মৎস্যজীবী নারী
ভাষায়ই আমার জায়গা নেই
১
সুলতানা ভোর চারটায় ওঠে।
অন্ধকারে। শীতের অন্ধকার আর গ্রীষ্মের অন্ধকার এক নয়। শীতের অন্ধকার ভারী, চামড়ায় লাগে। গ্রীষ্মের অন্ধকার হালকা, একটু পরেই ভেঙে যাবে জানা থাকে। কিন্তু সুলতানার কাছে দুটোই এক। ভোর চারটা মানে জাল গোছানো। ভোর চারটা মানে নৌকা টানা। ভোর চারটা মানে নদী।
আজ তিন বছর হলো সুলতানা নিজে নৌকায় ওঠে।
তার আগে জামাল উঠত। সুলতানার স্বামী। জেলে। তিন প্রজন্মের জেলে পরিবার, জামালের বাবা জেলে ছিল, তার বাবার বাবা জেলে ছিল। নদীর সাথে তাদের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়ে পুরোনো। জামাল বলত, "পানি আমার রক্তে আছে।" সুলতানা হাসত। সে জানত পানি কারো রক্তে থাকে না, পানি পানিতে থাকে, আর মানুষ পানিতে যায় কারণ মাটি তাকে খাওয়াতে পারে না।
তিন বছর আগে, আষাঢ় মাস। নদী ফুলেছিল। জামাল গভীরে গিয়েছিল, যেখানে ইলিশ থাকে, যেখানে স্রোত জোরালো। নৌকা উলটে গিয়েছিল। জামাল সাঁতার জানত, কিন্তু জাল পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল। যে জাল দিয়ে মাছ ধরত, সেই জাল তাকে ধরে ফেলেছিল। অন্য জেলেরা টেনে তুলেছিল, কিন্তু তখন মেরুদণ্ডে চোট। ডাক্তার বলেছিল, "হাঁটতে পারবে না। কোমরের নিচে অবশ।"
জামাল ঘরে। খাটিয়ায়। তিন বছর ধরে।
সুলতানা জামালের পাশে বসে ভেবেছিল। তিনটে ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে রুবিনা, ষোলো বছর। মেজো ছেলে তুহিন, বারো বছর। ছোট মেয়ে মুনিয়া, সাত বছর। চারটে পেট। প্লাস জামালের ওষুধ। প্লাস রুবিনার স্কুল। প্লাস নৌকার মেরামত।
সুলতানা ভাবনার হিসেবে গণিত জানে না। কিন্তু হিসেব জানে। হিসেবটা সহজ: কেউ মাছ না ধরলে কেউ খাবে না।
সুলতানা নৌকায় উঠল।
২
প্রথম দিনের কথা সুলতানা ভোলেনি।
ঘাটে নৌকা নামাতে গেলে পাশের রহমত মিয়া বলেছিল, "ভাবি, এটা আপনের কাম না।" সুলতানা কিছু বলেনি। জাল তুলেছিল। রহমত মিয়া আবার বলেছিল, "মাইয়াছেলে নৌকায় উঠলে মাছ পালায়।" সুলতানা তখনো কিছু বলেনি। নৌকা ঠেলে পানিতে নামিয়েছিল। রহমত মিয়া চেয়ে দেখেছিল।
সেদিন সুলতানা তিন কেজি রুই ধরেছিল। বড় নয়। কিন্তু তিন কেজি। রহমত মিয়া সেদিন দেড় কেজি ধরেছিল। সুলতানা কিছু বলেনি। বলার দরকার ছিল না। মাছ বলে দিয়েছিল।
কিন্তু কথাগুলো থামেনি।
বাজারে মাছ নিয়ে গেলে আড়তদার বলত, "তোমার স্বামী কই?" সুলতানা বলত, "বাড়িতে।" আড়তদার বলত, "স্বামীরে পাঠাও, আমরা স্বামীর সাথে কথা বলব।" সুলতানা বলত, "আমার সাথে বলেন।" আড়তদার মুখ কালো করত। দাম কমিয়ে দিত। যে মাছ জামাল আনলে কেজি দুইশো টাকা, সেই মাছ সুলতানা আনলে একশো আশি। বিশ টাকা কম। কেন কম? কারণ মাছ ধরেছে একজন নারী। মাছের গুণমান একই। ওজন একই। কিন্তু যে হাত ধরেছে সেই হাতের লিঙ্গ আলাদা, তাই দাম আলাদা।
সুলতানা এটা জানে। মেনে নেয়নি, কিন্তু জানে। জানাটা আর মানাটা আলাদা জিনিস। দরিদ্র মানুষ অনেক কিছু জানে যেটা সে মানে না, কিন্তু বদলানোর ক্ষমতা নেই বলে চুপ থাকে। চুপ থাকা মানে মেনে নেওয়া না। চুপ থাকা মানে বেঁচে থাকা।
৩
সুলতানার হাত দেখলে বোঝা যায় না এই হাত কোনোদিন মেহেদি পরেছিল।
আঠারো বছরে বিয়ে হয়েছিল। জামালের সাথে। জামাল ভালো মানুষ ছিল, এখনো ভালো মানুষ, শুধু শরীর কাজ করে না। বিয়ের দিন সুলতানার হাতে মেহেদি ছিল। লাল। ঘন লাল। পাড়ার মেয়েরা বলেছিল, "এত লাল মেহেদি মানে স্বামী খুব ভালোবাসবে।" ভালোবাসে। এখনো ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে ভাত হয় না। ভালোবাসা দিয়ে ওষুধ কেনা যায় না। ভালোবাসা দিয়ে মেয়ের স্কুলের বেতন দেওয়া যায় না।
এখন সুলতানার হাত রুক্ষ। জালের দড়ি টানতে টানতে তালু ফেটে গেছে। লবণপানিতে সেই ফাটা জায়গায় জ্বলে। প্রতিদিন জ্বলে। সুলতানা সেই জ্বালা সহ্য করে, কারণ সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। ব্যথানাশক মলম কিনতে গেলে সেই টাকাটা মুনিয়ার দুধের টাকা থেকে যাবে। সুলতানা নিজের হাত আর মুনিয়ার দুধের মধ্যে হিসেব করেছে। হিসেবটা স্পষ্ট। মায়ের হাত জ্বলুক, মেয়ের পেট ভরুক।
নদীতে সুলতানা একা থাকে না। অন্য জেলেরা আছে। সবাই পুরুষ। তারা সুলতানাকে এখন মেনে নিয়েছে, কিন্তু সেই মেনে নেওয়ায় একটা শর্ত আছে যেটা কেউ মুখে বলে না। শর্তটা হলো: সুলতানা তাদের সমান দাবি করবে না। সে মাছ ধরতে পারে, কিন্তু "জেলে" বলা যাবে না। সে নৌকা চালাতে পারে, কিন্তু "মাঝি" বলা যাবে না। সে সবকিছু করতে পারে, কিন্তু সেটার নাম পাবে না।
ভাষায়ই আমার জায়গা নেই।
সুলতানা এটা প্রথম টের পেয়েছিল যখন তুহিন স্কুলে গিয়ে বলেছিল, "আমার মা জেলে।" শিক্ষক বলেছিলেন, "জেলে তো তোমার বাবা। মা কী করে?" তুহিন বলেছিল, "মা-ও মাছ ধরে।" শিক্ষক হেসেছিলেন। সেই হাসিটা তুহিন বুঝেছিল। সেই হাসিটা সুলতানা তুহিনের মুখ দেখে বুঝেছিল।
"জেলে" শব্দটা পুরুষবাচক। "মাঝি" শব্দটা পুরুষবাচক। "চাষি" শব্দটা পুরুষবাচক। ভাষা পুরুষের জন্য তৈরি, কাজও পুরুষের জন্য তৈরি। সুলতানা দুটোতেই ঢুকে পড়েছে, কিন্তু কোনোটাই তাকে জায়গা দেয়নি।
৪
বিকেলে মাছ বিক্রি করে সুলতানা বাড়ি ফেরে।
জামাল খাটিয়ায়। টিভি দেখছে। পাশের বাড়ি থেকে টিভি এনেছে রুবিনা, বাবাকে সময় কাটানোর জন্য। জামালের চোখ টিভিতে, কিন্তু মন নেই। সুলতানা জানে। জামালের মনে নদী আছে। যে নদীতে সে আর যেতে পারে না, সেই নদীর স্রোতের শব্দ জামাল রাতে শোনে। সুলতানা শুনেছে, জামাল ঘুমের মধ্যে হাত নাড়ায়, যেন জাল ফেলছে। শরীর ভুলে গেছে, কিন্তু স্মৃতি ভোলেনি।
"আজ কতটা হইলো?" জামাল জিজ্ঞেস করে।
"পাঁচ কেজি। চিংড়ি তিন কেজি, বাকি রুই।"
"চিংড়ির দাম?"
"সাড়ে তিনশো।"
"কালো চিংড়ি না সাদা?"
"কালো।"
জামাল মাথা নাড়ে। "কালো চিংড়ি চারশোর নিচে দিতে নাই। কইসো আড়তদারকে?"
"কইসি। শোনে না।"
জামাল চুপ হয়ে যায়। এই চুপটা সুলতানা চেনে। এটা রাগের চুপ না। এটা অপমানের চুপ। যে মানুষ নিজে গিয়ে দাম আদায় করত, সে এখন খাটিয়ায় শুয়ে শুনছে যে তার স্ত্রীকে ঠকানো হচ্ছে। আর কিছু করতে পারছে না। এই "কিছু করতে না পারা" জামালকে ভেতর থেকে খায়। প্রতিদিন খায়। মেরুদণ্ডের চেয়ে আত্মসম্মান বেশি ভাঙে।
সুলতানা জামালের পাশে বসে। জামালের মাথায় হাত রাখে। কিছু বলে না। বলার কিছু নেই। বলা যায় এমন কিছু নেই।
রুবিনা রান্নাঘরে। ভাত চাপিয়েছে। রুবিনা ষোলো বছরেই বুড়ি হয়ে গেছে। যে বয়সে মেয়েরা আয়নায় নিজেকে দেখে, রুবিনা সেই বয়সে হাঁড়ি দেখে। যে বয়সে মেয়েরা বান্ধবীদের সাথে গল্প করে, রুবিনা সেই বয়সে বাবার ওষুধ মাপে। সুলতানা রুবিনার দিকে তাকায়, আর ভেতরে কিছু একটা ভেঙে যায়। মেয়ের শৈশব নিয়ে গেছে দারিদ্র্য। সুলতানা ফেরত দিতে পারবে না। কোনো মা পারে না।
৫
রাতে সুলতানা জাল সেলাই করে।
হ্যারিকেনের আলোতে। বিদ্যুৎ আসে, যায়। আসে, যায়। এটা নদীর মতো, ভরা নদী শুকিয়ে যায়, শুকনো নদী ভরে ওঠে। বিদ্যুৎও তাই। সুলতানা হ্যারিকেনের ওপর নির্ভর করে, কারণ হ্যারিকেন চলে যায় না।
জাল সেলাই করা ধ্যানের মতো। একটা ফাঁক, একটা গিট, একটা ফাঁক, একটা গিট। সুলতানা এই কাজ জামালের কাছে শেখেনি। নিজে শিখেছে। ইউটিউবে দেখে শিখেছে, তুহিনের ফোনে। তুহিন মাঝে মাঝে ভিডিও দেখায়, সুলতানা দেখে, হাতে করে। প্রথমবার জাল এত এলোমেলো হয়েছিল যে মাছ ঢুকত, আবার বেরিয়ে যেত। দ্বিতীয়বার ভালো হয়েছিল। তৃতীয়বার থেকে জামাল বলেছিল, "তোমার জাল আমার জালের চেয়ে ভালো।"
সুলতানা জানে এটা সত্যি না। জামালের জাল ভালো ছিল, জামালের হাত ভালো ছিল। কিন্তু জামাল এটা বলে কারণ সুলতানাকে সাহস দিতে চায়। যে মানুষটা খাটিয়ায় শুয়ে কিছু করতে পারে না, সে মুখ দিয়ে যেটুকু পারে সেটুকু করে। একটা বাক্য। একটা প্রশংসা। একটা ছোট মিথ্যা যেটা সুলতানার হাতে শক্তি দেয়।
মুনিয়া এসে কোলে উঠেছে। ঘুমাচ্ছে। সুলতানা এক হাতে জাল সেলাই করে, অন্য হাতে মুনিয়াকে ধরে রাখে। এটা সুলতানার জীবনের চিত্র: এক হাতে সংসার, অন্য হাতে জীবিকা। দুটো একসাথে। সবসময় একসাথে। আলাদা করার সুযোগ নেই।
সুলতানা ভাবে, কাল ভোরে কোন দিকে যাবে। পূর্ব পাড়ে চিংড়ি বেশি, কিন্তু স্রোত জোরালো। পশ্চিম পাড়ে রুই পাওয়া যায়, কিন্তু অন্য জেলেরা সেখানে যায়, ভিড় হয়। সুলতানা মাঝখানে যায়, যেখানে কেউ যায় না, কারণ সেখানে ঝুঁকি আছে। কিন্তু সুলতানার জীবনে ঝুঁকি ছাড়া কিছু নেই। নৌকায় ওঠাই ঝুঁকি। একা যাওয়াই ঝুঁকি। নারী হয়ে জেলেদের পেশায় আসাই ঝুঁকি। সুলতানা ঝুঁকি নিয়ে ভাবে না। ঝুঁকি তার কাছে শ্বাসের মতো, নিতেই হয়।
৬
শুক্রবার হাটবার।
সুলতানা হাটে যায়। পাঁচ কেজি মাছ ঝুড়িতে। মাথায় ঝুড়ি। দুই কিলোমিটার হেঁটে হাটে পৌঁছায়। হাটে মাছের সারিতে সব পুরুষ। সুলতানা একমাত্র নারী। পুরুষেরা তাকায়। কেউ কৌতূহলে, কেউ অবজ্ঞায়, কেউ সহানুভূতিতে। সুলতানা কারো দিকে তাকায় না। মাছ সাজায়। দাম লেখে। অপেক্ষা করে।
একটা মেয়ে এসে দাঁড়ায়। কলেজের মেয়ে মনে হয়। ব্যাগ কাঁধে।
"আপনি নিজে ধরেছেন?"
"হ্যাঁ।"
"নদীতে?"
"হ্যাঁ।"
"একা?"
"হ্যাঁ।"
মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে, "আপনি তো জেলেনি।"
সুলতানা থামে। "জেলেনি" শব্দটা সে আগে শোনেনি। "জেলে" শুনেছে। "মাছ ধরা মহিলা" শুনেছে। "জামালের বউ" শুনেছে। কিন্তু "জেলেনি" কেউ বলেনি। শব্দটা অদ্ভুত। নতুন। যেন ভাষা প্রথমবার তাকে জায়গা দিচ্ছে।
সুলতানা হাসে। অনেকদিন পর হাসে।
"জেলেনি। হ্যাঁ।"
মেয়েটা দুই কেজি রুই কেনে। পুরো দাম দেয়। দরাদরি করে না।
সুলতানা সেই মেয়েটার মুখ মনে রাখে। নাম জানে না। কোথাকার জানে না। কিন্তু মুখটা মনে রাখে। কারণ সেই মুখ থেকে একটা শব্দ এসেছে যেটা সুলতানার ভাষায় ছিল না।
জেলেনি।
রাতে, মুনিয়াকে ঘুম পাড়ানোর সময়, সুলতানা গুনগুন করে একটা গান। মায়ের কাছে শেখা। ঘুমপাড়ানি গান। কথাগুলো মনে নেই পুরো, সুর মনে আছে। সুর যথেষ্ট। মুনিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
সুলতানা জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। নদীর শব্দ আসে। নদী কখনো ঘুমায় না। সুলতানাও ঘুমায় না, অনেকক্ষণ। ভোর চারটায় উঠতে হবে। জাল নিতে হবে। নৌকা নামাতে হবে। মাছ ধরতে হবে। বিক্রি করতে হবে। ঘরে ফিরতে হবে। জামালের পাশে বসতে হবে। রুবিনার দিকে তাকাতে হবে। মুনিয়াকে কোলে নিতে হবে। তুহিনের পড়া দেখতে হবে।
এই বৃত্ত। প্রতিদিনের বৃত্ত।
সুলতানা জানে এই বৃত্ত থেকে বেরোনোর পথ নেই। কিন্তু এই বৃত্তের ভেতরেই সুলতানা দাঁড়িয়ে আছে, সোজা, যেভাবে নদীর ধারের নারকেলগাছ ঝড়ে হেলে পড়ে কিন্তু ভাঙে না।
ভাষায় জায়গা নেই। বাজারে দাম নেই। সমাজে নাম নেই।
কিন্তু নদী আছে। নদী সুলতানাকে চেনে। নদী জানে কে মাছ ধরে, কে ধরে না। নদীর কাছে লিঙ্গ নেই। স্রোত সবাইকে সমান ভাসায়, সমান ডোবায়।
সুলতানা নদীর কাছে যায়। কারণ নদী একমাত্র জায়গা যেখানে সে "জামালের বউ" না। নদীতে সে সুলতানা। শুধু সুলতানা। জাল হাতে, নৌকায় দাঁড়ানো, ভোরের কুয়াশায় একটা ছায়া, যেটা পুরুষ না নারী বোঝা যায় না।
সেটাই সুলতানার স্বাধীনতা। ভোরের কুয়াশায়, যখন কেউ দেখে না, তখন সে শুধু একজন মানুষ।