স্বপ্নের ঠিকানা লাগে না
১
সেতুর নিচে ভোর আসে আলাদাভাবে।
উপর দিয়ে গাড়ি চলে, সেতু কাঁপে, কাঁপুনিটা নেমে আসে কংক্রিটের থাম বেয়ে, হাসনার ঘুম ভাঙে। ঘুম বলতে যেটুকু হয়। চটের বস্তার ওপর শুয়ে, গায়ে একটা পুরনো চাদর, দুই পাশে দুই ছেলেমেয়ে। বড়ো মেয়ে ফাতেমা, নয় বছর। ছোটো ছেলে রবিউল, ছয়। দুইজনেই ঘুমাচ্ছে। ফাতেমার মুখে শান্তি, ঘুমের মধ্যে মুখে হাসি, হয়তো স্বপ্ন দেখছে। রবিউলের মুখ খোলা, একটু লালা গড়িয়ে পড়েছে গালে।
হাসনা উঠে বসে। পিঠ ব্যথা করে। বত্রিশ বছর বয়স, কিন্তু পিঠ বলে পঞ্চাশের। সেতুর নিচে ঘুমালে পিঠ এমনই হয়। মাটি শক্ত, ঠান্ডা, হাড়ে গিয়ে লাগে। হাসনা পিঠে হাত দেয়। কিছু হয় না, ব্যথা যায় না, কিন্তু হাত দেওয়ার অভ্যাস আছে, যেন হাত দিলে পিঠ বুঝবে কেউ খেয়াল রাখছে।
পাশে একটা প্লাস্টিকের বালতি। বালতিতে পানি আছে, রাতে ভরে রেখেছে, পাশের মসজিদের কল থেকে। পানি দিয়ে মুখ ধোয়, ফাতেমার মুখে ছিটিয়ে দেয়, ফাতেমা চোখ খোলে, তারপর আবার বন্ধ করে।
"উঠ, মা। স্কুলে যেতে হবে।"
ফাতেমা উঠে বসে। চোখ কচলায়। রবিউল এখনো ঘুমাচ্ছে। ওকে পরে তোলা যাবে।
২
স্কুল বলতে যেটুকু।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হেঁটে পনেরো মিনিট। ফাতেমা যায়, রবিউলও যায়। বিনামূল্যে পড়া, বই বিনামূল্যে, কিন্তু খাতা কিনতে হয়, কলম কিনতে হয়, জুতা কিনতে হয়। এগুলোর টাকা হাসনা জোগাড় করে। কীভাবে করে সেটা হাসনা ভাবতে চায় না।
ভোর থেকে বেরোয়। শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, গুলিস্তান। সিগন্যালে দাঁড়ায়। গাড়ি থামলে জানালায় হাত বাড়ায়। "ভাই, কিছু দেন।" "আপা, বাচ্চা আছে।" কেউ দেয়, কেউ দেয় না, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ গ্লাস উঠিয়ে দেয়। কেউ কেউ বলে, "কাজ করো, ভিক্ষা করো কেন?" হাসনা কিছু বলে না। কাজ করতে চায় না, এমন না। কাজ পায় না। কোথায় যাবে? বাসায় কাজ করতে চাইলে ঠিকানা চায়, হাসনার ঠিকানা নেই। কাগজপত্র চায়, হাসনার কাগজপত্র ছিল, স্বামী নিয়ে গেছে, না ফেরত দিয়ে যায়নি।
স্বামী। মনির। মনির তিন বছর আগে বেরিয়ে গেছে। বলেছিল, "চট্টগ্রামে কাজ আছে, যাই।" গেল। ফিরল না। ফোন নম্বর বন্ধ। কোনো খবর নেই। মরেছে নাকি বেঁচে আছে, অন্য সংসার করেছে নাকি জেলে আছে, কিছু জানে না হাসনা। জানার চেষ্টাও আর করে না। প্রথম বছর খুঁজেছে, কেঁদেছে, মনিরের গ্রামে ফোন করেছে, শ্বশুর বলেছেন "জানি না, খোঁজো না, ও আসবে না।" শ্বশুরের গলায় রাগ ছিল না, বিরক্তি ছিল, যেন মনির নামের ছেলেটা শ্বশুরেরও বোঝা।
হাসনা কাঁদা ছেড়ে দিয়েছে। কান্নায় ভাত হয় না।
কিন্তু রাতে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে। মনিরের মুখ দেখে। বিয়ের সময়ের মুখ, তখন হাসত মনির, চোখে আলো ছিল, হাতে শক্তি ছিল। স্বপ্নে মনির বলে, "আমি আসব।" হাসনা জেগে ওঠে। সেতুর নিচে অন্ধকার। মনির নেই। স্বপ্ন ছিল। হাসনা ফাতেমার মুখের দিকে তাকায়। ফাতেমা ঘুমাচ্ছে। ফাতেমা আছে। রবিউল আছে। এটুকুই বাস্তব। বাকিটা স্বপ্ন, আর স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠাই ভালো।
৩
দুপুরে ফিরে আসে সেতুর নিচে।
রবিউল খেলছে পাশের খালি জায়গায়, অন্য বাচ্চাদের সাথে। এখানে আরো পরিবার আছে, সাতটা পরিবার, সবাই সেতুর নিচে। প্রত্যেকের আলাদা জায়গা, চটের বস্তা দিয়ে সীমানা করা, কিন্তু দেয়াল নেই। দেয়াল ছাড়া ঘর। ছাদ আছে, সেতুটাই ছাদ, বৃষ্টি ঠেকায়, কিন্তু বাতাস আসে চারদিক দিয়ে, শীতকালে হাড়ে কামড় দেয়।
হাসনা রান্না করে। ইটের চুলা বানিয়েছে, লাকড়ি জ্বালায়, ধোঁয়া ওঠে। আজ ভাত, শুধু ভাত, একটু লবণ, একটু তেল। কখনো ডাল হয়, কখনো সবজি, যেদিন ভিক্ষায় বেশি আসে সেদিন মাছ। মাছ কেনার দিনগুলো ফাতেমা আর রবিউলের চোখ উজ্জ্বল হয়। সেই উজ্জ্বল চোখ দেখলে হাসনার বুকে কিছু একটা হয়, ব্যথা না, আনন্দ না, দুটোর মাঝখানে কিছু একটা, নাম নেই সেই অনুভূতির।
ফাতেমা স্কুল থেকে ফিরেছে। ব্যাগ রাখে চটের ওপর। ব্যাগটা পুরনো, একটা চেইন ভাঙা, কিন্তু ফাতেমা যত্ন করে রাখে, ভেতরে বই গোছানো, খাতায় পরিষ্কার হাতের লেখা।
"আজ কী পড়েছিস?"
"গণিত। যোগ বিয়োগ। আর বাংলা, ছড়া।"
"কোন ছড়া?"
ফাতেমা মুখস্থ বলে। "আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে..." হাসনা শোনে। ছড়াটা চেনা, হাসনাও পড়েছিল, ক্লাস থ্রিতে, ময়মনসিংহের একটা স্কুলে, অনেক আগে, অন্য জীবনে।
৪
রাত।
ফাতেমা আর রবিউল শুয়ে পড়েছে। হাসনা একটা মোমবাতি জ্বালায়। আলো কম, কিন্তু যথেষ্ট। একটা ছেঁড়া বই বের করে। বাংলা পাঠ্যবই, ক্লাস টু, রবিউলের। বইটা ছেঁড়া, কিছু পাতা নেই, কিন্তু যে পাতাগুলো আছে সেগুলো হাসনা রোজ রাতে পড়ে। নিজে পড়ে না, ফাতেমাকে আর রবিউলকে পড়ায়।
হাসনা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে। তারপর বিয়ে। চৌদ্দ বছরে বিয়ে, পনেরোতে ফাতেমা, আঠারোতে রবিউল। পড়া আর হয়নি। কিন্তু যতটুকু পড়েছে ততটুকু মনে আছে। অক্ষর চেনে, পড়তে পারে, লিখতে পারে, যোগ বিয়োগ পারে। এটুকু দিয়ে ফাতেমা আর রবিউলকে পড়ায়।
"রবিউল, 'ক' দিয়ে কী?"
রবিউল ঘুমের চোখে বলে, "কলা।"
"আর?"
"কবুতর।"
হাসনা হাসে। রবিউলের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, কিন্তু মুখে উত্তর আসছে। ঘুমের মধ্যেও পড়া মনে আছে।
ফাতেমা জাগছে। সে বলে, "আম্মা, আমি যখন বড় হব তখন কী হব?"
হাসনা বলে, "তুই কী হতে চাস?"
"ডাক্তার।"
হাসনা চুপ করে থাকে। ডাক্তার। সেতুর নিচে থেকে ডাক্তার। কতটা দূর সেই পথ? কত টাকা লাগবে, কত বছর লাগবে, কত বাধা আসবে? হাসনা জানে না। কিন্তু হাসনা জানে, ফাতেমা পড়ছে। ফাতেমা প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে। ফাতেমার খাতায় লাল তারা আসছে। এটুকু যথেষ্ট আজকের জন্য। আগামীকালের কথা আগামীকাল।
"হবি। ইনশাল্লাহ।"
ফাতেমা বলে, "আম্মা, ডাক্তার হলে তোমাকে একটা বাড়ি কিনে দেব। পাকা বাড়ি। ছাদ থাকবে। বৃষ্টি আসলেও ভিজবে না।"
হাসনা হাসে। ঠোঁটের কোণে, আস্তে। ভেজা চোখে। ফাতেমা তিনতলা বাড়ির স্বপ্ন দেখছে, হাসনা একটা ছাদের স্বপ্ন দেখে, শুধু একটা ছাদ, যেটা বৃষ্টি আটকায়, যেটা নিজের, যেটা কেউ কেড়ে নেবে না। ছাদটুকুই যথেষ্ট। তিনতলা লাগবে না।
ফাতেমা হাসে। মোমবাতির আলোয় ফাতেমার মুখ উজ্জ্বল। হাসনা সেই মুখটা দেখে। মোমবাতি শেষ হয়ে আসছে, মোম গলছে, আলো কমছে। কিন্তু ফাতেমার মুখের আলো নিজস্ব, মোমবাতির ওপর নির্ভর করে না।
৫
বৃষ্টি এলো।
ঢাকায় বৃষ্টি এলে সেতুর নিচে পানি আসে। নালা উপচায়, নোংরা পানি ঢোকে, চটের বিছানা ভেজে, জিনিসপত্র ভাসে। হাসনা ফাতেমা আর রবিউলকে টেনে তোলে, উঁচু জায়গায় নিয়ে যায়, সেতুর থামের পাশে দাঁড়ায়। তিনজন ভিজে যায়। হাসনা ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে ধরে, গায়ের উষ্ণতা দেয়। গায়ে কাপড় ভেজা, কিন্তু শরীরের ভেতরে যে উষ্ণতা সেটা পানিতে ভেজে না।
রবিউল কাঁদে। "আম্মা, ঠান্ডা।"
"জানি, বাবা। একটু পরে থামবে।"
ফাতেমা চুপ। সে কাঁদে না। সে মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। চোখে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো প্রশ্ন নেই। ফাতেমা নয় বছরে অনেক কিছু বুঝে গেছে যেটা নয় বছরের মেয়ের বোঝার কথা না।
বৃষ্টি থামে। পানি নামে। হাসনা চটের বিছানা ধুয়ে শুকাতে দেয়। ভেজা কাপড় ছেলেমেয়ের গায়ে থাকে, শুকনো কাপড় নেই। আগামীকাল রোদ উঠলে শুকাবে। আজ রাতটা ভেজা কাপড়ে কাটাতে হবে।
হাসনা ভাবে। আমার ঠিকানা নেই। জাতীয় পরিচয়পত্রে ঠিকানা আছে, ময়মনসিংহের একটা গ্রামের, কিন্তু সেই বাড়ি আর নেই, সেই গ্রামে কেউ নেই। ঢাকায় ঠিকানা নেই। সেতুর নিচে ঠিকানা হয় না। চিঠি আসে না এখানে, কুরিয়ার আসে না, কেউ খুঁজে পায় না।
কিন্তু আমার স্বপ্ন আছে।
ফাতেমা ডাক্তার হবে। রবিউল বড় হবে, পড়বে, কিছু একটা হবে। হাসনা জানে না কী হবে, কিন্তু কিছু একটা হবে, সেতুর নিচের জীবন চিরকাল থাকবে না। এই বৃষ্টি চিরকাল থাকবে না। এই ভেজা রাত চিরকাল থাকবে না।
স্বপ্নের ঠিকানা লাগে না। স্বপ্ন সেতুর নিচেও থাকে। স্বপ্ন ভেজা চটের ওপরেও বসে। স্বপ্নকে বৃষ্টিতে ভেজানো যায় না।
হাসনা ঘুমাতে পারে না। ফাতেমা আর রবিউলের ভেজা শরীর গায়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। ওদের শ্বাসের তাপ পায়। ওদের শ্বাস পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ জিনিস। কোনো চুলা, কোনো আগুন, কোনো কম্বল এত উষ্ণ না। মায়ের কাছে সন্তানের শ্বাসই চূড়ান্ত আশ্রয়।
সেতুর ওপর দিয়ে একটা ট্রাক গেল। পুরো জায়গাটা কেঁপে উঠল। ফাতেমা নড়ল ঘুমের মধ্যে, কিন্তু জাগল না। রবিউলও জাগল না। ওরা এই কাঁপুনিতে অভ্যস্ত। জন্ম থেকে কাঁপুনিতে বড় হচ্ছে। অভ্যাস হয়ে গেছে।
হাসনা তাকায় সেতুর কংক্রিটের ছাদের দিকে। ছাদে আলো-আঁধারি, গাড়ির হেডলাইটের আলো এসে পড়ে, চলে যায়। প্রতিটা আলো আসে আর যায়, আসে আর যায়। হাসনা ভাবে, জীবনও তাই, আলো আসে যায়। এখন অন্ধকারের সময়। কিন্তু আলো আসবে। আসতে হবে।
৬
একদিন একটা এনজিও এলো। সেতুর নিচে। দুইজন মেয়ে, পরিষ্কার জামা, গলায় আইডি কার্ড। বললেন, "আমরা বাচ্চাদের জন্য এসেছি। স্কুলের বাইরে যারা, তাদের পড়ানোর ব্যবস্থা করি।"
হাসনা বলল, "আমার বাচ্চারা স্কুলে যায়।"
মেয়ে দুটো অবাক হলো। সেতুর নিচের বাচ্চা স্কুলে যায়? হাসনা বুঝল, অবাক হওয়ার কারণটা। সেতুর নিচে থাকা মানে বাচ্চারাও রাস্তায় থাকবে, ভিক্ষা করবে, আবর্জনা কুড়োবে, এই ধারণা সবার। হাসনার বাচ্চারা স্কুলে যায়, এটা ধারণার বাইরে।
একজন বলল, "খুব ভালো কাজ করছেন।"
হাসনা কিছু বলল না। ভালো কাজ? মা তার বাচ্চাকে স্কুলে পাঠায়, এটা ভালো কাজ? এটা তো স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু সেতুর নিচের মায়ের জন্য স্বাভাবিক কাজটাও অসাধারণ হয়ে যায়। গরিবের স্বাভাবিক জীবনযাপনও বাকিদের কাছে অলৌকিক।
মেয়ে দুটো ফাতেমার সাথে কথা বলল। ফাতেমা বলল, "আমি ডাক্তার হব।" মেয়ে দুটো হাসল, সেই হাসি করুণার না, বিশ্বাসের। বলল, "তুমি পারবে।" ফাতেমার চোখ উজ্জ্বল হলো। কেউ বলল "তুমি পারবে," এটুকুই যথেষ্ট। কেউ বিশ্বাস করলে নিজেও বিশ্বাস করা সহজ হয়।
মেয়ে দুটো চলে গেল। কিছু বই দিয়ে গেল, কিছু খাতা, কলম। হাসনা বইগুলো গুছিয়ে রাখল প্লাস্টিকের ব্যাগে, যেন বৃষ্টিতে না ভেজে। বই ভেজানো যাবে না। বই ফাতেমার অস্ত্র। ভেজা অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করা যায় না।
৭
সকালে রোদ উঠল।
হাসনা কাপড় মেলে দিল সেতুর রেলিংয়ে। ফাতেমাকে স্কুলে পাঠাল। রবিউলকে পাশের পরিবারের কাছে রেখে বেরোল। শাহবাগের দিকে।
সিগন্যালে দাঁড়াল। গাড়ি থামল। একটা সাদা গাড়ির জানালা নামল। ভেতরে একটা মেয়ে, হাসনার বয়সী হবে, সুন্দর শাড়ি, চুল বাঁধা, কানে দুল। মেয়েটা তাকাল হাসনার দিকে। হাসনা তাকাল মেয়েটার দিকে। দুইজনের চোখাচোখি হলো, এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড। মেয়েটা একটা দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিল। হাসনা নিল।
সিগন্যাল সবুজ হলো। গাড়ি চলে গেল। হাসনা দশ টাকার নোটটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটার চোখে কী ছিল? করুণা? অপরাধবোধ? কৌতূহল? হাসনা ঠিক ধরতে পারল না। কিন্তু এটুকু বুঝল, মেয়েটা ভেবেছে, "আমি ওর জায়গায় হতে পারতাম।" এই ভাবনা দশ টাকায় ভেতরে ঢুকে আছে।
হাসনাও ভাবে। আমিও ওর জায়গায় হতে পারতাম। মায়ের পেটে জন্মের আগে কেউ ঠিক করে দেয়নি কে সেতুর নিচে থাকবে আর কে সাদা গাড়িতে বসবে। ভাগ্য ঠিক করেছে। ভাগ্য অন্ধ, কিন্তু তার হাত শক্ত।
হাসনা আবার দাঁড়ায়। পরের সিগন্যাল। পরের গাড়ি। পরের জানালা।
কিন্তু হাসনার মাথায় একটা ছবি আছে। ফাতেমা, সাদা অ্যাপ্রন পরে, গলায় স্টেথোস্কোপ, হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ছবিটা কল্পনার। কিন্তু কল্পনাও বাস্তবের একটা অংশ। যেদিন কল্পনা শেষ হয়, সেদিন মানুষ সত্যি সত্যি হেরে যায়।
হাসনার কল্পনা শেষ হয়নি। তাই হাসনা হারেনি।
সেতুর থামে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। পায়ে ব্যথা। সারাদিন হেঁটেছে। কিন্তু পা চলে, পা থামে না। পা থামলে সব থামবে। ফাতেমার স্কুল থামবে, রবিউলের খাওয়া থামবে, স্বপ্ন থামবে। হাসনার পা তাই চলে। ক্লান্ত পা, ব্যথা পা, কিন্তু চলে। মায়ের পা কখনো থামে না। মায়ের পা সন্তানের জন্য চলে, সন্তান না থাকলে হয়তো থামত, কিন্তু সন্তান আছে, তাই পা চলে।