নার্সিং ছাত্রী

এই দেশে নার্সকে সেবিকা বলে। সেবিকা মানে সেবা করো, সম্মান চাইও না।

পর্ব ৪২ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

তানজিলা সকাল ছয়টায় ওয়ার্ডে ঢোকে।

গন্ধটা প্রথমে লাগত। ডেটল, রক্ত, ঘাম, পুরোনো চাদর, সবকিছু মিশে একটা গন্ধ তৈরি হয় সরকারি হাসপাতালে, যেটা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। প্রথম সপ্তাহে তানজিলা বমি করেছিল। দ্বিতীয় সপ্তাহে গলা পর্যন্ত উঠত। তৃতীয় সপ্তাহে অভ্যাস হয়ে গেল। মানুষ সবকিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এটাই মানুষের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতা, আর সবচেয়ে বড় অভিশাপ।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তৃতীয় বর্ষ, বিএসসি ইন নার্সিং। তানজিলার ব্যাচে ত্রিশজন ছাত্রী, পাঁচজন ছাত্র। ছাত্র কম, কারণ নার্সিং পুরুষের পেশা না, এই দেশে। পুরুষ ডাক্তার হয়, নার্স হয় না। নার্স মানে মেয়ে। নার্স মানে সেবিকা। সেবিকা মানে সেবা করো, প্রশ্ন করো না, সম্মান চেয়ো না।

তানজিলা কুমিল্লার মেয়ে। বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। মা গৃহিণী। দুই বোন, এক ভাই। তানজিলা বড়। এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল। সবাই বলেছিল, "মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দে।" তানজিলা দিয়েছিল। হয়নি। সিটের চেয়ে চেষ্টা বেশি, এই দেশে এটা নতুন কিছু না। তারপর নার্সিংয়ে ভর্তি হলো। বাবা বলেছিল, "নার্সিংও ভালো। সেবার কাজ।" মা কিছু বলেনি। মা জানত, মেয়ের মনে অন্য স্বপ্ন আছে, কিন্তু স্বপ্নের কথা বলার সময় এটা না।

ওয়ার্ড নম্বর ১২। মেডিসিন। তিরিশটা বেড। পঁয়তাল্লিশজন রোগী। বেডের নিচে মাদুর পেতে শুয়ে আছে বাকিরা। একজন নার্সের দায়িত্বে পনেরোজন রোগী। কখনো বিশজন। কখনো বেশি।

তানজিলা ব্লাড প্রেশার মাপছিল তৃতীয় বেডের রোগীর। বয়স্ক পুরুষ। ষাটের কাছাকাছি। বাম হাতে কাফ বাঁধতে গেল, রোগী ডান হাত দিয়ে তানজিলার কোমর ধরল।

তানজিলা সরে গেল। একটা কথাও বলেনি।

এটা প্রথমবার না। এটা চতুর্থ সপ্তাহে পঞ্চমবার। প্রতিবার আলাদা রোগী। প্রতিবার আলাদা হাত। কিন্তু প্রতিবার একই জায়গায়, একই ভাব, একই হিসাব: মেয়ে তো, নার্স তো, কিছু বলবে না তো।

প্রথমবার তানজিলা সিনিয়র নার্সকে বলেছিল। সিনিয়র নার্স, নাজমা আপা, পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতা, বলেছিল, "এসব সহ্য করতে শেখো। প্রতিটা রোগী মানুষ না। কিছু রোগী পশু। কিন্তু তুমি সেবিকা। তোমাকে সেবা করতে হবে।"

সেবা। সেবা মানে শরীর ছুঁয়ে যাওয়া সহ্য করা? সেবা মানে অশ্লীল মন্তব্য শুনে চুপ থাকা? সেবা মানে রোগীর হাত সরিয়ে দিয়ে আবার ব্লাড প্রেশার মাপা, যেন কিছু হয়নি?

তানজিলা জিজ্ঞেস করেনি। জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসত, "চাকরি করতে চাইলে সহ্য করো। না চাইলে ছেড়ে দাও।" এই দেশে প্রশ্ন করার শাস্তি বেকারত্ব।

ডাক্তারদের কথা আলাদা।

তানজিলা আইসিইউতে পোস্টিং পেয়েছিল দ্বিতীয় বর্ষে। আইসিইউ মানে গুরুতর রোগী। আইসিইউ মানে মৃত্যুর কাছে দাঁড়িয়ে কাজ করা। আইসিইউ মানে দক্ষতা, মনোযোগ, দ্রুততা।

ডাঃ রেজাউল। রেজিস্ট্রার। তিনজন ইন্টার্নকে নিয়ে রাউন্ড করছিল। তানজিলা ভেন্টিলেটরের রিডিং নোট করছিল। ডাঃ রেজাউল পেছন থেকে এসে তানজিলার কাঁধে হাত রাখল।

"কী লিখছো?"

তানজিলা কাঁধ সরাল। "ভেন্টিলেটর রিডিং, স্যার।"

"বাসায় কি একা থাকো?"

প্রশ্নটা আইসিইউর সাথে সম্পর্কিত না। প্রশ্নটা ভেন্টিলেটরের সাথে সম্পর্কিত না। প্রশ্নটা চিকিৎসার সাথে সম্পর্কিত না। প্রশ্নটা একটা মেয়ের একা থাকা না-থাকার সাথে সম্পর্কিত। এই প্রশ্নের ভেতরে একটা প্রস্তাব আছে, যেটা প্রশ্নকর্তা জানে, প্রশ্নপ্রাপ্ত জানে, কিন্তু কেউ স্পষ্ট বলে না।

তানজিলা বলল, "হোস্টেলে থাকি, স্যার। রুমমেট আছে।"

ডাঃ রেজাউল হেসে চলে গেল। হাসিটা তানজিলার গায়ে লেগে রইল, আঠার মতো।

পরের সপ্তাহে ডাঃ রেজাউল তানজিলাকে তার চেম্বারে ডাকল। "একটা কনফারেন্স আছে চট্টগ্রামে। তুমি আসবে? তোমার জন্য আলাদা রুম বুকিং করা আছে।"

তানজিলা বলল, "পারব না, স্যার। পরীক্ষা আছে।"

ডাঃ রেজাউল বলল, "তোমার পরীক্ষার রেজাল্ট আমার হাতে থাকে, জানো তো?"

জানে। তানজিলা জানে। প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার নম্বরের একটা অংশ ক্লিনিক্যাল সুপারভাইজারের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। ডাঃ রেজাউল ক্লিনিক্যাল সুপারভাইজার। ডাঃ রেজাউলের হাতে তানজিলার নম্বর। ডাঃ রেজাউলের হাতে তানজিলার ভবিষ্যৎ।

তানজিলা চুপ করে বেরিয়ে এল।

সেই রাতে হোস্টেলে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল। রুমমেট সুমি জিজ্ঞেস করেছিল, "কী হয়েছে?" তানজিলা বলেছিল, "কিছু না।" সুমি বুঝেছিল। সুমিরও একই অভিজ্ঞতা। সবারই একই অভিজ্ঞতা। কেউ বলে না। বললে কী হবে? কে শুনবে? কোন কমিটি? কোন প্রশাসন? অভিযোগ করলে বদনাম হবে মেয়েটার, ডাক্তারের না।

রোগীর পরিবার আরেক অধ্যায়।

তানজিলা ইনজেকশন দিচ্ছিল একটা বাচ্চাকে। পাঁচ বছরের মেয়ে। জ্বর। ইনজেকশনের সুই ঢোকাতে গেল, বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। বাচ্চার বাবা, লম্বা মানুষ, গলায় সোনার চেইন, এসে তানজিলাকে ধমক দিল: "কী করছো? ব্যথা দিচ্ছো কেন? তুমি কি নার্স না মহিষ?"

মহিষ।

তানজিলা চুপ করে ইনজেকশন দিল। বাচ্চাটা কাঁদছে। বাবা গজগজ করছে। তানজিলার হাত কাঁপছে না। হাত কাঁপলে ভুল হবে। ভুল হলে আরও বকা খাবে। আরও অপমান। তানজিলা শিখেছে হাত স্থির রাখতে। শরীর কাঁপলেও হাত স্থির। ভেতরে ঝড় থাকলেও বাইরে শান্ত। এটাই নার্সিং।

ডাক্তারকে কেউ মহিষ বলে না। ডাক্তার ইনজেকশন দিলে "ব্যথা লাগবে একটু, সহ্য করো।" নার্স ইনজেকশন দিলে "মহিষ।" একই কাজ। একই সুই। আলাদা সম্মান।

তানজিলা বাবাকে বলল, "বাচ্চাকে ধরুন। নড়াচড়া করলে ব্যথা বেশি লাগে।"

বাবা বলল, "তুমি আমাকে শেখাচ্ছো? ডাক্তার ডাকো।"

ডাক্তার ডাকো। মানে নার্সের কথা যথেষ্ট না। মানে নার্স জানে না। মানে নার্স শুধু হাতের কাজ করে, মাথার কাজ ডাক্তারের। তানজিলা চার বছর পড়াশোনা করছে। অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি, সব পড়েছে। তানজিলা জানে এই ইনজেকশনে কোন ওষুধ আছে, কেন দেওয়া হচ্ছে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী, ডোজ কত। কিন্তু রোগীর বাবার কাছে তানজিলা শুধু একটা মেয়ে, সুই ফোটায়, এটুকুই।

রাতের শিফট সবচেয়ে কঠিন।

রাত দশটা থেকে সকাল ছয়টা। হাসপাতালের করিডোর ফাঁকা হয়ে যায়। লাইট ডিম। ওয়ার্ডে রোগীরা ঘুমায়, বা ঘুমানোর চেষ্টা করে। নার্সেস স্টেশনে দুজন নার্স। পুরো ওয়ার্ডের দায়িত্ব।

তানজিলা রাতের শিফটে একা হাঁটে করিডোরে। রাউন্ড দিতে হয়। প্রতিটা রোগী দেখতে হয়। ড্রিপ ঠিক আছে কিনা, অক্সিজেন চলছে কিনা, জ্বর বেড়েছে কিনা। একা। অন্ধকার করিডোরে। জুতার শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়।

একরাতে একটা পুরুষ রোগীর বেডসাইডে গেল তানজিলা। ড্রিপ বদলাতে হবে। রোগী জেগে ছিল। রোগী তানজিলার হাত ধরল। শক্ত করে।

"ছেড়ে দিন।"

"একটু বসো।"

"ছেড়ে দিন। আমি ডিউটিতে আছি।"

"ডিউটি তো সারারাত। একটু বসো।"

তানজিলা হাত ছাড়িয়ে নিল। জোরে। দ্রুত পায়ে নার্সেস স্টেশনে ফিরে গেল। আরেক নার্সকে বলল, "সাত নম্বর বেডের ড্রিপ বদলাও তুমি। আমি পারব না।"

সিনিয়র নার্স জিজ্ঞেস করল না কেন পারবে না। জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। সবাই জানে। সবাই জানে কোন বেডের রোগী "সমস্যা।" কিন্তু কেউ কিছু করে না। কারণ রোগী রোগী। রোগীর সেবা করতে হবে। রোগী যা-ই করুক।

তানজিলা পড়ে। রাতে, হোস্টেলে, ক্লাসের পড়া শেষ করে অন্য পড়া শুরু করে।

NMC। Nursing and Midwifery Council, United Kingdom। CBT পরীক্ষা। Computer Based Test। এটা পাস করলে ব্রিটেনে নার্স হিসেবে কাজ করা যায়। তানজিলা ইন্টারনেটে পড়ে। YouTube-এ ভিডিও দেখে। ফেসবুক গ্রুপে প্রশ্ন করে। "কেউ কি NMC CBT দিয়েছেন? কীভাবে প্রস্তুতি নেব?"

উত্তর আসে। কেউ বলে, "IELTS ৭ লাগবে।" কেউ বলে, "OET-ও হয়।" কেউ বলে, "পিয়ারসনে রেজিস্ট্রেশন করো।" কেউ বলে, "ভুলেও ভারতের কোচিংয়ে টাকা দিও না, ফ্রি ম্যাটেরিয়াল আছে।"

তানজিলা নোট করে। প্রতিটা তথ্য। প্রতিটা পথ। ব্রিটেনে একজন নার্সের বেতন বছরে ২৫-৩০ হাজার পাউন্ড। বাংলাদেশি টাকায় ৩৫-৪০ লাখ। বাংলাদেশে একজন সরকারি নার্সের বেতন মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা। পার্থক্য শুধু টাকার না। পার্থক্য সম্মানের।

ব্রিটেনে নার্স মানে পেশাদার। ব্রিটেনে নার্সকে কেউ "সেবিকা" বলে না। ব্রিটেনে নার্সকে কেউ মহিষ বলে না। ব্রিটেনে রোগী নার্সের কোমর ধরলে পুলিশ আসে।

তানজিলা জানে না ব্রিটেন ঠিক কতটা ভালো। হয়তো সেখানেও সমস্যা আছে। হয়তো সেখানেও বর্ণবাদ আছে, বাংলাদেশি অ্যাকসেন্ট নিয়ে হাসাহাসি আছে, বিদেশি নার্সকে কম দেখা আছে। কিন্তু সেখানে অন্তত একটা সিস্টেম আছে। অভিযোগ করলে কেউ শোনে। এখানে অভিযোগ করলে বলা হয়, "চাকরি ছেড়ে দাও।"

তানজিলার বাবা জানে না মেয়ে ব্রিটেনে যেতে চায়।

বাবা ভাবে, মেয়ে নার্সিং পাস করবে, সরকারি চাকরি পাবে, কুমিল্লায় কোনো হাসপাতালে কাজ করবে, বিয়ে হবে, সংসার হবে। বাবার হিসাবে সব ঠিক আছে। বাবার হিসাবে মেয়ের জীবন একটা সরলরেখা: পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে, সন্তান। সরলরেখা থেকে বেরোলে পরিবারের ইজ্জতের সমস্যা। পাড়ার লোক কী বলবে। আত্মীয়রা কী বলবে। "মেয়েকে বিদেশে পাঠাচ্ছে? একা? কেমন বাবা?"

তানজিলা ভাবে, বাবাকে বলবে কখন। পাস করার পরে? NMC পাস করার পরে? নাকি বিমানের টিকিট কেনার পরে?

মা জানে। মা-কে বলেছে। মা কেঁদেছিল। "এত দূর? একা?" তানজিলা বলেছিল, "মা, এখানে নার্স মানে চাকরানি। ডাক্তারের চাকরানি, রোগীর চাকরানি, পরিবারের চাকরানি। আমি চাকরানি হতে চার বছর পড়াশোনা করিনি।"

মা বলেছিল, "সব দেশেই কিছু সমস্যা থাকে।"

"থাকে। কিন্তু কিছু দেশে সমস্যার সমাধান আছে। এই দেশে সমস্যাটাই সমাধান। মানে, সহ্য করো।"

মা চুপ করে গিয়েছিল।

আজ ওয়ার্ডে একটা রোগী মারা গেল।

বৃদ্ধা মহিলা। সত্তর বছর। কিডনি ফেইলিউর। তানজিলা সকাল থেকে তার পাশে ছিল। ড্রিপ বদলেছে, বিপি মেপেছে, ওষুধ দিয়েছে, বালিশ ঠিক করে দিয়েছে। বৃদ্ধা তানজিলার হাত ধরে বলেছিল, "মা, তুমি ভালো।"

বিকেলে বৃদ্ধা মারা গেল। তানজিলা বডি ক্লিন করল। নতুন চাদর দিল। পরিবারকে ডাকল। পরিবার এসে কাঁদল। তানজিলা দাঁড়িয়ে ছিল। কাঁদেনি। কাঁদা যায় না। নার্স কাঁদলে বলবে, "দুর্বল।" নার্স কাঁদলে বলবে, "প্রফেশনাল না।"

কিন্তু রাতে হোস্টেলে ফিরে তানজিলা কাঁদল। বৃদ্ধার জন্য। বৃদ্ধার "মা, তুমি ভালো" কথাটার জন্য। পুরো দিনে, পুরো সপ্তাহে, কেউ তানজিলাকে "ভালো" বলেনি। কেউ ধন্যবাদ দেয়নি। রোগী ভালো হয়ে গেলে ডাক্তারকে ধন্যবাদ দেয়। রোগী মারা গেলে নার্সকে দোষ দেয়। মাঝখানে নার্স, সব করে, কিছু পায় না।

একজন মরা বৃদ্ধার মুখ থেকে শোনা "তুমি ভালো" এটুকুই তানজিলার পুরস্কার।

ক্লাসে আজ কমিউনিটি হেলথ নার্সিংয়ের লেকচার।

প্রফেসর বললেন, "নার্সিং একটা নোবেল প্রফেশন।" তানজিলা হাসল। ভেতরে ভেতরে। মুখে হাসি আসে না এসব কথায়। নোবেল প্রফেশন। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। ল্যাম্প হাতে মেয়ে। সুন্দর গল্প। কিন্তু ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ময়মনসিংহ মেডিকেলে কাজ করেনি। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলকে কেউ "মহিষ" বলেনি। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের কোমরে কেউ হাত দেয়নি।

নোবেল। শব্দটা সুন্দর। বাস্তবটা কুৎসিত।

ক্লাসের পর সুমি বলল, "তুই NMC-র জন্য কোন বই পড়ছিস?"

তানজিলা বলল, "ওসমান গনির বইটা ভালো। আর সোয়ানসন এন্ড ট্রিঙ্কসের টেস্ট ব্যাংক।"

সুমি বলল, "IELTS কত লাগবে?"

"ওভারঅল ৭। প্রতিটা মডিউলে ৭।"

"তুই পারবি?"

"আমি পারব," তানজিলা বলল। "আমাকে পারতেই হবে।"

পারতে হবে। এটা ইচ্ছা না। এটা বেঁচে থাকার শর্ত। এই হাসপাতালে আরও বিশ বছর কাজ করা, প্রতিদিন হাত সরানো, প্রতিদিন অপমান সহ্য করা, প্রতিদিন ডাক্তারদের ক্ষমতার খেলা দেখা, এটা জীবন না। এটা ধীর মৃত্যু।

১০

তানজিলা আজ ডিউটি শেষে হাসপাতালের ছাদে গেল।

ময়মনসিংহের আকাশ। সন্ধ্যা হচ্ছে। নিচে রাস্তায় রিকশার ঘণ্টা বাজছে। দূরে ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে বাতাস আসছে। তানজিলা রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে।

এই দেশে নার্সকে সেবিকা বলে।

সেবিকা মানে সেবা করো। সেবিকা মানে মাথা নিচু করো। সেবিকা মানে ডাক্তারের ছায়া হয়ে থাকো। সেবিকা মানে রোগী তোমাকে যা বলবে, যা করবে, মেনে নাও। সেবিকা মানে সম্মান চাইও না। সেবিকা মানে তুমি নারী, এটা ভুলো না।

তানজিলা ভোলেনি।

তানজিলা মনে রাখবে। প্রতিটা চড়, প্রতিটা অশ্লীল কথা, প্রতিটা হাতের ছোঁয়া, প্রতিটা "মহিষ," প্রতিটা "ডাক্তার ডাকো।" মনে রাখবে এবং এই দেশ ছেড়ে যাবে। এমন একটা জায়গায় যাবে যেখানে নার্স মানে নার্স। শুধু নার্স। শুধু পেশাদার। শুধু একজন মানুষ।

ফোনে IELTS পরীক্ষার তারিখ দেখল। আরও তিন মাস।

তিন মাস। তিরানব্বই দিন। তানজিলা গুনবে। প্রতিটা দিন।

নিচে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দরজায় একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল। আরেকটা রোগী। আরেকটা পরিবার। আরেকটা "নার্স, এদিকে আসো।"

তানজিলা ছাদ থেকে নামল। সিঁড়ি দিয়ে। একটু একটু করে। জুতার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে করিডোরে। সেই শব্দটা তানজিলার নিজের। সেই শব্দটা বলছে: আমি এখানে আছি। আমি এখনো আছি। কিন্তু চিরকাল থাকব না।