ফুটবলার

আমরা একই মাঠে খেলি। কিন্তু আমাদের মাঠের দাম কম।

পর্ব ৪৩ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আফরোজা খালি পায়ে বল মারে।

এটা অভ্যাস না। এটা অভাব। জুতার টাকা নেই। ফুটবল বুটের টাকা তো দূরের কথা, সাধারণ জুতার টাকা নেই কখনো কখনো। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলে, কঠিন মাটি, লাল মাটি, সেই মাটিতে খালি পায়ে দৌড়ায় আফরোজা। পায়ের তলা শক্ত হয়ে গেছে। চামড়া মোটা। কাঁকর বিঁধলে ব্যথা লাগে না আর। পা দুটো যেন জুতাই হয়ে গেছে, নিজের চামড়ার জুতা।

আট বছর বয়সে প্রথম বল ছুঁয়েছিল। বল না, আসলে কাপড় গোল করে বাঁধা একটা কিছু। ছোট ভাই শফিকের সাথে উঠানে খেলত। শফিক গোলকিপার, আফরোজা স্ট্রাইকার। শফিক কখনো ধরতে পারত না। আফরোজা বাঁ পায়ে মারত, ডান পায়ে মারত, মাথা দিয়ে মারত। শফিক হাঁপাত। আফরোজা হাসত।

পাড়ার ছেলেরা দেখত। প্রথমে হাসত। "মেয়ে ফুটবল খেলে?" এই প্রশ্নটা আফরোজা হাজারবার শুনেছে। হাজারবার। প্রতিটা মাঠে, প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা টুর্নামেন্টে। "মেয়ে ফুটবল খেলে?" যেন মেয়ে আর ফুটবল দুটো আলাদা প্রজাতি, যাদের মিলন সম্ভব না।

আফরোজা উত্তর দেয়নি কখনো। উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। বল দিয়ে উত্তর দিয়েছে। গোল দিয়ে উত্তর দিয়েছে।

আফরোজার বাবা রহমত আলী রিকশা চালায়।

সকাল থেকে সন্ধ্যা। কখনো রাত পর্যন্ত। রিকশার সিটে বসে যাত্রী বহন করে, পেডেল ঘোরায়, ঘাম ঝরায়। মাসে কত আয় হয়, সেটা মৌসুমের ওপর নির্ভর করে। আমের মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কিছু বেশি চলাচল হয়, তখন একটু বেশি। বাকি সময় টানাটানি।

কিন্তু রহমত আলী একটা কাজ করেছিল যেটা গ্রামের কোনো বাবা করেনি: মেয়েকে ফুটবল খেলতে দিয়েছিল।

এটা সহজ ছিল না। আফরোজার মা রাবেয়া প্রথমে রাজি ছিল না। "মেয়ে মানুষ মাঠে দৌড়াবে? লোকে কী বলবে?" রহমত আলী বলেছিল, "লোকে বলুক। মেয়ে খেলতে চায়, খেলবে।"

এটা সাহস ছিল। রিকশাচালক রহমত আলীর শিক্ষা ক্লাস সেভেন। কিন্তু কিছু জিনিস বোঝার জন্য শিক্ষা লাগে না। কিছু জিনিস দেখলেই বোঝা যায়। রহমত আলী দেখেছিল মেয়ের চোখ যখন বল নিয়ে দৌড়ায়। সেই চোখে একটা আগুন আছে, যেটা নেভানো যায় না, নেভানো উচিতও না।

"তোর মেয়ে পাগল হইয়া গেছে," পাড়ার লোক বলত।

"পাগল হইলে হইছে। খেলুক," রহমত আলী বলত।

দশ বছর বয়সে আফরোজা উপজেলা পর্যায়ের মেয়েদের ফুটবলে খেলল। জেলা ক্রীড়া অফিসের আয়োজন। মাঠটা ভালো ছিল না, ঘাস ছিল না, গর্ত ছিল, গোলপোস্ট বাঁশের। কিন্তু আফরোজার কাছে সেটা ওয়েম্বলি। সেটা ম্যারাকানা। সেই মাঠে আফরোজা তিনটা গোল করল। খালি পায়ে।

কোচ দেখল। মফিজুর রহমান, উপজেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা। বলল, "এই মেয়েটাকে জেলায় পাঠাও।"

জেলা থেকে বিভাগ। বিভাগ থেকে জাতীয় ক্যাম্প।

আফরোজার বয়স তখন চৌদ্দ। প্রথমবার ঢাকায় এসেছিল। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পাশে বিকেএসপির মাঠে ক্যাম্প। তিরিশজন মেয়ে, সারা দেশ থেকে। আফরোজা দেখল, সবাই জুতা পরে। ফুটবল বুট। অ্যাডিডাস, নাইকি, পুমা। আফরোজার পায়ে সাদা কেডস, বাজারে দুইশো টাকা।

কোচ মারুফ ভাই বলল, "তোমার বুট কই?"

আফরোজা বলল, "নাই।"

"কেডস পরে ফুটবল খেলবে?"

"আমি খালি পায়েও খেলতে পারি।"

মারুফ ভাই একটু তাকিয়ে থাকল। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একজোড়া পুরোনো বুট বের করল। "এটা পর। সাইজ একটু বড় হবে, মোজা দুই পাটি পর।"

আফরোজা বুটজোড়া হাতে নিল। জীবনে প্রথম ফুটবল বুট ধরল। ভেতরে হাত ঢোকাল। স্টাডগুলো ছুঁয়ে দেখল। পরল। মাঠে নামল। প্রথম বল কিক করল বুট পরে।

আওয়াজটা আলাদা। বলের সাথে বুটের আওয়াজ আর বলের সাথে খালি পায়ের আওয়াজ এক না। বুটের আওয়াজে একটা ক্ষমতা আছে, একটা অধিকার আছে, যেটা খালি পায়ে নেই।

ষোলো বছরে জাতীয় দলে ডাক পেল।

বাংলাদেশ মহিলা জাতীয় ফুটবল দল। সবুজ জার্সি। বুকে লাল-সবুজ পতাকা। আফরোজা জার্সিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। এটা শুধু কাপড় না। এটা একটা স্বীকৃতি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রিকশাচালকের মেয়ে, যে কাপড়ের বল দিয়ে খেলা শুরু করেছিল, সে এখন দেশের জার্সি পরবে। দেশের হয়ে খেলবে।

বাবাকে ফোন করল।

"বাবা, আমি জাতীয় দলে সিলেক্ট হইছি।"

ফোনের ওপারে নীরবতা। তারপর একটা শব্দ, ভেঙে ভেঙে: "বাবা... আমি..."

রহমত আলী কাঁদছিল। রিকশার ওপর বসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাস স্ট্যান্ডের কোণে। একটা রিকশাচালক কাঁদছে, আর কেউ জানে না কেন।

SAFF Women's Championship। নেপাল, তারপর ভারত, তারপর শ্রীলঙ্কা। আফরোজা প্রতিটা ম্যাচে খেলল।

ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনাল। ভারতের মেয়েরা লম্বা, দ্রুত, প্রশিক্ষিত। তাদের কোচ বিদেশি। তাদের ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি আন্তর্জাতিক মানের। তাদের ডায়েটিশিয়ান আছে, ফিজিওথেরাপিস্ট আছে, স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট আছে।

বাংলাদেশের মেয়েদের আছে একটা মাঠ, একজন কোচ, আর ইচ্ছা।

আফরোজা সেই ম্যাচে একটা গোল করেছিল। ৬৩ মিনিটে। বাম পায়ে। মিডফিল্ড থেকে বল নিয়ে দৌড়ে গেল, দুজন ডিফেন্ডার কাটিয়ে, গোলকিপারের ডান পাশ দিয়ে বল ঢুকিয়ে দিল।

সেই মুহূর্তে আফরোজা কিছু ভাবেনি। গোলের পর ভাবা যায় না। গোলের পর শরীর নিজেই দৌড়ায়, হাত ওপরে ওঠে, চিৎকার বেরিয়ে আসে, সতীর্থরা এসে জড়িয়ে ধরে। সেই কয়েক সেকেন্ড পৃথিবীর সবচেয়ে মুক্ত সময়। কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো "মেয়ে ফুটবল খেলে?" নেই, শুধু গোল, শুধু জয়, শুধু আনন্দ।

ম্যাচ হেরেছিল বাংলাদেশ। ১-৩। কিন্তু আফরোজার সেই গোলটা ভাইরাল হয়েছিল ফেসবুকে। দশ লাখ ভিউ। মন্তব্যে কেউ লিখেছিল, "চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেয়ে!" কেউ লিখেছিল, "বাংলাদেশের মেসি!" আফরোজা পড়ে হেসেছিল। মেসি। মেসির পায়ে জুতা ছিল ছোটবেলা থেকে।

চ্যাম্পিয়নশিপ জিতল বাংলাদেশ। SAFF Under-19।

পুরো দল ট্রফি নিয়ে ফটো তুলল। আফরোজা ট্রফি ধরল। ভারী। ঝকঝকে। এই ট্রফিটার জন্য কত মেয়ে কত মাঠে দৌড়েছে, কত রোদে পুড়েছে, কত বৃষ্টিতে ভিজেছে, কতবার শুনেছে "মেয়ে ফুটবল খেলে?"

পুরস্কার ঘোষণা হলো। প্রতিটা খেলোয়াড় পাবে পঞ্চাশ হাজার টাকা।

পঞ্চাশ হাজার।

আফরোজা খবরটা শুনল। তারপর আরেকটা খবর শুনল। ছেলেদের দল একই টুর্নামেন্ট জিতলে প্রতিটা খেলোয়াড় পায় পাঁচ লাখ টাকা।

পঞ্চাশ হাজার আর পাঁচ লাখ। একই খেলা। একই ট্রফি। একই সময়। একই ঘাম। কিন্তু দাম আলাদা।

আফরোজা হিসাব করল। ছেলেরা পায় দশ গুণ বেশি। দশ গুণ। মানে আফরোজার একটা গোলের দাম ছেলেদের একটা গোলের দশ ভাগের এক ভাগ। মানে আফরোজার ঘামের দাম কম। মানে আফরোজার পায়ের দাম কম। মানে আফরোজার জয়ের দাম কম।

কেন?

কারণ আফরোজা মেয়ে।

শুধু এই একটা কারণ। আর কোনো কারণ নেই। আফরোজার দক্ষতা কম না। আফরোজার পরিশ্রম কম না। আফরোজার আঘাতের ঝুঁকি কম না। আফরোজার হাঁটুতে ব্যথা কম না। কিন্তু আফরোজা মেয়ে। আর মেয়েদের মাঠের দাম কম।

পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে আফরোজা বাড়ি গেল।

বাবার হাতে দিল। রহমত আলী টাকাটা হাতে নিয়ে গুনল। একবার। দুইবার। তারপর মেয়ের দিকে তাকাল।

"এত টাকা?"

আফরোজা হাসল। পঞ্চাশ হাজার টাকা রহমত আলীর কাছে "এত টাকা।" আফরোজার কাছে এটা পাঁচ লাখের দশ ভাগের এক ভাগ। কিন্তু বাবাকে সেটা বলেনি। বাবা জানলে কষ্ট পাবে। বাবা ভাববে, মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে কম পেয়েছে? রহমত আলী পৃথিবীর সবকিছু সহ্য করতে পারে, কিন্তু মেয়ের অবিচার সহ্য করতে পারবে না।

তাই আফরোজা বলল, "হ্যাঁ বাবা, এত টাকা।"

রহমত আলী টাকাটা রাবেয়ার হাতে দিল। "রাখো। মেয়ের জন্য।"

রাবেয়া, যে একদিন বলেছিল "মেয়ে মানুষ মাঠে দৌড়াবে?", সে টাকাটা বুকে চেপে ধরল।

আঠারো বছর বয়সে আফরোজা জানে কিছু জিনিস যেগুলো সমবয়সী মেয়েরা জানে না।

সে জানে হেরে যাওয়া কেমন লাগে। ম্যাচ হারলে লকার রুমে বসে থাকা, কেউ কথা বলে না, শুধু জলের বোতলের শব্দ আর নিঃশ্বাসের শব্দ, সেই নীরবতা সে জানে।

সে জানে আঘাত কেমন লাগে। গোড়ালিতে মচকে যাওয়া, হাঁটুতে লিগামেন্ট টানটান হওয়া, পাঁজরে ধাক্কা লেগে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা। সে জানে ব্যথা উপেক্ষা করা কেমন, ব্যথা পকেটে রেখে মাঠে ফেরা কেমন।

সে জানে দলের জন্য খেলা কেমন। নিজের গোল না হলেও হাসা, সতীর্থের গোলে চিৎকার করা, হারলে একসাথে কাঁদা, জিতলে একসাথে নাচা।

কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা জানে: এই দেশে মেয়েদের খেলাধুলা একটা বিলাসিতা। ছেলেদের খেলা "জাতীয় গৌরব।" মেয়েদের খেলা "ওরা তো মেয়ে, খেলছে, ভালো।" গৌরব আর সমবেদনা এক না। গৌরবে টাকা আসে, স্পনসর আসে, টেলিভিশনে সম্প্রচার হয়। সমবেদনায় একটা ফেসবুক পোস্ট আসে, "গর্বিত," তারপর সবাই ভুলে যায়।

সন্ধ্যায় প্র্যাক্টিস শেষে আফরোজা মাঠের কোণে বসে। বুট খুলে পা বের করে। পায়ের তলায় ফোসকা। আঙুলে ঘর্ষণের দাগ।

আকাশে তারা উঠছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আকাশ। ঢাকার আকাশ না। এখানে তারা দেখা যায়।

ফোনে বাবার মিসকল। কলব্যাক করল।

"বাবা, কেমন আছো?"

"ভালো, বাবা। আজ তোর মায়ের জ্বর। ওষুধ খাওয়াইছি।"

"কী ওষুধ?"

"প্যারাসিটামল। আর লেবু-পানি।"

"ডাক্তার দেখাও।"

"ডাক্তার দেখানোর খরচ কোথায়, বাবা? তুই চিন্তা করিস না। ভালো হইয়া যাবে।"

আফরোজা ফোন রাখল। মায়ের ডাক্তার দেখানোর খরচ নেই। আফরোজা জাতীয় দলের খেলোয়াড়, কিন্তু মায়ের ডাক্তারের ফি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। পঞ্চাশ হাজার টাকা, তার মধ্যে ত্রিশ হাজার চলে গেছে বাবার রিকশার লোন শোধে, দশ হাজার বোনের স্কুলের খরচে, বাকি দশ হাজার মায়ের কাছে।

শূন্য। আফরোজার কাছে শূন্য।

ছেলেদের দলের একটা খেলোয়াড়, সেও গ্রাম থেকে এসেছে, সেও গরিবের ছেলে, কিন্তু পাঁচ লাখ পেয়ে সে বাড়ির টিনের চাল বদলে দিয়েছে, মায়ের চিকিৎসা করিয়েছে, বোনের বিয়ে দিয়েছে। আফরোজা সেটা পারেনি। কারণ আফরোজা মেয়ে। মেয়েদের গোলের দাম কম।

১০

আফরোজা একটা কথা ভাবে, বারবার ভাবে, রাতে ঘুমানোর আগে ভাবে।

আমরা একই মাঠে খেলি। একই বল। একই ৯০ মিনিট। একই ঘাম। একই রোদ। একই বৃষ্টি। একই আঘাত। একই জয়। একই পরাজয়।

কিন্তু আমাদের মাঠের দাম কম।

আমাদের গোলের দাম কম। আমাদের ট্রফির দাম কম। আমাদের হারের ব্যথা সমান, কিন্তু জয়ের পুরস্কার সমান না।

কেন?

আফরোজা উত্তর জানে। কিন্তু উত্তর জানলে কী হয়? জেনে কি কিছু বদলায়? এই দেশে মেয়েদের ক্রিকেট একটু ভালো হয়েছে, কারণ ক্রিকেটে টাকা আছে, স্পনসর আছে, টেলিভিশন আছে। ফুটবলে কিছু নেই। মেয়েদের ফুটবলে তো আরও কিছু নেই।

আফরোজা বুটজোড়া ব্যাগে রাখল। মারুফ ভাইয়ের দেওয়া সেই প্রথম বুট আর নেই, ক্ষয়ে গেছে। এখন নিজের বুট। নিজের কেনা। পঞ্চাশ হাজারের মধ্যে তিন হাজার দিয়ে কেনা।

কাল আবার প্র্যাক্টিস। কাল আবার মাঠ। কাল আবার দৌড়। কাল আবার গোল।

আফরোজা দৌড়াবে। দাম যত কমই হোক, খেলা থামাবে না। কারণ খেলা থামালে তারা জিতে যায় যারা বলে, "মেয়ে ফুটবল খেলে?" খেলা চালিয়ে গেলে অন্তত প্রশ্নটা দুর্বল হয়। একটু একটু করে। একটা গোলে একটু, আরেকটা গোলে আরেকটু।

আফরোজা খেলবে। খালি পায়ে শুরু করেছিল, বুট পরে চালিয়ে যাবে। একদিন হয়তো এই মাঠের দামও বাড়বে। আফরোজা সেদিনের জন্য খেলে যাচ্ছে।

সেদিন না এলেও খেলবে। কারণ খেলা তো শুধু দামের জন্য না। খেলা আফরোজার ভাষা। যে ভাষায় সে কথা বলে, যে ভাষায় সে বাঁচে।