নকশিকাঁথা শিল্পী
আমার সুই দিয়ে গল্প বলি, গ্যালারি টাকা নেয়
১
আমবিয়ার চোখ আগের মতো দেখে না।
পঞ্চান্ন বছর বয়স। চল্লিশ বছর ধরে সুই আর সুতো ধরে আছে। চোখ ক্লান্ত হয়েছে, কিন্তু হাত ক্লান্ত হয়নি। হাত মনে রাখে কোথায় সুই ফোটাতে হবে। চোখ বন্ধ করলেও হাত জানে। হাতের নিজের চোখ আছে, নিজের স্মৃতি আছে। চল্লিশ বছরে হাত যা শিখেছে, সেটা চোখের চেয়ে গভীর।
আমবিয়া যশোরের একটা গ্রামে থাকে। গ্রামের নাম বলার দরকার নেই। এরকম গ্রাম বাংলাদেশে হাজার আছে, যেখানে মেয়েরা কাঁথা সেলাই করে, যেখানে প্রতিটা বাড়িতে একটা না একটা কাঁথা তৈরি হচ্ছে, যেখানে সুই আর সুতো মেয়েদের হাতে এমনভাবে আছে যেন শরীরের অংশ।
কিন্তু আমবিয়ার কাঁথা আলাদা।
আমবিয়ার কাঁথায় গল্প থাকে। সে কাঁথার উপর গ্রাম আঁকে, নদী আঁকে, মানুষ আঁকে, পাখি আঁকে, গাছ আঁকে। একটা কাঁথার ভেতরে একটা পুরো জীবন থাকে। কে দেখে সেটা, সে ঠিক করে না। কিন্তু যে দেখে, সে জানে এটা সাধারণ সেলাই না। এটা ভাষা। সুই দিয়ে লেখা ভাষা।
আমবিয়ার মা নকশিকাঁথা করত। তার নানি করত। তার নানির মা করত। এই শৃঙ্খল কতদূর যায় কেউ জানে না, কারণ কেউ লিখে রাখেনি। মেয়েদের ইতিহাস কেউ লেখে না। মেয়েদের ইতিহাস সুতোয় থাকে, কাপড়ে থাকে, হাতে থাকে। কাগজে থাকে না।
২
একটা কাঁথা তৈরি করতে আমবিয়ার তিন মাস লাগে।
প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা। ভোরে দুই ঘণ্টা, বিকেলে দুই ঘণ্টা, রাতে দুই ঘণ্টা। মাঝে সংসার। রান্না, ঘর মোছা, গরুর ঘাস দেওয়া, পুকুরে কাপড় কাচা। সংসারের ফাঁকে শিল্প। শিল্পের ফাঁকে সংসার। দুটো জড়িয়ে আছে, আলাদা করার উপায় নেই।
আমবিয়ার স্বামী করিম দিনমজুর। ইটভাটায় কাজ করে। সকাল ছয়টায় যায়, সন্ধ্যায় ফেরে। দৈনিক পাঁচশো টাকা। মাসে পনেরো হাজার, যদি প্রতিদিন কাজ থাকে। থাকে না সবসময়। বর্ষায় ইটভাটা বন্ধ। শীতে কখনো কখনো বন্ধ। করিম কিছু বলে না। করিম জানে আমবিয়ার কাঁথা বিক্রি হলে কিছু টাকা আসে। কিন্তু কত আসে, সেটা জানলে করিম কষ্ট পায়, তাই আমবিয়া বলে না।
আমবিয়ার শেষ কাঁথাটা ছিল একটা মাস্টারপিস। সে নিজে এই শব্দ জানে না। তার কাছে এটা "বড় কাঁথা।" ছয় ফুট বাই আট ফুট। পুরো কাঁথায় একটা গ্রামের জীবন। এক কোণায় ভোরের আজান, মসজিদের মিনার, মুয়াজ্জিনের হাত কানের কাছে। পাশে ধানক্ষেত, কৃষক গরু নিয়ে হালচাষ করছে। মাঝখানে নদী, নদীতে নৌকা, নৌকায় জেলে। অন্য কোণায় বিয়ের আনন্দ, ঢোল, শাড়ি পরা কনে। আরেক কোণায় শেষযাত্রা, খাটিয়ায় লাশ, কাঁদছে মানুষ।
জন্ম থেকে মৃত্যু। একটা কাঁথায়।
তিন মাস লেগেছিল। প্রতিটা ফোঁড়ে আমবিয়া একটু একটু করে নিজেকে ঢেলে দিয়েছিল। প্রতিটা সুতোয় তার চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা। প্রতিটা রঙে তার দেখা গ্রামের ছবি।
৩
কাঁথাটা কিনেছিল একজন মধ্যস্বত্বভোগী। ঢাকা থেকে আসে, গ্রামে গ্রামে ঘোরে, মেয়েদের কাঁথা কেনে।
পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল।
আমবিয়া জানে না সেই কাঁথাটা এখন কোথায়। কিন্তু আমবিয়ার মেজো মেয়ে রাবেয়া ঢাকায় থাকে, গার্মেন্টসে কাজ করে। রাবেয়া একদিন ফোন করেছিল।
"আম্মা, গুলশানে একটা গ্যালারিতে তোমার কাঁথা দেখলাম।"
"আমার কাঁথা? গুলশানে?"
"হ্যাঁ। দামটা জানো কত?"
"কত?"
"পঞ্চাশ হাজার।"
আমবিয়া কিছু বলতে পারেনি। ফোন ধরে বসেছিল। পঞ্চাশ হাজার। পাঁচ হাজার দিয়ে কিনেছে। পঞ্চাশ হাজারে বিক্রি করছে। দশ গুণ। দশ গুণ লাভ। আর আমবিয়া পেয়েছে পাঁচ হাজার। তিন মাসের কাজ। ছয় ঘণ্টা করে নব্বই দিন। পাঁচশো চল্লিশ ঘণ্টা। পাঁচ হাজার ভাগ পাঁচশো চল্লিশ মানে ঘণ্টায় সাড়ে নয় টাকা। একটা চায়ের দামের চেয়ে কম।
আমবিয়া হিসেব করতে পারে না। কিন্তু বোঝে। বোঝাটা হিসেবের চেয়ে গভীর।
আমার সুই দিয়ে গল্প বলি। গ্যালারি টাকা নেয়।
৪
আমবিয়ার ঘরে একটা ট্রাংক আছে। পুরোনো টিনের ট্রাংক। তার মায়ের ছিল।
ট্রাংকের ভেতরে তিনটে কাঁথা আছে যেগুলো আমবিয়া বিক্রি করেনি। করবে না। এগুলো তার নিজের জন্য।
প্রথমটা তার মায়ের তৈরি। আমবিয়ার মা সখিনা বেগম এটা তৈরি করেছিল আমবিয়ার জন্মের সময়। কাঁথায় একটা শিশু আঁকা, মায়ের কোলে। মায়ের মুখে হাসি। শিশুর মুখে ঘুম। সুতো কিছু জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, রঙ কিছু জায়গায় ফ্যাকাশে। কিন্তু আমবিয়া ছোঁয় না। মেরামত করে না। মায়ের হাতের ফোঁড় যেমন ছিল তেমন রাখে। ক্ষয়টাও মায়ের।
দ্বিতীয়টা আমবিয়া নিজে তৈরি করেছিল পনেরো বছর বয়সে। প্রথম কাঁথা। কাঁচা হাতের কাজ। ফোঁড় অসমান, ডিজাইন এলোমেলো। একটা পাখি আঁকতে চেয়েছিল, হয়েছিল ব্যাঙের মতো। আমবিয়া হাসে যখন দেখে। কিন্তু রাখে। এটা তার শুরু। শুরুটাকে মুছে ফেলা যায় না।
তৃতীয়টা সবচেয়ে ছোট। রুমাল সাইজের। আমবিয়া এটা তৈরি করেছিল তার প্রথম সন্তান মারা যাওয়ার পর। ছেলে। তিন দিনের ছেলে। নাম রাখা হয়নি। তিন দিনে নাম রাখার সময় হয়নি। কাঁথাটায় কিছু আঁকা নেই। শুধু সাদা কাপড়ে সাদা সুতোর ফোঁড়। দেখলে মনে হয় খালি। কিন্তু হাত দিয়ে ছুঁলে বোঝা যায়, ফোঁড় আছে। অদৃশ্য ফোঁড়। অদৃশ্য শোক।
এই তিনটে কাঁথা বিক্রি হবে না। কোনো গ্যালারিতে যাবে না। কোনো মিউজিয়ামে যাবে না। এগুলো আমবিয়ার। শুধু আমবিয়ার।
৫
মিউজিয়াম থেকে একবার লোক এসেছিল।
ঢাকা থেকে। দুজন। একজন বাঙালি, একজন বিদেশি। বিদেশিটা সাদা চামড়ার, চোখে চশমা, হাতে নোটবুক। তারা আমবিয়ার কাঁথা দেখেছিল। বিদেশিটা বলেছিল ইংরেজিতে কিছু, বাঙালি অনুবাদ করেছিল: "উনি বলছেন, আপনার কাজ অসাধারণ। এটা আর্ট।"
আমবিয়া "আর্ট" শব্দটা বোঝে না। তার কাছে এটা সেলাই। তার মা যেভাবে শিখিয়েছিল সেভাবে করে। এটা আর্ট না, এটা উত্তরাধিকার। এটা প্রদর্শনীর জন্য না, এটা ব্যবহারের জন্য। কাঁথা দিয়ে গায়ে দেওয়া হয়, ঠান্ডা রাতে। কাঁথা দিয়ে শিশুকে জড়ানো হয়। কাঁথা শিল্প না, কাঁথা জীবন।
কিন্তু তারা এটাকে "আর্ট" বলে। ফ্রেমে ভরে দেয়ালে টাঙায়। কাচের পেছনে। কেউ ছোঁয় না। কেউ গায়ে দেয় না। কাঁথা তার উদ্দেশ্য হারায়।
তারা আমবিয়ার নাম লিখেছিল। ছবি তুলেছিল। বলেছিল, "আপনার কাঁথা মিউজিয়ামে রাখব। সারা পৃথিবীর মানুষ দেখবে।" আমবিয়া মাথা নেড়েছিল। কী বলবে বুঝতে পারেনি।
পরে রাবেয়া বলেছিল, "আম্মা, তোমার কাঁথা জাতীয় জাদুঘরে আছে। তোমার নামে।"
আমবিয়ার নামে। একটা কাঁথা। জাদুঘরে। কিন্তু আমবিয়ার ঘরে টিনের চাল ফুটো। বর্ষায় পানি পড়ে। যে কাঁথা জাদুঘরে কাচের পেছনে শুকনো আছে, সেই কাঁথার স্রষ্টার ঘরে বৃষ্টি ঝরে।
৬
সন্ধ্যায় আমবিয়া উঠানে বসে।
আলো কমে আসছে। চোখ আর সুই ধরতে পারে না এই আলোতে। কিন্তু হাত বসে নেই। হাতে একটুকরো কাপড়, সুই চলছে, চোখ বন্ধ। এটা অভ্যাসের ওপর। চল্লিশ বছরের অভ্যাস।
আমবিয়া ভাবে, তার পরে কে করবে? বড় মেয়ে হাসিনা গ্রামে আছে, কিছুটা শিখেছে, কিন্তু হাসিনার ধৈর্য কম। তিন মাস একটা কাঁথায় বসে থাকা হাসিনার পক্ষে সম্ভব না। রাবেয়া ঢাকায়, গার্মেন্টসে সেলাই করে, কিন্তু সেটা মেশিনের সেলাই, হাতের সেলাই না। মেশিনের সেলাইয়ে প্রাণ নেই। মেশিন ফোঁড় দেয়, কিন্তু গল্প বলে না। ছোট মেয়ে জাহানারা পড়ালেখা করছে, কাঁথার দিকে তাকায় না।
একটা শিল্প মরে যাচ্ছে।
না, মরে যাচ্ছে না। বদলে যাচ্ছে। গ্যালারি আছে, মিউজিয়াম আছে, বিদেশি ক্রেতা আছে। কিন্তু শিল্পী নেই। যে হাত গল্প বলত, সেই হাত থামছে। একটা একটা করে।
আমবিয়া জানে তার চোখ আরো খারাপ হবে। এক বছর, দুই বছর। তারপর সুইয়ের ফুটো দেখতে পাবে না। সুতো গলাতে পারবে না। তখন? তখন কী হবে?
তখন আমবিয়া বসে থাকবে। উঠানে। খালি হাতে। যে হাত চল্লিশ বছর ধরে থামেনি, সেই হাত থামবে। আর আমবিয়া জানে, সেদিনই সে আসলে মারা যাবে। শরীর থাকবে, কিন্তু আমবিয়া থাকবে না। আমবিয়া আছে তার সুইয়ে, তার সুতোয়, তার ফোঁড়ে। সেগুলো চলে গেলে আমবিয়া খোলসমাত্র।
করিম ফিরেছে ইটভাটা থেকে। ক্লান্ত। গায়ে ইটের ধুলো। আমবিয়া ভাত বাড়ে। করিম খায়। দুজনেই চুপ। চুপ থাকাটাও একটা ভাষা। পঁয়ত্রিশ বছরের সংসারে চুপ থাকার নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি হয়। কোন চুপ মানে সব ঠিক। কোন চুপ মানে কিছু হয়েছে। আজকের চুপ মানে: দিন গেছে, আরেকটা দিন গেছে, বেঁচে আছি।
রাতে আমবিয়া নতুন কাঁথা শুরু করে। এটা তার শেষ কাঁথা হতে পারে, নাও হতে পারে। সে জানে না। কিন্তু শুরু করে। কারণ আমবিয়ার কাছে কাঁথা শুরু করা মানে আরেকটা গল্প শুরু করা। আর যতদিন গল্প আছে, ততদিন আমবিয়া আছে।
এই কাঁথায় কী থাকবে? আমবিয়া এখনো ঠিক করেনি। হয়তো নদী। হয়তো ক্ষেত। হয়তো তার মায়ের মুখ। হয়তো সেই তিন দিনের ছেলের মুখ যেটা সে কখনো দেখতে পায়নি ঠিকমতো, কিন্তু কল্পনায় আঁকে, প্রতিদিন, প্রতিরাতে, তিরিশ বছর ধরে।
সুই ফোটে। সুতো টানে। কাপড়ে একটা ফোঁড়। তারপর আরেকটা। তারপর আরেকটা।
আমবিয়ার সুই দিয়ে গল্প বলে। গ্যালারি টাকা নেয়। কিন্তু গল্পটা আমবিয়ার। সেটা কেউ কিনতে পারে না।