মিড-ওয়াইফ
আমি বাঁচালাম, হাসপাতাল নাম পেলো
১
ফেরদৌসীর ব্যাগে জীবন আর মৃত্যু দুটোই থাকে।
ব্যাগটা কালো। কৃত্রিম চামড়ার। ভেতরে: রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, স্টেথোস্কোপ, জীবাণুমুক্ত গ্লাভস, সিরিঞ্জ, অক্সিটোসিন ইনজেকশন, মিসোপ্রস্টল ট্যাবলেট, একটা আম্বু ব্যাগ (নবজাতকের জন্য), সুতো, কাঁচি, ক্লিন ডেলিভারি কিট, পালস অক্সিমিটার। আর একটা টর্চলাইট। টর্চলাইটটা সবচেয়ে জরুরি, কারণ বাচ্চা আসে রাতে। বেশিরভাগ বাচ্চা রাতে আসে। কেন, ফেরদৌসী জানে না। কিন্তু তিন বছরে যতগুলো ডেলিভারি করেছে, তার সত্তর ভাগ রাতে।
ফেরদৌসী আটাশ বছর বয়সী। নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে মিড-ওয়াইফারি কোর্স করেছে। আঠারো মাসের কোর্স। তারপর ছয় মাস ইন্টার্নশিপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তারপর সরকারি পোস্টিং, কুড়িগ্রামের একটা ইউনিয়নে। কমিউনিটি মিড-ওয়াইফ। মাসিক বেতন সতেরো হাজার টাকা।
সতেরো হাজার টাকায় জীবন বাঁচানো।
ফেরদৌসী হিসেব করে না। হিসেব করলে চাকরি ছেড়ে দিত। সে জানে ঢাকায় গেলে ক্লিনিকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার পেত। কিন্তু ফেরদৌসী ঢাকায় যায়নি। কারণ ঢাকায় মিড-ওয়াইফ আছে, ডাক্তার আছে, হাসপাতাল আছে। কুড়িগ্রামের এই ইউনিয়নে কেউ নেই। একজন উপ-স্বাস্থ্য পরিদর্শক আছে, সে পুরুষ, ডেলিভারি করে না। একটা কমিউনিটি ক্লিনিক আছে, সেখানে ওষুধ আছে, ডেলিভারি রুম নেই। নিকটতম হাসপাতাল উপজেলা সদরে, পনেরো কিলোমিটার দূরে। রাস্তা কাঁচা। বর্ষায় নৌকা ছাড়া যাওয়া যায় না।
ফেরদৌসীর আগে এখানে দাই ছিল। হামিদা দাই। সত্তর বছরের বৃদ্ধা। হামিদা দাই তিরিশ বছর ধরে এই এলাকায় বাচ্চা ধরেছে। কোনো প্রশিক্ষণ নেই। মা-দাদির কাছ থেকে শেখা। হামিদা দাই ভালো মানুষ, কিন্তু তার হাতে স্টেথোস্কোপ নেই, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র নেই, অক্সিটোসিন নেই। তার হাতে অভিজ্ঞতা আছে আর দোয়া আছে। অভিজ্ঞতা কাজ করে যখন সব ঠিক থাকে। যখন ঠিক থাকে না, তখন দোয়া যথেষ্ট না।
২
ফেরদৌসী প্রথম যেদিন এসেছিল, গ্রামের মানুষ তাকিয়ে ছিল।
একটা মেয়ে। আটাশ বছর বয়সী। অবিবাহিত। শহর থেকে এসেছে। বলছে সে বাচ্চা ধরবে।
প্রশ্ন এসেছিল চারদিক থেকে।
"ডাক্তার?" "না।" "নার্স?" "না।" "তাহলে কী?" "মিড-ওয়াইফ।" "মিড-ওয়াইফ কী?" ফেরদৌসী বুঝিয়েছিল। প্রশিক্ষিত ধাত্রী। যে ডেলিভারি করতে পারে, জটিলতা বুঝতে পারে, জরুরি হলে রেফার করতে পারে।
"ডাক্তার না, নার্স না, এটা কী?"
প্রশ্নটা আজও আসে। তিন বছর পরেও। গ্রামের মানুষ দুটো জিনিস বোঝে: ডাক্তার আর দাই। ডাক্তার মানে হাসপাতাল, টাকা, শহর। দাই মানে ঘর, বিনা পয়সা, গ্রাম। মিড-ওয়াইফ এর মাঝখানে। মাঝখানটা কেউ বোঝে না।
হামিদা দাই ফেরদৌসীকে পছন্দ করেনি। স্বাভাবিক। তিরিশ বছর ধরে যে এই কাজ করেছে, তার জায়গায় নতুন কেউ এলে কে পছন্দ করে? হামিদা দাই বলেছিল, "আমি তিনশো বাচ্চা ধরেছি। তুমি কয়টা ধরেছো?" ফেরদৌসী বলেছিল, "চৌদ্দটা। ইন্টার্নশিপে।" হামিদা দাই হেসেছিল। সেই হাসিতে অবজ্ঞা ছিল, কিন্তু ভয়ও ছিল। কারণ হামিদা দাই জানত, ফেরদৌসীর ব্যাগে যেগুলো আছে, সেগুলো তার কাছে নেই। আর সেই জিনিসগুলোই মানুষকে বাঁচায় যখন সব উলটে যায়।
ফেরদৌসী হামিদা দাইকে সম্মান করে। সত্যিই করে। তিরিশ বছর, কোনো যন্ত্র ছাড়া, কোনো ওষুধ ছাড়া, শুধু হাত আর অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনশো বাচ্চা, এটা সামান্য কাজ না। কিন্তু সেই তিনশোর মধ্যে কতজন মা রক্তক্ষরণে মারা গেছে, কতটা বাচ্চা শ্বাস নিতে না পেরে মারা গেছে, সেই হিসেব হামিদা দাই রাখে না। হয়তো রাখতে চায় না। হয়তো সেই সংখ্যা জানলে রাতে ঘুম আসত না।
৩
সেই রাতের কথা ফেরদৌসী ভোলেনি।
রাত দুইটা। ফোন বেজেছিল। তার ফোনে কমিউনিটি ক্লিনিকের নম্বর সেভ করা, কিন্তু এটা সেই নম্বর না। অচেনা নম্বর।
"আপা, আমার বউয়ের রক্ত যাইতেছে। আসেন।"
ফেরদৌসী ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছিল। মটরসাইকেল নেই, সাইকেলে। চার কিলোমিটার। কাঁচা রাস্তা। অন্ধকার। টর্চের আলোতে সাইকেল চালিয়ে গেছে। পড়ে গেছে একবার। হাঁটু কেটে গেছে। উঠে আবার চালিয়েছে।
বাড়িতে পৌঁছে দেখেছিল: একটা ঘর, মাটির মেঝে, তেলের বাতি। মেয়েটা শুয়ে আছে। নাম মরিয়ম। আঠারো বছর। প্রথম সন্তান। বাচ্চা হয়ে গেছে, হামিদা দাই ধরেছিল। কিন্তু প্লাসেন্টা আসেনি। আর রক্ত যাচ্ছে। ক্রমাগত।
ফেরদৌসী রক্তচাপ মেপেছিল। ৭০/৪০। বিপজ্জনক মাত্রায় কম। পালস ১৩০। শরীর ঠান্ডা। পোস্টপার্টাম হেমোরেজ। প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ। এটাই বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ।
ফেরদৌসী জানত কী করতে হবে। প্রশিক্ষণে শিখেছে। সিমুলেশনে করেছে। কিন্তু সিমুলেশন আর বাস্তব আলাদা। সিমুলেশনে ম্যানিকিনের রক্ত প্লাস্টিকের, আলো ফ্লুরোসেন্টের, পেছনে প্রশিক্ষক দাঁড়ানো। বাস্তবে রক্ত আসল, আলো তেলের বাতির, পেছনে স্বামী কাঁদছে, শাশুড়ি দোয়া পড়ছে, পুরো পরিবার তাকিয়ে আছে।
ফেরদৌসী হাত কাঁপেনি। হাত কাঁপালে মরিয়ম মারা যেত।
মিসোপ্রস্টল দিয়েছিল জিভের নিচে। জরায়ু ম্যাসাজ শুরু করেছিল। একটানা। জরায়ু সংকুচিত না হলে রক্ত বন্ধ হবে না। বিশ মিনিট ম্যাসাজ করেছিল। হাত ব্যথা করছিল, কিন্তু থামেনি। একই সাথে আইভি স্যালাইন সেট করেছিল, এক হাতে। অক্সিটোসিন ইনজেকশন দিয়েছিল।
প্লাসেন্টা বেরিয়ে এসেছিল। রক্তক্ষরণ কমেছিল। ধীরে ধীরে। মরিয়মের রক্তচাপ উঠতে শুরু করেছিল। ৮০/৫০। ৯০/৬০। ফেরদৌসী শ্বাস ছেড়েছিল।
মরিয়ম বেঁচেছিল।
ফেরদৌসী সকালে ফিরেছিল। সাইকেলে। হাঁটুতে রক্ত শুকিয়ে আছে। শরীরে মরিয়মের রক্ত। ক্লান্ত। কিন্তু ভেতরে একটা কিছু আছে যেটা ক্লান্তির চেয়ে বড়। সেটা কী, ফেরদৌসী নাম দেয় না। নাম দিলে ছোট হয়ে যায়।
আমি না থাকলে দুটো প্রাণ যেতো।
৪
কিন্তু গল্পটা সেখানে শেষ হয়নি।
এক সপ্তাহ পরে মরিয়মের শাশুড়ি বাজারে গিয়ে বলেছিল, "আমার বউমাকে হাসপাতালে নিছিলাম, হাসপাতাল বাঁচাইছে।"
হাসপাতাল বাঁচায়নি। ফেরদৌসী বাঁচিয়েছিল। মরিয়মের ঘরে। মাটির মেঝেতে। তেলের বাতিতে। কিন্তু সেটা কেউ বলেনি। কারণ ফেরদৌসী ডাক্তার না। ফেরদৌসী হাসপাতাল না। ফেরদৌসী একটা মেয়ে, ব্যাগ হাতে, সাইকেলে আসে।
আমি বাঁচালাম, হাসপাতাল নাম পেলো।
ফেরদৌসী রাগ করে না। রাগ করার সময় নেই। রাগ করলে পরের ডাক মিস হবে। পরের মরিয়ম অপেক্ষা করছে। পরের রাত দুটোর ফোন আসবে। ফেরদৌসী ব্যাগ নেবে। সাইকেলে উঠবে।
কিন্তু কখনো কখনো, একা ঘরে, রাতে, ফেরদৌসী ভাবে: কেন? কেন স্বীকৃতি নেই? কেন মানুষ বিশ্বাস করে না? কেন "মিড-ওয়াইফ" শব্দটা শুনলে মানুষ বোঝে না?
উত্তরটা ফেরদৌসী জানে। এদেশে স্বাস্থ্য মানে ডাক্তার। ডাক্তার ছাড়া কেউ কিছু জানে না, এটাই ধারণা। মিড-ওয়াইফ এই ধারণার বাইরে। নার্স এই ধারণার বাইরে। প্যারামেডিক এই ধারণার বাইরে। যারা আসলে গ্রামে গিয়ে কাজ করে, তারাই অদৃশ্য। যারা শহরে বসে প্রেসক্রিপশন লেখে, তারাই দৃশ্যমান।
৫
ফেরদৌসীর মা চান না মেয়ে এখানে থাকুক।
ফেরদৌসীর মা ময়মনসিংহে থাকে। শিক্ষিত মহিলা। স্কুল শিক্ষিকা। মেয়েকে পড়িয়েছে, নার্সিং কোর্স করিয়েছে, আশা ছিল মেয়ে ঢাকায় ভালো হাসপাতালে চাকরি করবে, ভালো ছেলে পাবে, ভালো সংসার করবে।
মেয়ে কুড়িগ্রামে। একটা কামরায়। একা। রাত দুটোয় সাইকেলে বেরোয়। সতেরো হাজার টাকা বেতন।
"ফেরদৌসী, ঢাকায় আয়।"
"আম্মা, এখানে কেউ নেই আমি ছাড়া।"
"তুই একা পৃথিবী বদলাবি?"
"পৃথিবী না। একটা ইউনিয়ন।"
মা চুপ হয়ে যায়। মায়ের চুপ মানে: আমি বুঝি, কিন্তু ভয় পাই। ফেরদৌসী সেই ভয় বোঝে। মা ভাবে, মেয়ে একা, রাতে বেরোয়, গ্রামের রাস্তায়, কোনো নিরাপত্তা নেই। যদি কিছু হয়? মায়ের "যদি কিছু হয়" পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বাক্য।
ফেরদৌসী জানে ঝুঁকি আছে। একটা ঘটনা হয়েছিল, ছয় মাস আগে। রাতে যাচ্ছিল, পথে দুজন লোক থামিয়েছিল। "কই যাও এত রাতে?" ফেরদৌসী বলেছিল, "ডেলিভারি।" লোক দুটো ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু ফেরদৌসীর হাত কেঁপেছিল। সেদিনের পরে সে টর্চের সাথে একটা হুইসেল রাখে ব্যাগে।
৬
গত তিন বছরে ফেরদৌসী ষাটটা ডেলিভারি করেছে।
ষাটটা শিশু। ষাটটা মা। কোনো মাতৃমৃত্যু নেই। দুটো নবজাতক মৃত্যু, একটা প্রিম্যাচিওর (সাত মাসে), রেফার করেছিল কিন্তু পথে মারা গিয়েছিল, আরেকটা জন্মগত ত্রুটি, কিছু করার ছিল না। বাকি আটান্নটা জীবিত, সুস্থ।
ফেরদৌসী সেই দুটো মৃত্যু মনে রাখে। ষাটটার মধ্যে আটান্নটা মনে পড়ে না, কিন্তু দুটো মনে পড়ে। কারণ সাফল্য ভুলে যাওয়া যায়, ব্যর্থতা ভোলা যায় না। সেই প্রিম্যাচিওর বাচ্চাটার মুখ ফেরদৌসী দেখে, কখনো কখনো, ঘুমের মধ্যে। এত ছোট ছিল। একটা হাতের তালুতে ধরে যেত।
ফেরদৌসী ভাবে, একটা অ্যাম্বুলেন্স থাকলে বাচ্চাটা বাঁচত। পনেরো কিলোমিটার ভ্যানে যেতে এক ঘণ্টা লেগেছিল। অ্যাম্বুলেন্সে পনেরো মিনিট লাগত। সেই পঁয়তাল্লিশ মিনিটে একটা প্রাণ গেছে। পঁয়তাল্লিশ মিনিট। সেটাই বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ব্যবধান জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে।
আজ রাতে ফেরদৌসী ব্যাগ গোছায়। কাল একটা প্রসূতি আছে, নয় মাস পূর্ণ, প্রথম সন্তান। ফেরদৌসী গতকাল দেখে এসেছে, সব ঠিক আছে, বাচ্চার পজিশন ঠিক আছে, মায়ের রক্তচাপ স্বাভাবিক। কিন্তু ফেরদৌসী জানে, ডেলিভারিতে সব ঠিক থেকে হঠাৎ উলটে যেতে পারে। প্রস্তুত থাকতে হয়। সবসময় প্রস্তুত।
ফেরদৌসী ব্যাগের জিপার বন্ধ করে। ব্যাগটা বিছানার পাশে রাখে। জুতো দরজার কাছে। ফোন চার্জে। টর্চ ব্যাগের পকেটে।
ফোন বাজতে পারে। যেকোনো সময়। ফেরদৌসী প্রস্তুত।
বাইরে অন্ধকার। কুড়িগ্রামের গ্রামীণ অন্ধকার, যেটা শহরের মানুষ কল্পনা করতে পারে না। কোনো বাতি নেই রাস্তায়। কোনো গাড়ির হেডলাইট নেই। শুধু অন্ধকার, তারা, আর মাঝে মাঝে শেয়ালের ডাক।
এই অন্ধকারে ফেরদৌসী একা। এই অন্ধকারেই সে কাজ করে। এই অন্ধকারেই প্রাণ আসে, প্রাণ বাঁচে, আর কখনো কখনো প্রাণ যায়।
ফেরদৌসী ঘুমায়। হালকা ঘুম। কান খোলা। ফোনের জন্য।
কারণ কোথাও একটা মা ব্যথায় কাতরাচ্ছে। কোথাও একটা বাচ্চা আসতে চাইছে। কোথাও একটা পরিবার ভয়ে আছে।
ফেরদৌসী যাবে। সবসময় যাবে। ডাক্তার না, নার্স না, কিন্তু যাবে।
কারণ সে ফেরদৌসী। মিড-ওয়াইফ। যার নাম কেউ মনে রাখে না, কিন্তু যার হাতে জীবন আসে।