আদিবাসী নারী
আমাদের ভাষা মরলে আমরাও মরবো। ভাষা বাঁচিয়ে রাখা আমার যুদ্ধ।
১
মেনকা চাকমা সকালে উঠে প্রথম যেটা দেখে, সেটা পাহাড়।
খাগড়াছড়ির পাহাড়। সবুজ পাহাড়। কুয়াশায় ঢাকা, সকালে। কুয়াশা সরে গেলে রোদ আসে, রোদে পাহাড়ের গায়ে আলো-ছায়ার খেলা হয়, সেই খেলা দেখতে দেখতে মেনকা চা বানায়। চা-তে আদা দেয়। আদার গন্ধে ঘর ভরে যায়। মেনকার মায়ের ঘরেও এই গন্ধ ছিল। মায়ের মায়ের ঘরেও। চাকমা মেয়েদের সকাল আদার গন্ধে শুরু হয়।
পঁয়ত্রিশ বছর। দুই সন্তান। ছেলে বিপ্লব, বারো বছর। মেয়ে তৃষ্ণা, আট বছর। স্বামী সুশান্ত চাকমা সেনাবাহিনীতে চাকরি করত, গত বছর বদলি হয়ে রাঙামাটি গেছে। মাসে একবার আসে। মেনকা একা থাকে বাচ্চাদের নিয়ে। একা থাকতে অভ্যস্ত। পাহাড়ের মেয়েরা একা থাকতে পারে। পাহাড়ই তাদের সঙ্গী।
মেনকার বাড়ি পানছড়ি উপজেলায়। ছোট গ্রাম। পঁচিশটা ঘর। বেশিরভাগ চাকমা। কিছু মারমা। পাশে একটা বাঙালি সেটলার কলোনি, সেটা নব্বই দশকে হয়েছে। সেই কলোনি নিয়ে অনেক গল্প আছে, অনেক ক্ষত আছে, কিন্তু সেগুলো এখন বলার সময় না। এখন অন্য গল্প।
মেনকা একটা স্কুলে পড়ায়। সরকারি স্কুল না। এনজিওর স্কুল না। মেনকার নিজের স্কুল। নিজের ঘরের একটা ঘরে। বিকেলে, স্কুল ছুটির পর, গ্রামের চাকমা বাচ্চারা আসে। মেনকা তাদের চাকমা ভাষা শেখায়।
২
চাকমা ভাষা মরে যাচ্ছে।
এটা বলা সহজ। বোঝা কঠিন। একটা ভাষা মরে যাওয়া মানে কী? মানে একদিন কোনো শিশু সেই ভাষায় প্রথম শব্দ বলবে না। মানে একদিন কোনো মা সেই ভাষায় লোরি গাইবে না। মানে একদিন সেই ভাষার শেষ বক্তা মারা যাবে, আর তার সাথে মরবে হাজার বছরের গল্প, প্রবাদ, গান, রসিকতা, রাগ, দুঃখ, ভালোবাসা।
মেনকা জানে, চাকমা ভাষা এখনো মরেনি। কিন্তু অসুস্থ। গুরুতর অসুস্থ।
গ্রামের বাচ্চারা এখন বাংলায় কথা বলে। স্কুলে বাংলা পড়ে। টেলিভিশনে বাংলা দেখে। ফোনে বাংলা শোনে। বাংলা সবখানে। চাকমা ভাষা শুধু ঘরে। তাও সব ঘরে না। কিছু ঘরে বাবা-মা নিজেরাই বাংলায় কথা বলে বাচ্চাদের সাথে। "বাংলা ভালো করে শিখলে চাকরি পাবে।" ঠিক। চাকরি পাওয়ার জন্য বাংলা লাগে। কিন্তু চাকরি পাওয়ার জন্য নিজের ভাষা হারাতে হবে, এটা কোন ন্যায়বিচার?
মেনকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিল। খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে। বাংলায়। ইংরেজিতে। চাকমা ভাষায় কোনো পাঠ্যপুস্তক নেই। চাকমা ভাষায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স নেই। চাকমা ভাষায় কোনো সরকারি কাগজপত্র নেই। চাকমা ভাষা সরকারের কাছে একটা "আঞ্চলিক ভাষা," ভাষা জরিপের একটা সংখ্যা, গবেষণার একটা বিষয়, কিন্তু জীবনের ভাষা না।
মেনকা ঠিক করেছিল, এটা বদলাবে। একটু হলেও বদলাবে। নিজের ঘরে, নিজের গ্রামে, নিজের হাতে।
৩
বিকেল চারটায় বাচ্চারা আসে।
বারোজন। ছয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী। মেনকার ঘরের পেছনের দিকে একটা ঘর আছে, বাঁশের দেয়াল, টিনের চাল, মেঝেতে মাদুর পাতা। একটা ব্ল্যাকবোর্ড, মেনকা নিজে কালো রঙ করেছে একটা কাঠের তক্তায়। চক। আর একটা খাতা, যেটায় মেনকা চাকমা লিপি লিখে রেখেছে।
চাকমা লিপি। অধিকাংশ চাকমা মানুষ নিজেদের লিপি পড়তে পারে না। লিখতে পারে না। চাকমা ভাষায় কথা বলে, কিন্তু বাংলা হরফে। নিজেদের হরফ হারিয়ে যাচ্ছে। মেনকা সেই হরফ শিখিয়েছিল তার দাদুর কাছে। দাদু অজিত চাকমা, গ্রামের প্রবীণ, যিনি শেষ প্রজন্মের একজন যিনি চাকমা লিপি পড়তে পারতেন। দাদু মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। মারা যাওয়ার আগে মেনকাকে বলেছিল, "এই লিপি যেন হারিয়ে না যায়।"
মেনকা হারাতে দেয়নি।
"আজ আমরা 'ক' শিখব," মেনকা বলে।
বাচ্চারা খাতা খোলে। মেনকা ব্ল্যাকবোর্ডে লেখে। চাকমা 'ক'। বাংলা 'ক'-এর চেয়ে আলাদা। গোলাকার। সুন্দর। যেন একটা পাতা ভাঁজ করা।
"এটা আমাদের 'ক'," মেনকা বলে। "এটা তোমাদের দাদা-দাদির 'ক'। এটা তোমাদের।"
বাচ্চারা লেখে। হাতের লেখা কাঁচা। অক্ষর বেঁকে যায়। কিন্তু লেখে। প্রতিটা অক্ষরে একটু একটু করে একটা ভাষা বেঁচে থাকে।
৪
মেনকা পিনোন-হাদি পরে।
চাকমা নারীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক। পিনোন হলো নিচের অংশ, হাদি হলো ওপরের অংশ। হাতে বোনা। রঙিন। লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, সব রঙ মেশানো। জ্যামিতিক নকশা। প্রতিটা নকশার একটা মানে আছে, যেটা মেনকা জানে, কিন্তু অনেকে ভুলে গেছে।
শহরে গেলে মেনকা পিনোন-হাদি পরে। সবাই তাকায়। কেউ কৌতূহলে, কেউ অবজ্ঞায়। একবার খাগড়াছড়ি শহরের একটা দোকানে গিয়েছিল, দোকানদার বলেছিল, "এই কাপড় পরে কোথায় যাও? সালোয়ার-কামিজ পরো না কেন?"
মেনকা বলেছিল, "এটা আমার কাপড়।"
"এটা তো পুরোনো দিনের কাপড়।"
"পুরোনো দিন আমার দিন।"
দোকানদার আর কিছু বলেনি।
এটা কাপড় না। এটা পরিচয়। মেনকা যখন পিনোন-হাদি পরে, তখন সে শুধু মেনকা না। সে চাকমা। সে পাহাড়ের মেয়ে। সে সেই বংশের মানুষ যারা এই পাহাড়ে হাজার বছর ধরে আছে। এই কাপড়ের প্রতিটা সুতায় একটা ইতিহাস বোনা আছে। সেই ইতিহাস খুলে ফেললে মেনকা আর কেউ না। একটা নাম, একটা সংখ্যা, একটা জাতীয় পরিচয়পত্র।
মেনকা জাতীয় পরিচয়পত্র হতে রাজি না। সে চাকমা হতে রাজি। সে পাহাড়ের মেয়ে হতে রাজি। সে পিনোন-হাদি পরতে রাজি। প্রতিদিন।
৫
জমি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি একটা যুদ্ধক্ষেত্র। ১৯৯৭-র শান্তি চুক্তির পরও জমি সমস্যার সমাধান হয়নি। ভূমি কমিশন আছে, কিন্তু কাজ হয় না। সেটলাররা জমি দখল করে, সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের জন্য জমি নেওয়া হয়, ইকো-পার্ক বানানোর নামে আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়।
মেনকার পরিবারের জমি ছিল পনেরো একর। দাদুর আমলে। এখন পাঁচ একর। বাকি দশ একর কোথায় গেছে? কিছু সেটলারদের কাছে গেছে, কিছু সরকারের কাছে গেছে, কিছু "হারিয়ে গেছে," মানে কাগজপত্র নেই, প্রমাণ নেই, দাদু কোনো কাগজ রাখেনি, মুখে মুখে জমির সীমানা জানত, পাহাড়ের ঢাল দেখে চিনত কোনটা তার। কিন্তু মুখের কথা আদালতে চলে না। আদালতে কাগজ চলে। চাকমাদের কাছে কাগজ কম।
গত বছর মেনকার বাড়ির পেছনের পাহাড়টা কেটে ফেলা হয়েছে। একটা রাস্তা হবে। কার রাস্তা? কার জন্য? মেনকা জানে না। কেউ জিজ্ঞেস করেনি। কেউ অনুমতি নেয়নি। একদিন বুলডোজার এসেছে, পাহাড় কাটা শুরু করেছে, গাছ পড়ে গেছে, মাটি সরে গেছে, পাখি উড়ে গেছে।
মেনকা দাঁড়িয়ে দেখেছিল। কিছু করতে পারেনি। কী করবে? প্রতিবাদ করবে? কার কাছে? পুলিশের কাছে? পুলিশ বুলডোজারের সাথেই এসেছে।
৬
বন।
বন কমে যাচ্ছে। মেনকার ছোটবেলায় গ্রামের চারদিকে ঘন বন ছিল। গর্জন গাছ, শাল গাছ, সেগুন গাছ, বাঁশঝাড়, বেতঝাড়। বনে হরিণ ছিল, বানর ছিল, ময়ূর ছিল। মেনকা ময়ূরের নাচ দেখেছিল ছোটবেলায়। এখন ময়ূর নেই। হরিণ নেই। বন নেই।
বন কেটেছে কারা? সবাই কেটেছে। সেটলাররা কেটেছে ঘর বানাতে। সরকার কেটেছে রাস্তা বানাতে। ব্যবসায়ীরা কেটেছে কাঠ বিক্রি করতে। কিছু আদিবাসীও কেটেছে, জুম চাষের জন্য। কিন্তু আদিবাসীদের জুম চাষে বন ফিরে আসত, কারণ জুম ঘূর্ণায়মান, এক জায়গায় চাষ করে অন্য জায়গায় যায়, বন আবার গজায়। বাকিদের কাটায় বন ফেরে না। সিমেন্ট আসে। ইট আসে। বন চিরকালের জন্য যায়।
বন গেলে পানি যায়। ঝিরি শুকিয়ে যায়। ঝরনা শুকিয়ে যায়। মেনকার গ্রামের পাশে একটা ঝিরি ছিল, সেখানে মেনকা ছোটবেলায় গোসল করত, মাছ ধরত, পাথরের ওপর বসে গান গাইত। সেই ঝিরি এখন শুকনো। পাথরগুলো আছে। পানি নেই।
পানি ছাড়া পাহাড় বাঁচে না। পাহাড় ছাড়া চাকমা বাঁচে না। চাকমা ছাড়া চাকমা ভাষা বাঁচে না।
সব সংযুক্ত। সব একটা শিকলের মতো। একটা জায়গা ভাঙলে পুরো শিকল ভেঙে যায়।
৭
মেনকা প্রতিদিন বিকেলে ভাষা শেখায়। সন্ধ্যায় তাঁতে বসে।
তাঁত বোনা চাকমা মেয়েদের ঐতিহ্য। মেনকার মা বুনত। মেনকা শিখেছে মায়ের কাছে। তৃষ্ণাকেও শেখাচ্ছে। আট বছরের মেয়ে। ছোট হাতে সুতো ধরতে কষ্ট হয়। কিন্তু ধরে। মেনকা ধৈর্য ধরে শেখায়।
"এই নকশাটার নাম কী, মা?"
"এটা হলো 'আলম'। মানে সূর্য।"
"আর এটা?"
"এটা 'বিনই'। মানে পাহাড়।"
তৃষ্ণা বোনে। ধীরে ধীরে। প্রতিটা সুতায় একটু একটু করে ইতিহাস ঢুকছে। তৃষ্ণা জানে না এটা ইতিহাস। তৃষ্ণার কাছে এটা মায়ের সাথে সময় কাটানো। কিন্তু বিশ বছর পর তৃষ্ণা জানবে। বিশ বছর পর তৃষ্ণা এই নকশা দেখে মায়ের কথা মনে করবে, পাহাড়ের কথা মনে করবে, সন্ধ্যার আলোয় তাঁতের শব্দ মনে করবে।
এটাই ঐতিহ্য। এভাবেই ঐতিহ্য বাঁচে। কাগজে না, বইয়ে না, জাদুঘরে না। মায়ের হাতে, মেয়ের হাতে, সুতোয়, নকশায়, গানে, ভাষায়।
৮
রাতে মেনকা বারান্দায় বসে।
পাহাড়ের রাত। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। দূরে একটা ব্যাঙ ডাকছে। আকাশে তারা। পাহাড়ি আকাশে তারা অনেক বেশি। শহরের আলো এখানে পৌঁছায় না। অন্ধকার পুরোপুরি অন্ধকার। তারা পুরোপুরি তারা।
মেনকা ভাবে।
আমাদের ভাষা মরলে আমরাও মরবো।
এটা রূপক না। এটা সত্য। ভাষা মরলে চাকমা গল্প মরবে। চাকমা গান মরবে। চাকমা রীতিনীতি মরবে। চাকমা পরিচয় একটা জাদুঘরের জিনিস হয়ে যাবে, কাচের বাক্সে রাখা, লেবেল লাগানো: "চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিলুপ্ত।" মেনকা সেটা হতে দিতে রাজি না।
ভাষা বাঁচিয়ে রাখা আমার যুদ্ধ।
যুদ্ধ। শব্দটা ভারী। কিন্তু মেনকার কাছে এটা যুদ্ধই। বন্দুকের যুদ্ধ না, সুতোর যুদ্ধ, অক্ষরের যুদ্ধ, গানের যুদ্ধ। প্রতিটা বাচ্চাকে একটা চাকমা শব্দ শেখানো মানে একটা গুলি ছোঁড়া, বিস্মৃতির বিরুদ্ধে। প্রতিটা পিনোন বোনা মানে একটা পতাকা তোলা, অদৃশ্যতার বিরুদ্ধে।
৯
সুশান্ত ফোন করে।
"কেমন আছো?"
"ভালো। বাচ্চারা ভালো।"
"স্কুলটা কেমন চলছে?"
"চলছে। নতুন দুটো বাচ্চা আসছে পরের সপ্তাহ থেকে। পাশের গ্রাম থেকে।"
"ভালো। কিন্তু সাবধানে থেকো। আমি শুনেছি পানছড়িতে আবার কিছু ঝামেলা হয়েছে।"
ঝামেলা। এটা পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরকালের শব্দ। ঝামেলা মানে জমি নিয়ে বিরোধ। ঝামেলা মানে সেটলার আর আদিবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা। ঝামেলা মানে কখনো কখনো আগুন, ঘর পোড়ানো, মারামারি।
মেনকা বলে, "সাবধানে আছি। তুমি আসবে কবে?"
"মাস শেষে। ছুটি পেলে।"
ফোন রেখে মেনকা দরজা বন্ধ করে। পাহাড়ের রাতে দরজা বন্ধ করা একটা অভ্যাস, যেটা ভয় থেকে এসেছে। চাকমা মেয়েরা একা থাকলে সতর্ক থাকে। থাকতে হয়। পাহাড় সুন্দর, কিন্তু পাহাড়ে সবকিছু সুন্দর না।
১০
সকালে মেনকা তৃষ্ণাকে স্কুলে পাঠাল।
তৃষ্ণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। বাংলায় পড়ে। বাংলায় লেখে। বাংলায় পরীক্ষা দেয়। তৃষ্ণার ক্লাসে ত্রিশজন, তার মধ্যে পাঁচজন চাকমা, বাকি বাঙালি। তৃষ্ণা ক্লাসে ভালো করে। শিক্ষক তৃষ্ণাকে পছন্দ করে। "তৃষ্ণা ভালো ছাত্রী।" ভালো ছাত্রী মানে বাংলা ভালো পারে। ভালো ছাত্রী মানে বাঙালিদের মতো কথা বলে। ভালো ছাত্রী মানে আদিবাসী বলে বোঝা যায় না।
মেনকা চায় না তৃষ্ণাকে আদিবাসী বলে বোঝা না যাক। মেনকা চায় তৃষ্ণা আদিবাসী হোক এবং ভালো ছাত্রী হোক। দুটো একসাথে। একটার জন্য আরেকটা ত্যাগ করতে হবে কেন?
তৃষ্ণা স্কুলে যায়। বিকেলে ফিরে মায়ের কাছে চাকমা শেখে। দুটো জগৎ। দুটো ভাষা। দুটো পরিচয়। তৃষ্ণা দুটোই ধরে রাখবে। মেনকা সেটাই চায়।
১১
মেনকা আজ পিনোন-হাদি পরে বাজারে গেল।
পানছড়ি বাজার। ছোট বাজার। সবজি, মাছ, চাল, তেল। মেনকা সবজি কিনছে। পাশের দোকানদার তাকিয়ে আছে। মেনকা জানে সে তাকিয়ে আছে। এই তাকানো মেনকার জীবনের অংশ। যখনই পিনোন-হাদি পরে বাইরে যায়, কেউ না কেউ তাকায়। কৌতূহলে। বিস্ময়ে। কখনো বিদ্রূপে।
মেনকা সবজি কিনল। টাকা দিল। ফিরে আসছে।
একটা মেয়ে দৌড়ে এল। দশ-এগারো বছর। বাঙালি মেয়ে। মেনকার পিনোন-হাদির দিকে তাকিয়ে বলল, "আন্টি, এটা কী পরেছেন? কত সুন্দর!"
মেনকা হাসল। "এটা পিনোন-হাদি।"
"কোথায় পাওয়া যায়?"
"পাওয়া যায় না। বানাতে হয়। তাঁতে বুনতে হয়।"
"আপনি বুনেছেন?"
"হ্যাঁ।"
মেয়েটা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকল। তারপর চলে গেল।
মেনকা দেখল মেয়েটার চলে যাওয়া। একটা ছোট মুহূর্ত। কিন্তু এই মুহূর্তগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। একটা বাঙালি মেয়ে আজ জানল পিনোন-হাদি কী। জানল এটা তাঁতে বোনা হয়। জানল এটা সুন্দর। এটুকুই যথেষ্ট। আজকের জন্য এটুকুই।
১২
সন্ধ্যায় ভাষার ক্লাস শেষে বাচ্চারা চলে গেলে মেনকা একা বসে থাকে।
ব্ল্যাকবোর্ডে চাকমা অক্ষর লেখা। চকের গুঁড়ো উড়ছে। বাইরে পাহাড়ে সূর্য ডুবছে। আকাশ কমলা, তারপর গোলাপি, তারপর বেগুনি, তারপর অন্ধকার।
মেনকা জানে, তার এই ছোট ক্লাসরুম পৃথিবী বদলাবে না। বারোটা বাচ্চা চাকমা লিপি শিখলে ইউনেস্কোর "বিপন্ন ভাষা" তালিকা থেকে চাকমা বের হয়ে আসবে না। মেনকার তাঁতে বোনা পিনোন দেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার সমাধান হবে না। মেনকা জানে।
কিন্তু মেনকা এটাও জানে: প্রতিটা ছোট কাজের একটা জমা আছে। একটা বাচ্চা চাকমা লিখতে শিখলে সে তার বাচ্চাকে শেখাবে। একটা মেয়ে তাঁত বুনতে শিখলে সে তার মেয়েকে শেখাবে। একটু একটু করে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। এভাবেই ভাষা বাঁচে। এভাবেই পরিচয় বাঁচে। এভাবেই মানুষ বাঁচে।
আমাদের ভাষা মরলে আমরাও মরবো। ভাষা বাঁচিয়ে রাখা আমার যুদ্ধ।
মেনকা উঠে দাঁড়ায়। তাঁতে বসে। সুতো ধরে। বুনতে শুরু করে। ঠক ঠক ঠক। তাঁতের শব্দ। পাহাড়ের সন্ধ্যায় সেই শব্দ ছড়িয়ে যায়। কেউ শোনে। কেউ শোনে না।
মেনকা বোনে। একটু একটু করে। সুতোয় সুতোয়। অক্ষরে অক্ষরে। দিনে দিনে।
এটাই তার যুদ্ধ। নিঃশব্দ। নিরস্ত্র। কিন্তু যুদ্ধ।