যৌন হয়রানি সারভাইভার
জিতেছি, কিন্তু জেতার দামও আমাকেই দিতে হলো
১
মেহজাবীন স্ক্রিনশট নেয়।
এটা তার অভ্যাস হয়ে গেছে। প্রতিটা মেসেজের। প্রতিটা কমেন্টের। প্রতিটা "দেখা হবে" এর। স্ক্রিনশট, তারিখ, সময়, প্রেক্ষাপট। ফোনের একটা ফোল্ডারে, পাসওয়ার্ড-লক করা, নাম দিয়েছে "Receipts।" কারণ মেহজাবীন জানত, একদিন কেউ বলবে "প্রমাণ আছে?" আর সেদিনের জন্য প্রমাণ থাকতে হবে।
মেহজাবীন চব্বিশ বছর বয়সী। গুলশানের একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করত। মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট। জুনিয়র এক্সিকিউটিভ। ভালো বেতন, ত্রিশ হাজার, ফ্রেশারদের জন্য অনেক। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস। ল্যাপটপ দিয়েছে কোম্পানি। আইডি কার্ড। বিজনেস কার্ড। "মেহজাবীন আক্তার, Junior Executive, Marketing" লেখা।
মেহজাবীন প্রথম দিন অফিসে গিয়ে ভেবেছিল, এটাই শুরু। এখান থেকে উপরে উঠবে। ম্যানেজার হবে। ডিরেক্টর হবে। মেহজাবীন মেধাবী। জাহাঙ্গীরনগর থেকে মার্কেটিংয়ে প্রথম শ্রেণি। ইন্টারভিউতে বোর্ডের সবাই মুগ্ধ হয়েছিল। ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিজে বলেছিলেন, "আমরা তোমার মতো তরুণ প্রতিভা চাই।"
মেহজাবীনের বস ছিল মাহবুব স্যার। ডিপার্টমেন্ট হেড। পঞ্চাশ বছর বয়সী। দুই সন্তানের পিতা। স্ত্রী ডাক্তার। মাহবুব স্যার হাসিখুশি মানুষ, সবার সাথে ভালো ব্যবহার করেন, অফিসে সবাই পছন্দ করে।
প্রথম তিন মাস কিছু হয়নি। চতুর্থ মাসে শুরু হয়েছিল।
২
শুরুটা ছিল এত সূক্ষ্ম যে মেহজাবীন নিজেও বুঝতে পারেনি প্রথমে।
"তুমি আজ সুন্দর দেখাচ্ছো।" এটা কি হয়রানি? একজন বস একজন কর্মীকে বলতে পারে না? মেহজাবীন ভেবেছিল, হয়তো স্বাভাবিক।
"এই শাড়িটা তোমাকে মানায়।" এটা? হয়তো নিরীহ মন্তব্য।
"তুমি একটু পরে আমার রুমে এসো, একটু কথা আছে।" ঠিক আছে, অফিসের কাজ।
কিন্তু রুমে গেলে কাজের কথা দশ মিনিট, ব্যক্তিগত প্রশ্ন বিশ মিনিট। "বয়ফ্রেন্ড আছে?" "একা থাকো?" "বাসায় কে কে আছে?" মেহজাবীন উত্তর দিয়েছিল, কারণ বস জিজ্ঞেস করছেন, না বলা যায় না। নাকি যায়? সীমানাটা কোথায়? মেহজাবীন জানত না।
পঞ্চম মাসে স্পষ্ট হয়ে গেছিল।
অফিসের ইভেন্টে মাহবুব স্যার মেহজাবীনের কোমরে হাত রেখেছিলেন। "ফটোর জন্য।" মেহজাবীন সরে গিয়েছিল। মাহবুব স্যার আবার হাত রেখেছিলেন। এবার আরেকটু নিচে। মেহজাবীন আবার সরে গিয়েছিল। কেউ দেখেনি। কেউ দেখে না। এই জিনিসগুলো এমনভাবে হয় যে দশজনের মধ্যে কেউ দেখে না। কিন্তু যে সহ্য করে, সে জানে। তার শরীর জানে। তার চামড়া জানে। সেই স্পর্শটা ধুয়ে যায় না।
তারপর মেসেজ শুরু হয়েছিল। রাতে। অফিস আওয়ারের বাইরে।
"কী করো?"
"ঘুমাইনি?"
"তোমার কথা ভাবছিলাম।"
মেহজাবীন রিপ্লাই দিত না। কিন্তু পরদিন অফিসে মাহবুব স্যার বলতেন, "রাতে মেসেজ দিলাম, দেখোনি?" চোখে একটা চাপা রাগ। যেন মেসেজের উত্তর না দেওয়া অফিসের নিয়ম ভাঙা।
মেহজাবীন তখন থেকে স্ক্রিনশট নেওয়া শুরু করেছিল।
৩
ষষ্ঠ মাসে মাহবুব স্যার বলেছিলেন, "তোমার প্রমোশনের কথা ভাবছি।"
মেহজাবীন খুশি হয়েছিল। তারপরেই বলেছিলেন, "একটু সময় দাও আমাকে। ব্যক্তিগতভাবে। আমরা একটু ঘুরে আসি, কথা বলি।"
মেহজাবীন বুঝে গিয়েছিল।
"স্যার, আমি প্রফেশনাল রিলেশনশিপ রাখতে চাই।"
মাহবুব স্যার হেসেছিলেন। "অবশ্যই। আমিও তাই চাই।" কিন্তু সেই হাসির পেছনে কিছু একটা ছিল। মেহজাবীন সেটা দেখেছিল। সেই হাসি বলছিল: তুমি না বলতে পারো, কিন্তু পরিণতি আমি ঠিক করব।
পরের সপ্তাহ থেকে পরিণতি শুরু হয়েছিল। মেহজাবীনের প্রজেক্টগুলো অন্যদের দেওয়া হতে লাগল। মিটিংয়ে ডাকা হতো না। ইমেইলে সিসি থেকে বাদ পড়ত। মাহবুব স্যার সরাসরি কিছু বলতেন না, কিন্তু অদৃশ্যভাবে মেহজাবীনকে কোণঠাসা করতে শুরু করেছিলেন। যেটা সবচেয়ে নিষ্ঠুর ধরনের প্রতিশোধ: কিছু না করা। শুধু না দেওয়া। সুযোগ না দেওয়া। জায়গা না দেওয়া।
মেহজাবীন বুঝেছিল, এভাবে চলতে থাকলে ছয় মাসের মধ্যে তার পারফরম্যান্স রিভিউ খারাপ আসবে। পারফরম্যান্স খারাপ আসলে চাকরি যাবে। আর কেউ জানবে না কেন খারাপ আসল। কারণ কোনো প্রমাণ নেই যে তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সবকিছু এমনভাবে হয় যে দেখলে মনে হয় স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক না। কিছুই স্বাভাবিক না।
সপ্তম মাসে মেহজাবীন এইচআরে গিয়েছিল।
৪
এইচআর ম্যানেজার ফারহানা আপা। পেশাদার মহিলা। ভালো পোশাক, ভালো ইংরেজি, দেয়ালে "We Value Our People" পোস্টার।
মেহজাবীন সব বলেছিল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
ফারহানা আপা শুনেছিলেন। মুখ গম্ভীর। তারপর বলেছিলেন:
"প্রমাণ আছে?"
মেহজাবীন ফোন বের করেছিল। "Receipts" ফোল্ডার খুলেছিল। একটা একটা করে দেখিয়েছিল। মেসেজ। সময়। তারিখ। পঞ্চাশটারও বেশি স্ক্রিনশট। ফারহানা আপা দেখেছিলেন। চুপ হয়ে গিয়েছিলেন।
দুই সপ্তাহ তদন্ত হয়েছিল। মেহজাবীন সেই দুই সপ্তাহ অফিসে গেছে, মাহবুব স্যারের সাথে একই ফ্লোরে কাজ করেছে। মাহবুব স্যার জানতেন না। নাকি জানতেন? মেহজাবীন নিশ্চিত না। কিন্তু সেই দুই সপ্তাহ ছিল মেহজাবীনের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। প্রতিটা মুহূর্ত ভয়। কী হবে? আমাকে বিশ্বাস করবে? নাকি মাহবুব স্যারকে? তিনি পঞ্চাশ বছরের, বিশ বছরের অভিজ্ঞতা, পরিবারের মানুষ। আমি চব্বিশ বছরের, ছয় মাসের কর্মী, অবিবাহিত মেয়ে।
তদন্ত শেষে কোম্পানি মাহবুব স্যারকে বরখাস্ত করেছিল।
মেহজাবীন জিতেছিল। প্রমাণ ছিল। প্রমাণ জোরালো ছিল। কোম্পানি ঠিক কাজটাই করেছিল।
কিন্তু।
৫
"কিন্তু" দিয়ে শুরু হয় আসল গল্প।
মাহবুব স্যার চলে গেলেন। কিন্তু মেহজাবীন রয়ে গেল। সেই অফিসে। সেই ফ্লোরে। সেই মানুষগুলোর মাঝে।
কেউ সরাসরি কিছু বলেনি। কেউ বলে না। এটা ততটা স্থূল না। এটা সূক্ষ্ম। সহকর্মীরা যারা আগে লাঞ্চে ডাকত, ডাকা বন্ধ করে দিল। "ব্যস্ত ছিলাম" বলে। ক্যান্টিনে মেহজাবীন বসলে পাশের চেয়ারটা খালি থাকত। কেউ বসত না। ঠিক এড়িয়ে যেত না, কিন্তু কাছেও আসত না। একটা অদৃশ্য দেয়াল।
কানাঘুষা শুনত মেহজাবীন। "ওই মেয়েটা..." "মাহবুব স্যারের চাকরি গেল..." "কে জানে সত্যি কী হয়েছিল..." "মেয়েটা একটু ওভার-রিঅ্যাক্ট করেছে হয়তো..."
মেহজাবীন প্রমাণ দিয়ে জিতেছে, কিন্তু সংস্কৃতির কাছে হারছে। কারণ সংস্কৃতি বলে: মেয়েরা সহ্য করে। মেয়েরা বলে না। মেয়েরা যখন বলে, তখন তারা "ঝামেলা তৈরি করে।" পঞ্চাশ বছরের পুরুষের ক্যারিয়ার ধ্বংস হলো, সেটা কার দোষ? মেয়েটার।
কেউ বলে না মাহবুব স্যারের নিজের দোষে নিজের ক্যারিয়ার গেছে। কারণ সেটা স্বীকার করলে স্বীকার করতে হয় যে সিস্টেমে সমস্যা আছে। সিস্টেম স্বীকার করে না। সিস্টেম মেয়েটাকে দোষ দেয়।
নতুন বস এলেন। ভালো মানুষ, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু মেহজাবীনকে কোনো বড় প্রজেক্ট দিলেন না। "তুমি একটু সেটেল হও।" সেটেল হও মানে কী? মেহজাবীন ছয় মাস ধরে সেটেল্ড ছিল, যতক্ষণ না মাহবুব স্যার তাকে আনসেটেল করেছিলেন। এখন মেহজাবীনকে "সেটেল" হতে বলা হচ্ছে, যেন সে-ই অস্থির ছিল।
যে কোম্পানি আমাকে বাঁচালো, সেই কোম্পানি আমাকে থামালো।
৬
মেহজাবীন নয় মাস পর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল।
না, বরখাস্ত করেনি। পদত্যাগ। নিজের সিদ্ধান্তে। কারণ কোনো মানুষ এমন জায়গায় থাকতে পারে না যেখানে সে প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করতে বাধ্য হয়, আর তারপরেও কেউ বিশ্বাস করে না।
পদত্যাগের দিন ফারহানা আপা বলেছিলেন, "মেহজাবীন, আমি চেষ্টা করেছি।" মেহজাবীন বলেছিল, "জানি।" জানত। ফারহানা আপা সত্যিই চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একজন এইচআর ম্যানেজার পুরো সংস্কৃতি বদলাতে পারে না। পলিসি বদলানো যায়, সংস্কৃতি বদলানো যায় না। পলিসিতে লেখা আছে "জিরো টলারেন্স।" সংস্কৃতিতে লেখা আছে "চুপ করে সহ্য করো।"
মেহজাবীন অন্য কোম্পানিতে জয়েন করেছিল। ছোট কোম্পানি। বেতন কম, পঁচিশ হাজার। কিন্তু নতুন শুরু। নতুন মানুষ। কেউ চেনে না। কেউ জানে না। কোনো ইতিহাস নেই।
প্রথম দিন নতুন অফিসে, মেহজাবীন ওয়াশরুমে গিয়ে কেঁদেছিল। কেন কেঁদেছিল নিজেও জানে না ঠিক। হয়তো স্বস্তিতে। হয়তো রাগে। হয়তো ক্লান্তিতে। হয়তো এই ভেবে যে, একটা মেয়ে সঠিক কাজ করল, আর তার পুরস্কার হলো নতুন করে শুরু করা, কম বেতনে, কম পদে, শূন্য থেকে।
মেহজাবীন মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এসেছিল। ডেস্কে বসেছিল। কাজ শুরু করেছিল।
কারণ মেহজাবীন জানে, থেমে গেলে মাহবুব স্যার জেতেন। থেমে গেলে সেই কানাঘুষা সত্যি হতো। থেমে গেলে পরের মেয়েটা, যে হয়রানির শিকার হবে, সে ভাববে "বলে কী হবে? মেহজাবীনের কী হয়েছিল দেখো।"
মেহজাবীন থামেনি। নতুন জায়গায়, কম বেতনে, কম পদে, কিন্তু থামেনি।
জিতেছি। কিন্তু জেতার দামও আমাকেই দিতে হলো।
রাতে ফ্ল্যাটে ফিরে মেহজাবীন ফোন চেক করে। "Receipts" ফোল্ডারটা এখনো আছে। ডিলিট করেনি। করবে না। এটা প্রমাণ। কিসের প্রমাণ? যে সে সত্য বলেছিল, সেটার। কিন্তু সেটার চেয়েও বেশি কিছুর প্রমাণ। প্রমাণ যে সে ভয় পায়নি। প্রমাণ যে একটা চব্বিশ বছরের মেয়ে একটা পঞ্চাশ বছরের পুরুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পেরেছিল। প্রমাণ যে দাম দিতে হয়েছে, কিন্তু মাথা নত করেনি।
মেহজাবীন জানালার পাশে দাঁড়ায়। ঢাকার রাতের আকাশ দেখা যায় না ঠিকমতো, আলোদূষণে তারা ঢাকা পড়ে। কিন্তু আজ একটা তারা দেখা যাচ্ছে। একটা মাত্র। সেটাই যথেষ্ট।
মেহজাবীন ভাবে, পরের মেয়েটার জন্য। যে মেয়েটা এখন কোনো অফিসে বসে আছে, যার বস রাতে মেসেজ দেয়, যে জানে না কী করবে। সেই মেয়েটা যদি জানে মেহজাবীনের গল্প, হয়তো সে স্ক্রিনশট নেবে। হয়তো সে বলবে। হয়তো তারও দাম দিতে হবে। কিন্তু হয়তো, একটু কম দাম।
কারণ প্রতিটা মেয়ে যে বলে, সে পথ বানায়। আর পথ বানানো মানে নিজে কাঁটায় হাঁটা, যাতে পেছনের মানুষ একটু কম কাঁটায় হাঁটে।
মেহজাবীন বাতি নেভায়। ঘুমায়। কাল সকালে নতুন অফিসে যাবে। নতুন প্রজেক্ট আছে। নতুন মানুষ আছে। নতুন সুযোগ আছে।
আর ফোনে "Receipts" আছে। সবসময় থাকবে। কারণ মেহজাবীন ভুলবে না। কেউ যেন না ভোলে।