ক্যান্সার যোদ্ধা
ক্যান্সার জিতেছে, আমিও জিতেছি। স্বামী হেরেছে।
১
শাহনাজ আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
প্রতিদিন দাঁড়ায়। এটা অভ্যাস না, এটা অভ্যাস বানিয়েছে। ইচ্ছা করে। জোর করে। কারণ পালিয়ে বেড়ানো সমাধান না। প্রতিদিন সকালে, গোসলের পরে, তোয়ালে সরিয়ে, আয়নায় নিজেকে দেখে। পুরোটা। বাম দিকে স্তন আছে। ডান দিকে নেই। একটা সমতল জায়গা, সেলাইয়ের দাগ, গোলাপি-বাদামি, তির্যক, বুকের ওপর দিয়ে একটা মানচিত্রের মতো।
প্রথম মাসে আয়নায় তাকাতে পারত না। তিন মাস লেগেছে আয়নার সামনে দাঁড়াতে। ছয় মাস লেগেছে তোয়ালে সরাতে। এক বছর লেগেছে দাগটার দিকে সরাসরি তাকাতে।
এখন তাকায়। প্রতিদিন। কারণ এই শরীরটা তার। এই দাগটা তার। এই অসম্পূর্ণতা তার। আর তাসনিয়ার মতো সে বিশ্বাস করে: যা তোমার, সেটার দিকে তাকাও। লুকাও না।
বয়স বিয়াল্লিশ। চুলে এখন একটু পাক ধরেছে, কেমোর পরে নতুন চুলে সাদা মিশেছে। দুই বছর আগে বিয়াল্লিশ ছিল না, চল্লিশ ছিল। চল্লিশে শাহনাজ একটা গোটা মানুষ ছিল। স্বামী ছিল, সংসার ছিল, দুটো বাচ্চা ছিল, চাকরি ছিল, একটা শরীর ছিল যেটা "স্বাভাবিক" ছিল। চল্লিশের পরে সব বদলে গেল। একটা গোটার জন্য।
২
গোটাটা ডান স্তনে। ছোট্ট। প্রায় অনুভব করা যায় না।
শাহনাজ গোসলে টের পেয়েছিল। একটা শক্ত জায়গা। ছোট, মটরশুঁটির মতো। ব্যথা নেই। তাই গুরুত্ব দেয়নি। মেয়েরা নিজেদের শরীরের কত কিছু উপেক্ষা করে। ব্যথা হলে ভাবে, "এমনিতেই সারবে।" গোটা দেখলে ভাবে, "কিছু না।" কারণ ডাক্তারে যাওয়া মানে সময়, টাকা, আর সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া যেটা জিজ্ঞেস করতে ভয় লাগে।
দুই মাস পরে গোটাটা বড় হলো। কাজুবাদামের মতো। এবার ব্যথা আছে, হালকা, যেন কেউ আঙুল দিয়ে চাপ দিচ্ছে ভেতর থেকে। শাহনাজ ডাক্তারে গেল। ম্যামোগ্রাম। বায়োপসি। রিপোর্ট।
রিপোর্টটা একটা কাগজ। সাদা কাগজে কালো অক্ষর। কিন্তু সেই কাগজটা শাহনাজের জীবনকে দুইভাগ করে দিল: রিপোর্টের আগে আর রিপোর্টের পরে। রিপোর্টের আগে শাহনাজ একজন স্বাভাবিক নারী ছিল। রিপোর্টের পরে সে একজন "রোগী" হয়ে গেল। একটা শব্দে পরিচয় বদলে যায়।
ম্যালিগন্যান্ট। ক্যান্সার। স্টেজ টু।
শব্দগুলো কাগজে লেখা, কিন্তু শাহনাজের কানে বাজল বজ্রপাতের মতো।
ডাক্তার বলেছিলেন শান্ত গলায়, যেভাবে ডাক্তাররা বলে, অভ্যস্ত গলায়, "শাহনাজ, ভয়ের কিছু নেই। স্টেজ টু ট্রিটেবল। কিন্তু সার্জারি লাগবে। ম্যাসটেকটমি।"
ম্যাসটেকটমি। স্তন কেটে ফেলা।
শাহনাজ শব্দটা শুনে কিছু বলতে পারেনি। ভেতরে কিছু একটা ধসে পড়েছিল। শরীরের একটা অংশ কেটে ফেলা, এটা শুধু শারীরিক ব্যাপার না। এটা পরিচয়ের ব্যাপার। নারীর স্তন শুধু অঙ্গ না। সমাজ এটাকে নারীত্বের প্রতীক বানিয়েছে। নারীর সৌন্দর্যের মাপকাঠি বানিয়েছে। সেই প্রতীক কেটে ফেলা মানে সমাজের চোখে "অসম্পূর্ণ" হয়ে যাওয়া।
শাহনাজ জানত। অপারেশনের আগেই জানত। কারণ শাহনাজ মেয়ে। মেয়েরা জানে সমাজ তাদের শরীর দিয়ে বিচার করে।
৩
স্বামী নাসিরকে বলল। রাতে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে।
নাসির চুপ হয়ে গেল। দীর্ঘ চুপ। তারপর বলল, "ডাক্তার যা বলে তাই করো।"
অপারেশন হলো। ডান স্তন কেটে ফেলা হলো। কেমোথেরাপি শুরু হলো। চুল পড়ে গেল। শরীর শুকিয়ে গেল। শাহনাজ আয়নায় তাকালে নিজেকে চিনতে পারত না। মাথায় চুল নেই, বুকে একটা অংশ নেই, শরীরে শক্তি নেই। ক্যান্সার শুধু কোষ খায় না, পরিচয়ও খায়।
নাসির প্রথম কয়েক মাস সাথে ছিল। হাসপাতালে নিয়ে যেত। ওষুধ কিনে আনত। রাতে পাশে শুয়ে থাকত। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা দূরত্ব তৈরি হলো। শারীরিক দূরত্ব। নাসির শাহনাজের দিকে আর আগের মতো তাকাত না। শাহনাজ বুঝতে পারত। মেয়েরা বোঝে। চোখের ভাষা পড়তে পারে। নাসিরের চোখে আর আকর্ষণ নেই। সেখানে করুণা আছে, দায়িত্ববোধ আছে, কিন্তু যে তাকানো বলে "তুমি সুন্দর," সেটা নেই।
ছয় মাস পর নাসির বলল।
বসার ঘরে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেছে। রাত এগারোটা। নাসির মেঝেতে বসে, শাহনাজ সোফায়।
"শাহনাজ, আমাকে একটা কথা বলতে হবে।"
শাহনাজ জানত কী আসছে। শরীর জানত। ছয় মাস ধরে আসছে এই মুহূর্তটা।
"তুমি আর আগের মতো নেই।"
আগের মতো নেই। কোন আগের? যে আগে দুটো স্তন ছিল? যে আগে চুল ছিল? যে আগে শরীর "সম্পূর্ণ" ছিল? নাসির কোন শাহনাজকে বিয়ে করেছিল? একটা শরীরকে, নাকি একটা মানুষকে?
শাহনাজ কিছু বলেনি। কিছু বলার ছিল না। যে পুরুষ স্ত্রীর ক্যান্সারের পরে "তুমি আর আগের মতো নেই" বলে, তাকে কী বলবে? কোন যুক্তি? কোন অনুনয়? শাহনাজ চুপ থাকল। চুপ থাকাটাও একটা উত্তর। সবচেয়ে জোরালো উত্তর।
নাসির চলে গেল। তালাক দিল। বাচ্চাদের রেখে গেল। শাহনাজের কাছে। কারণ বাচ্চা মায়ের কাছে থাকে, এটা নিয়ম। বাচ্চা, সংসার, দায়িত্ব, সব মায়ের। পুরুষ শুধু থাকে যখন সুবিধা থাকে। সুবিধা শেষ, পুরুষ শেষ।
তালাকের কাগজে সই করার দিন শাহনাজের হাত কাঁপেনি। কলম ধরল, সই করল, কাগজ ফেরত দিল। নাসির অবাক হয়েছিল হয়তো। হয়তো ভেবেছিল শাহনাজ কাঁদবে, ধরবে, "যেও না" বলবে। শাহনাজ কিছু বলেনি। যে শরীর ক্যান্সারের অপারেশন সহ্য করেছে, সেই শরীর একটা কাগজে সই করতে পারবে না?
৪
কেমোথেরাপির শেষ সাইকেল।
ডাক্তার বলেছিলেন, "শাহনাজ, তোমার রেসপন্স খুব ভালো। ক্যান্সার কমছে। আমরা আশাবাদী।"
আশাবাদী। শাহনাজ শব্দটা চিবাল। আশা। চল্লিশ বছরের একজন নারী, যার একটা স্তন নেই, যার স্বামী নেই, যার চুল নেই, যার শরীরে বিষ ঢোকানো হচ্ছে ক্যান্সার মারতে, সেই নারীর কাছে আশা মানে কী?
আশা মানে বেঁচে থাকা। সেটুকুই। বাচ্চাদের মুখ দেখা। মেয়ে আয়েশার স্কুলে যাওয়া দেখা। ছেলে সজীবের ক্রিকেট খেলা দেখা। সেটুকু। বেশি কিছু না।
শাহনাজ বেঁচে থাকার জন্য লড়ল। প্রতিটা কেমোর পর বমি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথরুমে কাটানো। মুখে কিছু রাখতে না পারা। পানি খেলেও বমি। প্রতিটা রাতে শরীরে আগুন, প্রতিটা সকালে বালিশে চুল, প্রতিটা আয়নায় একটা অচেনা মুখ। কিন্তু লড়ল। কারণ বিকল্প কী? না লড়ে হার মানা? শাহনাজ হার মানে না। ক্যান্সার তাকে শিখিয়েছে: তুমি যা হারাতে পারো তা অনেক, কিন্তু তুমি যা তুমি সেটা কেউ নিতে পারে না।
সমাজ পিটি করল। পাড়ার লোক বলল, "বেচারি শাহনাজ। স্বামীও চলে গেল।" "বেচারি" শব্দটায় করুণা আছে, কিন্তু আরো বেশি আছে "ভালো হলো আমি না।" মানুষ অন্যের দুঃখে দুঃখিত হয়, কিন্তু চুপে চুপে স্বস্তিও পায়, যে এটা তার সাথে হয়নি।
শাহনাজের মা এসে থাকলেন। রান্না করলেন, বাচ্চা সামলালেন, শাহনাজের মাথায় তেল দিলেন যখন চুল ছিল না। মা কিছু বলেননি। মায়ের কিছু বলার দরকার নেই। মায়ের থাকাটাই বলা।
নাসিরের মা একবার এসেছিলেন। শাহনাজকে দেখে বলেছিলেন, "মা, নাসিরকে দোষ দিও না। ছেলেমানুষ, সহ্য করতে পারেনি।" ছেলেমানুষ। আটত্রিশ বছরের "ছেলেমানুষ।" শাহনাজ কিছু বলেনি। কিন্তু ভেবেছে: শাশুড়ি নিজেও নারী। নিজেও জানেন নারীর শরীর কী সহ্য করে। তবু ছেলের পক্ষে দাঁড়ান। কারণ এই সমাজে মায়েরাও পুত্রের পক্ষে। পুত্রের ভুলকে "সহ্য করতে না পারা" বলে ক্ষমা করে দেন। স্ত্রীর কষ্টকে "ভাগ্য" বলে মেনে নিতে বলেন।
শাহনাজ মেনে নেয়নি। মেনে নেওয়া বন্ধ করেছে। ক্যান্সার তাকে সেটাও শিখিয়েছে: মেনে নেওয়ার একটা সীমা আছে। সেই সীমার পরে শুরু হয় বেঁচে থাকা। নিজের শর্তে।
৫
এক বছর পর। ক্যান্সার মুক্ত।
ডাক্তার বলেছিলেন, "শাহনাজ, তোমার সব রিপোর্ট ক্লিয়ার। কোনো ক্যান্সার কোষ নেই। তুমি জিতেছ।"
জিতেছ। একটা শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে এক বছরের ইতিহাস। ছয়টা কেমো সাইকেল। প্রতিটায় তিন সপ্তাহের বিরতি। প্রতিটা সাইকেলের পরে শরীর একটু আরেকটু ভেঙে পড়ত, আর তারপর আবার উঠে দাঁড়াত। একটা ম্যাসটেকটমি। একটা তালাক। অগণিত "বেচারি।" আর এখন, "জিতেছ।"
শাহনাজ ডাক্তারের চেম্বারে বসে কাঁদল। প্রথমবার কাঁদল ক্যান্সার ধরা পড়ার পর থেকে। সব কান্না জমিয়ে রেখেছিল। অপারেশনের রাতে কাঁদেনি। কেমোর সময় কাঁদেনি। নাসির চলে যাওয়ার রাতে কাঁদেনি। চুল পড়ে যাওয়ার সময় কাঁদেনি। কিন্তু "তুমি জিতেছ" শুনে কাঁদল। কারণ জেতার পরে কাঁদা যায়। জেতার পরে দুর্বল হওয়া যায়। যুদ্ধের মাঝখানে কাঁদলে হেরে যেতে হয়।
শাহনাজ বাড়ি ফিরল। আয়নার সামনে দাঁড়াল। এবার দাগটার দিকে তাকাল। দাগটা শুকিয়ে গেছে। গোলাপি থেকে হালকা বাদামি হয়েছে। চুল ফিরে আসছে, ছোট ছোট, ঘন, আগের চেয়ে কোঁকড়া। শরীর পাতলা, কিন্তু শক্ত। কেমোর বিষ শরীর থেকে বের হচ্ছে। শরীর নিজেকে সারাচ্ছে। শরীর সবসময় নিজেকে সারায়। এটাই শরীরের কাজ।
শাহনাজ ভাবল তিনটা যুদ্ধের কথা।
প্রথম: ক্যান্সার। শরীরের ভেতরের শত্রু। দেখা যায় না, কিন্তু মারে। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়েছে অস্ত্রোপচার, কেমো, ওষুধ, ইচ্ছাশক্তি দিয়ে। জিতেছে।
দ্বিতীয়: নাসির। যে পুরুষ ভালোবাসার কথা বলে বিয়ে করেছিল, যে পুরুষ "সুখে-দুঃখে" বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই পুরুষ দুঃখে পালিয়েছে। নাসির শাহনাজের একটা স্তন হারানো সহ্য করতে পারেনি। কিন্তু শাহনাজ নাসিরকে হারানো সহ্য করেছে। কে বেশি শক্তিশালী?
তৃতীয়: সমাজ। সমাজের দয়া, সমাজের করুণা, সমাজের "বেচারি।" সমাজ শাহনাজকে একটা গল্প বানিয়েছে: "স্বামীহারা ক্যান্সার রোগী।" শাহনাজ সেই গল্প মানে না। শাহনাজের গল্প সে নিজে লেখে: "ক্যান্সার জয়ী, একক মা, জীবিত।"
৬
দুই বছর পরে। আজকে।
শাহনাজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। এটা অভ্যাস এখন। ভালো অভ্যাস। দাগটা দেখে। দাগটা এখন শরীরের অংশ, যেমন হাত, পা, চোখ। আলাদা কিছু না। শুধু একটা চিহ্ন যে শাহনাজ একটা যুদ্ধ করেছে এবং জিতেছে।
চুল ফিরে এসেছে। ছোট, কোঁকড়া, ঘন। শাহনাজ ছোট চুলই রাখে এখন। আগে লম্বা ছিল, কোমর পর্যন্ত। নাসির পছন্দ করত। এখন নাসির নেই, লম্বা চুলের দরকার নেই। ছোট চুলে শাহনাজ নিজেকে নতুন করে চেনে। এই চুল ক্যান্সারের পরের চুল। এই চুল নতুন শাহনাজের চুল।
অফিসে ফিরেছে। একই ব্যাংক, একই ডেস্ক। সহকর্মীরা প্রথমে জানত না কী বলবে। কেউ বলল, "ভালো হয়ে গেছ?" কেউ বলল, "তুমি তো আগের মতোই দেখাচ্ছ।" মিথ্যা, কিন্তু সদিচ্ছার মিথ্যা। শাহনাজ আগের মতো দেখায় না। কিন্তু আগের চেয়ে শক্ত দেখায়। চোখে একটা গভীরতা আছে যেটা আগে ছিল না। মৃত্যুর কাছে গিয়ে ফেরত আসা মানুষের চোখে একটা আলাদা আলো থাকে। সেই আলো ভয় থেকে আসে না, ভয়কে জয় করা থেকে আসে।
বাচ্চারা স্কুলে গেছে। আয়েশা ক্লাস সেভেন, সজীব ক্লাস ফোর। আয়েশা জানে মায়ের ক্যান্সার হয়েছিল। জানে বাবা চলে গেছে। কিন্তু আয়েশা তার মাকে "বেচারি" ভাবে না। আয়েশা তার মাকে "সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ" ভাবে। একদিন স্কুলে রচনা লিখতে হয়েছিল: "আমার আদর্শ।" আয়েশা লিখেছিল তার মায়ের কথা।
সজীব ছোট, সবটা বোঝে না। কিন্তু জানে, মা একটু আলাদা। মায়ের বুকে একটা দাগ আছে। একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "মা, এটা কীসের দাগ?" শাহনাজ বলেছিল, "এটা সাহসের দাগ। মা একটা যুদ্ধ করেছিল, এটা সেই যুদ্ধের চিহ্ন।" সজীব বলেছিল, "তুমি কি জিতেছ?" শাহনাজ বলেছিল, "হ্যাঁ।"
শাহনাজ এখন একটা ক্যান্সার সাপোর্ট গ্রুপে কাজ করে। সপ্তাহে একদিন। অন্য নারীদের সাথে কথা বলে যারা ক্যান্সারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। যাদের ভয় লাগছে। যাদের স্বামী চলে যাচ্ছে বা যাওয়ার কথা বলছে। যারা আয়নায় তাকাতে পারছে না।
শাহনাজ তাদের বলে, "তোমার শরীরের একটা অংশ গেছে। কিন্তু তুমি পুরো আছো। তুমি তোমার স্তন না। তুমি তোমার চুল না। তুমি তুমি।"
কেউ কেউ কাঁদে। কেউ কেউ মাথা নাড়ে। কেউ কেউ বিশ্বাস করে, কেউ করে না। কিন্তু শাহনাজ বলে। বলতে থাকে। কারণ কেউ তাকে বলেনি যখন তার দরকার ছিল। কেউ বলেনি, "শাহনাজ, তুমি এখনো তুমি।" কেউ বলেনি, "দাগটা যুদ্ধের চিহ্ন, লজ্জার না।"
গতকাল একজন নতুন মেয়ে এসেছিল গ্রুপে। বত্রিশ বছর। স্তন ক্যান্সার ধরা পড়েছে। স্বামী এখনো আছে, কিন্তু মেয়েটা বলল, "আপা, আমি দেখছি ওর চোখ বদলে যাচ্ছে।" শাহনাজ চিনল সেই চোখ। নাসিরের চোখ। সেই চোখ যেটা ধীরে ধীরে আকর্ষণ হারায়, ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, ধীরে ধীরে "তুমি আর আগের মতো নেই" বলার প্রস্তুতি নেয়।
শাহনাজ বলল, "তুমি তৈরি থাকো। যদি সে থাকে, ভালো। যদি না থাকে, তাও ভালো। তুমি তোমার নিজের জন্য বাঁচো। অন্য কারো জন্য না।"
মেয়েটা কাঁদল। শাহনাজ কাঁদল না। শাহনাজের কান্না শেষ হয়ে গেছে ডাক্তারের চেম্বারে, সেই দিন, যেদিন শুনেছিল "তুমি জিতেছ।" সব কান্না সেদিন বেরিয়ে গেছে। এখন শুধু শক্তি আছে।
নাসির মাঝে মাঝে ফোন করে। বাচ্চাদের সাথে কথা বলে। শাহনাজের সাথে বলে না। শাহনাজ ফোনটা বাচ্চাদের হাতে দিয়ে অন্য ঘরে চলে যায়। নাসিরের গলা শুনলে কিছু হয় না, ব্যথা হয় না, রাগ হয় না। শূন্যতা আসে। সেটাই সবচেয়ে সৎ অনুভূতি। যে মানুষ তোমাকে সবচেয়ে দুর্বল সময়ে ছেড়ে যায়, তার জন্য রাগও অপচয়।
সন্ধ্যায় বাচ্চারা ফিরলে শাহনাজ রান্না করে। তিনজনের রান্না। আগে চারজনের ছিল। এখন তিনজনের। হাঁড়ি ছোট হয়েছে, কিন্তু রান্নাটা ভালো হয়েছে। কারণ শাহনাজ এখন নিজের জন্যও রান্না করে। আগে সবার পরে খেত, এখন সাথে খায়। আগে নিজেকে শেষে রাখত, এখন নিজেকেও গোনে।
রাতে শোয়ার আগে আয়নায় তাকায়। শেষবার। দাগটা দেখে। হাসে।
ক্যান্সার আমার এক স্তন নিয়েছে। আমার স্বামী আমার আত্মবিশ্বাস নিতে চেয়েছিল। ক্যান্সার জিতেছে, আমিও জিতেছি। স্বামী হেরেছে।
শাহনাজ লাইট নেভায়। অন্ধকারে শোয়। বিছানার পুরোটা তার। ডান পাশ, বাম পাশ, মাঝখান। কেউ নেই পাশে। কিন্তু শাহনাজ একা না। পাশের ঘরে দুটো বাচ্চা ঘুমাচ্ছে। তাদের শ্বাসের শব্দ দেয়ালের ওপাশ থেকে আসে। হালকা, সমান, জীবিত।
শাহনাজ চোখ বন্ধ করে। ভাবে, চল্লিশ বছর বেঁচে ছিল একরকম। এখন বিয়াল্লিশে বেঁচে আছে অন্যরকম। আগে বেঁচে থাকাটা স্বাভাবিক ছিল, খেয়াল করত না। এখন বেঁচে থাকাটা সচেতন, প্রতিটা দিন জেনেশুনে গ্রহণ করা। সকালে চোখ খুললে প্রথম ভাবনা: আমি আছি। এটুকুই শুরু। এটুকু দিয়েই সারাদিন চলে।
আয়েশা বড় হচ্ছে। একদিন আয়েশাকেও কেউ বলবে, "তুমি সুন্দর না হলে তোমার মূল্য নেই।" কেউ বলবে, "তোমার শরীরই তোমার পরিচয়।" শাহনাজ চায় আয়েশা সেদিন হাসুক। সেদিন বলুক, "আমার মা একটা স্তন ছাড়া পুরো পৃথিবী জিতেছে। আমি আমার পুরো শরীর নিয়ে কী করতে পারি ভাবো।"
শাহনাজ ঘুমায়। গভীর ঘুম। ভয়হীন। যে মানুষ ক্যান্সারকে হারিয়েছে, সে আর কিসে ভয় পাবে?