নীরবে চলি
১
রিনা সকাল সাড়ে পাঁচটায় ওঠে। অ্যালার্ম বাজে না। অ্যালার্ম বাজলেও শুনত না। ফোনটা বালিশের নিচে রাখে, কম্পন হলে ঘুম ভাঙে। কম্পনটাই রিনার অ্যালার্ম। পৃথিবী শব্দে চলে। রিনা কম্পনে চলে।
উঠে মুখ ধোয়, চুল বাঁধে, শাড়ি পরে। আয়নায় তাকায়। পঁচিশ বছরের মেয়ে, গায়ের রং শ্যামলা, চোখ বড়, ঠোঁট পাতলা। আয়নার মেয়েটা কিছু বলে না। রিনাও কিছু বলে না। দুজনেই চুপ। এই চুপ আয়নার এপারে ওপারে সমান।
মা রান্নাঘরে ভাত বসিয়েছেন। রিনা বুঝতে পারে রান্না হচ্ছে, হাঁড়ির ঢাকনা কাঁপছে দেখে। বাষ্প উঠছে। শব্দ শুনতে পায় না, কিন্তু বাষ্প দেখতে পায়। রিনার পৃথিবী চোখের। কান যা দেয় না, চোখ সেটা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। পুরোটা পারে না। কিছুটা পারে।
মা রিনার দিকে তাকান। হাত দিয়ে ইশারা করেন, খেয়ে নে। মা ইশারা ভাষা পুরোটা শেখেননি, কিন্তু রিনার সাথে যোগাযোগের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু জানেন। হাতের তালু উল্টে ধরা মানে খাবার, ভ্রু তোলা মানে প্রশ্ন, দুই হাত জোড়া মানে যত্ন নে। বাকিটা চোখ দিয়ে বলেন। মায়ের চোখের ভাষা রিনা জন্ম থেকে পড়ে।
বাবা ভোরে বেরিয়ে গেছেন। রিকশা চালান। বাবা কখনো ইশারা ভাষা শেখেননি। রিনার সাথে কথা বলেন স্বাভাবিকভাবে, মুখ দিয়ে, যেন রিনা শুনতে পায়। রিনা বাবার ঠোঁট পড়ে। বাবা যখন বলেন "মা," ঠোঁট দুটো জুড়ে আসে তারপর খুলে যায়। যখন বলেন "ভালো আছিস?" ঠোঁটের আকৃতি বদলায়, চোয়াল নামে, জিভ দাঁতে ঠেকে। রিনা পড়তে পারে। সবসময় পুরোটা না। কিন্তু বাবার মুখ পড়তে সহজ, কারণ বাবা সবসময় একই কথা বলেন। "ভালো আছিস?" "খেয়েছিস?" "যত্ন নিস।"
২
গাজীপুর ইপিজেড। ফ্যাক্টরি। সাতটায় পৌঁছাতে হয়। রিনা বাস ধরে ছয়টা পনেরোতে। বাস ভর্তি, গার্মেন্টস কর্মী, বেশিরভাগ মেয়ে। সবাই কথা বলে, গল্প করে, হাসে, ঝগড়া করে। রিনা জানালার পাশে বসে বাইরে তাকায়। বাসের ভেতরের কথা শুনতে পায় না, কিন্তু মুখের ভাব দেখে বুঝতে পারে কে রাগ করছে, কে হাসছে, কে ক্লান্ত।
ফ্যাক্টরিতে রিনা সেলাই করে। সেলাই মেশিনে কাপড় দেয়, প্যাডেল মাড়ায়, সুই চলে, সুতো যায়। এই কাজে কান লাগে না। চোখ লাগে, হাত লাগে, ছন্দ লাগে। রিনার ছন্দ ভালো। সুপারভাইজার বলেছেন, "রিনার কাজ সবচেয়ে পরিষ্কার।" এই কথা রিনা জানে না, অন্যদের কাছে শুনেছে, মানে অন্যরা ইশারায় বলেছে। সুপারভাইজার রিনার সাথে কথা বলেন না সরাসরি, বলতে অস্বস্তি হয় হয়তো, বধির মানুষের সাথে কথা বলতে অনেকেরই অস্বস্তি হয়, যেন অসুখটা ছোঁয়াচে।
পাশের মেশিনে ফারজানা বসে। ফারজানা রিনার বান্ধবী, মানে ফারজানা তাই মনে করে। রিনা জানে না বান্ধবী কাকে বলে ঠিক, কিন্তু ফারজানা লাঞ্চের সময় পাশে বসে, নিজের টিফিন থেকে ভাত দেয়, মাঝে মাঝে রিনার চুলে ক্লিপ লাগিয়ে দেয়।
ফারজানা একটু একটু ইশারা ভাষা শিখেছে রিনার কাছে। ধন্যবাদ, ভালো, খারাপ, চলো, খাবার, পানি। ছয়টা শব্দ। ছয়টা শব্দ দিয়ে একটা বন্ধুত্ব চলে। বেশি কথার দরকার হয় না বন্ধুত্বে, রিনা এটা জানে।
লাঞ্চের সময় ফারজানা হাত তুলে বলে "ভালো?" রিনা মাথা নাড়ে, ভালো। ফারজানা হাসে। রিনা হাসে। দুজনের হাসি একটা সম্পূর্ণ কথোপকথন। শব্দ ছাড়া, শুধু মুখের পেশীর নড়াচড়ায়, দুটো মানুষ যুক্ত হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ভাষা হাসি। হাসির আগে শব্দ ছিল না। হাসি শব্দের আগের ভাষা। রিনা সেই পুরনো ভাষায় কথা বলে।
৩
কিন্তু সবাই ফারজানা না।
ফ্যাক্টরিতে রিনা যখন ইশারায় কিছু বলে, কেউ কেউ হাসে। মুখে হাত নাড়িয়ে নকল করে। "দেখ দেখ, বোবা কী করে।" রিনা শুনতে পায় না কথাটা, কিন্তু দেখতে পায় হাসিটা। হাসির ধরন বোঝে। সহানুভূতির হাসি আর উপহাসের হাসি এক না। সহানুভূতির হাসিতে চোখ নরম হয়। উপহাসের হাসিতে চোখ সরু হয়, ভ্রু ওঠে, মুখের একপাশ বেশি ওঠে। রিনা চোখ পড়তে শিখেছে। মানুষ মুখে মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু চোখে পারে না।
একদিন টয়লেটে গেল। ভেতরে তিনজন। রিনাকে দেখে একজন কিছু বলল, বাকি দুইজন হাসল। রিনা ঠোঁট পড়ার চেষ্টা করল। পুরোটা বুঝল না। "বোবা" শব্দটা বুঝল। ঠোঁট বন্ধ, তারপর গোল হয়ে খুলে যায়, তারপর আবার বন্ধ। বো-বা। শব্দটা ঠোঁটে স্পষ্ট।
বোবা। রিনা বোবা না। রিনা বধির। দুটো আলাদা জিনিস। কিন্তু মানুষ পার্থক্য করে না। শুনতে পায় না মানে কথা বলতে পারে না মানে বোবা মানে বোকা। একটার সাথে আরেকটা গুলিয়ে যায়। রিনা বোকা না। রিনা বুদ্ধিমান। রিনার বুদ্ধি শব্দে প্রকাশ হয় না, হাতে প্রকাশ হয়, চোখে প্রকাশ হয়, কাজে প্রকাশ হয়। কিন্তু পৃথিবী শব্দ ছাড়া বুদ্ধি মাপে না।
রিনা কিছু বলল না। মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছাদে ফাটল আছে, একটা লম্বা ফাটল, মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে গেছে। রিনা ভাবে, "বোবা" শব্দটা কেমন? শব্দটা শুনতে কেমন? রিনা কোনো শব্দ শোনেনি কখনো। জন্ম থেকে। মায়ের গলা শোনেনি, বাবার ডাক শোনেনি, বৃষ্টির শব্দ শোনেনি, আজানের সুর শোনেনি। শব্দহীন পৃথিবীতে বাস করে রিনা। এই পৃথিবীতে রং আছে, স্পর্শ আছে, গন্ধ আছে, কম্পন আছে। শব্দ নেই।
আমি শুনতে পাই না। কিন্তু আমি সব দেখি।
এই কথাটা রিনার নিজের আবিষ্কার। কেউ শেখায়নি। জীবন শিখিয়েছে। বছরের পর বছর মানুষের মুখ পড়তে পড়তে রিনা বুঝে গেছে, মানুষ যা বলে আর যা ভাবে তা এক না। মুখে বলে "ভালো আছি," চোখ বলে "ভালো নেই।" মুখে বলে "সমস্যা নেই," কপালের ভাঁজ বলে "অনেক সমস্যা।" রিনা শব্দ শোনে না, তাই শব্দের আড়ালটা দেখে না। সরাসরি মুখটা দেখে, চোখটা দেখে, হাতের নড়াচড়াটা দেখে। সত্যিটা দেখে।
এটা সুবিধা না। এটা বেঁচে থাকার কৌশল। কিন্তু কখনো কখনো এই কৌশলটা একটা ক্ষমতা হয়ে ওঠে। মানুষের ভেতরটা দেখার ক্ষমতা। কেউ দেয়নি এই ক্ষমতা। নীরবতা দিয়েছে।
রিনা এই কথাটা মনে মনে বলে। মুখে বলতে পারে না, রিনার গলা থেকে শব্দ বের হয়, কিন্তু সেই শব্দ অন্যরা বোঝে না, রিনা নিজেও শোনে না। তাই মনে মনে বলে। মনের ভাষায় শব্দ লাগে না।
৪
হাসপাতালে গেল রিনা। জ্বর, তিনদিন ধরে। মা বললেন যেতে, মুখ দেখেই বুঝলেন জ্বর, কপালে হাত দিলেন, হাত সরিয়ে ভ্রু কুঁচকালেন।
গাজীপুর সরকারি হাসপাতাল। লম্বা লাইন। রিনা লাইনে দাঁড়ায়। ডাক্তারের রুমে ঢুকল।
ডাক্তার বললেন, "কী সমস্যা?"
রিনা হাত দিয়ে ইশারা করল। কপালে হাত রাখল, মানে জ্বর। গলায় হাত রাখল, মানে ব্যথা।
ডাক্তার তাকালেন। বুঝলেন না। "কথা বলতে পারেন না?"
রিনা মাথা নাড়ল। পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল। কাগজটা রিনা নিজে বানিয়েছে। মা বলেছিলেন বানাতে, "তুই সবসময় রাখবি, যেখানেই যাবি।" কাগজে লেখা: "আমি বধির। কথা বলতে ও শুনতে পারি না। অনুগ্রহ করে লিখে দেখান।" কাগজটা ভাঁজে ভাঁজে পুরনো হয়ে গেছে, কোণা ছিঁড়ে যাচ্ছে, কিন্তু লেখাটা পরিষ্কার। রিনার পরিচয়পত্র এটা। সরকারি না, নিজের তৈরি।
ডাক্তার কাগজটা পড়লেন। তারপর প্রেসক্রিপশন প্যাডে লিখলেন: "জ্বর কতদিন?"
রিনা তিন আঙুল দেখাল।
ডাক্তার লিখলেন: "কাশি আছে?"
রিনা মাথা নাড়ল, না।
এভাবে চলল। লিখে লিখে। একটা পাঁচ মিনিটের পরীক্ষায় পনেরো মিনিট লাগল। বাইরে লাইনে অপেক্ষারত রোগীরা অস্থির হলো। কেউ দরজায় উঁকি দিল। ডাক্তার তাড়াহুড়ো করলেন। প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন।
ওষুধের দোকানে গেল রিনা। প্রেসক্রিপশন দেখাল। দোকানদার ওষুধ দিলেন। কিছু বললেন, হয়তো কখন খেতে হবে, কতটুকু খেতে হবে। রিনা শুনতে পেল না। দোকানদারের ঠোঁট পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু দোকানদার দ্রুত কথা বলেন, মুখ ঘোরান, পাশে তাকান, রিনা ধরতে পারল না।
বাসায় এসে ওষুধের প্যাকেটের গায়ে লেখা পড়ল। ইংরেজিতে। "Twice daily after meals." এটুকু বুঝল। বাকিটা জানা হলো না। জানার উপায়ও নেই।
ইন্টারপ্রেটার নেই হাসপাতালে। ইশারা ভাষার দোভাষী নেই। সরকারি হাসপাতালে বধির মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। বধির মানুষ অসুস্থ হলে কী করবে? নিজের শরীরের কথা নিজে বলতে পারবে না, ডাক্তারের কথা শুনতে পারবে না। মাঝখানে একটা দেয়াল, নীরবতার দেয়াল, কেউ ভাঙতে আসে না।
রিনা ভাবে, শরীরের অসুখের চিকিৎসা আছে, কিন্তু চিকিৎসায় পৌঁছানোর রাস্তাটা বধির মানুষের জন্য বন্ধ। দরজা আছে, কিন্তু দরজায় তালা, আর তালার চাবি শব্দের, যে শব্দ রিনার কাছে নেই।
৫
ব্যাংকে গেল। মাসের বেতন তোলা। গাজীপুরের একটা সরকারি ব্যাংক শাখা।
কাউন্টারে দাঁড়াল। ফর্ম ভরল, নিজেই। লিখতে পারে রিনা, বাংলা, ইংরেজি, নাম, ঠিকানা, অ্যাকাউন্ট নম্বর। ফর্ম জমা দিল।
ক্যাশিয়ার কিছু বললেন। রিনা শুনল না। ক্যাশিয়ার আবার বললেন, জোরে। রিনা ফোনের নোটপ্যাড খুলে লিখে দেখাল: "আমি শুনতে পাই না।"
ক্যাশিয়ার বিরক্ত হলেন। ভ্রু কুঁচকালেন। কাগজে লিখলেন: "আইডি দেখান।"
রিনা আইডি কার্ড দেখাল। ক্যাশিয়ার মিলিয়ে দেখলেন। টাকা গুনলেন। দিলেন।
পুরো প্রক্রিয়াটা পাঁচ মিনিটের, অন্যদের তিন মিনিটে হয়।
কিন্তু সেই পাঁচ মিনিটে ক্যাশিয়ারের মুখে যে ভাব দেখল রিনা, সেটা অনেকবার দেখেছে। বিরক্তি। অধৈর্য। যেন রিনা তাদের সময় নষ্ট করছে। যেন শুনতে না পাওয়াটা রিনার দোষ। যেন রিনা ইচ্ছে করে শোনে না।
পৃথিবী শব্দে চলে। আমি নীরবে চলি। পৃথিবী আমার জন্য থামে না। আমি পৃথিবীর সাথে তাল মেলাই। কিন্তু তাল মেলাতে গেলে হাঁপ ধরে।
রিনা ভাবে, যদি একদিন সবকিছু বদলে যেত? যদি পৃথিবী একদিনের জন্য নীরব হতো? যদি সবাই শুনতে না পেত, একদিন, শুধু একদিন? তাহলে বুঝত কেমন লাগে। বুঝত একটা সাধারণ কাজ করতে গেলে কত কঠিন হয়। বুঝত ওষুধের নিয়ম না জানার ভয়। বুঝত নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দিতে পারার অসহায়তা।
কিন্তু পৃথিবী নীরব হবে না। পৃথিবী শব্দের। রিনা শব্দের পৃথিবীতে নীরবতার দ্বীপ।
৬
কোর্টে গেল রিনা। একটা কাগজ দরকার, জন্ম সনদ হারিয়ে গেছে, নতুন করে তুলতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ বলেছে কোর্টে যেতে হবে, এফিডেভিট করতে হবে।
কোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মানুষের ভিড়। সবাই কথা বলছে, উকিল ডাকছে, পিয়ন ডাকছে, নাম ধরে ডাকছে। রিনার নাম কেউ ডাকলে শুনবে না। তাই রিনা দাঁড়িয়ে থাকে, চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে, কে কার দিকে ইশারা করছে, কোন ঘরে যেতে হবে।
একটা ঘরে ঢুকল। টেবিলে একজন মানুষ বসে আছেন, সামনে কাগজের স্তূপ। রিনা কাগজটা দেখাল। মানুষটা কিছু বললেন। রিনা ফোনের নোটপ্যাডে লিখে দেখাল: "আমি শুনতে পাই না। লিখে বলুন।"
মানুষটা বিরক্ত হলেন। পাশের লোককে কিছু বললেন। পাশের লোক রিনার দিকে তাকাল, তারপর মাথা নাড়ল। রিনা বুঝল, তারা রিনাকে নিয়ে কথা বলছে। কী বলছে জানে না। কিন্তু মুখের ভাব দেখে আন্দাজ করতে পারে। ঝামেলা, ঝামেলা, এই মেয়ে কেন এসেছে, কীভাবে কাজ চলবে।
রিনা দাঁড়িয়ে রইল। ধৈর্য ধরে। ধৈর্য রিনার শেখা। পৃথিবী যখন তোমার জন্য থামে না, তখন তুমি অপেক্ষা করো। অপেক্ষা ছাড়া আর কী করার আছে?
শেষ পর্যন্ত কাগজ হলো। দুই ঘণ্টা লাগল যেটা অন্যদের বিশ মিনিটে হয়। রিনা কাগজটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল। বেরিয়ে এলো। রোদ চোখে লাগল। চোখ কুঁচকে তাকাল আকাশের দিকে। আকাশ নীল, মেঘ নেই। আকাশের কোনো শব্দ নেই। আকাশও বধির।
৭
ফারজানা একদিন রিনাকে একটা কাগজ দিল। কাগজে লেখা: "তুই বোবা না। তুই ভিন্নভাবে কথা বলিস।"
রিনা কাগজটা পড়ল। পড়ে রাখল। ভাঁজ করে পকেটে রাখল। কাগজটা এখনো আছে, রিনার আলমারিতে, একটা ছোট টিনের বাক্সে, যেখানে রিনা জরুরি জিনিস রাখে। জন্ম সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, ফ্যাক্টরির আইডি কার্ড, আর ফারজানার কাগজ। চারটে কাগজ। চারটের মধ্যে ফারজানারটা সবচেয়ে জরুরি।
কারণ বাকি তিনটা বলে রিনা কে। ফারজানারটা বলে রিনা কেমন।
৮
রাতে রিনা ছাদে যায়।
গাজীপুরের আকাশ ধোঁয়াটে, ফ্যাক্টরির চিমনির ধোঁয়া, গাড়ির ধোঁয়া, কিন্তু মাঝে মাঝে তারা দেখা যায়। রিনা তারা দেখে। তারার শব্দ নেই। তারা নীরবে জ্বলে, নীরবে নেভে। রিনা ভাবে, তারাও কি বধির? তারাও কি শুনতে পায় না পৃথিবীর হইচই?
নিচে রাস্তায় গাড়ি চলছে, মানুষ হাঁটছে, কেউ চেঁচাচ্ছে হয়তো, কেউ গান গাইছে হয়তো। রিনা জানে না। রিনার পৃথিবীতে ছাদ নীরব, রাস্তা নীরব, আকাশ নীরব। সবকিছু নড়ে, কিন্তু শব্দ ছাড়া নড়ে, যেন কেউ টিভির ভলিউম একদম শূন্যে নামিয়ে দিয়েছে।
মা ছাদে আসেন। পাশে দাঁড়ান। কিছু বলেন না। মায়ের সাথে নীরবতা ভাগ করা যায়। মায়ের সাথে নীরবতা বিব্রতকর না, মায়ের সাথে নীরবতা আরামের।
মা রিনার মাথায় হাত রাখেন। হাতের স্পর্শটা একটা বাক্য। পুরো বাক্য। "তুই আমার মেয়ে, তুই ভালো আছিস, তুই ভালো থাকবি।" কানে শোনা যায় না, ত্বকে পড়া যায়।
রিনা মায়ের হাত ধরে। দুইজনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। নিচে পৃথিবী চলে, শব্দে চলে, তাড়াহুড়োয় চলে। ছাদে দুইজন দাঁড়িয়ে, নীরবে।
রিনা হাসে। ভেতরে। বাইরে মুখটা স্থির। কিন্তু ভেতরে হাসে। কারণ রিনা জানে একটা কথা, যেটা শব্দের পৃথিবী জানে না।
নীরবতার নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা শিখতে হয়। শিখলে বোঝা যায়, শব্দ সবকিছু না। শব্দের বাইরেও পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবীতে রিনা বাস করে। সেই পৃথিবী ছোট না। সেই পৃথিবী অন্যরকম।
আমি শুনতে পাই না। কিন্তু আমি সব দেখি। তোমরা যা বলো তাও দেখি। তোমরা যা বলো না তাও দেখি। শব্দ লুকানো যায়। চোখ লুকানো যায় না।