ডে-কেয়ার চালক
অন্যের বাচ্চা সামলাই, আমার নিজের বাচ্চাকে সামলানোর সময় নেই
১
মুক্তার দিন শুরু হয় অন্যের বাচ্চাদের আগমনে।
সকাল সাতটা। ঢাকার মিরপুরে একটা তিন রুমের ফ্ল্যাট। নিচতলা। ফ্ল্যাটের দরজায় একটা সাইনবোর্ড: "আলোর ঠিকানা ডে-কেয়ার।" সাইনবোর্ডটা মুক্তা নিজে বানিয়েছে, সাদা কাগজে মার্কার দিয়ে। পেশাদার সাইনবোর্ডের টাকা নেই। কিন্তু নামটা পেশাদার। "আলোর ঠিকানা।" মুক্তা নামটা অনেক ভেবে রেখেছিল। আলো, কারণ বাচ্চারা আলো। ঠিকানা, কারণ প্রতিটা বাচ্চার একটা নিরাপদ জায়গা দরকার।
প্রথম বাচ্চা আসে সাড়ে সাতটায়। রায়হান। তিন বছর। তার মা রুমানা গার্মেন্টসে কাজ করে। রুমানার শিফট আটটায় শুরু। রুমানা রায়হানকে মুক্তার হাতে দেয়, কিছু বলে না, চোখ বলে। চোখে একটু অপরাধবোধ, একটু কৃতজ্ঞতা, একটু তাড়া। তিনটা একসাথে। মুক্তা চেনে এই চোখ। প্রতিটা মায়ের চোখে এটা থাকে যখন সে নিজের বাচ্চাকে অন্যের হাতে দেয়।
আটটার মধ্যে পনেরোটা বাচ্চা। তিন থেকে ছয় বছর বয়সী। পনেরোটা নাম, পনেরোটা অভ্যাস, পনেরোটা পছন্দ-অপছন্দ। মুক্তা সবগুলো জানে। রায়হান ঘুমের আগে বাম কান টেনে ধরে। তানিয়া শুধু সাদা ভাত খায়, তরকারি ছোঁয় না। আরিফ দুপুরে ঘুমাতে চায় না, জোর করলে কাঁদে। সুমাইয়া অন্য বাচ্চাদের খেলনা নেয়, নিজেরটা দেয় না। ফাহিম চুপচাপ, কিছু বলে না, কিন্তু সব বোঝে।
মুক্তা এই পনেরোটা বাচ্চাকে নিজের মতো করে চেনে। কিন্তু নিজের বাচ্চাটাকে?
২
মুক্তার মেয়ে অনন্যা। চার বছর। অনন্যা এই ডে-কেয়ারেই থাকে।
এটা হাসির কথা, নাকি কান্নার কথা, মুক্তা ঠিক করতে পারে না। মুক্তা ডে-কেয়ার খুলেছিল কারণ অনন্যার জন্য ডে-কেয়ার খুঁজে পায়নি। তিন বছর আগের কথা। মুক্তা তখন একটা বেসরকারি অফিসে কাজ করত। অ্যাডমিন। মাসিক বেতন পনেরো হাজার। অনন্যার বাবা শামীম দূরপাল্লার বাসের ড্রাইভার, তিন-চার দিন পর ফেরে। মুক্তা একা। অনন্যাকে রেখে অফিসে যেতে হবে।
ডে-কেয়ার খুঁজেছিল। মিরপুরে তিনটা পেয়েছিল। একটার ভাড়া মাসে আট হাজার। মুক্তার বেতন পনেরো হাজার, বাসা ভাড়া সাত হাজার। আট হাজার ডে-কেয়ার দিলে মাইনাস হয়ে যায়। দ্বিতীয়টা সস্তা ছিল, তিন হাজার, কিন্তু মুক্তা গিয়ে দেখেছিল: একটা অন্ধকার ঘর, বিশটা বাচ্চা, একজন বুড়ি, টিভিতে কার্টুন চলছে, বাচ্চারা মেঝেতে বসে আছে। তৃতীয়টা ভালো ছিল, কিন্তু ওয়েটিং লিস্ট ছয় মাস।
মুক্তা চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল।
সেই রাতে শামীম ফোন করেছিল। "চাকরি ছাড়লি?" "ছাড়লাম।" "তাহলে?" "ডে-কেয়ার খুলব।" শামীম চুপ ছিল অনেকক্ষণ। তারপর বলেছিল, "টাকা কই?" মুক্তা বলেছিল, "জমানো আছে কিছু।" ছিল না। একটা টাকাও ছিল না। কিন্তু মুক্তা জানত, কিছু সিদ্ধান্ত মিথ্যা দিয়ে শুরু করতে হয়।
মায়ের কাছ থেকে ধার নিয়েছিল বিশ হাজার। বোনের কাছ থেকে দশ হাজার। শামীমের এক মাসের বেতন, আঠারো হাজার। মোট আটচল্লিশ হাজার। এই টাকায় ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি ডিপোজিট, কিছু খেলনা, দুটো ম্যাট্রেস, প্লাস্টিকের চেয়ার, একটা ছোট টিভি।
প্রথম মাসে তিনটা বাচ্চা এসেছিল। তিন হাজার করে। নয় হাজার টাকা। ভাড়া দশ হাজার। মাইনাস এক হাজার। দ্বিতীয় মাসে পাঁচটা। তৃতীয় মাসে আটটা। ছয় মাসে পনেরোটা। মুক্তা বুঝেছিল, চাহিদা আছে। মিরপুরে হাজার হাজার মা আছে যাদের কাজে যেতে হয়, কিন্তু বাচ্চা রাখার জায়গা নেই।
৩
মুক্তার দিন এরকম:
সকাল ছয়টায় ওঠে। নিজের রান্না করে। অনন্যাকে ওঠায়। অনন্যাকে খাওয়ায়। ঘর গোছায়। সাড়ে সাতটা থেকে বাচ্চারা আসতে শুরু করে। আটটা থেকে এগারোটা: খেলা, গান, ছবি আঁকা, অক্ষর শেখানো। মুক্তা নিজে পড়ায়। একটা সহকারী আছে, ফারজানা, তাকে মাসে পাঁচ হাজার দেয়। এগারোটায় টিফিন। বাচ্চারা বাড়ি থেকে আনে, কিন্তু কিছু বাচ্চা আনে না, তাদের জন্য মুক্তা রাখে। বারোটায় ঘুম। দুটোয় উঠে আবার খেলা। চারটা-পাঁচটায় বাবা-মা আসে নিতে। কখনো ছয়টা বাজে, গার্মেন্টসের ওভারটাইম হলে। মুক্তা অপেক্ষা করে। কখনো সাতটা বাজে। মুক্তা অপেক্ষা করে।
এই অপেক্ষার সময়টুকু মুক্তা অনন্যার সাথে থাকতে পারত। কিন্তু তখন অন্য বাচ্চারা আছে। অনন্যা মুক্তার মেয়ে, কিন্তু দিনের বেলা অনন্যা পনেরোজনের একজন। মুক্তা অনন্যাকে আলাদা সময় দিতে পারে না। দিলে অন্য বাচ্চারা ঠকবে। মুক্তা পেশাদার। পেশাদার মানে নিজের বাচ্চাকে অন্যদের সাথে সমান রাখা।
অনন্যা বোঝে না। চার বছরের বাচ্চা বোঝে না কেন মা অন্য বাচ্চাদের কোলে নেয়। কেন মা তানিয়াকে খাওয়ায়। কেন মা ফাহিমকে গল্প বলে। অনন্যা কখনো কখনো এসে মুক্তার পা ধরে দাঁড়ায়। কিছু বলে না। শুধু দাঁড়ায়। মুক্তা নিচে তাকায়, অনন্যার চোখে একটা প্রশ্ন: আমি কি তোমার?
মুক্তা অনন্যাকে তুলে নেয়। একটু ধরে রাখে। তারপর নামায়। কারণ সুমাইয়া কাঁদছে। কারণ আরিফ পড়ে গেছে। কারণ রায়হানের ডায়াপার বদলাতে হবে।
অন্যের বাচ্চা সামলাই যাতে অন্যরা কাজে যেতে পারে। কিন্তু আমার নিজের বাচ্চাকে সামলানোর সময় নেই।
৪
রাত নয়টায় সব বাচ্চা চলে যায়।
ঘর খালি হয়। খেলনা ছড়ানো। বিস্কিটের গুঁড়ো মেঝেতে। একটা জুতো পড়ে আছে, কোনো বাচ্চা ফেলে গেছে, কাল ফেরত দিতে হবে। মুক্তা ঘর পরিষ্কার করে। ফারজানা চলে গেছে।
অনন্যা ক্লান্ত। সারাদিন অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলেছে, কিন্তু ক্লান্ত। মুক্তা জানে এটা শরীরের ক্লান্তি না। এটা অন্য ক্লান্তি। নিজের মাকে শেয়ার করার ক্লান্তি। চার বছরের বাচ্চা শব্দে বলতে পারে না, কিন্তু শরীরে দেখায়।
মুক্তা অনন্যাকে গোসল করায়। খাওয়ায়। গল্প বলে। ঘুম পাড়ায়। এই দুই ঘণ্টা, রাত নয়টা থেকে এগারোটা, এটা মুক্তা আর অনন্যার সময়। দিনের পুরোটা পনেরোজনের। রাতের এই দুই ঘণ্টা দুজনের।
অনন্যা ঘুমিয়ে পড়লে মুক্তা হিসেব করে। পনেরোটা বাচ্চা, তিন হাজার করে, পঁয়তাল্লিশ হাজার। ভাড়া দশ হাজার। ফারজানার বেতন পাঁচ হাজার। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পাঁচ হাজার। খেলনা, কাগজ, রঙ, দুই হাজার। খাবার যেটুকু মুক্তা দেয়, তিন হাজার। মোট খরচ পঁচিশ হাজার। বাকি বিশ হাজার। এর থেকে মুক্তার নিজের সংসার। শামীমের বেতন আঠারো হাজার। মোট আটত্রিশ হাজার। ঢাকায়। তিনজনের সংসার।
চলে। কোনোরকমে চলে। ভালো চলে না। কিন্তু চলে।
মুক্তা জানে সে ধনী হবে না এই কাজে। ডে-কেয়ার চালানো ব্যবসা না। ব্যবসা মানে মুনাফা। মুক্তার মুনাফা বিশ হাজার, তার মধ্যে ট্যাক্স নেই, কিন্তু ভবিষ্যৎও নেই। কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। কোনো বোনাস নেই। কোনো ছুটি নেই। মুক্তা অসুস্থ হলে ডে-কেয়ার বন্ধ। ডে-কেয়ার বন্ধ মানে পনেরোটা পরিবার সমস্যায়। মুক্তা তাই অসুস্থ হয় না। অসুস্থ হওয়ার অনুমতি নেই।
৫
একদিন রুমানা দেরি করেছিল।
রাত আটটা। রায়হান ঘুমিয়ে পড়েছে মুক্তার কোলে। রুমানা ফোন করেছিল, কাঁদছিল।
"আপা, ওভারটাইম ছাড়তে দিচ্ছে না। আরো এক ঘণ্টা।"
"ঠিক আছে, রায়হান আমার কাছে আছে।"
"আপা, আমি..."
"কিছু বলতে হবে না। আসো।"
রুমানা রাত সাড়ে নয়টায় এসেছিল। চোখ লাল। শরীরে ক্লান্তি। হাতে গার্মেন্টসের ব্যাগ। রায়হানকে কোল থেকে নিয়েছিল, রায়হান জেগে উঠে কেঁদেছিল, তারপর মায়ের গন্ধ পেয়ে চুপ হয়ে গিয়েছিল।
মুক্তা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেছিল রুমানা রায়হানকে নিয়ে অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাচ্ছে।
সেই রাতে মুক্তা ভেবেছিল, এই শহরের ব্যবস্থাটাই ভুল। মায়েদের কাজে যেতে হয়, কারণ এক আয়ে সংসার চলে না। কিন্তু কাজে গেলে বাচ্চা রাখার ব্যবস্থা নেই। সরকারি ডে-কেয়ার নেই বললেই চলে। বেসরকারি ডে-কেয়ার ব্যয়বহুল। তাহলে মায়েরা কী করবে? পাশের বাড়িতে রেখে যাবে? বুড়ি দাদি-নানির কাছে রেখে যাবে? নাকি পাঁচ বছরের বাচ্চাকে তালা মেরে একা রেখে যাবে?
মুক্তা জানে, কিছু মা তালা মেরে রেখে যায়। সেই বাচ্চারা দরজা আর জানালার মাঝে সারাদিন থাকে। টিভি দেখে। অথবা ঘুমায়। অথবা কাঁদে। কেউ শোনে না।
মুক্তার ডে-কেয়ার সেই বাচ্চাদের জন্য। মুক্তা জানে সে পৃথিবী বদলাতে পারবে না। কিন্তু পনেরোটা বাচ্চার দিনটা বদলাতে পারে। সেটাই যথেষ্ট। সেটাই সবকিছু।
৬
রাত এগারোটা। অনন্যা ঘুমিয়ে আছে।
মুক্তা অনন্যার পাশে শুয়ে তাকিয়ে থাকে। অনন্যার মুখ ঘুমে শান্ত। দিনের সেই প্রশ্ন নেই চোখে। ঘুমে সব প্রশ্ন মুছে যায়।
মুক্তা অনন্যার চুলে হাত বোলায়। আস্তে। যেন ভয় পাচ্ছে জাগিয়ে দিতে।
মুক্তা জানে একদিন অনন্যা বুঝবে। বুঝবে কেন মা সারাদিন অন্যের বাচ্চা সামলাত। বুঝবে কেন মা তাকে আলাদা সময় দিতে পারত না। বুঝবে কেন মা রাতে এত ক্লান্ত থাকত। সেদিন হয়তো অনন্যা ক্ষমা করবে। হয়তো করবে না। মুক্তা জানে না।
কিন্তু মুক্তা জানে, রুমানা কাজে যেতে পারে কারণ রায়হান মুক্তার কাছে থাকে। নাসরিন কাজে যেতে পারে কারণ তানিয়া মুক্তার কাছে থাকে। ফেরদৌস কাজে যেতে পারে কারণ ফাহিম মুক্তার কাছে থাকে। পনেরোটা মা কাজে যেতে পারে কারণ মুক্তা এখানে আছে।
এটাই তার কাজের মানে।
কিন্তু মানে খুঁজতে গেলে একটা ফাঁক থাকে। সেই ফাঁকটা অনন্যার আকারের। সেই ফাঁকটা সেই দুই ঘণ্টার আকারের যেটা মুক্তা প্রতিদিন হারায়। সেই ফাঁকটা ভরাট হবে না। কখনো না।
শামীম ফোন করে।
"কেমন আছো?"
"ভালো।"
"অনন্যা?"
"ঘুমাইছে।"
"তুমি?"
"ঘুমাব এখন।"
মুক্তা ঘুমায় না। শুয়ে থাকে। কাল সকাল সাড়ে সাতটায় রায়হান আসবে। তারপর তানিয়া। তারপর আরিফ। একে একে পনেরোজন। মুক্তা হাসবে। বলবে, "আয়, বাবু।" "আয়, মা।" প্রতিটা বাচ্চাকে নিজের বলে নেবে। দিনটা শুরু হবে।
আর অনন্যা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে দেখবে মা অন্যদের কোলে তুলে নিচ্ছে।
এটাই মুক্তার জীবন। এটাই মুক্তার মূল্য। এটাই মুক্তার ক্ষত।