একই গর্ভে জন্ম
১
রুমা আর সুমা একসাথে জন্মেছিল। ১৯৯৯ সালের শ্রাবণ মাস, রংপুরের একটা গ্রাম, বৃষ্টি পড়ছিল। ধাত্রী বলেছিলেন, "একটা না, দুইটা।" মা চিৎকার করেছিলেন, বাবা বাইরে পায়চারি করেছিলেন, তারপর দুটো কান্নার শব্দ, একটার পরেই আরেকটা, যেন একজন আরেকজনকে ডাকছে।
রুমা আগে এসেছিল। তিন মিনিট পর সুমা। তিন মিনিটের ব্যবধান। পঁচিশ বছর পর সেই তিন মিনিটের ব্যবধান পঁচিশ বছরের ব্যবধান হয়ে গেছে।
একই মুখ। একই চোখ। একই নাক। মানুষ আলাদা করতে পারত না ছোটবেলায়। মা পারতেন, বাবা মাঝে মাঝে ভুল করতেন। স্কুলে শিক্ষকরা বলতেন, "কে রুমা? কে সুমা?" দুজনে হাসত। মাঝে মাঝে নাম বদল করত, রুমা হয়ে যেত সুমা, সুমা হয়ে যেত রুমা, কেউ ধরতে পারত না।
একই মুখ, কিন্তু ক্লাস এইটের পর থেকে পথ আলাদা হতে শুরু করল। ধীরে ধীরে। যেমন নদী থেকে শাখা নদী বের হয়, প্রথমে কাছাকাছি থাকে, তারপর দূরে সরে যায়, তারপর আর দেখা যায় না।
২
রুমার বিয়ে হলো আঠারোতে।
বাবা বললেন, "ভালো ঘর, ভালো ছেলে। রুমার বিয়ে দিই।"
মা বললেন, "দুইজনেরই দিই।"
সুমা বলল, "আমি পড়ব।"
বাবা তাকালেন সুমার দিকে। সুমার চোখে যে জেদ, রুমার চোখে সেটা নেই। একই চোখ, কিন্তু ভেতরের আলো আলাদা। সুমার চোখে আগুন, রুমার চোখে নরম আলো, সন্ধ্যার প্রদীপের মতো।
রুমা কিছু বলল না। বিয়ে মেনে নিল। মেনে নিল বলে রাজি ছিল, এমন না। মেনে নিল কারণ না বলার ভাষা জানত না, না বলার সাহস পাকেনি, না বললে কী হবে সেটা কল্পনা করতে পারেনি। সুমা পারল। একই গর্ভে জন্ম, কিন্তু সুমার গলায় "না" শব্দটা তৈরি ছিল, রুমার ছিল না।
বিয়ের দিন সুমা রুমাকে সাজিয়ে দিল। কাজল পরাল, সিঁদুর দিল, ঠোঁটে লাল রং। দুইজনে আয়নায় দেখল। আয়নায় দুটো মুখ, একই। কিন্তু একটা সাজানো, কাজলে ঢাকা, অন্যটা খোলা। একটা কনে, অন্যটা ছাত্রী।
সুমা বলল, "আপু, তুই কি খুশি?"
রুমা হাসল। "তুই পড়বি, আমি সংসার করব। দুইজনে মিলে দুই জীবন বাঁচব।"
সুমা কিছু বলল না। কিছু বলার ছিল, কিন্তু বিয়ের দিনে বলা যায় না।
৩
সাত বছর কেটে গেল।
রুমা গ্রামে। স্বামী রাজ্জাক, রিকশা চালায়, মাঝে মাঝে ক্ষেতে কাজ করে, মাঝে মাঝে শহরে দিনমজুরি করে। দুটো বাচ্চা, ছেলে আর মেয়ে। ছেলে সুজন, পাঁচ। মেয়ে মুক্তা, তিন। রুমা রান্না করে, কাপড় ধোয়, বাচ্চাদের খাওয়ায়, শাশুড়ির সেবা করে, সন্ধ্যায় উঠোনে বসে আকাশ দেখে। আকাশ দেখার সময় পায় পাঁচ মিনিট, তারপর কেউ ডাকে, "বউমা, পানি দাও," "আম্মা, খিদে," "রুমা, চা বানাও।"
রুমার দিন সকাল পাঁচটায় শুরু হয়, রাত এগারোটায় শেষ হয়। আঠারো ঘণ্টা। প্রতিটা ঘণ্টা কারো জন্য। রুমার নিজের জন্য কোনো ঘণ্টা নেই। নিজের জন্য সময় চাওয়াটাও একটা বিলাসিতা, রুমা জানে। বিলাসিতা গরিবের জন্য না।
সুমা ঢাকায়। রংপুর থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল, অনার্স, মাস্টার্স, তারপর ঢাকায় চাকরি পেল, একটা এনজিওতে, বেতন বেশি না কিন্তু ঢাকায় থাকে, নিজের একটা রুম ভাড়া করে থাকে, মেসে না, একা, নিজের রান্না নিজে করে, নিজের কাপড় নিজে ধোয়, অফিসে যায়, বাসে, কখনো রিকশায়, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বই পড়ে, ল্যাপটপে কাজ করে, রাতে একা ঘুমায়।
সুমার দিন সকাল সাতটায় শুরু হয়, রাত বারোটায় শেষ হয়। সতেরো ঘণ্টা। প্রতিটা ঘণ্টা নিজের জন্য। নিজের জন্য সময় আছে, কিন্তু ভাগ করার মানুষ নেই। নিজের জন্য সময় থাকাটাও একটা একাকীত্ব, সুমা জানে।
৪
ঈদে দেখা হলো।
গ্রামের বাড়ি। বাবা-মা এখনো আছেন। বাবার চুল সাদা, মা কুঁজো হয়ে গেছেন। দুজনে দুই মেয়েকে দেখে কাঁদলেন। মা বললেন, "একসাথে এসেছিস, কত বছর পর।"
রুমা মুক্তাকে কোলে নিয়ে এসেছে, সুজন বাবার হাত ধরে। রাজ্জাক আসেনি, "কাজ আছে" বলেছে, আসলে শ্বশুরবাড়িতে আসতে চায় না, বিব্রত হয়, গরিব জামাই। সুমা একা এসেছে, ব্যাগে ঢাকা থেকে জামাকাপড় এনেছে, মুক্তার জন্য একটা ফ্রক, সুজনের জন্য একটা শার্ট, মায়ের জন্য শাড়ি, বাবার জন্য পাঞ্জাবি।
দুই বোন পাশাপাশি বসল। মা দেখলেন। একই মুখ। এখনো একই। কিন্তু রুমার মুখে ক্লান্তি আছে, চোখের নিচে কালি, হাতে ফাটা চামড়া, পিঠ একটু ঝুঁকে গেছে, পঁচিশ বছরে যা হওয়ার কথা না। সুমার মুখ পরিষ্কার, চামড়ায় ক্রিম, চুল ঝরঝরে, জামা ইস্ত্রি করা, জুতো পরিষ্কার।
একই মুখ, দুটো আলাদা জীবন মুখে ছাপ ফেলেছে। জীবন মুখে লেখে। সুখের জীবন এক রকম লেখে, কষ্টের জীবন আরেক রকম।
মা দুই মেয়েকে পাশাপাশি বসিয়ে তাকিয়ে থাকেন। চোখ ভিজে যায়। বাবা বলেন, "কাঁদিস কেন?" মা বলেন, "কাঁদছি না। দেখছি।" দেখছেন। দুই মেয়ে, একই গর্ভের, একই রক্তের, কিন্তু একজনের হাত রুক্ষ আর অন্যজনের নরম। মা দুজনের হাত ধরেন। দুটো হাত, দুটো বাংলাদেশ, মায়ের দুই হাতে ধরা।
মা ভাবেন, কোথায় ভুল হলো? বিয়ে দেওয়াটা ভুল ছিল? না দিলে কি রুমাও সুমার মতো পড়ত? নাকি দুজনকেই বিয়ে দিলে দুজনেই রুমার মতো হতো? মায়ের প্রশ্নের উত্তর নেই। মা শুধু জানেন, যেটাই হতো, দোষটা মায়ের ঘাড়ে পড়ত। মেয়ে সুখী না হলে মায়ের দোষ। মেয়ে একা থাকলেও মায়ের দোষ। মায়ের সবসময় দোষ।
৫
রাতে দুই বোন ছাদে বসল।
রংপুরের আকাশ পরিষ্কার। তারা দেখা যায়, অনেক তারা, ঢাকায় এত তারা দেখা যায় না। সুমা তাকাল আকাশের দিকে। রুমাও তাকাল। দুজনে চুপ। মুক্তা রুমার কোলে ঘুমিয়ে গেছে, সুজন নিচে দাদার পাশে।
রুমা বলল, "তুই কি সুখী, সুমা?"
সুমা চুপ করে রইল। সুখী? ঢাকায় একা থাকে, অফিস করে, বেতন পায়, নিজের ইচ্ছেমতো চলে। স্বাধীনতা আছে। কিন্তু রাতে ঘরে ফিরলে কেউ নেই। খাবার টেবিলে একটাই প্লেট। কথা বলার মানুষ নেই, ফোনে বলে, কিন্তু ফোনের কথা আর মুখোমুখি কথা এক না। ঈদে সবাই পরিবারের সাথে, সুমা মেসেজ পাঠায়, "ঈদ মোবারক," তারপর একা বসে থাকে।
সুমা বলল, "তুই কি সুখী, আপু?"
রুমা চুপ করে রইল। সুখী? সংসার আছে, স্বামী আছে, বাচ্চা আছে, শাশুড়ি আছে। মানুষ আছে চারপাশে, একাও লাগে না। কিন্তু নিজের বলে কিছু নেই। নিজের টাকা নেই, নিজের সময় নেই, নিজের ইচ্ছে চাপা পড়ে গেছে এত মানুষের ইচ্ছের নিচে যে খুঁজে পাওয়া যায় না আর। রুমাও পড়তে চেয়েছিল, রুমাও স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু স্বপ্ন দেখার আগেই বিয়ে হয়ে গেল, তারপর বাচ্চা, তারপর সংসার, তারপর স্বপ্ন ভুলে যাওয়া।
কেউ উত্তর দিল না।
দুজনেই চুপ। দুজনেই জানে, উত্তর দিলে সত্যি কথা বলতে হবে। সত্যি কথা হলো, কেউ পুরোপুরি সুখী না। রুমার যা আছে সুমার নেই, সুমার যা আছে রুমার নেই। দুজনে মিলে একটা পুরো জীবন হতে পারত। কিন্তু জীবন ভাগ করা যায় না, জীবন একা একা বাঁচতে হয়।
৬
সুমা বলল, "আপু, তুই কি কখনো ভাবিস, আমি তোর জায়গায় থাকলে কেমন হতো?"
রুমা বলল, "ভাবি। তুই কি ভাবিস?"
"ভাবি।"
রুমা ভাবে। সুমার জায়গায় থাকলে ঢাকায় থাকত, চাকরি করত, নিজের পায়ে দাঁড়াত। কিন্তু একা থাকতে পারত কি? মুক্তার মুখ ছাড়া সকালটা কেমন হতো? সুজনের "আম্মা" ডাক ছাড়া বিকেলটা কেমন হতো? রুমা জানে না।
সুমা ভাবে। রুমার জায়গায় থাকলে বাচ্চা থাকত, সংসার থাকত, কারো সাথে রাতে কথা বলতে পারত। কিন্তু স্বাধীনতা থাকত না। নিজের ইচ্ছেমতো চলতে পারত না। বই পড়ার সময় পেত না। নিজেকে হারিয়ে ফেলত সংসারের ভিড়ে। সুমা জানে না।
দুজনেই ভাবে, অন্যজনের জীবন ভালো। দুজনেই ভুল ভাবে। কারণ বাইরে থেকে জীবন অন্যরকম দেখায়, ভেতর থেকে অন্যরকম।
নিচে মা উঠোনে ঘুরে ঘুরে কাজ করছেন। মুড়ি ভাজছেন, ঈদের পরের দিনের নাশতা। মায়ের জীবন তৃতীয় বাংলাদেশ। যেখানে মেয়ের বিয়েও মায়ের দায়, মেয়ের পড়াও মায়ের দায়, মেয়ের সুখ-দুঃখ সব মায়ের ঘাড়ে। মা কোনো বাংলাদেশ বেছে নেননি। মা শুধু বেঁচে আছেন, দুই মেয়ের মাঝখানে, দুই বাংলাদেশের মাঝখানে।
রুমা বলল, "আম্মার কথা ভাবিস?"
সুমা বলল, "ভাবি। তুই?"
"ভাবি। আম্মা বুড়ো হচ্ছেন।"
"আমি মাঝে মাঝে টাকা পাঠাই।"
"আমি পাশে থাকি।"
দুজনেই চুপ হলো। টাকা আর পাশে থাকা, কোনটা বেশি? তুলনা করা যায় না। দুটোই দরকার। দুটোই অসম্পূর্ণ একা একা।
৭
সকালে সুমা যাবে।
ঢাকার বাস ধরবে। রুমা থাকবে গ্রামে। আবার দেখা হবে ছয় মাস পর, পরের ঈদে, হয়তো তার পরের ঈদে।
সুমা মুক্তাকে কোলে নিল। চুমু দিল কপালে। মুক্তা হাসল। সুজনের মাথায় হাত রাখল। সুজন বলল, "খালামনি, আবার আসবে?"
"আসব।"
রুমার দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো। একই চোখ। একই রং, একই আকৃতি, একই পাতা। কিন্তু চোখের ভেতরে যা আছে সেটা আলাদা। রুমার চোখে একটা প্রশ্ন আছে যেটা জিজ্ঞেস করা হয়নি, সুমার চোখে একটা উত্তর আছে যেটা দেওয়া হয়নি।
সুমা বলল, "আপু..."
রুমা বলল, "যা। বাস মিস হবে।"
সুমা ব্যাগ তুলল। রুমা বলল, "দাঁড়া।" ভেতর থেকে একটা ছোট কৌটা নিয়ে এলো। খুলল। ভেতরে নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, রুমার নিজের হাতে তৈরি। "নে, রাস্তায় খাবি।" সুমা নিল। নাড়ু নিতে গিয়ে হাতে হাত লাগল। রুমার হাত খসখসে, সুমার নরম। দুটো হাত একই মায়ের পেটের। কিন্তু একটা হাত সংসারের, অন্যটা অফিসের।
সুমা গেল। রিকশায়। রুমা দাঁড়িয়ে দেখল। রিকশা ছোট হতে হতে দেখা গেল না। ধুলো উড়ল রাস্তায়, তারপর ধুলোও থামল।
রুমা ঘরে ঢুকল। মুক্তা কাঁদছে। ভাত দিতে হবে। সুজনকে স্কুলে পাঠাতে হবে। শাশুড়ির ওষুধ দিতে হবে। রুমার দিন শুরু হলো।
সুমা বাসে বসল। জানালার পাশে। বাস ছাড়ল। রংপুরের মাঠ, ধানক্ষেত, নদী, গ্রাম, সব পেছনে যাচ্ছে। ঢাকা সামনে। ঢাকায় ফিরে খালি ঘরে ঢুকবে, দরজা বন্ধ করবে, একটা চা বানাবে, একা বসে খাবে।
একই গর্ভে জন্ম। দুটো ভিন্ন বাংলাদেশে বাস।
একটা বাংলাদেশে মেয়ের বিয়ে হয় আঠারোতে, সংসার হয়, বাচ্চা হয়, নিজের জীবন হারিয়ে যায় অন্যের জীবনে। আরেকটা বাংলাদেশে মেয়ে পড়ে, চাকরি করে, নিজের পায়ে দাঁড়ায়, কিন্তু একা থাকে, কারণ সমাজ অবিবাহিত মেয়েকে সন্দেহের চোখে দেখে, "বিয়ে হয়নি কেন?" প্রশ্নটা তাড়া করে।
দুটো বাংলাদেশ। একটায় স্বাধীনতা নেই। আরেকটায় সঙ্গ নেই। দুটোতেই কিছু একটা অসম্পূর্ণ।
রুমা আর সুমা। একই মুখ। একই রক্ত। একই মায়ের দুধ। তারপরেও দুটো আলাদা ভাগ্য, দুটো আলাদা অসুখ, দুটো আলাদা অসম্পূর্ণতা।
পরের ঈদে আবার দেখা হবে। আবার একই প্রশ্ন। "তুই কি সুখী?" আবার কেউ উত্তর দেবে না।
কিছু প্রশ্নের উত্তর থাকে না। কিছু প্রশ্ন শুধু প্রশ্ন হয়ে থাকে, বাতাসে ভাসে, মিলিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। রুমা আর সুমার প্রশ্ন সেরকম। এই প্রশ্ন বাংলাদেশের প্রতিটা মেয়ের। এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশ এখনো দিতে পারেনি।
একই আকাশের নিচে দুজনে। রুমা গ্রামের আকাশ দেখে, তারা ভরা, কিন্তু একা দেখে না, মুক্তা কোলে, সুজন পাশে। সুমা ঢাকার আকাশ দেখে, ধোঁয়াটে, তারা কম, একা দেখে। একই আকাশ, দুটো ভিন্ন জানালা দিয়ে।