অনলাইন ব্যবসায়ী
যখন ১ টাকাও আসেনি, 'তোমার টাইমপাস'। যখন ৬০ হাজার আসে, 'আমাদের ব্যবসা'।
১
দুই হাজার টাকা।
সানজিদা মনে রাখে। সবকিছুর শুরু দুই হাজার টাকায়। মায়ের কাছ থেকে ধার। "মা, দুই হাজার টাকা দেন। ফেরত দেব।" মা দিয়েছিলেন। কোনো প্রশ্ন না করে। মায়েরা এভাবেই দেয়, চুপচাপ, কারণ তারা জানে মেয়েদের হাতে টাকা কম থাকে, আর যখন চায় তখন সত্যিই দরকার।
সানজিদা সেই দুই হাজার টাকা দিয়ে দশটা হিজাব কিনেছিল। একা গিয়েছিল। ফয়সালকে বলেনি, বললে বারণ করত।
ইসলামপুরের কাপড়ের দোকান থেকে। সাদা, কালো, নেভি, মেরুন, ধূসর। সাধারণ কাপড়। সাধারণ ডিজাইন। কিন্তু সানজিদা কাপড় চেনে। কোন কাপড় ত্বকে নরম, কোনটা ঘামে আঠালো হয় না, কোনটা ধুলে রং যায় না। এই জ্ঞান কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখায় না। এটা মেয়েরা শেখে নিজেরা, কাপড় পরে, ধুয়ে, ভাঁজ করে।
ফেসবুক পেজ খুলল। "হিজাবঘর।" প্রথম পোস্ট: দশটা হিজাবের ছবি, নিজের ফোনে তোলা, বিছানায় সাজিয়ে। ক্যাপশন: "আরামদায়ক হিজাব, মূল্য ২৫০-৩৫০ টাকা। অর্ডার করতে ইনবক্স করুন।"
প্রথম দিন: শূন্য লাইক। শূন্য অর্ডার। সানজিদা ফোন চেক করল বারবার। নোটিফিকেশন নেই। কেউ দেখেনি। কেউ পাত্তা দেয়নি। ফয়সাল জিজ্ঞেস করল, "কেউ কিনেছে?" সানজিদা বলল, "না, আজকেই তো দিলাম।" ফয়সাল হাসল। সেই হাসিতে "তো বলেছিলাম" লেখা ছিল।
দ্বিতীয় দিন: তিনটা লাইক। তিনটাই সানজিদার নিজের আত্মীয়।
তৃতীয় দিন: একটা মেসেজ। "আপা, কালো হিজাবটার কাপড় কী?" সানজিদা উত্তর দিল। বিস্তারিত। কাপড়ের ধরন, পুরুত্ব, ধোয়ার নিয়ম। মেয়েটা অর্ডার করল। একটা হিজাব। তিনশো টাকা।
প্রথম বিক্রি।
সানজিদার হাত কাঁপল। তিনশো টাকা। কিন্তু সেই তিনশো টাকায় একটা প্রমাণ ছিল: কেউ তার জিনিস কিনতে চায়। কেউ তার ওপর ভরসা করেছে। কেউ তাকে ইনবক্সে মেসেজ করে বলেছে, "আমি এটা নিতে চাই।"
সেই রাতে সানজিদা ঘুমায়নি। ফোন ধরে বসে ছিল। পেজে গিয়ে বারবার দেখেছে: ১ অর্ডার। সংখ্যাটা ছোট, কিন্তু সানজিদার কাছে বিশাল।
পরের দিন ডেলিভারি দিল। নিজে প্যাকেট করল। সাদা কাগজে মুড়ে, সেলোটেপ দিয়ে আটকে, ওপরে হাতে লিখে দিল ক্রেতার ঠিকানা। কুরিয়ার অফিসে গেল। পঁয়ষট্টি টাকা খরচ। তিনশো টাকার হিজাবে লাভ একশো বিশ, তার থেকে কুরিয়ার বাদ দিলে পঞ্চান্ন টাকা। পঞ্চান্ন টাকা লাভ। এক কাপ চায়ের দাম।
কিন্তু সেই পঞ্চান্ন টাকা সানজিদার কাছে পৃথিবীর সব টাকার চেয়ে বেশি। কারণ এটা তার। শুধু তার। কারো দেওয়া না, কারো অনুমতিতে আসেনি, কারো অনুগ্রহে আসেনি।
২
স্বামী ফয়সাল তখন কী বলেছিল?
"এটা টাইমপাস।"
ফয়সাল প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। হিসাবরক্ষক। মাসে পঁয়ত্রিশ হাজার। সংসার চলে। বড়লোক না, গরিবও না। মাঝামাঝি। সেই মাঝামাঝি জায়গায় যেখানে প্রতি মাসের শেষে টান পড়ে, কিন্তু অনাহারে থাকতে হয় না। সানজিদা অনার্স পাস। ইংরেজিতে। চাকরি খুঁজেছিল, পায়নি। ইন্টারভিউতে বলত, "আপনি বিবাহিত? বাচ্চা হলে ছুটি নেবেন তো?" সানজিদা ভাবত, পুরুষদেরও তো বাচ্চা হয়, তাদের কেন জিজ্ঞেস করে না?
চাকরি না পেয়ে ঘরে বসে ছিল। ঘরে বসা মানে কাজ নেই, সেটা ভুল। ঘরে বসা মানে বিনা বেতনে কাজ: রান্না, ধোয়া, মোছা, ফয়সালের কাপড় ইস্ত্রি, ফয়সালের মায়ের ফোন ধরা। এসব কাজের কোনো মূল্য নেই। টাকায় না, সম্মানে না।
ফয়সাল সানজিদার ফেসবুক পেজটাকে দেখত যেভাবে বড়রা বাচ্চাদের খেলা দেখে: মুচকি হাসি, একটু আদর, কিন্তু গুরুত্ব শূন্য। "বাচ্চা খেলছে, খেলুক।"
সানজিদা বলত, "ফয়সাল, আমি তো একটা বিজনেস করতে চাই।" ফয়সাল বলত, "তুমি হিজাব বেচবে ফেসবুকে? এটা কোনো বিজনেস? বিজনেস মানে দোকান, পুঁজি, কর্মচারী। ফেসবুকে ছবি দিয়ে হিজাব বেচা এটা টাইমপাস।"
টাইমপাস। শব্দটা সানজিদা গিলে নিয়েছিল। শব্দটা গলায় আটকেছিল, তিতা, শক্ত। কিন্তু সানজিদা কিছু বলেনি। কিছু বলার দরকার নেই। প্রমাণ দেওয়া দরকার। আর প্রমাণ টাকায় আসে। কথায় না।
সেই রাতে সানজিদা বালিশে মুখ চেপে কেঁদেছিল। চুপে চুপে, যেন ফয়সাল না শোনে। কান্নাটা রাগের ছিল না, দুঃখেরও না। কান্নাটা ছিল অপমানের। যে মানুষটা তার সবচেয়ে কাছের, সেই মানুষটা তার স্বপ্নকে "টাইমপাস" বলল। সেই অপমান হাড়ে লেগে থাকে।
৩
ছয় মাস পর।
হিজাবঘরের ফলোয়ার পাঁচ হাজার। অর্ডার প্রতিদিন পাঁচ থেকে আটটা। সানজিদা এখন ইসলামপুর থেকে পাইকারি কেনে। একবারে পঞ্চাশটা, একশোটা। ঘরের একটা কোণা গুদাম হয়ে গেছে। স্তূপ করে রাখা হিজাব, স্কার্ফ, শাল। প্যাকিং করে, কুরিয়ারে দেয়, ট্র্যাকিং নম্বর পাঠায়।
সানজিদা সব একা করে। কেনা, ছবি তোলা, পোস্ট করা, কাস্টমারের মেসেজের উত্তর দেওয়া, প্যাকিং, কুরিয়ার। একটা মানুষ। একটা ফোন। একটা ফেসবুক পেজ। কোনো অফিস নেই, কোনো কর্মচারী নেই, কোনো লোন নেই।
মাসে আসে পনেরো হাজার। খরচ বাদে লাভ দশ হাজার। দশ হাজার টাকা সানজিদার নিজের। ফয়সালের দেওয়া না, বাবার দেওয়া না, কারো দয়া না। নিজের হাতে উপার্জিত।
সেই দশ হাজার টাকা দিয়ে সানজিদা প্রথম কাজ যেটা করল: মায়ের দুই হাজার টাকা ফেরত দিল। মা নিতে চাননি। "রাখ মা, তোর দরকার।" সানজিদা জোর করে দিল। কারণ এটা শুধু টাকা না, এটা প্রমাণ। মা, তুমি যে বিশ্বাস করেছিলে, সেই বিশ্বাসের ফল এটা। দুই হাজার থেকে দশ হাজার। তোমার মেয়ে পেরেছে।
মা কেঁদেছিলেন। চুপে চুপে। সানজিদাও।
ফয়সাল এখন আর "টাইমপাস" বলে না। বলে, "তোমার পেজটা ভালোই চলছে।" স্বীকৃতি? না, পর্যবেক্ষণ। ফয়সাল এখনো মনে করে এটা শখ। শখ যেটা কিছু টাকা আনছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।
৪
এক বছর পর। মাসিক আয় ষাট হাজার।
সানজিদা নিজেও বিশ্বাস করতে পারে না। দুই হাজার টাকার শুরু, এখন ষাট হাজার। ফয়সালের বেতনের প্রায় দ্বিগুণ।
এখন পেজে ফলোয়ার বাইশ হাজার। শুধু হিজাব না, আবায়া, বোরকা, স্কার্ফ, পিন সেট, আন্ডারক্যাপ। সানজিদা পণ্যের সংখ্যা বাড়িয়েছে। কাপড়ের কোয়ালিটি বাড়িয়েছে। কিছু হিজাব সে নিজে ডিজাইন করে, কারখানায় বানায়। নিজস্ব ব্র্যান্ড। নিজস্ব লোগো।
একটা মেয়ে এখন সাহায্য করে। রিমা। পাশের বাড়ির মেয়ে। এইচএসসি পাস। চাকরি পায়নি। সানজিদা তাকে প্যাকিং শেখাল, কুরিয়ার পাঠানো শেখাল। মাসে আট হাজার দেয়। রিমার প্রথম আয়। রিমার মা বললেন, "সানজিদা, তুমি আমার মেয়েকে বাঁচিয়ে দিলে।" সানজিদা ভাবল, কেউ আমাকে বাঁচায়নি, আমি নিজে বেঁচেছি। কিন্তু আমি পারি রিমাকে বাঁচাতে।
ফয়সাল এখন কী বলে?
"আমাদের ব্যবসা।"
সানজিদা প্রথমবার শুনে থমকে গিয়েছিল। আমাদের। কবে থেকে আমাদের? যখন দুই হাজার টাকা নিয়ে ইসলামপুরে গিয়েছিল, তখন কি "আমাদের" ছিল? যখন রাত দুটায় কাস্টমারের মেসেজের উত্তর দিত, তখন? যখন কুরিয়ারের টাকা জমাতে রিকশায় না চড়ে হেঁটে যেত, তখন? যখন একটা হিজাবের রিটার্ন আসত আর সানজিদা নিজের টাকা থেকে রিফান্ড দিত, তখন?
তখন "তোমার টাইমপাস" ছিল। এখন "আমাদের ব্যবসা।"
সানজিদা হাসে। এই হাসিটা তিতা। এই হাসিতে রাগ আছে, কিন্তু বেশি আছে চেনা। সানজিদা চেনে এই প্যাটার্ন। এটা শুধু ফয়সালের না। এটা সব জায়গায়। মেয়ে যখন ব্যর্থ, সেটা মেয়ের একার ব্যর্থতা। মেয়ে যখন সফল, সেটা "আমাদের" সাফল্য। স্বামীর, পরিবারের, সমাজের।
ফয়সাল এখন "পরামর্শ" দেয়। "তুমি কি ওয়েবসাইট বানাবে না? ফেসবুকে থাকলে তো লিমিটেড।" "তুমি কি ইনস্টাগ্রামেও দাও না কেন?" "তুমি কি পেমেন্ট গেটওয়ে যোগ করবে না?"
পরামর্শ ভালো। কিন্তু পরামর্শের সুরটা শোনো। "তুমি কি এটা করো না কেন?" মানে "তুমি কেন এটা এখনো করনি?" মানে "তুমি একটু কম বুঝো, আমি বেশি বুঝি।" ফয়সাল কখনো ফেসবুকে একটা পেজ চালায়নি। কখনো ইসলামপুরে কাপড় দরদাম করেনি। কখনো সন্ধ্যায় পোস্টের ক্যাপশন লিখে মুছে আবার লেখেনি। কিন্তু পরামর্শ দেয়। কারণ সে পুরুষ। পুরুষ মানেই জানে। জানুক বা না জানুক।
সানজিদা একদিন ফয়সালকে বলেছিল, "তুমি একটা পেজ খোলো না কেন? তুমি তো জানো সব।" ফয়সাল বলেছিল, "আমার সময় কোথায়? অফিস করি।" সানজিদাও অফিস করে। সানজিদার অফিস ঘর। সানজিদার অফিস সকাল ছয়টা থেকে রাত বারোটা। রান্না, বাজার, ঘর গোছানো, আর তার ফাঁকে ফাঁকে অর্ডার নেওয়া, প্যাকিং, কুরিয়ার, ক্রেতার সাথে কথা। ফয়সাল অফিসে আটটা থেকে পাঁচটা বসে, বাকি সময় টিভি দেখে। কিন্তু ফয়সালের "সময় নেই।" সানজিদার সময় আছে, কারণ সানজিদা ঘুম কমিয়ে সময় বানায়।
৫
একদিন ফয়সাল বলল, "সানজিদা, আমি একটা প্রপোজাল দেব।"
"বলো।"
"আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তোমার ব্যবসায় ফুলটাইম আসতে চাই।"
সানজিদা চুপ করে থাকল। দীর্ঘ চুপ। ভেতরে অনেক কিছু ঘুরপাক খাচ্ছে।
ফয়সাল বলল, "আমি অ্যাকাউন্টস জানি। ফাইন্যান্স জানি। তোমার ব্যবসা বাড়ছে, তোমার একজন দরকার যে হিসাব রাখবে, ট্যাক্স দেখবে, সাপ্লায়ারদের সাথে নেগোশিয়েট করবে।"
সানজিদা শুনল। ফয়সাল ঠিক বলছে। ব্যবসা বাড়ছে, একার পক্ষে সব সামলানো কঠিন। একজন দরকার। কিন্তু সেই একজন কি ফয়সাল হতে হবে? ফয়সাল এলে ব্যবসাটা কার থাকবে? সানজিদা জানে উত্তরটা। ফয়সাল এলে ব্যবসাটা ফয়সালের হয়ে যাবে। কারণ এই সমাজে পুরুষ যেখানে যায়, মালিকানা তার। পুরুষ যদি রান্নাঘরে ঢোকে, সে "শেফ।" নারী রান্নাঘরে থাকে, সে "গৃহিণী।" একই কাজ, ভিন্ন মর্যাদা।
সানজিদা বলল, "ফয়সাল, তুমি চাকরি ছেড়ো না। আমার দরকার হলে আমি কাউকে হায়ার করব।"
ফয়সালের মুখ শক্ত হলো। "মানে তুমি আমাকে চাও না?"
"চাই। তুমি আমার স্বামী। কিন্তু এই ব্যবসাটা আমার। এটা আমি শুরু করেছি। এটা আমি বড় করব।"
সানজিদা জানে, এই কথাটা বলতে কত সাহস লেগেছে। বাংলাদেশে স্ত্রী স্বামীকে "না" বলে না। স্ত্রী স্বামীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে না। স্ত্রী স্বামীকে "এটা আমার" বলে না। সানজিদা বলেছে। কারণ দুই হাজার টাকা থেকে ষাট হাজার পর্যন্ত পথটা সে একা হেঁটেছে। সেই পথের মালিকানা সে কাউকে দেবে না।
ফয়সাল কিছু বলল না। দুদিন চুপ ছিল। তারপর স্বাভাবিক হয়ে গেল। পুরুষের অভিমান স্বল্পস্থায়ী হয় যখন স্ত্রীর আয় তার দ্বিগুণ।
৬
রাতে সানজিদা হিসাব করে।
খাতায়। হাতে লেখা। ডিজিটাল স্প্রেডশিট আছে, কিন্তু খাতায় লিখতে ভালো লাগে। সংখ্যাগুলো হাতে লিখলে বেশি সত্যি মনে হয়।
মোট বিক্রি: ১,০৮,০০০। খরচ: ৪৮,০০০। লাভ: ৬০,০০০।
ষাট হাজার টাকা। দুই হাজার থেকে ষাট হাজার। দেড় বছরে।
সানজিদা খাতাটা বন্ধ করে। জানালার দিকে তাকায়। বাইরে ঢাকার রাত। দূরে একটা মসজিদের আলো জ্বলছে।
সানজিদা ভাবে, যখন ১ টাকাও আসেনি, তখন "তোমার টাইমপাস।" যখন ৬০ হাজার আসে, তখন "আমাদের ব্যবসা।"
এই "তোমার" থেকে "আমাদের"-এ যাওয়ার পথটা সানজিদা মনে রাখে। সেই পথে কোনো সাহায্য ছিল না ফয়সালের। কোনো উৎসাহ ছিল না। কোনো "তুমি পারবে" ছিল না। ছিল শুধু "টাইমপাস," শুধু মুচকি হাসি, শুধু উদাসীনতা।
কিন্তু সানজিদা রাগ করে না। রাগ অপচয়। রাগে সময় যায়, শক্তি যায়। সানজিদা হিসাব করে। হিসাবটা সোজা: ফয়সাল যা ভাবুক, ব্যবসাটা সানজিদার। ট্রেড লাইসেন্সে তার নাম। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তার নাম। পেজে তার ছবি। কাস্টমাররা তার নাম জানে।
সানজিদা ফোন তুলে নেয়। একটা কাস্টমারের মেসেজ এসেছে। "আপা, নতুন কালেকশন কবে আসবে?" সানজিদা উত্তর দেয়: "আগামী সপ্তাহে, ইনশাআল্লাহ।"
আরেকটা মেসেজ। "আপা, আমি রংপুর থেকে। আপনার পেজ দেখে অর্ডার দিতে চাই। আমিও একটা পেজ খুলতে চাই। কোনো টিপস দিবেন?" সানজিদা থামে। এই মেসেজটা অন্যরকম। এই মেয়েটা শুধু কিনতে চায় না, শিখতে চায়। সানজিদা যেমন শুরু করেছিল, এই মেয়েটাও শুরু করতে চায়। দুই হাজার টাকা দিয়ে। একটা ফেসবুক পেজ দিয়ে। একটা স্বপ্ন দিয়ে।
সানজিদা লেখে: "বোন, শুরু করো। কেউ সাহায্য না করলেও শুরু করো। কেউ বিশ্বাস না করলেও শুরু করো। প্রথম বিক্রিটাই সবচেয়ে কঠিন। তারপর পথ খুলে যায়।"
পাঠিয়ে দিল। ফোন রাখল। ভাবল, ফয়সাল কোনোদিন এই মেসেজটা দেখবে না। দেখলেও বুঝবে না। বুঝবে না কেন একটা অচেনা মেয়ের প্রশ্নে সানজিদার বুক ভরে ওঠে। কারণ সেই মেয়েটা সানজিদা নিজেই, দেড় বছর আগের সানজিদা, যাকে কেউ "তুমি পারবে" বলেনি।
পাশের ঘরে ফয়সাল ঘুমাচ্ছে। তার পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার চাকরি আছে, সেটা দিয়ে সে "উপার্জনক্ষম পুরুষ।" সানজিদার ষাট হাজার টাকার ব্যবসা আছে, সেটা দিয়ে সে "ব্যবসায়ী।" কিন্তু সমাজ ফয়সালকে জিজ্ঞেস করে না "তোমার বউ কেমন ব্যবসা করে?" সমাজ সানজিদাকে জিজ্ঞেস করে, "তোমার স্বামী কী করে?"
ঈদের সময় আত্মীয়রা আসবে। জিজ্ঞেস করবে, "ফয়সালের চাকরি কেমন?" কেউ জিজ্ঞেস করবে না, "সানজিদা, তোমার ব্যবসা কেমন?" কারণ মেয়েদের "ব্যবসা" আত্মীয়দের চোখে এখনো "শখ।" পুরুষ যখন ব্যবসা করে, সেটা "ক্যারিয়ার।" মেয়ে যখন ব্যবসা করে, সেটা "সময় কাটানো।"
সানজিদা হাসে। সেই হাসিতে তিতা আছে, মিষ্টিও আছে। দুই হাজার টাকা থেকে ষাট হাজার। এটা সানজিদার গল্প। শুধু সানজিদার। আর রংপুরের সেই মেয়েটার, যে আজ রাতে হয়তো তার প্রথম পেজ খুলবে, প্রথম ছবি তুলবে, প্রথম ক্যাপশন লিখবে। আর কেউ তাকে বলবে, "এটা টাইমপাস।" সেও গিলে নেবে। সেও চুপ থাকবে। সেও প্রমাণ দেবে। টাকায়।