কবি

আমার কবিতা নিষিদ্ধ। আমার অভিজ্ঞতা সার্বজনীন।

পর্ব ৫৯ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

পাণ্ডুলিপি ফেরত এসেছে।

তাসনিয়া খামটা খুলল। ভেতরে একটা চিঠি। ছাপানো, সই নেই। "প্রিয় লেখক, আপনার পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিষয়বস্তু আমাদের প্রকাশনার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমরা দুঃখিত।"

সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোন বিষয়বস্তু? ঋতুস্রাব? স্তন্যদান? মাতৃত্বের শারীরিক বাস্তবতা? নারীশরীরের সেই অভিজ্ঞতাগুলো যেগুলো অর্ধেক মানবজাতি প্রতিদিন যাপন করে, কিন্তু কাগজে লিখলে "অশ্লীল" হয়ে যায়?

তাসনিয়া চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলে রাখল। চায়ে চুমুক দিল। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু খেয়াল নেই। চিঠির শব্দগুলো মাথায় ঘুরছে।

এই তৃতীয় প্রকাশনী। তিনবার পাঠিয়েছে, তিনবার ফেরত এসেছে। প্রথমবার ফোনে বলেছিল, "আপা, কবিতাগুলো ভালো, কিন্তু বিষয়গুলো একটু..." থামল। "একটু কী?" তাসনিয়া জিজ্ঞেস করেছিল। "একটু সেনসিটিভ।"

সেনসিটিভ। শব্দটা শুনে তাসনিয়া হেসেছিল। তিতা হাসি।

ঋতুস্রাব সেনসিটিভ। প্রতি মাসে কোটি কোটি নারীর শরীরে যা ঘটে, সেটা সেনসিটিভ। কিন্তু পুরুষ কবি যখন "তোমার ঠোঁটে চাঁদ" লেখে, সেটা কাব্যিক। পুরুষ কবি যখন নারীশরীরের বর্ণনা করে, ঠোঁট, কোমর, চুল, সেটা রোমান্টিক। তাসনিয়া যখন নিজের শরীরের অভিজ্ঞতা লেখে, সেটা "সেনসিটিভ।"

দ্বিতীয় প্রকাশনীর সম্পাদক আরো সরাসরি বলেছিলেন। "তাসনিয়া, কবিতায় 'রক্ত' শব্দটা বারবার আসছে। পাঠক অস্বস্তি বোধ করবে।" তাসনিয়া বলেছিল, "স্যার, যুদ্ধের কবিতায় রক্ত থাকলে কেউ অস্বস্তি বোধ করে না। নারীর শরীরের রক্ত কেন আলাদা?" সম্পাদক চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, "ভাবব।" ভাবেননি। পাণ্ডুলিপি ফেরত এসেছে।

তাসনিয়া কবিতা লেখে পনেরো বছর বয়স থেকে।

প্রথম কবিতা ক্লাস নাইনে। স্কুলের দেয়ালিকায়। বিষয়: ফুল। গোলাপ নিয়ে কবিতা। শিক্ষক বলেছিলেন, "সুন্দর।" সবাই বলেছিল, "সুন্দর।" ফুল নিয়ে কবিতা সবসময় সুন্দর। কারণ ফুল নিরাপদ বিষয়। কেউ প্রশ্ন করে না। কেউ বিব্রত হয় না। কেউ বলে না, "এটা কি লেখার বিষয়?" ফুল, চাঁদ, নদী, এগুলো মেয়েদের জন্য অনুমোদিত বিষয়। মেয়েরা ফুল নিয়ে লিখবে, চাঁদ নিয়ে লিখবে, প্রকৃতি নিয়ে লিখবে। এটাই প্রত্যাশা।

তাসনিয়া ফুল নিয়ে লেখা বন্ধ করেছে অনেক আগে। কলেজে ফার্স্ট পিরিয়ড এসেছিল ক্লাসে বসে, সাদা সালোয়ারে দাগ পড়েছিল, পাশের মেয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, "তাসনিয়া, ওঠো না, ওড়নাটা পেছনে দাও।" সেই মুহূর্তের লজ্জা, আতঙ্ক, অসহায়তা। চেয়ারে বসে থাকা, নড়তে না পারা, কারণ উঠলে সবাই দেখবে। ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকা। দশ মিনিট। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ দশ মিনিট। সেটা কোনো ফুলের কবিতায় ধরা যায় না। সেটা ধরতে হলে রক্তের কথা লিখতে হয়। রক্তের রং, গন্ধ, গতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ল তাসনিয়া। চার বছর। সিলেবাসে শতাধিক কবি। মেয়ে কবি? হাতে গোনা। সুফিয়া কামাল আছেন, কিন্তু তাকেও পড়ানো হয় "নারী কবি" হিসেবে, যেন "কবি" তিনি না, "নারী কবি" তিনি। পুরুষ কবিদের আলাদা বিশেষণ লাগে না। তারা শুধু "কবি।"

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ। পুরুষদের কবিতা। পুরুষদের ভাষায় পৃথিবী। রবীন্দ্রনাথের নারী ইথারীয়, স্বপ্নময়ী, ভোরের আলোর মতো। নজরুলের নারী বিদ্রোহিনী, কিন্তু সেই বিদ্রোহও পুরুষের কলমে লেখা। জীবনানন্দের নারী অলৌকিক, "আমি তার ধানসিঁড়িটিকে চিনি না।" কিন্তু ধানসিঁড়ি পারের সেই নারী কী খায়, কখন ঘুমায়, তার পিরিয়ডে ব্যথা হয় কিনা, তার বুকের দুধ কমে গেলে সে কাঁদে কিনা, এসব কেউ লেখেনি। কেউ জিজ্ঞেসও করেনি।

তাসনিয়া লিখতে শুরু করল সেই কবিতা যেগুলো কেউ লেখেনি। ঋতুস্রাবের প্রথম দিনের যন্ত্রণা। গর্ভধারণের অনিশ্চয়তা। স্তন্যদানের ক্লান্তি আর আনন্দ। মেনোপজের নীরব রূপান্তর। নারীশরীর যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষা।

প্রথম কবিতাটা লিখেছিল এক রাতে, হোস্টেলে, পিরিয়ডের ব্যথায় ঘুম আসছিল না। হট ওয়াটার ব্যাগ পেটে চেপে ধরে লিখেছিল। কবিতার প্রতিটা লাইনে সেই ব্যথা ছিল, সেই তাপ ছিল, সেই ক্লান্তি ছিল যেটা প্রতি মাসে আসে, প্রতি মাসে মনে করিয়ে দেয় যে তুমি একটা নারী, তোমার শরীর একটা ছন্দ মানে, সেই ছন্দ সুন্দর, কিন্তু বেদনাদায়ক।

পরের দিন সকালে পড়ে দেখল। ভয় পেল। ছিঁড়ে ফেলতে গেল। ফেলেনি। রেখে দিল। সেই না-ছেঁড়াটাই তাসনিয়ার প্রথম সাহস।

বন্ধুরা বলল, "তাসনিয়া, তুই কী লিখিস!" কেউ কেউ বলল, "ইশ, এগুলো কবিতায় লেখে?" কেউ কেউ চুপ করে পড়ল, তারপর বলল, "এটা তো আমার কথা। এটা তো আমার অভিজ্ঞতা।"

সেই দ্বিতীয় দল তাসনিয়ার পাঠক। যারা নিজেদের শরীরকে কবিতায় দেখে চমকে ওঠে। যারা ভাবে, "কেউ তো লিখেছে, কেউ তো বলেছে।" তারা তাসনিয়ার কবিতা ফটোকপি করে বান্ধবীদের দেয়। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠায়। ডায়েরিতে টুকে রাখে। তারা তাসনিয়ার নাম জানে না সবসময়, কিন্তু তার কথা মনে রাখে। কবিতার কাজ এটাই: নাম মুছে যাক, কথা থাকুক।

প্রথম বই বেরোলো নিজ খরচে।

তাসনিয়া পাঁচশো কপি ছাপল। নিজের টাকায়। বিশ হাজার টাকা। বইয়ের নাম: "শরীরের ভাষা।" প্রচ্ছদে কোনো নারীমূর্তি নেই, শুধু লাল রঙের একটা রেখা, অনির্দিষ্ট, প্রবাহমান।

বইমেলায় একটা ছোট স্টলে রাখল। বন্ধুর স্টল। নিজের স্টল দেওয়ার সামর্থ্য নেই। বন্ধু বলল, "একটা কোণায় রাখো, দেখি কেউ কেনে কিনা।"

প্রথম দিন: চার কপি বিক্রি। দ্বিতীয় দিন: ছয় কপি। তৃতীয় দিন: একটা ঘটনা ঘটল।

একজন মধ্যবয়সী নারী এসে বইটা তুলে নিলেন। পাতা উল্টালেন। একটা কবিতায় থামলেন। পড়লেন। আবার পড়লেন। তারপর তাসনিয়ার দিকে তাকালেন। চোখে পানি।

"এটা কে লিখেছে?"

"আমি।"

"তুমি জানো আমাদের কথা। তুমি জানো।"

সেই মুহূর্তটা তাসনিয়া মনে রাখে। সেই মুহূর্তটা পাঁচশো কপির সবকটার চেয়ে বেশি দামি। একজন মানুষ তার কবিতায় নিজেকে পেয়েছে। একজন মানুষের চোখে পানি এসেছে। এটাই কবিতার কাজ। এটাই সাহিত্যের কাজ। মানুষকে বলা, "তুমি একা নও।"

পাঁচশো কপির দুইশো বিক্রি হলো। তিনশো এখনো তাসনিয়ার ঘরে, খাটের নিচে, বাক্সে ভরা।

তাসনিয়ার বাবা একদিন পেজ উল্টাতে উল্টাতে থামলেন। একটা কবিতা। ঋতুস্রাবের প্রথম দিনের কবিতা। পড়লেন। তারপর বই বন্ধ করলেন। কিছু বলেননি। পরের দিনও বলেননি। এক সপ্তাহ পর বললেন, "তোর কবিতায় সত্য আছে। কিন্তু সত্যটা এমন যে আমি পড়তে পারি না। আমি তোর বাবা।"

তাসনিয়া বুঝল। বাবা অশ্লীল বলেননি। বাজে বলেননি। বলেছেন পড়তে পারেন না। কারণ বাবা হিসেবে মেয়ের ঋতুস্রাবের কবিতা পড়া তার কাছে অস্বস্তিকর। এই অস্বস্তিটাই সমস্যা। এই অস্বস্তিটাই তাসনিয়ার কবিতার বিষয়। যে বাবা মেয়ের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কথা পড়তে পারেন না, সেই বাবা কি মেয়ের শরীরকে সত্যিই মানুষের শরীর মনে করেন? নাকি মনে করেন এটা লুকানোর জিনিস, ঢাকার জিনিস, চুপ থাকার জিনিস?

দ্বিতীয় বই: "রক্ত ও দুধ।"

নামটা শুনে প্রকাশক বলল, "এই নামে বই? মানুষ কিনবে?"

তাসনিয়া বলল, "রক্ত মানে ঋতুস্রাব। দুধ মানে স্তন্যদান। দুটোই নারীশরীরের সবচেয়ে মৌলিক অভিজ্ঞতা। এই নামেই হবে।"

প্রকাশক বলল, "নাম বদলালে বিক্রি বেশি হবে।" তাসনিয়া বলল, "বিক্রির জন্য লিখি না।" সত্যি। তাসনিয়া বিক্রির জন্য লেখে না। লেখে কারণ না লিখলে পারে না। লেখে কারণ ভেতরে যেটা জমে আছে সেটা না বের করলে বুক ফেটে যাবে। কবিতা সানজিদার অক্সিজেন।

এবার একটা ছোট প্রকাশনী রাজি হলো। নতুন, তরুণ সম্পাদক। মেয়ে। সে বলল, "আমি ছাপব। কিন্তু বইমেলায় কিছু স্টল হয়তো রাখবে না।"

ঠিকই বলেছিল। বইমেলায় তিনটা স্টলে পাঠানো হলো। একটা ফেরত পাঠাল। "আমাদের স্টলে এই ধরনের বই রাখি না।" কোন ধরনের বই? যে বই নারীশরীরের কথা বলে? যে বই পিরিয়ডের ব্যথা নিয়ে কবিতা রাখে? যে বই বুকের দুধ শুকিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে লেখে?

তাসনিয়া ফেসবুকে একটা পোস্ট করল। বইয়ের প্রচ্ছদ, আর একটা লাইন: "আমার কবিতা নিষিদ্ধ। আমার অভিজ্ঞতা সার্বজনীন।"

পোস্টটা ভাইরাল হলো। তিন হাজার শেয়ার। মেয়েরা লিখল: "এই বই আমাদের কথা বলে।" "কেন নিষিদ্ধ? কেন আমাদের শরীর লজ্জার?" "তাসনিয়া আপা, লিখতে থাকুন।" একজন লিখল, "আমি মা হয়েছি ছয় মাস আগে। বুকের দুধ আসছিল না। আমাকে সবাই বলেছে আমি ব্যর্থ মা। তোমার কবিতা পড়ে কেঁদেছি। কারণ কেউ প্রথমবার বলেছে, এটা ব্যর্থতা না, এটা শরীরের একটা সত্য।"

সেই মেসেজটা তাসনিয়া স্ক্রিনশট করে রেখেছে। যখন মনে হয় লেখার কোনো মানে নেই, তখন পড়ে।

পুরুষেরাও লিখল। কেউ কেউ সমর্থন করল। কেউ কেউ লিখল: "এগুলো কবিতা না, এগুলো প্রচারণা।" কেউ লিখল: "মেয়েরা এসব পাবলিকে বলে কেন? ব্যক্তিগত বিষয়।"

ব্যক্তিগত। ঋতুস্রাব ব্যক্তিগত। কিন্তু যুদ্ধ পাবলিক। মৃত্যু পাবলিক। রাজনীতি পাবলিক। পুরুষের অভিজ্ঞতা সর্বদা পাবলিক, সর্বদা সাহিত্যযোগ্য, সর্বদা কবিতাযোগ্য। নারীর অভিজ্ঞতা "ব্যক্তিগত," "সেনসিটিভ," "অশ্লীল।"

পুরুষ কবি প্রেম লেখে, মহান। নারী কবি শরীর লেখে, অশ্লীল।

তাসনিয়া এই অসমতাটা একটা কবিতায় লিখল। কবিতার নাম: "দ্বৈত মানদণ্ড।" সেই কবিতাটাও কেউ কেউ "উত্তেজক" বলল।

তাসনিয়ার ঘরে একটা তাক আছে।

সেই তাকে তার দুটো বই। পাশে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ। আর পাশে সুফিয়া কামাল, তসলিমা নাসরিন, কবিতা সিংহ। তাসনিয়া প্রতিদিন সেই তাকের দিকে তাকায়। তার বইদুটো ছোট, পাতলা, পুরুষ কবিদের বইয়ের পাশে প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু আছে। সেটাই যথেষ্ট।

তাসনিয়ার মা একদিন বলেছিলেন, "মা, তুই কী লিখিস বুঝি না। কিন্তু তোকে দেখে ভালো লাগে। তুই লিখিস, এটাই আমার গর্ব।" তারপর একটু চুপ করে বলেছিলেন, "কিন্তু পিরিয়ডের কথা কি লিখতেই হয়? লোকে কী ভাববে?"

লোকে কী ভাববে। আবার সেই ভয়। সেই চিরন্তন ভয়। মেয়েরা কী করবে, কী বলবে, কী পরবে, কী লিখবে, সব নির্ধারণ করে "লোকে কী ভাববে।" সেই "লোক" কে? কোথায় থাকে? কেন তার মতামত এত গুরুত্বপূর্ণ?

তাসনিয়া মাকে বলেছিল, "মা, আমার কবিতা সেই মেয়েটার জন্য যে ক্লাসে বসে পিরিয়ড হলে মরে যেতে চায় লজ্জায়। সেই মায়ের জন্য যে বুকের দুধ কমে গেলে নিজেকে ব্যর্থ মনে করে। সেই নারীর জন্য যে মেনোপজে গিয়ে ভাবে তার জীবন শেষ। আমি তাদের জন্য লিখি। লোকে যা ভাবুক।"

মা কিছু বলেননি। শুধু তাসনিয়ার মাথায় হাত রেখেছিলেন। মায়ের হাত। সব উত্তরের ওপরে।

তাসনিয়া জানে তার মাও একদিন পিরিয়ডে ভুগেছেন। তার নানিও। তার নানির মাও। কিন্তু কেউ সেটা নিয়ে একটা শব্দও বলেনি। কেউ লেখেনি। কেউ স্বীকার করেনি যে এটা কষ্টের, এটা কঠিন, এটা একটা অভিজ্ঞতা যেটার ভাষা থাকা উচিত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নীরবে সহ্য করে গেছে। তাসনিয়া সেই নীরবতা ভাঙতে চায়। একটা কবিতায় একটা করে।

সন্ধ্যায় তাসনিয়া লেখে।

খাতায়। কলমে। প্রথম খসড়া সবসময় হাতে লেখা। তারপর টাইপ করে। কিন্তু প্রথম স্পর্শটা কলমের, কাগজের। কবিতা হাতে জন্মায়, তারপর স্ক্রিনে বড় হয়।

আজকের কবিতা:

একটা মেয়ে প্রথমবার রক্ত দেখে ভয় পায়। তারপর শেখে: এটা তার, এটা স্বাভাবিক, এটা জীবন। কিন্তু পৃথিবী বলে: লুকাও। লুকাও প্যাডটা, লুকাও ব্যথাটা, লুকাও রক্তটা। যেন তুমি রক্তহীন, ব্যথাহীন, শরীরহীন।

তাসনিয়া কলম রাখে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না। দূষণে, আলোতে, ধোঁয়ায় তারা হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাসনিয়া জানে তারা আছে। দেখা না গেলেও আছে।

তার কবিতাও তাই। দেখা যায় না সর্বত্র। বইয়ের দোকানে কম পাওয়া যায়। বইমেলায় সব স্টলে নেই। সমালোচকরা উপেক্ষা করেন। কিন্তু আছে। পাঁচশো কপি। দুইশো পাঠক। দুইশো মানুষ যারা তাসনিয়ার কবিতায় নিজেদের খুঁজে পেয়েছে।

দুইশো যথেষ্ট। কারণ দুইশো থেকে চারশো হবে। চারশো থেকে আটশো। কবিতা ধীরে ছড়ায়। নদীর মতো। নদী দ্রুত যায় না, কিন্তু থামেও না।

তাসনিয়া মাঝে মাঝে ভাবে, তার মেয়ে হলে সে কী শেখাবে। তাসনিয়ার মেয়ে নেই, বিয়ে হয়নি, একটা প্রেম ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, সে-ও শেষ পর্যন্ত বলেছিল, "তুমি তো শুধু কবিতা নিয়ে থাকো, সংসার করবে কবে?" সংসার। সবকিছুর শেষ উত্তর। মেয়ে যা-ই করুক, পড়ুক, লিখুক, আঁকুক, শেষে প্রশ্ন একটাই: "সংসার কবে?"

তাসনিয়া সংসার করেনি। একা থাকে। ছোট ফ্ল্যাট, মিরপুরে, একটা ঘর, একটা রান্নাঘর। বই, খাতা, কলম। এটুকুই তার সংসার। কেউ কেউ বলে, "তাসনিয়ার জীবনটা ফাঁকা।" তাসনিয়া হাসে। ফাঁকা? ফাঁকা মানে কী? স্বামী নেই, তাই ফাঁকা? বাচ্চা নেই, তাই ফাঁকা? নাকি যে জীবনে শব্দ আছে, ভাষা আছে, সৃষ্টি আছে, সেই জীবনও ফাঁকা?

পুরুষ কবি একা থাকলে "নিভৃতচারী।" নারী কবি একা থাকলে "বেচারি।" একই একাকীত্ব, ভিন্ন বিশেষণ।

তাসনিয়া আরেকটা কবিতা লেখে। এই কবিতায় কোনো ফুল নেই, কোনো চাঁদ নেই, কোনো রোমান্টিক প্রকৃতি নেই। এই কবিতায় একটা মেয়ে আছে, তার শরীর আছে, তার অভিজ্ঞতা আছে। সেটুকুই যথেষ্ট। সেটুকুই কবিতা।

রাতে শোওয়ার আগে তাসনিয়া তার দুটো বই তাক থেকে নামায়। হাতে ধরে। ওজন করে, যেভাবে মানুষ সোনা ওজন করে। এই দুটো বই তার সোনা। এই দুটো বইয়ে তার পনেরো বছরের লেখা, পনেরো বছরের দেখা, পনেরো বছরের সহ্য করা জমে আছে।

তাক থেকে একটা চিঠি বের করে। সেই মধ্যবয়সী নারীর চিঠি, যিনি বইমেলায় কেঁদেছিলেন। পরে তিনি তাসনিয়াকে চিঠি লিখেছিলেন: "মেয়ে, তোমার কবিতা পড়ে আমি প্রথমবার বুঝলাম, আমার ব্যথাটা আমার একার না। ধন্যবাদ।"

তাসনিয়া চিঠিটা রাখে। লাইট নেভায়। অন্ধকারে শোয়। কাল আবার লিখবে। কাল আবার কেউ বলবে "অশ্লীল।" কাল আবার কেউ বলবে "সেনসিটিভ।" কিন্তু কাল আবার কেউ কাঁদবে তার কবিতা পড়ে। সেই কান্নাটাই যথেষ্ট। সেই কান্নাটাই প্রমাণ যে তাসনিয়ার কবিতা দরকার। দরকার সেই অর্ধেক মানবজাতির, যাদের অভিজ্ঞতা এতদিন ভাষা পায়নি।