মা রাখার জায়গা নেই

পর্ব ৪৯ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আমেনা জানালার পাশে বসেন। প্রতিদিন। সকাল আটটা থেকে। চেয়ারটা প্লাস্টিকের, সাদা ছিল একসময়, এখন হলুদ হয়ে গেছে। পিঠে একটা ছোট বালিশ রাখেন, কোমর ব্যথা করে, বালিশ দিলে একটু কমে।

জানালা দিয়ে বাইরে একটা আম গাছ দেখা যায়। বৃদ্ধাশ্রমের উঠোনে। গাছটা পুরনো, পাতা ঘন, ছায়া পড়ে মাটিতে। আমেনা গাছটা দেখেন। তাঁর গ্রামের বাড়িতে একটা আম গাছ ছিল, উঠোনের কোণে, ওই গাছের নিচে বসে ছেলেদের ভাত খাওয়াতেন, চার ছেলে গোল হয়ে বসত, আমেনা মাঝখানে, হাতে থালা, "আর একটু নে, আর একটু খা।"

চার ছেলে।

আকবর, বড়ো। ঢাকায়, সরকারি চাকরি। ফারুক, মেজো। সৌদি আরব, দশ বছর ধরে। কামাল, সেজো। সিলেট শহরে, ব্যবসা করে। জামাল, ছোটো। আমেরিকায়, কী করে ঠিক জানেন না আমেনা, কম্পিউটারের কিছু।

চার ছেলে, চার দিকে। আমেনা একা, বৃদ্ধাশ্রমে।

বৃদ্ধাশ্রমে আসার গল্পটা আমেনা কাউকে বলেন না।

কিন্তু মনে আছে। প্রতিটা শব্দ মনে আছে। আশি বছর বয়সে অনেক কিছু ভুলে যান, গতকাল কী খেয়েছেন ভুলে যান, ওষুধ খেয়েছেন কি না ভুলে যান, কিন্তু সেদিনের কথা ভুলতে পারেন না।

আকবর এসেছিল। বড়ো ছেলে। ঈদের পরে। বাড়িতে বসে বলল, "আম্মা, আপনি একা থাকেন, আমরা চিন্তায় থাকি।"

আমেনা বললেন, "আমি ভালো আছি, বাবা।"

"না, আম্মা, একা থাকা ঠিক না। অসুখ হলে কে দেখবে? রাতে কিছু হলে?"

আমেনা বললেন, "পাশের বাড়ির রেহানা আসে, দেখে যায়।"

আকবর বলল, "রেহানা তো পর মানুষ।"

পর মানুষ। আমেনা কথাটা গিলে নিলেন। রেহানা পর মানুষ, কিন্তু রেহানা আসে। আকবর আপন, কিন্তু আকবর ঢাকায় থাকে, বছরে দুইবার আসে, ঈদে আর পূজায়, না পূজায় না, ঈদে আর কখনো কখনো।

"সিলেটে একটা বৃদ্ধাশ্রম আছে, আম্মা। ভালো জায়গা। ডাক্তার আছে, খাবার আছে, আপনার বয়সী মানুষ আছে।"

আমেনা চুপ করে বসে রইলেন।

বৃদ্ধাশ্রম। শব্দটা কানে ঢুকল, কিন্তু মাথায় ঢুকল না। বৃদ্ধাশ্রম মানে কী? মানে ছেলেরা রাখতে চায় না? মানে বাড়ি আর আমেনার জায়গা না? মানে আমেনা অপ্রয়োজনীয়?

আকবর বলল, "ফারুক ভাই, কামাল, জামাল, সবাই রাজি। সবাই মিলে খরচ দেবে।"

সবাই রাজি। চার ছেলে মিলে ঠিক করেছে। আমেনাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমেনা মা, কিন্তু সিদ্ধান্ত ছেলেদের।

আমেনা বললেন, "এই বাড়ি?"

আকবর বলল, "বাড়ি আছে, আম্মা। কেউ নেবে না। ভাড়া দেব।"

ভাড়া। আমেনা যে বাড়িতে পঞ্চাশ বছর কাটিয়েছেন, যে বাড়িতে চার ছেলেকে জন্ম দিয়েছেন, যে বাড়ির প্রতিটা ইট আমেনা আর আমেনার মৃত স্বামী রহমান সাহেবের ঘামে গড়া, সেই বাড়ি ভাড়া দেবে। আমেনাকে সরিয়ে দিয়ে।

বৃদ্ধাশ্রমে আমেনার ঘর আট বাই দশ ফুট।

একটা খাট, লোহার, তার ওপর তোশক, পাতলা। একটা আলমারি, কাঠের, ছোট। একটা চেয়ার, প্লাস্টিকের। একটা টেবিল, তার ওপর ওষুধের বাক্স, পানির বোতল, চশমা। দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার, গত বছরের, কেউ বদলায়নি, আমেনাও বদলাননি, দিন তারিখ তাঁর কাছে সব এক।

পাশের ঘরে আয়েশা আপা। পঁচাত্তর বছর। তিন মেয়ে, সব বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ রাখেনি। আয়েশা আপা বলেন, "মেয়েরা শ্বশুরবাড়ির মানুষ হয়ে যায়। মায়ের বাড়ি ভুলে যায়।" আমেনা বলেন, "ছেলেরাও ভুলে যায়, আয়েশা আপা।" আয়েশা আপা হাসেন। দুজনের হাসিতে রস নেই, শুকনো হাসি, হাড়ের মতো শুকনো।

বৃদ্ধাশ্রমে আঠারোজন মানুষ। চৌদ্দজন নারী, চারজন পুরুষ। বেশিরভাগের ছেলেমেয়ে আছে। কারো ছেলে বিদেশে, কারো ছেলে শহরে, কারো মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে। সবার একই গল্প, শুধু নাম আলাদা।

সকালে চা, দুপুরে ভাত, রাতে রুটি। একই খাবার, প্রতিদিন। আমেনা খান, কিন্তু স্বাদ পান না। স্বাদ কোথায় গেছে জানেন না। হয়তো বাড়িতে রেখে এসেছেন, হয়তো বয়সে চলে গেছে, হয়তো মনের সাথে সাথে জিভও অবসাদে ডুবে গেছে।

ঈদ এলো।

বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ মানে সেমাই, নতুন না পুরনো জামা, নামাজ, আর অপেক্ষা। ফোনের অপেক্ষা।

আমেনার ফোনটা নকিয়া, পুরনো মডেল, বোতামওয়ালা, স্ক্রিনে সবুজ আলো জ্বলে। ফোনটা বালিশের পাশে রাখেন, সবসময়। ঈদের দিন সকাল থেকে ফোনটা হাতে ধরে বসেন।

দুপুর হলো। ফোন বাজল না।

বিকেল হলো। বাজল না।

সন্ধ্যা হলো। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। নেটওয়ার্ক আছে, ব্যাটারি আছে। ফোনের কোনো সমস্যা নেই। সমস্যাটা অন্য জায়গায়।

আয়েশা আপার ফোন বাজল। মেজো মেয়ে। "ঈদ মোবারক, আম্মা।" আয়েশা আপা কাঁদলেন। খুশির কান্না। তিন মিনিট কথা বললেন। ফোন রেখে বললেন, "সুমি ফোন করেছে।" মুখে হাসি, চোখে পানি।

আমেনা বললেন, "ভালো।"

রাত আটটায় ফোন বাজল। আমেনার হাত কাঁপল। স্ক্রিনে দেখলেন, কামালের নম্বর। সেজো ছেলে।

"আম্মা, ঈদ মোবারক।"

"মোবারক, বাবা।"

"কেমন আছেন?"

"ভালো আছি।"

কামাল বলল, "আকবর ভাই বলল ফোন করতে। ব্যস্ত ছিলাম।"

ব্যস্ত। ঈদের দিন ব্যস্ত। আম্মাকে একটা ফোন করতে সারাদিন সময় হয়নি, ভাই বলেছে তাই করেছে, নিজে থেকে মনে পড়েনি।

আমেনা বললেন, "আচ্ছা, বাবা। তোর পরিবার ভালো আছে?"

"হ্যাঁ, সবাই ভালো।"

দুই মিনিট কথা হলো। কামাল ফোন রাখল। আকবর ফোন করল না, হয়তো করবে, হয়তো করবে না। ফারুক সৌদি থেকে করেনি। জামাল আমেরিকা থেকে করেনি। সময়ের ফারাক, ব্যস্ততা, ভুলে যাওয়া, যে কারণেই হোক।

আমেনা ফোনটা বালিশের পাশে রাখলেন। চোখ বন্ধ করলেন। কাঁদলেন না। কান্না শুকিয়ে গেছে অনেক আগে। চোখে পানি আসে, কিন্তু গড়ায় না, ভেতরেই থাকে, যেন কান্নাটাও বাইরে আসতে ভয় পায়।

মা ডাকার মানুষ আছে। চারজন। চার ছেলে। সবাই "আম্মা" বলতে পারে। কিন্তু মা রাখার জায়গা নেই। ঘরে জায়গা নেই, জীবনে জায়গা নেই, দিনপঞ্জিতে জায়গা নেই। মা একটা ফোন কল, বছরে দুইটা, তিনটা, কখনো কখনো শূন্যটা।

আমেনা রাতে ঘুমাতে পারেন না ভালো করে।

বৃদ্ধাশ্রমের ঘর নীরব। বাইরে ঝিঁঝিঁ ডাকে। কোথাও কুকুর ডাকে। আমেনা শোনেন। এই শব্দগুলো তাঁর পুরনো বাড়ির শব্দ, গ্রামের রাতের শব্দ। চোখ বন্ধ করলে মনে হয় বাড়িতেই আছেন। কিন্তু চোখ খুললে দেখেন লোহার খাট, সাদা দেয়াল, ছোট জানালা। বাড়ি না।

আমেনা ভাবেন।

পঞ্চাশ বছর আগে। বিয়ে হয়েছিল। রহমান সাহেব, লম্বা মানুষ, পাতলা, নাকের ওপর চশমা, মুখে হাসি। রহমান সাহেব স্কুলশিক্ষক ছিলেন, মাইনে কম, কিন্তু সম্মান ছিল, গ্রামের মানুষ "স্যার" বলত। আমেনা ঘর সামলেছেন, ছেলে বড় করেছেন, ধান শুকিয়েছেন, গরু-ছাগল দেখেছেন, ঈদে সেমাই বানিয়েছেন চারশো মানুষের জন্য। রহমান সাহেব মারা গেলেন বারো বছর আগে, হার্ট অ্যাটাক, একদিনও হাসপাতালে থাকেননি, ঘরেই চলে গেলেন।

তারপর আমেনা একা। ছেলেরা একে একে চলে গেল। আকবর আগেই ঢাকায় ছিল। ফারুক সৌদি গেল। কামাল সিলেট শহরে উঠল। জামাল আমেরিকায়। বাড়িতে আমেনা আর আমেনার ছায়া।

ছেলেদের বড় করেছি। দুধ খাইয়েছি, রাতে জেগে থেকেছি, জ্বর হলে কপালে পানি দিয়েছি, স্কুলে পাঠিয়েছি, পরীক্ষার আগে রাতে জেগে চা বানিয়েছি। বাড়ি বানিয়েছি, ইটের ওপর ইট, রহমান সাহেবের সাথে মিলে, নিজের হাতে মাটি বহন করেছি। জমি রেখেছি, বিক্রি করিনি, ছেলেদের জন্য রেখেছি।

শেষে আমার জন্য একটা ঘর রাখেনি।

আট বাই দশ ফুটের ঘর আমেনার। লোহার খাট আমেনার। প্লাস্টিকের চেয়ার আমেনার। এটুকুই আমেনার পৃথিবী। যে পৃথিবী ছেলেরা দিয়েছে, মাসে মাসে টাকা পাঠায়, বৃদ্ধাশ্রমের খরচ, ওষুধের খরচ। টাকা দেয়, সময় দেয় না। টাকা দিয়ে মায়ের দায় শেষ।

একদিন আয়েশা আপা বললেন, "আমেনা, আমরা কি দোষ করেছিলাম?"

আমেনা বললেন, "কী দোষ?"

"ছেলেমেয়ে বড় করতে গিয়ে। নিজেদের ভুলে গিয়ে। সবকিছু ওদের দিয়ে দিয়ে।"

আমেনা চুপ করে রইলেন। দোষ? ছেলেদের জন্য সবকিছু দেওয়া কি দোষ? মা তো দেয়। মা তো দিতেই থাকে। দুধ দেয়, রক্ত দেয়, ঘুম দেয়, যৌবন দেয়, স্বাস্থ্য দেয়। দিতে দিতে একসময় নিজে ফাঁকা হয়ে যায়। ফাঁকা মাকে কে ভরবে?

আমেনা বললেন, "দোষ করিনি, আয়েশা আপা। মা হয়েছিলাম। মা হওয়ায় কোনো দোষ নেই।"

আয়েশা আপা বললেন, "তাহলে শাস্তি কেন?"

আমেনা উত্তর দিতে পারলেন না।

বিকেলে উঠোনে হাঁটেন আমেনা। ধীরে ধীরে। হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা, কিন্তু হাঁটেন। ডাক্তার বলেছেন হাঁটতে, তাই হাঁটেন। আম গাছটার নিচে দাঁড়ান। গাছের ছাল ধরেন। খসখসে, শক্ত, পুরনো।

আমেনা গাছটাকে বলেন, "তুমিও বুড়ো হয়েছ।"

গাছ কিছু বলে না। গাছের উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। গাছ দাঁড়িয়ে আছে, এটাই উত্তর। গাছ কাউকে জিজ্ঞেস করে না, "আমাকে রাখবে কি না?" গাছ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কাটলে পড়ে, না কাটলে দাঁড়িয়ে থাকে। গাছের অধিকারের কথা কেউ জিজ্ঞেস করে না, গাছও জিজ্ঞেস করে না।

আমেনা ভাবেন, গাছ হলে ভালো হতো। মাটিতে শেকড়, আকাশে ডাল, নিজের জায়গায় নিজে। কাউকে ডাকতে হয় না, কারো ফোনের অপেক্ষায় বসতে হয় না।

সন্ধ্যায় ঘরে ফেরেন। ওষুধ খান। বিছানায় শোয়েন। ফোনটা দেখেন। কোনো মিসড কল নেই। কোনো মেসেজ নেই।

আমেনা ফোন রেখে দেন। চোখ বন্ধ করেন। ঘুম আসে না। আসবে, অনেক রাতে, যখন শরীর আর পারবে না, তখন ঘুম এসে জোর করে চোখ বন্ধ করে দেবে।

ততক্ষণ আমেনা জেগে থাকবেন। ছাদের দিকে তাকিয়ে। ভাববেন, ছেলেরা কি ভালো আছে? আকবরের মেয়ের পরীক্ষা কেমন হলো? ফারুকের শরীর ঠিক আছে তো, সৌদির গরমে? কামালের ব্যবসা চলছে তো? জামাল কি খায় ঠিকমতো, ওদেশে ভাত পায় তো?

মা চিন্তা করবেন। এটা থামে না। ছেলেরা ভুলে গেলেও মায়ের চিন্তা ভুলে যায় না। চিন্তাটা মায়ের রক্তে, হাড়ে, শ্বাসে। শেষ শ্বাসেও থাকবে।

এটাই মা।

এটাই শাস্তি।