বাসের মহিলা আসন

আমাদের জন্য ৩টা আসন। বাকি ৫৭টা তাদের। এটাই সমতা।

পর্ব ৫৬ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সকাল ছয়টা পঁয়তাল্লিশ।

জেসমিন মিরপুর-১০ এর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে মানুষ। শব্দ। ধোঁয়া। সিএনজির হর্ন, রিকশার ঘণ্টা, হকারের চিৎকার। ঢাকা জেগে উঠছে, যেভাবে প্রতিদিন জেগে ওঠে, হঠাৎ করে, একসাথে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়া।

জেসমিনের হাতে একটা ব্যাগ। ব্যাগে টিফিন, পানির বোতল, একটা বই যেটা সে কখনো পড়তে পারে না, আর একটা ওড়না যেটা সে তিনভাবে ব্যবহার করে: মাথায়, মুখে ধুলোর সময়, আর কাঁধে যখন কেউ ঘেঁষে দাঁড়ায়।

বাস আসবে। কখন আসবে কেউ জানে না। সময়সূচি বলে কিছু নেই। বাস আসে যখন আসে। ঢাকার বাস ঈশ্বরের মতো, নিজের ইচ্ছায় আসে, মানুষের প্রার্থনায় না।

জেসমিন দাঁড়িয়ে থাকে। পাশে আরো তিনজন মেয়ে। গার্মেন্টস? না, চেহারায় ক্লান্তি আছে কিন্তু ইউনিফর্ম নেই। হয়তো প্রাইভেট অফিস। হয়তো ব্যাংক। হয়তো জেসমিনের মতোই কোনো জায়গা যেখানে সকাল নয়টায় পৌঁছাতে হয়, আর পৌঁছাতে লাগে দুই ঘণ্টা, কখনো আড়াই।

পুরুষেরা আলাদাভাবে দাঁড়ায়। তারা রাস্তার কাছে দাঁড়ায়, বাস আসলে দৌড়ে ওঠে। মেয়েরা পেছনে দাঁড়ায়। মেয়েরা দৌড়ায় না। দৌড়ালে ওড়না সরে যায়, শরীর দেখা যায়, লোকে তাকায়। তাই মেয়েরা অপেক্ষা করে। পরের বাসের জন্য। তার পরের বাসের জন্য। ধৈর্য মেয়েদের জন্মগত গুণ না, শেখানো হয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শেখানো হয়।

বাস এলো। সবুজ রঙের। গায়ে লেখা "মিরপুর-মতিঝিল।"

জেসমিন জানে এই বাসে ষাটটা আসন। তিনটা "মহিলা আসন।" সামনের দিকে, বাঁ পাশে, তিনটা সিট। কখনো কখনো সিটের ওপরে লেখা থাকে: "এই আসনগুলো মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত।" কখনো কখনো লেখাটা মুছে গেছে।

তিনটা।

ষাটটার মধ্যে তিনটা।

জেসমিন এই অঙ্কটা প্রতিদিন করে। পাঁচ শতাংশ। সে ব্যাংকে কাজ করে, সংখ্যা তার পরিচিত। পাঁচ শতাংশ আসন নারীদের। পঁচানব্বই শতাংশ পুরুষের। ঢাকায় নারী যাত্রীর সংখ্যা কত? জেসমিন জানে না সঠিক সংখ্যা, কিন্তু জানে যে বাসে ওঠা প্রতিটা মেয়েই একই যুদ্ধ লড়ে।

বাস থামল। দরজা খুলল। পুরুষেরা দৌড়ালো। ধাক্কাধাক্কি। চিৎকার। হেল্পার বলল, "পেছন দিয়ে উঠেন, পেছন দিয়ে।"

জেসমিন সামনের দরজায় গেল। মহিলা আসন সামনে। সামনের দরজা দিয়ে উঠতে হয়। কিন্তু সামনের দরজায় পুরুষেরাও উঠছে। একজন জেসমিনের সামনে ঢুকে গেল। আরেকজন পেছন থেকে ধাক্কা দিল। জেসমিন ব্যাগটা বুকের সাথে চেপে ধরল। ওড়নাটা টানটান করল।

উঠল।

তিনটা মহিলা আসনের একটায় বসল। পাশে একজন বয়স্ক মহিলা, হাতে বাজারের ব্যাগ। অন্য আসনে একটা মেয়ে, কানে ইয়ারফোন, চোখ বন্ধ, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। তৃতীয় আসনে একজন পুরুষ বসে আছে। চল্লিশের কাছাকাছি। চোখ মোবাইলে।

জেসমিন কিছু বলল না। বলে লাভ নেই। বললে সে বলবে, "আপনি তো বসেছেন, আমি কি দাঁড়ালে আপনার ক্ষতি?" কিংবা, "মহিলা আসন মানে কী, আসন তো সবার।" কিংবা চুপ করে থাকবে, ফোনে তাকিয়ে, যেন শোনেনি।

জেসমিন শিখে গেছে: মহিলা আসন কাগজে তিনটা, বাস্তবে দুটো, ভিড়ের সময়ে একটা, আর কখনো কখনো শূন্য।

বাস চলতে শুরু করল।

মিরপুর থেকে মতিঝিল। রুট: মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেসক্লাব, মতিঝিল। মানচিত্রে সোজা দেখায়। বাস্তবে সোজা কিছু না। ট্র্যাফিক জ্যাম, ওভারটেক, ব্রেক, হর্ন, আবার জ্যাম।

জেসমিন জানালার পাশে বসেছে। জানালা দিয়ে বাতাস আসছে, সাথে ধুলো আর ধোঁয়া। সে জানালা বন্ধ করতে পারে না, বন্ধ করলে দম বন্ধ হয়ে আসে। খোলা রাখলে চোখ জ্বলে।

পাশে দাঁড়ানো একজন পুরুষ। ব্যাগ কাঁধে। বাসের ঝাঁকুনিতে সে জেসমিনের দিকে হেলে পড়ে। প্রথমবার দুর্ঘটনা মনে হয়। দ্বিতীয়বারও। তৃতীয়বার জেসমিন জানে এটা দুর্ঘটনা না।

জেসমিন কাঁধ শক্ত করে। শরীরটা জানালার দিকে সরিয়ে নেয়। লোকটা আরেকটু এগিয়ে আসে। জেসমিনের কাঁধে তার হাত লেগে থাকে। হালকা, যেন কিছুই হয়নি।

জেসমিন বলতে চায়, "সরেন।" কিন্তু বলে না। বললে কী হবে? বাসভর্তি মানুষ। কেউ কিছু বলবে না। কেউ কেউ তাকাবে। কেউ কেউ ভাববে জেসমিনই বাড়াবাড়ি করছে। "এত ভিড়ে একটু লাগতেই পারে, এত কী!" আর লোকটা বলবে, "আমি কী করেছি? বাসে ঝাঁকুনি লাগছে, আমি কি ইচ্ছা করে লাগাচ্ছি?"

ইচ্ছা আর দুর্ঘটনার মধ্যে মেয়েরা তফাৎ বোঝে। শরীর বোঝে। শরীর জানে কোন স্পর্শ ঝাঁকুনির, কোনটা ইচ্ছাকৃত। কিন্তু সেই জানাটা আদালতে চলে না। বাসে চলে না। সমাজে চলে না।

জেসমিন ব্যাগটা কাঁধ আর জানালার মাঝখানে ঢুকিয়ে দেয়। দেয়াল বানায়। প্রতিদিনের দেয়াল। ব্যাগ, ওড়না, কনুই, শক্ত কাঁধ। এগুলো জেসমিনের অস্ত্র। প্রতিটা মেয়ের নিজস্ব অস্ত্র থাকে বাসে। কেউ সেফটিপিন রাখে। কেউ ব্যাগ বুকে চেপে ধরে। কেউ কনুই শক্ত করে পাশের দিকে রাখে। এগুলো কেউ শেখায় না। মেয়েরা নিজেরা শেখে। প্রথম বাসযাত্রায়, দ্বিতীয়তে, তৃতীয়তে। শেখা শেষ হয় না।

ফার্মগেট। ঢাকার সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। ভিড়। চারদিক থেকে মানুষ উঠছে। বাস ইতিমধ্যে ভর্তি। হেল্পার বলছে, "আরেকটু ভেতরে যান, জায়গা আছে।" জায়গা নেই। কিন্তু মানুষ উঠছে। মানুষ সবসময় ওঠে। ঢাকার বাসে জায়গা না থাকাটা ওঠার প্রতিবন্ধক না।

জেসমিনের চারপাশে এখন শুধু শরীর। সামনে একজনের পিঠ, পেছনে একজনের বুক, ডানে জানালার গ্রিল, বামে একজনের কনুই। জেসমিন আটকে আছে। নড়ার জায়গা নেই। শ্বাস নেওয়ার জায়গা কম।

সে ভাবে, এই বাসে তিরিশজন নারী আছে হয়তো। দাঁড়িয়ে, চেপে, ঠেসে। প্রত্যেকে একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকের শরীরে কোনো না কোনো অবাঞ্ছিত স্পর্শ লেগে আছে। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। সবাই চুপ। চুপ থাকাটা এই শহরে মেয়েদের দ্বিতীয় ভাষা।

জেসমিনের ফোন বাজে। বস। "জেসমিন, নয়টায় মিটিং। তুমি কোথায়?"

"স্যার, বাসে আছি। ফার্মগেটে।"

"তাড়াতাড়ি এসো।"

ফোন কাটা গেল। জেসমিন ঘড়ি দেখে। সাতটা পঁয়ত্রিশ। মতিঝিল এখনো অনেক দূর। ট্র্যাফিক ছাড়বে কবে কেউ জানে না। সে সকাল ছয়টায় বাড়ি থেকে বের হয়েছে। নয়টায় অফিসে পৌঁছাতে পারবে কিনা সন্দেহ।

তিন ঘণ্টা। প্রতিদিন তিন ঘণ্টা যাতায়াতে। যাওয়া দুই ঘণ্টা, ফেরা আরো বেশি। সন্ধ্যায় ভিড় বাড়ে। সন্ধ্যার বাসে অন্ধকার থাকে, কারণ অনেক বাসের ভেতরে লাইট জ্বলে না। অন্ধকারে মেয়েদের শরীর আরো অরক্ষিত। অন্ধকারে হাত আরো সাহসী হয়।

জেসমিন প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা রাস্তায় কাটায়। অফিসে আট ঘণ্টা। ঘুম ছয় ঘণ্টা। বাকি চার ঘণ্টায় রান্না, খাওয়া, গোসল, কাপড় ধোয়া, পরেরদিনের প্রস্তুতি। নিজের জন্য সময়? জেসমিন হাসে। নিজের জন্য সময় পুরুষদের বিলাসিতা।

শাহবাগ পার হলো। প্রেসক্লাব আসছে। ভিড় একটু কমেছে। জেসমিন একটু শ্বাস নিল।

পাশের মেয়েটা, যে কানে ইয়ারফোন দিয়ে বসেছিল, চোখ খুলল। জেসমিনের দিকে তাকাল। একটা চাউনি। সেই চাউনিতে কথা আছে। সেই চাউনিতে লেখা: "আমিও। আমিও একই পথে, একই বাসে, একই অভিজ্ঞতায়।"

জেসমিন ফিরে তাকাল। মুখে কিছু বলল না। কিন্তু চোখ বলল: "জানি।"

এই শহরে মেয়েরা চোখে কথা বলে। বাসে, রাস্তায়, অফিসে। একটা চাউনি যথেষ্ট। একটা মাথা নাড়ানো যথেষ্ট। শব্দের দরকার নেই। যে ভাষায় এত অভিজ্ঞতা জমে আছে, সেই ভাষা নীরব।

বাস মতিঝিল ঢুকলো। জেসমিন নামার প্রস্তুতি নিল। ব্যাগ কাঁধে। ওড়না ঠিক করল। চুল গুছালো। মুখে একটু পানি দিল বোতল থেকে। আয়নায় নিজেকে দেখল না, কারণ আয়না নেই, কিন্তু জানে চোখের নিচে কালি পড়েছে। ক্লান্তির কালি। ছয়টায় ওঠার কালি। ঘুম না হওয়ার কালি।

নামল। ফুটপাত। আরো মানুষ। আরো হাঁটা। অফিস আরো দশ মিনিট হেঁটে। জেসমিন হাঁটে। দ্রুত। মাথা নিচু করে। চোখ সামনে। কাউকে দেখে না, কারণ দেখলে কেউ ফিরে তাকায়, আর ফিরে তাকানো মানে আমন্ত্রণ, এই শহরে মেয়ের চোখে তাকানো মানে আমন্ত্রণ।

অফিসে ঢুকল। লিফটে উঠল। ডেস্কে বসল। কম্পিউটার চালু করল। ঘড়িতে আটটা বেজে পঞ্চান্ন। পাঁচ মিনিট বাকি। সকাল ছয়টা থেকে তিন ঘণ্টার যুদ্ধের পর, জেসমিন পৌঁছে গেছে। ঘামে ভেজা। শরীরে অচেনা স্পর্শের ছাপ। কিন্তু পৌঁছে গেছে। এটাই জয়। ছোট, ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জয়।

সহকর্মী রাকিব বলল, "জেসমিন, আজ তো একটু লেইট হইলা।"

রাকিব গুলশানে থাকে। গাড়ি চালিয়ে আসে। চল্লিশ মিনিট। এসি গাড়ি। গান শুনতে শুনতে। কেউ তার শরীরে হাত দেয় না। কেউ তাকে ঠেলে দেয় না। কেউ তার কাঁধে ঘেঁষে দাঁড়ায় না।

জেসমিন হাসল। "একটু ট্র্যাফিক ছিল।"

ট্র্যাফিক। সব বাসযাত্রার সারসংক্ষেপ একটা শব্দে। ট্র্যাফিক মানে ভিড়, ধাক্কা, স্পর্শ, চুপ থাকা, সহ্য করা, পৌঁছানো। পুরো যুদ্ধটা একটা শব্দে শেষ।

সন্ধ্যা ছয়টা। অফিস শেষ।

জেসমিন আবার বাসস্ট্যান্ডে। মতিঝিল থেকে মিরপুর। একই রুট, উল্টো দিকে। একই ভিড়। একই বাস। একই তিনটা আসন।

সন্ধ্যার বাস সকালের চেয়ে খারাপ। সকালে মানুষ তাড়াহুড়োয় থাকে, অফিসের চিন্তায় থাকে, ভিড়ে থাকলেও একটা উদ্দেশ্য থাকে। সন্ধ্যায় মানুষ ক্লান্ত, বিরক্ত, আর ক্লান্ত মানুষ কম সচেতন। সন্ধ্যায় আলো কম। সন্ধ্যায় ভিড় বেশি। সন্ধ্যায় মেয়েদের কাছে আসার অজুহাত বেশি।

জেসমিন দাঁড়িয়ে আছে। আসন পায়নি। তিনটা মহিলা আসনে তিনজন বসে আছে। বাকি বাসে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই। পুরুষদের পাশে দাঁড়ানো। পুরুষদের ভিড়ে দাঁড়ানো।

জেসমিন হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। হাত ওপরে তুললে শরীরের আকৃতি বোঝা যায়। জেসমিন তাই একহাতে হ্যান্ডেল ধরে, অন্যহাতে ওড়নাটা টেনে বুকের ওপর রাখে। এই ভারসাম্য। এই হিসাব। প্রতি মুহূর্তে।

বাস ব্রেক কষল। জেসমিন সামনে ঝুঁকে পড়ল। পেছনের একজন তাকে ধরল। "সামলান।" শব্দটা যত্নের মতো শোনালো। কিন্তু হাতটা কোমরে ছিল। কোমরে ধরার দরকার ছিল না। কাঁধে ধরলেও হতো। কিন্তু হাত কোমরে গেল। সবসময় কোমরে যায়।

জেসমিন ঝটকা দিয়ে সরে গেল। লোকটা মুখ ফিরিয়ে নিল। কিছু হয়নি। কিছুই হয়নি। ঢাকার বাসে প্রতিদিন কিছুই হয় না। লক্ষ মেয়ের শরীরে লক্ষ অনাহূত স্পর্শ, কিন্তু কিছুই হয় না।

মিরপুর এলো। জেসমিন নামল। রাত আটটা। দুই ঘণ্টা পনেরো মিনিট।

বাড়ি হেঁটে দশ মিনিট। রাস্তায় অন্ধকার। স্ট্রিটলাইট দুটো জ্বলে, তিনটো জ্বলে না। জেসমিন দ্রুত হাঁটে। ফোনটা হাতে রাখে। কাকে কল করবে জানে না, কিন্তু ফোন হাতে থাকলে একটু সাহস হয়।

বাড়ি ঢুকে দরজা বন্ধ করল। নিঃশ্বাস ছাড়ল। প্রতিদিনের এই নিঃশ্বাস। বাড়ি ফেরার নিঃশ্বাস। আজকেও বেঁচে ফিরেছি, পৌঁছে গেছি, কেউ বেশি কিছু করেনি। এই নিঃশ্বাসটা স্বস্তির, কিন্তু এই স্বস্তিটাই অন্যায়। বাড়ি ফেরা স্বস্তির বিষয় হওয়া উচিত না। বাড়ি ফেরা স্বাভাবিক হওয়া উচিত।

জেসমিন কাপড় বদলায়। রান্নাঘরে যায়। ভাত চড়ায়। আয়নায় মুখ দেখে। পঁচিশ বছরের মুখে তিরিশ বছরের ক্লান্তি।

ফোন বাজে। মা। গ্রাম থেকে।

"মা, খেয়েছিস?"

"হ্যাঁ, মা।"

"অফিস কেমন?"

"ভালো।"

জেসমিন বলে না: আজকে বাসে একটা লোক আমার কাঁধে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। আজকে ফার্মগেটে এত ভিড় ছিল যে শ্বাস নিতে পারিনি। আজকে সন্ধ্যায় ফেরার পথে অন্ধকারে একটা লোক পেছন থেকে "মালটা দেখ" বলেছিল। জেসমিন কিছু বলে না। মাকে বলে লাভ নেই। মা চিন্তা করবে। মা বলবে, "ঢাকা ছেড়ে চলে আয়।" কিন্তু গ্রামে চাকরি কোথায়? গ্রামে ব্যাংক কোথায়? গ্রামে জেসমিনের বেতনের সমান কাজ কোথায়?

জেসমিন ঢাকায় থাকে কারণ ঢাকা ছাড়া উপায় নেই। ঢাকায় বাসে চড়ে কারণ বাস ছাড়া উপায় নেই। বাসে সহ্য করে কারণ সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই।

কাল আবার সকাল ছয়টা। আবার বাসস্ট্যান্ড। আবার তিনটা আসন। আবার ষাটটার ভেতর তিনটা।

আমাদের জন্য ৩টা আসন। বাকি ৫৭টা তাদের। এটাই সমতা।

জেসমিন ভাত খায়। একা। টিভিতে খবর চলছে। কেউ নারী অধিকার নিয়ে কথা বলছে। জেসমিন সাউন্ড কমিয়ে দেয়। ওরা কথা বলুক। জেসমিন কাল সকালে আবার বাসে উঠবে। কথা দিয়ে বাসের আসন বাড়ে না। নীতি দিয়ে ভিড় কমে না। আইন দিয়ে হাত থামে না।

জেসমিনের শরীর জানে। প্রতিদিন শেখে। প্রতিদিন ভোলে। ভুলতে হয়। না ভুললে কাল সকালে বাসে উঠতে পারবে না।