রাতের শিফটের নারী

বিপদটা আমার, টাকাটাও আমার। কিন্তু নিরাপত্তা কারো না।

পর্ব ৫৭ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রাত দশটা। তাহমিনা গাড়িতে বসে আছে।

গাড়িটা তার স্বামী রাসেলের। পুরোনো টয়োটা। এসি কাজ করে না, জানালা নামিয়ে রাখতে হয়। রাসেল চালাচ্ছে। চোখে ঘুম, কিন্তু তাহমিনাকে নামিয়ে না দিয়ে ঘুমাতে পারে না। প্রতিদিন রাতে আনা-নেওয়া। দশটায় নামিয়ে দেয়, সকাল ছয়টায় তুলে নেয়। এই রুটিন দুই বছর ধরে।

তাহমিনা কল সেন্টারে কাজ করে। গুলশানে। একটা আন্তর্জাতিক কোম্পানির বাংলাদেশ অফিস। আমেরিকান ক্লায়েন্ট। তাদের দিন, তাহমিনার রাত। তাদের সকাল দশটা মানে বাংলাদেশের রাত দশটা। সময়ের হিসাবটা সোজা। কিন্তু জীবনের হিসাবটা জটিল।

রাসেল বলল, "আজকে তোমার ডিনার?"

"খেয়েছি।"

"কখন আসবে?"

"ছয়টায়। সবসময়ের মতো।"

রাসেল কিছু বলল না। গাড়ি থামল অফিসের সামনে। তাহমিনা নামল। রাসেল অপেক্ষা করল যতক্ষণ না তাহমিনা ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল।

এই অপেক্ষাটা ভালোবাসা। কিন্তু এই অপেক্ষাটা আসলে ভয়। ভালোবাসা আর ভয় এই শহরে একসাথে চলে। তাহমিনাকে ভালোবাসে বলে রাসেল আনে-নেয়। তাহমিনার জন্য ভয় পায় বলেও আনে-নেয়। দুটোকে আলাদা করা যায় না।

অফিসে ঢুকলো তাহমিনা। লিফট, তৃতীয় তলা, কার্ড সোয়াইপ, হেডসেট।

ফ্লোরে চল্লিশজন। রাতের শিফট। এদের মধ্যে বারোজন নারী। বাকি আটাশজন পুরুষ। রাতে মেয়ে কম আসে। কারণ সহজ: রাতে একা আসা যায় না, একা ফেরা যায় না, পরিবার রাজি হয় না, সমাজ মেনে নেয় না।

তাহমিনার বাবা প্রথমে রাজি হননি। "মেয়ে রাতে কাজ করবে? লোকে কী বলবে?" তাহমিনার মা বলেছিলেন, "তাহমিনা তো বিয়ে হয়ে গেছে, স্বামী রাজি হলে আমাদের কী?" বাবা বলেছিলেন, "স্বামী রাজি হলেও, পাড়ার লোক তো কথা বলবে।"

পাড়ার লোক কথা বলেছে। এখনো বলে। "ওই মেয়েটা রাতে কোথায় যায়?" "স্বামী কেমন পুরুষ যে বউকে রাতে বাইরে যেতে দেয়?" "রাতের কাজ, হুম, কী কাজ কে জানে।"

তাহমিনা জানে। তার কাজ ফোন ধরা। হেডসেট পরে বসে থাকা। একের পর এক কল। আমেরিকান ক্রেডিট কার্ড কোম্পানির গ্রাহকদের ফোন। বিলের সমস্যা, কার্ড হারিয়ে গেছে, পেমেন্ট হয়নি, রিওয়ার্ড পয়েন্ট কোথায়। একই প্রশ্ন, একই উত্তর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

কিন্তু তাহমিনা ভালো। খুব ভালো। কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন স্কোর ফ্লোরে সবার ওপরে। ৯৭ শতাংশ। ম্যানেজার বলে, "তাহমিনা, তোমার ভয়েসে একটা শান্তি আছে। গ্রাহকরা তোমার সাথে কথা বলে ভালো ফিল করে।"

শান্তি। তাহমিনা হাসে। শান্তির পেছনে কত অশান্তি। রাত তিনটায় ক্লান্ত চোখে হেডসেট পরে বসে থাকা, রাগী গ্রাহকের গালি শোনা, হাসিমুখে "আমি বুঝতে পারছি আপনার সমস্যাটা" বলা। এটা শান্তি না, এটা প্রশিক্ষণ। তাহমিনা প্রশিক্ষিত। মেয়েরা সবসময় প্রশিক্ষিত: ধৈর্য ধরতে, হাসতে, সহ্য করতে। কল সেন্টার সেই প্রশিক্ষণটাকে পেশায় রূপান্তরিত করেছে।

রাত দুটো। বিরতি। পনেরো মিনিট।

তাহমিনা ব্রেক রুমে গেল। চা নিল। জানালার ধারে দাঁড়ালো। নিচে গুলশানের রাস্তা। ফাঁকা। মাঝে মাঝে একটা গাড়ি যায়। দূরে একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রাতের ঢাকা অন্য ঢাকা। চুপ, অন্ধকার, ভয়ংকর সুন্দর।

তাহমিনা ভাবে, এই শহরটা রাতে তার নয়। দিনে নারীর কিছুটা অধিকার আছে, রাস্তায় হাঁটা যায়, বাসে চড়া যায়, অফিসে যাওয়া যায়। কিন্তু রাত পুরুষের। রাতে রাস্তা পুরুষের। রাতে ফুটপাত পুরুষের। রাতে অন্ধকার পুরুষের। নারীর জন্য রাতে শুধু ঘর। চার দেয়ালের ভেতর। দরজা বন্ধ করে। তালা দিয়ে।

তাহমিনা একা বাসায় ফিরতে পারে না। দুই বছর ধরে একবারও একা আসেনি বা ফেরেনি। একদিন রাসেলের জ্বর ছিল, তাহমিনা অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিল। একদিন গাড়ি নষ্ট হয়েছিল, উবার ডেকেছিল, কিন্তু উবারও রাতে একা মেয়ের জন্য ভরসা না, তাই রাসেল জ্বর নিয়ে উবারে সাথে গিয়েছিল। তাহমিনা বলেছিল, "তুমি থাকো, আমি পারব।" রাসেল বলেছিল, "পারবে। কিন্তু আমি পারব না। পারব না তোমাকে একা পাঠাতে।"

এটা ভালোবাসা? নাকি এটা একটা দেশের ব্যর্থতা?

দুটোই।

পাশের চেয়ারে নাজনীন বসল। নাজনীন রাতের শিফটে নতুন। তিন মাস হয়েছে। "আপা, আপনি কত বছর ধরে রাতে কাজ করেন?"

"দুই বছর।"

"আপনার কি ভয় লাগে?"

তাহমিনা চায়ে চুমুক দিল। "ভয় আর লাগে না। অভ্যাস হয়ে গেছে।" মিথ্যা। ভয় লাগে। প্রতিদিন লাগে। রাত তিনটায় যখন চোখ ভারী হয়ে আসে, যখন ফ্লোরে মানুষ কমে যায়, যখন করিডোরে পায়ের শব্দ হয়, তখন একটা চমক জেগে ওঠে। সেটা ভয় না, সেটা সতর্কতা। মেয়েদের শরীরে একটা অ্যালার্ম বসানো থাকে জন্ম থেকে। সেটা কখনো বন্ধ হয় না।

"নাজনীন, তোমার বাসায় কেউ আনে-নেয়?"

"ভাই আনে। কিন্তু ভাই রাজি না। বলে, 'দিনের কাজ খুঁজো।'"

তাহমিনা মাথা নাড়ল। সবাই একই কথা বলে। দিনে কাজ করো। রাত মেয়েদের জন্য না। কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না, রাতে কেন মেয়েদের জন্য না? রাস্তা কার বানানো? আইন কার? পুলিশ কার? নিরাপত্তা কার দায়িত্ব? মেয়েটার না রাষ্ট্রের?

সকাল ছয়টা। শিফট শেষ।

তাহমিনা হেডসেট খুলল। আট ঘণ্টায় ১১২টা কল নিয়েছে। ৯৭ শতাংশ সন্তুষ্টি। একটা কমপ্লিমেন্ট পেয়েছে কোনো আমেরিকান বৃদ্ধার কাছ থেকে: "You have such a lovely voice, dear."

তাহমিনা হাসল। সেই হাসিটা ক্লান্ত, কিন্তু সত্যি। ভালো লাগে যখন কেউ বলে সে ভালো কাজ করে। এটুকু যথেষ্ট। এটুকুই শক্তি। পরের রাতের জন্য।

রাসেল নিচে অপেক্ষা করছে। গাড়িতে। জানালা খোলা। ঘুমিয়ে পড়েছে সিটে মাথা রেখে। তাহমিনা দরজায় টোকা দিল। রাসেল চমকে উঠল। "এসেছো? চলো।"

গাড়িতে বসলো তাহমিনা। শরীর ভেঙে পড়ছে। রাতভর জেগে থাকা শরীরকে বিভ্রান্ত করে। শরীর জানে না এটা দিন না রাত। ঘড়ি বলে সকাল, কিন্তু শরীর বলে ঘুমাও।

রাসেল বলল, "তাহমিনা, একটা কথা বলব?"

"বলো।"

"তোমাকে প্রমোশন অফার করেছে তো? দিনের শিফটে?"

"হ্যাঁ।"

"নিয়ে নাও।"

তাহমিনা চুপ করে থাকল। হ্যাঁ, প্রমোশন অফার করেছে। টিম লিড। দিনের শিফট। সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। স্বাভাবিক সময়। স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু বেতন কমবে। পনেরো শতাংশ।

রাতের শিফটে ভাতা আছে। নাইট অ্যালাউন্স। কারণ রাতে কাজ করা কঠিন। কারণ রাত বিপজ্জনক। বিপদের দাম আছে, সেটা টাকায় পাওয়া যায়। কিন্তু নিরাপত্তা? সেটার দাম কে দেয়?

তাহমিনা হিসাব করে। রাতের শিফটে চল্লিশ হাজার। দিনে হবে চৌত্রিশ। ছয় হাজার কম। বাড়ি ভাড়া, খাওয়া, রাসেলের গাড়ির তেল, ওষুধ, বাবা-মায়ের জন্য টাকা। ছয় হাজার অনেক। ছয় হাজার একটা মাসের বাজার।

কিন্তু দিনে গেলে রাসেলকে রোজ রাতে জেগে থাকতে হবে না। রাসেলের ঘুম হবে। তাহমিনার ঘুম হবে। দুজনের শরীর স্বাভাবিক হবে। পাড়ার লোক কথা বলা বন্ধ করবে। বাবা চিন্তা করবেন না।

"নিচ্ছি," তাহমিনা বলল।

রাসেল কিছু বলল না। গাড়ি চালাল।

একমাস পরে।

তাহমিনা দিনের শিফটে। সকাল নয়টায় আসে, সন্ধ্যা ছয়টায় যায়। একা আসে। বাসে। একা ফেরে। বাসে। রাসেলের আনা-নেওয়া বন্ধ।

দিনে বাসে ভিড় আছে, ধাক্কা আছে, কিন্তু আলো আছে। আলো একটা ঢাল। অন্ধকারে যা ঘটে আলোতে ঘটে না, বা ঘটলেও প্রমাণ থাকে, সাক্ষী থাকে।

বেতন কমেছে। তাহমিনা কিছু খরচ কাটছে। চা কম খায়। রিকশায় চড়ে না, হাঁটে। নতুন কাপড় কেনেনি তিন মাস। ছয় হাজার টাকা নিরাপত্তার দাম। ছয় হাজার টাকা দিয়ে তাহমিনা কিনেছে একটা স্বাভাবিক জীবন, যেটা পুরুষেরা বিনা পয়সায় পায়।

রাসেল এখন ঘুমায়। পুরো রাত। ক্লান্ত চোখে গাড়ি চালানো বন্ধ। রাসেলের মুখে রং ফিরেছে। তাহমিনা দেখে আর ভাবে, আমার রাতের কাজ শুধু আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, রাসেলকেও করেছে। একটা মেয়ের রাতের অনিরাপত্তা দুটো জীবন নষ্ট করে, মেয়েটার আর তাকে রক্ষা করতে আসা মানুষটার।

অফিসে একদিন ম্যানেজার ডেকে বলল, "তাহমিনা, তোমার পারফরমেন্স একটু ড্রপ করেছে।"

ড্রপ হয়নি। স্কোর ৯৫ শতাংশ। আগে ছিল ৯৭। দুই শতাংশ কমেছে। কারণ দিনের কলগুলো আলাদা। দিনে গ্রাহকরা বেশি তাড়াহুড়োতে থাকে, বেশি রাগী, কম ধৈর্যশীল। রাতে আমেরিকান গ্রাহকরা একটু শান্ত থাকত, সন্ধ্যার ক্লান্তিতে, একটু বেশি মানবিক।

তাহমিনা বলল, "আমি চেষ্টা করব, স্যার।"

সবসময় চেষ্টা। সবসময় আরেকটু ভালো করার চেষ্টা। পুরুষ সহকর্মীরা ৯০ শতাংশে থাকলে কেউ কিছু বলে না। তাহমিনা ৯৫-এ থাকলে বলে, "ড্রপ করেছে।" মেয়েদের মানদণ্ড সবসময় উঁচুতে। কারণ মেয়েদের প্রমাণ করতে হয়, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে, যে তারা এই জায়গার যোগ্য।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে তাহমিনা রান্না করে। দুজনের রান্না। রাসেল আর সে।

রান্না করতে করতে ভাবে। রাতের শিফটে ভাতা পেত ছয় হাজার বেশি। কারণ রাতে কাজ করা বিপজ্জনক। কিন্তু বিপদটা কার? বিপদটা তার। রাস্তায় ফেরার সময়, অফিসের করিডোরে, লিফটে একা, পার্কিংয়ে অন্ধকারে। বিপদটা সবসময় তার। আর টাকাটা? সেটাও তার। কিন্তু নিরাপত্তা? সেটা কারো না।

কোম্পানি গাড়ি দেয় না। ট্রান্সপোর্ট ভাতা দেয়, এক হাজার টাকা, যেটা দিয়ে ঢাকায় মাসে পাঁচদিনও উবারে যাওয়া যায় না। নিরাপত্তা গার্ড আছে অফিসের গেটে, কিন্তু অফিসের বাইরে? রাস্তায়? বাসে? অটোতে? সেখানে তাহমিনা একা। সেখানে সব মেয়ে একা।

রাসেল এসে বলল, "খিদা লেগেছে।"

তাহমিনা হাসল। "দুই মিনিট।"

রাসেল ভালো মানুষ। সত্যিই ভালো। অনেক স্বামী বউকে রাতের কাজ করতে দেয় না। রাসেল দিয়েছে। শুধু দেয়নি, সাথে গিয়েছে, প্রতি রাতে জেগে থেকেছে, গাড়ি চালিয়েছে, অপেক্ষা করেছে। কিন্তু রাসেলকে এটা করতে হওয়াটাই সমস্যা। একটা স্বাভাবিক কাজের জন্য একজন পুরুষকে প্রহরী হতে হয়, এটা কোনো সভ্য ব্যবস্থা না।

তাহমিনা ভাত বাড়ে। দুটো প্লেটে। একটা রাসেলের, একটা তার। খায়। চুপচাপ। টিভিতে কিছু একটা চলছে।

রাতে শোওয়ার আগে তাহমিনা ফোনে ব্যাংক অ্যাপ খোলে। ব্যালেন্স দেখে। আগের মাসের চেয়ে কম। ছয় হাজার কম। সেই ছয় হাজার যেটা সে হারিয়েছে দিনে আসার জন্য। সেই ছয় হাজার যেটা আসলে নিরাপত্তার দাম।

বিপদটা আমার, টাকাটাও আমার। কিন্তু নিরাপত্তা কারো না।

তাহমিনা ফোন রেখে দেয়। চোখ বন্ধ করে। পাশে রাসেল ঘুমাচ্ছে। গভীর ঘুম। এক মাসের জমানো ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাচ্ছে। তাহমিনা শোনে রাসেলের শ্বাসের শব্দ। শান্ত, সমান, নিশ্চিন্ত।

তাহমিনাও ঘুমায়। রাতে। স্বাভাবিক সময়ে। প্রথমবারের মতো দুই বছরে। জানালা দিয়ে চাঁদ দেখা যায়। তাহমিনা ভাবে, চাঁদ সবসময় ছিল, কিন্তু সে দেখেনি। কারণ চাঁদ ওঠে যখন, তখন তাহমিনা হেডসেট পরে ছিল, কল নিচ্ছিল, হাসছিল, "আমি বুঝতে পারছি আপনার সমস্যাটা" বলছিল।

এখন চাঁদ দেখে। ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে। ছয় হাজার টাকায় একটু চাঁদ, একটু ঘুম, একটু নিরাপত্তা। দামটা বেশি না কম, তাহমিনা জানে না। শুধু জানে, এই দাম পুরুষদের দিতে হয় না।