এই দেশ আমার

পর্ব ৪৬ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

অনিতা রানী জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। আম গাছটা এখনো আছে। বাবার লাগানো। পঁয়ত্রিশ বছরের আম গাছ, কান্ড এত মোটা হয়েছে যে দুই জন জড়িয়ে ধরলেও হাত মেলে না। গত বৈশাখে ফল ধরেছিল, ছোট ছোট ফজলি, খেতে মধু। বাবা বলতেন, "এই গাছটা তোর জন্মের বছর লাগিয়েছি। তুই বড় হচ্ছিস, গাছও বড় হচ্ছে।"

বাবা আর নেই। তিন বছর হলো।

গাছটা আছে। জমিটা আছে। কিন্তু জমিটা কার, সেই প্রশ্নটা তিন বছর ধরে অনিতার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

বাবা মারা যাওয়ার সাত দিনের মাথায় হাজির হলো মতিন চাচা। চাচা না, পাড়ার লোক, কিন্তু অনিতা ছোটবেলা থেকে চাচা বলে ডাকত। বাবাও বলতেন, "মতিন ভাই আমার ভাই।" শ্রাদ্ধের দিন এসেছিল, মাথায় হাত রেখেছিল, বলেছিল, "চাচীমা, কিছু লাগলে বোলো।" মা বলেছিলেন, "আল্লা তোমার মঙ্গল করুক।" মতিন চাচা হাসিমুখে চলে গিয়েছিল।

এক মাস পর দলিল নিয়ে হাজির।

"দাদা, তোমার বাবা এই জমিটা আমার কাছে বেচে গেছিলেন। এই দেখো কাগজ।"

অনিতা কাগজটা দেখল। বাবার নাম আছে। সই আছে। তারিখ আছে, বাবা মারা যাওয়ার ঠিক দুই মাস আগের। অনিতার বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠল, যেন কেউ পাকা সুতো ছিঁড়ে দিল। বাবা অসুস্থ ছিলেন দুই মাস আগে। বিছানায়। কথা বলতে পারতেন না ঠিকমতো। হাত কাঁপত। সই করবেন কীভাবে?

"এই সই বাবার না।"

মতিন চাচা হাসল। সেই হাসি, শ্রাদ্ধের দিনের হাসি না। অন্য হাসি। "দাদা, মেয়ে তো, জমি কী করবে? বিয়ে দিয়ে দে, শ্বশুরবাড়ি যাবে। জমি দেখবে কে?"

অনিতা চুপ করে তাকিয়ে রইল।

মা কাঁদলেন। বললেন, "থাক, অনিতা। ওদের সাথে পারবি না। ওরা অনেক। আমরা কজন?"

অনিতা গুনল। মা, অনিতা, ছোট বোন মিতা। তিনজন। মতিন চাচার পরিবার, তার ভাই, ভাইয়ের ছেলে, ছেলের বন্ধু, বন্ধুর দল। কতজন? গোনার দরকার নেই। অনেক।

সেই রাতে অনিতা ঘুমাতে পারল না। মায়ের পাশে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবল। জমি চলে গেলে কী থাকবে? বাড়ি থাকবে, কিন্তু বাড়ির চারপাশের জমি না থাকলে বাড়ি একটা দ্বীপ হয়ে যাবে, চারদিকে মতিন চাচার জমি, মাঝখানে অনিতার বাড়ি। দ্বীপে বাস করা যায়, কিন্তু দ্বীপ একা। মিতা বলত, "আপু, তুই বাড়ি নিয়ে এত পাগল কেন?" অনিতা উত্তর দিত না। কারণ উত্তরটা মিতা বুঝবে না। বাড়ি শুধু ইট আর চুন না। বাড়ি পরিচয়। বাড়ি হারালে পরিচয় হারায়।

অনিতা আদালতে গেল।

ফরিদপুর জজ কোর্ট। লম্বা বারান্দা, ভাঙা মেঝে, দেয়ালে সবুজ শ্যাওলা। উকিল খুঁজতে তিনজনের কাছে গেল। প্রথমজন বললেন, "কেস করতে পারবেন, কিন্তু সময় লাগবে।" দ্বিতীয়জন বললেন, "মেয়েমানুষ একা জমির কেস করবেন? ভাবুন।" তৃতীয়জন বললেন, "ফি দিতে পারবেন?"

তৃতীয়জনকে বেছে নিল অনিতা। অন্তত সরাসরি বলেছেন। ফি কত, কত সময়, কী করতে হবে। বাকি দুইজন প্রশ্ন করেছেন অনিতার পরিচয় নিয়ে, অনিতার সাহস নিয়ে, অনিতার একা হওয়া নিয়ে। তৃতীয়জন শুধু টাকার কথা বলেছেন। টাকা দিতে পারবে অনিতা। সাহসের পরীক্ষা দিতে হবে না।

উকিল বললেন, "দলিলটা জাল প্রমাণ করতে হবে। সই যাচাই করাতে হবে। সময় লাগবে, দুই বছর হয়তো, তিন বছর, আরো বেশিও হতে পারে।"

অনিতা বলল, "করুন।"

কেস শুরু হলো। তারিখ পড়ল। একটার পর একটা তারিখ। প্রতিটা তারিখে ফরিদপুর শহরে যেতে হয়, বাস ভাড়া, রিকশা ভাড়া, উকিলের ফি, কোর্টের কাগজ। টাকা যায়, সময় যায়, শরীর ক্লান্ত হয়। কিন্তু কেস চলে।

গ্রামে ফিরলে মতিন চাচার লোকজন তাকায়। কেউ কিছু বলে না সরাসরি। পেছনে বলে। "হিন্দুর মেয়ে, জমি নিয়ে কোর্টে গেছে। লজ্জা নেই।"

অনিতা শোনে। ভেতরে জ্বলে। বাইরে চুপ থাকে।

মিতা ফোন করে ঢাকা থেকে। "আপু, ছেড়ে দে। আমরা ঢাকায় চলে আসি। মার সাথে।"

অনিতা বলে, "ছাড়ব না।"

"কেন?"

"বাবার গাছ আছে ওই জমিতে।"

মিতা চুপ করে যায়। সে জানে, আম গাছটার কথা বলছে অনিতা। সে জানে, আম গাছ না, বাবার কথা বলছে। জমি না, অস্তিত্বের কথা বলছে। ছেড়ে দিলে মানে আমরা এখানে ছিলাম না, বাবা ছিলেন না, এই বাড়ি ছিল না, এই গাছ ছিল না। সব মুছে যাবে। অনিতা মুছতে দেবে না।

দুই বছর পর রায় এলো। আংশিক।

তিন বিঘা জমির মধ্যে দেড় বিঘা অনিতার পক্ষে গেল। বাকি দেড় বিঘা মতিন চাচার দখলে রইল। উকিল বললেন, "উচ্চ আদালতে যেতে পারেন।" অনিতা হিসাব করল। আর কত টাকা, আর কত বছর, আর কত তারিখ, আর কত বাস ভাড়া। মা বললেন, "যা পেয়েছিস তাই রাখ।"

অনিতা মেনে নিল। পুরোটা না, অর্ধেক। অর্ধেক জমি, অর্ধেক ন্যায়, অর্ধেক জীবন। সংখ্যালঘুর হিসাব সবসময় অর্ধেক। পুরোটা চাইতে নেই, পুরোটা পেতে নেই। যা পাওয়া যায় তাই অনেক।

আম গাছটা অনিতার অর্ধেকে পড়েছে। এটুকু যথেষ্ট। বাবার গাছ আছে। বাবার স্মৃতি আছে। বাকিটা ইতিহাস গিলে খাবে, কিন্তু গাছটা দাঁড়িয়ে থাকবে।

রায়ের দিন আদালত থেকে বের হয়ে অনিতা রিকশায় বসল। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, "কোথায় যাবেন?" অনিতা বলল, "বাড়ি।" শব্দটা বলতে গিয়ে গলা কাঁপল। বাড়ি। এখনো বাড়ি বলতে পারে। আদালত বলেছে বাড়ি আছে, অর্ধেক হলেও আছে। রিকশা চলল। ফরিদপুরের রাস্তা, ধুলো, গরু, মানুষ, দোকান। সব চেনা। এই রাস্তায় বাবার সাথে হেঁটেছে, বাবার আঙুল ধরে, বাবা বলতেন, "দেখ, এই রাস্তা আমাদের পূর্বপুরুষরা তৈরি করেছে, হিন্দু-মুসলমান মিলে।" সত্যি কি না জানে না অনিতা, কিন্তু বাবা বিশ্বাস করতেন।

শারদীয় দুর্গাপূজা। অক্টোবর। অনিতাদের বাড়ির পাশে ছোট মন্দির, বাবা বানিয়েছিলেন, ইটের দেয়াল, টিনের চাল। আগে বড় করে পূজা হতো, ঢাকি আসত, প্রতিমা আসত কুমারটুলি থেকে না, স্থানীয় কুমোরের তৈরি, কিন্তু সুন্দর। মাইক বাজত, প্রসাদ বিলানো হতো, পাড়ার মুসলমান পরিবারও আসত, খিচুড়ি খেত।

এখন চুপচাপ করে। মাইক নেই। মন্দিরের দরজা খোলা, কিন্তু জানালা বন্ধ। প্রতিমা ছোট, দুই ফুটের। মা বলেন, "বড় করে করার দরকার নেই। ঈশ্বর ছোটতেও থাকেন।"

অনিতা জানে, ঈশ্বরের আকার নিয়ে কথা না। ভয় নিয়ে কথা। বড় করে পূজা করলে কে কী বলবে, কে কী করবে, সেই ভয়। বাবা থাকতে ভয় কম ছিল। বাবা লম্বা মানুষ ছিলেন, গলা জোরে, পাড়ায় সবাই চিনত, সম্মান করত। বাবা বলতেন, "আমরা এই দেশের মানুষ। পূজা করব, উৎসব করব। ভয় পাব কেন?"

বাবা নেই। ভয় আছে।

পূজার আগের দিন অনিতা মন্দির পরিষ্কার করে। মেঝে ধোয়, দেয়ালে চুন লাগায়, দরজায় আলপনা আঁকে। আলপনা আঁকতে আঁকতে ভাবে, মা শিখিয়েছিলেন, মায়ের মা শিখিয়েছিলেন, তার মা শিখিয়েছিলেন। কত প্রজন্মের আলপনা। কত প্রজন্মের নারী এই মাটিতে এই চালের গুঁড়ো দিয়ে এই নকশা এঁকেছে। অনিতা আঁকে। লাইন কাঁপে, হাত কাঁপে, কিন্তু নকশা তৈরি হয়।

অনিতা সন্ধ্যায় আরতি করে। ঘণ্টা বাজায় আস্তে, যেন পাশের বাড়ি পর্যন্ত শব্দ না যায়। ধূপ জ্বালায়, ধোঁয়া ওঠে, চোখ জ্বলে। চোখ জ্বলার কারণ ধোঁয়া না, অন্য কিছু। অনিতা চোখ মোছে আঁচলে।

মা পাশে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করেন। কী প্রার্থনা করেন জানে না অনিতা। হয়তো বাবার জন্য। হয়তো জমির জন্য। হয়তো শুধু বেঁচে থাকার জন্য। এই দেশে সংখ্যালঘু হিন্দু নারীর বেঁচে থাকা নিজেই একটা প্রার্থনা।

রাতে অনিতা উঠোনে বসে।

আকাশে তারা। গ্রামের আকাশ এখনো পরিষ্কার, শহরের মতো ধোঁয়ায় ঢাকা হয়নি। বাবা এই উঠোনে বসে তারা দেখাতেন। "ওটা সপ্তর্ষি, ওটা ধ্রুবতারা। ধ্রুবতারা সবসময় এক জায়গায় থাকে, নড়ে না।"

অনিতা ভাবে, সে কি ধ্রুবতারা? এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, নড়ছে না? নাকি গোঁয়ার? নাকি বোকা?

মিতা ঢাকায়, চাকরি করে, মেসে থাকে, নিজের জীবন নিজে চালায়। মিতা বলে, "আপু, তুই ওই গ্রামে পড়ে থাকিস কেন? এখানে চলে আয়।" অনিতা বলে, "মা আছে।" মিতা বলে, "মাকেও নিয়ে আয়।" অনিতা বলে, "বাবার বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাব?"

এটাই শেষ কথা। বাবার বাড়ি। বাবার গাছ। বাবার মাটি। এগুলো ছেড়ে দিলে বাবা কোথায় থাকবেন? স্মৃতির একটা ঠিকানা লাগে। ঠিকানা মুছে গেলে মানুষও মুছে যায়।

মতিন চাচা দখল করা জমিতে ইটের দেয়াল তুলেছে। অনিতা দেখেছে। কিছু বলেনি। আদালত যা দিয়েছে তাই নিয়ে চুপ। বাকিটা নিয়ে আর লড়বে না। লড়াই শেষ, ক্লান্তি শেষ হয়নি।

পাশের বাড়ির রহিমা ভাবি মাঝে মাঝে আসেন। ভাত দেন, মাছ দেন, বলেন, "অনিতা, তোমরা ভালো মানুষ। তোমাদের সাথে যা হয়েছে ঠিক হয়নি।" অনিতা হাসে। রহিমা ভাবি ভালো মানুষ। কিন্তু রহিমা ভাবি একজন। মতিন চাচারা অনেক।

একজন ভালো মানুষ কি অনেক খারাপ মানুষের ওজন সামলাতে পারে? অনিতা জানে না। কিন্তু রহিমা ভাবির ভাতের থালা নিয়ে বসতে গেলে চোখে পানি আসে। ভালোবাসার ওজন অন্যরকম, সেটা অনিতা জানে।

একদিন ফাতেমা আসে। মতিন চাচার নাতনি। অনিতার সমবয়সী। ছোটবেলায় একসাথে খেলেছে, একসাথে নদীতে গেছে, একসাথে পুতুল খেলেছে। ফাতেমা এখন মতিন চাচার বাড়িতে থাকে, স্বামী মারা গেছে, দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছে।

ফাতেমা বলে, "দিদি, আমি কিছু জানতাম না। বাবা কী করেছে জানতাম না।"

অনিতা বলে, "জানি।"

"আমি চাইনি এমন হোক।"

"জানি, ফাতেমা।"

দুজনে চুপ করে বসে থাকে। দুই পাশে একটা দেয়াল, চোখে দেখা যায় না, কিন্তু আছে। মতিন চাচার তৈরি দেয়াল। ছোটবেলায় এই দেয়াল ছিল না। ছোটবেলায় ফাতেমা হিন্দু বাড়িতে আসত, অনিতা মুসলমান বাড়িতে যেত, কেউ কিছু বলত না। এখন দেয়াল আছে। জমির দেয়াল, ধর্মের দেয়াল, সম্পত্তির দেয়াল।

ফাতেমা চলে যায়। অনিতা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে। ফাতেমা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, একবার, তারপর চলে যায়। অনিতা জানে, ফাতেমা আবার আসবে না। আসতে পারবে না। মতিন চাচার বাড়ির মানুষ অনিতার বাড়িতে আসে না, এটাই নিয়ম হয়ে গেছে। নিয়মটা কে বানিয়েছে জানে না, কিন্তু সবাই মানে।

অনিতা ভাবে।

এই দেশ আমার।

জন্ম এখানে। বড় হওয়া এখানে। বাবার কবর এখানে, না, কবর না, বাবাকে পোড়ানো হয়েছে নদীর ঘাটে, ছাই ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে পদ্মায়। পদ্মা এই দেশের নদী। বাবার ছাই এই দেশের নদীতে। বাবা এই দেশের মাটিতে মিশে গেছেন, পানিতে মিশে গেছেন। এর চেয়ে বেশি নিজের দেশ আর কীভাবে হয়?

কিন্তু।

কিন্তু এই দেশে অনিতা অতিথি। পূজা করতে গেলে অনুমতি লাগে, উৎসব করতে গেলে সাবধান থাকতে হয়, জমি রাখতে গেলে কোর্টে যেতে হয়, রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে হয় আর ভাবতে হয় কাল সকালে সব ঠিক থাকবে তো।

এই দেশ আমার। কিন্তু এই দেশে আমি অতিথি।

অনিতা এই বাক্যটা কাউকে বলে না। এটা বলার জায়গা নেই। এটা বললে কেউ বুঝবে না, কেউ বলবে "এত কী, তোমরা তো ভালোই আছ," কেউ বলবে "ভারতে চলে যাও।" ভারত? কেন? অনিতার বাবা ভারতে যাননি। দাদা যাননি। পরদাদা যাননি। সাতচল্লিশে যাননি, একাত্তরে যাননি, তারপরেও যাননি। তাহলে অনিতা কেন যাবে?

অনিতা যাবে না।

অনিতা এখানে থাকবে। এই বাড়িতে, এই জমিতে, এই আম গাছের ছায়ায়। অর্ধেক জমি নিয়ে, অর্ধেক অধিকার নিয়ে, অর্ধেক নাগরিকত্ব নিয়ে। পুরোটা চাওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু অর্ধেকটাই বাস্তব। অর্ধেক আকাশ। সংখ্যালঘু মেয়ের জন্য আকাশটা সবসময় অর্ধেক।

মা ঘরের ভেতর থেকে ডাকেন, "অনিতা, ভেতরে আয়। শিশির পড়ছে।"

অনিতা ওঠে। শিশিরভেজা উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢোকে। দরজা বন্ধ করে। তালা দেয়। তালা দেওয়ার অভ্যাস বাবার সময় ছিল না। এখন আছে। তালার শব্দটা ঘরে প্রতিধ্বনি তোলে। শব্দটা ছোট, কিন্তু ভারী।

আম গাছটা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্ধকারে। নিঃশব্দে। বাবার মতো।