাওয়ার খরচ, থাকার খরচ, ভিসার খরচ," ম্যাডাম বলেছিল।
তিন লাখ। দুই বছরের জীবনের দাম। দুই বছরের চড়ের দাম। দুই বছরের অন্ধকারের দাম। দুই বছরের একাকীত্বের দাম।
জরিনা ফিরে আসার অনুমতি পেয়েছিল কীভাবে? ম্যাডাম নতুন একটা মেয়ে আনিয়েছিল। ফিলিপাইনের মেয়ে। জরিনার বদলে। জরিনাকে আর দরকার নেই। জিনিস পুরোনো হলে বদলে ফেলা হয়।
পাসপোর্ট ফেরত পেল। বিমানবন্দরে গেল। এবার জানালার পাশে বসেনি। মাঝের সিটে বসেছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর ইচ্ছে ছিল না। রিয়াদ ছোট হয়ে যাচ্ছে, এটা দেখতে চায়নি। কিছু জায়গা ছোট হলেও মনের ভেতর বড় থেকে যায়।
৮
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নামল জরিনা।
মা এসেছিল। বাবা আসেনি, হাঁটতে পারে না এখন। ছোট ভাই এসেছিল। মা জরিনাকে জড়িয়ে ধরল। জরিনার শরীর শক্ত হয়ে গেল। দুই বছর কেউ ছোঁয়নি, ভালোবাসার ছোঁয়া নেই, শুধু মারের ছোঁয়া। শরীর ভুলে গেছে ভালোবাসার স্পর্শ কেমন লাগে। শরীর মনে রাখে শুধু ভয়।
বাড়ি ফিরে জরিনা ঘরে ঢুকল। সেই ঘর। টিনের চাল। মাটির মেঝে। জানালায় পুরোনো শাড়ি ঝোলানো পর্দার বদলে। রিয়াদের মার্বেলের মেঝে নেই, ঝাড়বাতি নেই, সোনার রঙের কল নেই। কিন্তু দরজায় তালা নেই। বাইরে থেকে কেউ তালা দেয় না। এটুকুই যথেষ্ট।
জরিনা তিন লাখ টাকা এনেছিল। এক লাখ দিয়ে জমি ছাড়িয়ে আনল। এক লাখ দিয়ে বাবার চিকিৎসা। বাকি এক লাখ ব্যাংকে রাখল।
জমি ফিরে এসেছে। বাবার ওষুধ চলছে। ছোট ভাই এসএসসি দিচ্ছে।
কাগজে-কলমে সব ঠিক আছে।
৯
কিন্তু জরিনা ঠিক নেই।
রাতে ঘুম আসে না। আসলে ভয় জাগে। ছোট্ট শব্দে চমকে ওঠে। দরজা বন্ধের আওয়াজে হাত কাঁপে। কেউ পেছন থেকে ডাকলে পুরো শরীর শক্ত হয়ে যায়। বুকের ভেতর একটা কিছু থরথর করে কাঁপে, সারাক্ষণ, যেন একটা পাখি খাঁচায় আটকা পড়ে ছটফট করছে।
মা বলে, "কী হয়েছে তোর?"
জরিনা বলে, "কিছু না।"
রাতে দুঃস্বপ্ন আসে। ম্যাডামের মুখ। চওড়া মুখ। কাজলের চোখ। হাতে ইস্ত্রি। জরিনা চিৎকার করে ঘুম ভাঙে। মা পাশে এসে বসে। মাথায় হাত বোলায়। কিন্তু জরিনার মাথায় হাত পড়লে সে সরে যায়। ছোঁয়া ভালোবাসার হলেও শরীর চেনে না। শরীর শুধু বিপদ চেনে।
গ্রামের ডাক্তার বলল, "দুর্বলতা। ভিটামিন খাও।"
ভিটামিন দিয়ে কি ভেতরের ক্ষত সারে? ভিটামিন দিয়ে কি দুই বছরের আতঙ্ক মুছে যায়? জরিনা জানে, তার রোগের নাম গ্রামের ডাক্তার জানে না। তার রোগের নাম শহরের ডাক্তাররা জানে, কিন্তু শহরে যাওয়ার খরচ তার নেই। তার রোগের নাম তিনটা ইংরেজি অক্ষর, সেটা জরিনা জানে না, কিন্তু রোগটা জানে। রোগটা তার শরীরে, তার ঘুমে, তার জেগে থাকায়, সব জায়গায়।
১০
সিরাজগঞ্জের বাজারে জরিনা যায়। মাছ কিনতে, তরকারি কিনতে। লোকে তাকায়। ফিসফিস করে। "সৌদি ফেরত। টাকা এনেছে। কিন্তু দেখো, চেহারা কেমন হয়ে গেছে।"
চেহারা। জরিনা আয়নায় দেখে নিজেকে। ছাব্বিশে যে মেয়েটা গিয়েছিল, আটাশে যে মেয়েটা ফিরেছে, দুজন আলাদা। চোখের নিচে কালো দাগ, যেটা আর যায় না। গালের হাড় বেরিয়ে আছে। চুল পাতলা হয়ে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন চোখে। চোখে একটা ফাঁকা জায়গা আছে, যেখানে আগে বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাস রিয়াদে রয়ে গেছে। ম্যাডামের বাড়ির খুপরিতে, দেয়ালের আঁচড়ের সাথে।
গ্রামের মেয়েরা আসে। জিজ্ঞেস করে, "আপা, আমিও যাব। কীভাবে যাই?" জরিনা বলে, "যেও না।" তারা বলে, "কেন? আপনি তো গিয়েছিলেন।" জরিনা বলে, "তাই তো বলছি, যেও না।"
কেউ শোনে না। গরিবের কাছে শোনার বিলাসিতা নেই। গরিব শোনে পেটের কথা। পেট বলে, "যাও।" তারা যায়।
জরিনা দেখে। একটার পর একটা মেয়ে যায়। দালালের হাত ধরে। নতুন জুতা পরে। নতুন স্বপ্ন নিয়ে। জরিনা জানে, তাদের কেউ কেউ ফিরবে তার মতো। ভাঙা। তালাবন্ধ ঘরের স্মৃতি নিয়ে। ইস্ত্রির দাগ নিয়ে। রাতের দুঃস্বপ্ন নিয়ে।
কিন্তু কেউ কেউ ফিরবে ভালো করে। সবার গল্প একই না। জরিনা এটুকু জানে।
১১
সন্ধ্যায় জরিনা উঠানে বসে। বাঁশঝাড়ের ওপর দিয়ে আকাশ দেখে। এই আকাশ রিয়াদের আকাশের চেয়ে আলাদা। এই আকাশের তলায় জরিনা মুক্ত। কেউ তালা দেয় না। কেউ পাসপোর্ট কেড়ে নেয় না। কেউ চড় মারে না।
কিন্তু মুক্তি কি শুধু তালা না থাকা? মুক্তি কি শুধু চড় না খাওয়া?
জরিনা জানে, সে মুক্ত নয়। সে এখনো সেই খুপরিতে আছে। মাথার ভেতরে। সেই ছোট ঘর, সেই তালা, সেই অন্ধকার, সেগুলো তার মাথার ভেতরে আছে, আর সেখান থেকে বেরোনোর কোনো বিমান নেই।
ছোট ভাই এসে বলল, "আপু, চা খাবা?"
জরিনা তাকাল। ভাইয়ের মুখে হাসি। নিষ্পাপ হাসি। এই হাসির জন্য সে গিয়েছিল। এই হাসির জন্য সে সহ্য করেছিল। এই হাসিটুকু রক্ষা করার জন্য তিন লাখ টাকা আর দুই বছরের জীবন দিয়েছিল।
"দে।"
চায়ে চুমুক দিতে দিতে জরিনা ভাবে।
বিদেশে গিয়েছিলাম মানুষ হতে। মানুষ হিসেবে গণ্য হইনি। ফিরে এসেছি। এখন মানুষ হতে শিখছি। আবার। প্রথম থেকে।
বাম হাতের কবজিতে ইস্ত্রির দাগটা চকচক করে। জরিনা সেটার ওপর আঙুল বোলায়। এটা দাগ না। এটা প্রমাণ। জরিনা ছিল, জরিনা সহ্য করেছে, জরিনা ফিরেছে।
এটুকুই।