প্রথম প্রজন্মের গ্র্যাজুয়েট
এই কাগজটার জন্য আমি ৪ বছর লড়েছি
১
সাথীর বাবার নাম আনোয়ার।
আনোয়ার রিকশা চালায়। চল্লিশ বছর ধরে। মিরপুর থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট থেকে শাহবাগ, শাহবাগ থেকে মতিঝিল। একই রাস্তা। একই চাকা। একই ঘাম। রিকশার সিটে বসা মানুষগুলো বদলায়, কিন্তু আনোয়ার বদলায় না। তার পা একইভাবে চাপে, তার পিঠ একইভাবে বাঁকে, তার শ্বাস একইভাবে ওঠানামা করে।
আনোয়ারের হাত দুটো রিকশার হ্যান্ডেলের সাথে একাকার হয়ে গেছে। আঙুলের গিঁটগুলো স্থায়ীভাবে বাঁকা। তালুতে চামড়া এত মোটা হয়ে গেছে যে সুই ফুটলেও টের পায় না। এই হাত দিয়ে আনোয়ার রিকশা চালিয়েছে, এই হাত দিয়ে সংসার চালিয়েছে, এই হাত দিয়ে মেয়ের বইয়ের পাতা উল্টেছে, যদিও অক্ষর চেনে না।
সাথী যেদিন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, আনোয়ার সেদিন দুপুরে রিকশা রেখে দিয়ে বাসায় এসেছিল। ভাড়া হারিয়েছে। কিন্তু মেয়ের মুখ দেখতে চেয়েছিল। সাথী জিজ্ঞেস করেছিল, "বাবা, রিকশা রেখে কেন?" আনোয়ার বলেছিল, "আজকে আমার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছে। আজকে রিকশা চালানোর দিন না।"
সেই মুহূর্তটা সাথী ভোলেনি। সেটা ভোলা সম্ভব না।
২
সাথীর পরিবারে কেউ কোনোদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি।
দাদা ছিলেন কৃষক, ভোলার চরে ধান ফলাতেন। দাদি কখনো স্কুলের দরজাও দেখেননি। বাবা আনোয়ার ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে, তারপর পরিবার ঢাকায় এসেছে, ক্ষুধা পেটে রিকশায় উঠেছে। মা রোকেয়া ক্লাস থ্রি পাস। গার্মেন্টসে কাজ করতেন, এখন চোখ খারাপ হয়ে গেছে, সেলাই করতে পারেন না। বড় ভাই সোহেল এসএসসি ফেল করে অটোরিকশা চালায়।
সাথী প্রথম। সব কিছুতে প্রথম।
প্রথম যে মেয়ে এই পরিবার থেকে এসএসসি পাস করেছে। প্রথম যে মেয়ে এইচএসসি পাস করেছে। প্রথম যে মেয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। প্রথম যে মেয়ে অনার্স পড়েছে। এবং এখন, প্রথম যে মানুষ, মেয়ে বা ছেলে, এই পরিবার থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছে।
প্রথম হওয়া মানে পথ নেই। প্রথম হওয়া মানে কেউ দেখিয়ে দেয়নি কোন দিকে যেতে হবে, কোন ফর্ম পূরণ করতে হবে, কোন লাইনে দাঁড়াতে হবে। প্রথম হওয়া মানে প্রতিটা পদক্ষেপ অন্ধকারে। প্রতিটা সিদ্ধান্ত একা।
ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে সাথী কেঁদে ফেলেছিল। বাবার পেশা লিখতে হয়েছিল। "রিকশাচালক" লেখার সময় হাতটা কেঁপেছিল। লজ্জায় না। ব্যথায়। বাবা সারাজীবন রিকশা চালিয়েছে যাতে মেয়ে একটা ফর্মে "রিকশাচালক" লিখতে পারে, আর সেই ফর্মটা তাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে রিকশাচালকের মেয়ে যায় না।
৩
চার বছর।
প্রথম বছর সবচেয়ে কঠিন ছিল। ক্লাসের মেয়েরা অন্য জগতের। তাদের বাবারা সরকারি চাকরি করে, ব্যবসা করে, গাড়ি চালায়। তারা ল্যাপটপ নিয়ে আসে। স্মার্টফোনে নোট নেয়। ক্যান্টিনে বার্গার খায়। ইংরেজিতে কথা বলে, এমনকি নিজেদের মধ্যেও।
সাথীর কাছে একটা বোতামফোন ছিল। নোট নিত সস্তা খাতায়, কলম দিয়ে। ক্যান্টিনে যেত না, বাসা থেকে ভাত-ডাল আনত টিফিন ক্যারিয়ারে। ইংরেজি বুঝত, কিন্তু বলতে গেলে জিভ আটকে যেত।
একদিন প্রেজেন্টেশনে একটা মেয়ে হেসেছিল। সাথীর উচ্চারণ শুনে। "রুরাল একসেন্ট" বলেছিল, মুখ ঘুরিয়ে, কিন্তু যথেষ্ট জোরে যাতে সাথী শুনতে পায়।
সাথী সেদিন রাতে কাঁদেনি। কাঁদলে সময় নষ্ট হয়। সময় নষ্ট করার সুযোগ তার নেই। সে সেই রাতে ইংরেজি প্র্যাকটিস করেছিল। ইউটিউবে ভিডিও দেখে দেখে। বাবার পুরনো ফোনে, স্ক্রিন ভাঙা, ধীরগতির ইন্টারনেটে। তিন ঘণ্টা।
পরের প্রেজেন্টেশনে কেউ হাসেনি।
৪
দ্বিতীয় বছরে টিউশনি শুরু করেছিল।
পড়ার খরচ জোগাড় করতে হতো। বাবা রিকশা চালিয়ে যা আনে তাতে সংসার চলে কোনোমতে। সাথীর বই, ফটোকপি, পরীক্ষার ফি, এগুলোর জন্য আলাদা টাকা নেই। বৃত্তি পেয়েছিল একটা, কিন্তু সেটা দিয়ে অর্ধেকও হয় না।
সকাল সাতটায় ক্লাস। বিকেল চারটায় শেষ। পাঁচটায় টিউশনি, মিরপুরের এক বাসায়, দুটো বাচ্চাকে ইংরেজি পড়ানো। সাতটায় আরেক বাসায়, একটা ছেলেকে গণিত। রাত নটায় বাসায় ফেরা। তারপর নিজের পড়া। রাত দুটা পর্যন্ত।
ঘুম চার ঘণ্টা। কখনো তিন। কখনো আড়াই।
তৃতীয় বছরে শরীর ভেঙে পড়েছিল। জন্ডিস। দুই সপ্তাহ বিছানায়। বাবা আনোয়ার সেই দুই সপ্তাহ অতিরিক্ত শিফট চালিয়েছে, রাত দশটা পর্যন্ত। বাষট্টি বছরের শরীরে, রাতের ঠাণ্ডায়, রিকশার প্যাডেলে পা রেখে। যাতে মেয়ের ওষুধের টাকা হয়।
সাথী জানত। চোখ বুজে শুয়ে শুনত বাবা রাতে ফিরে আসত, দরজা খুলত, জুতো খুলত, পা ধুত। পায়ের ছপছপ শব্দ। সেই শব্দটা সাথীর মনে আছে। সেই শব্দটাই তাকে পরীক্ষার হলে বসিয়ে রাখত। যখন মনে হতো আর পারছি না, তখন সেই ছপছপ শব্দ মনে পড়ত। বাবার ক্লান্ত পায়ের শব্দ। সেই শব্দের উত্তর দিতে হবে। সেই শব্দের ঋণ শোধ করতে হবে।
৫
চতুর্থ বছর। ফাইনাল পরীক্ষা।
সাথীর পরীক্ষার আগের রাতে মা রোকেয়া ঘুমায়নি। কিচেনে বসে ছিল, চা বানিয়েছিল মেয়ের জন্য, বারবার। প্রতি ঘণ্টায় একবার। সাথী বলেছিল, "মা, ঘুমাও।" রোকেয়া বলেছিল, "তুই পড়, আমি আছি।"
আমি আছি। এই কথাটা রোকেয়া সারাজীবন বলেছে। মেয়ে যখন ক্লাস সিক্সে প্রথম পিরিয়ড হয়েছিল আর ভয়ে কাঁপছিল, রোকেয়া বলেছিল, "আমি আছি।" মেয়ে যখন এইচএসসি পরীক্ষায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, রোকেয়া বলেছিল, "আমি আছি।" মেয়ে যখন ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পেলে কী হবে ভেবে কাঁদত, রোকেয়া বলেছিল, "আমি আছি।"
রোকেয়ার "আমি আছি" কোনো প্রতিশ্রুতি না। এটা একটা সত্য। মা আছে। ব্যাস। এর বেশি কিছু দরকার নেই।
ফাইনাল পরীক্ষা ভালো হয়েছিল। প্রথম শ্রেণি। মেধাতালিকায় নাম।
রেজাল্টের দিন সাথী একা একা ফোনে দেখেছিল। লাইব্রেরিতে বসে। স্ক্রিনে নিজের নাম দেখে কিছুক্ষণ কিছু বুঝতে পারেনি। তারপর হাত কাঁপতে শুরু করেছিল। পুরো শরীর কাঁপছিল। পাশের ছেলেটা ভেবেছিল অসুস্থ হয়ে গেছে।
সাথী অসুস্থ হয়নি। সাথী মুক্ত হচ্ছিল। চার বছরের চাপ, চার বছরের ঘুমহীনতা, চার বছরের লড়াই, সব একসাথে শরীর থেকে বের হচ্ছিল। কাঁপুনি দিয়ে।
৬
গ্র্যাজুয়েশন দিন।
সাথী গাউন পরেছে। কালো গাউন, মাথায় টুপি। আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতে পারেনি। এই মেয়ে কে? এই মেয়ে সেই মেয়ে যে মিরপুরের একটা টিনের ঘরে জন্মেছিল? সেই মেয়ে যে বাবার রিকশায় চড়ে স্কুলে যেত? সেই মেয়ে যে টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত-ডাল আনত?
হ্যাঁ। সেই মেয়ে। একই মেয়ে। শুধু গাউন পরেছে।
হলরুমে বাবা-মা এসেছে। ভাই সোহেলও। আনোয়ার শার্ট পরেছে নতুন, সাদা, সাথী টাকা দিয়েছিল। রোকেয়া শাড়ি পরেছে, পুরনো কিন্তু ইস্ত্রি করা। সোহেল চুল আঁচড়ে এসেছে, জেল দিয়ে।
তারা হলরুমে বসে আছে, অন্য অভিভাবকদের মাঝে। আনোয়ারের পাশে একজন ভদ্রলোক স্যুট পরে বসা। আনোয়ার নিজেকে ছোট করে বসেছে, যেন জায়গা কম নিতে চায়। সারাজীবন ছোট হয়ে বসেছে, ছোট হয়ে দাঁড়িয়েছে, ছোট হয়ে চলেছে। আজকেও।
সাথীর নাম ডাকা হলো। সে মঞ্চে উঠল। সার্টিফিকেট হাতে নিল। হলরুমে তাকিয়ে দেখল বাবাকে।
আনোয়ার কাঁদছে।
নিঃশব্দে। মুখ নিচু করে। হাত দিয়ে চোখ মুছছে। রোকেয়াও কাঁদছে, কিন্তু রোকেয়ার কান্না শব্দ করে, নাকে টান দেয়। সোহেল চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে, কাঁদছে না, কিন্তু ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে।
সাথী মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাঁদতে শুরু করল। হলরুমের সবাই দেখছে। সাথীর কিছু যায় আসে না। আজকে কাঁদার দিন।
৭
অনুষ্ঠানের পরে বাইরে। হলরুমের সামনে লন।
সবাই ছবি তুলছে। পরিবারের সাথে, বন্ধুদের সাথে, শিক্ষকদের সাথে। আনোয়ার দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সাথী ডাকল, "বাবা, এদিকে আসো।" আনোয়ার আসতে চায় না। "আমি এমনিই আছি।" সাথী গিয়ে হাত ধরে আনল।
সোহেল ফোনে ছবি তুলল। সাথী আর আনোয়ার। মেয়ে গাউনে, বাবা সাদা শার্টে। মেয়ের হাতে সার্টিফিকেট।
সাথী সার্টিফিকেটটা বাবার হাতে দিল। "ধরো, বাবা।"
আনোয়ারের হাত কাঁপছিল। সেই হাত যেটা চল্লিশ বছর রিকশার হ্যান্ডেল ধরেছে, সেই হাত যেটা কখনো কাঁপেনি, ঝড়ে কাঁপেনি, রোদে কাঁপেনি, না খেয়ে কাঁপেনি, সেই হাত একটা কাগজ ধরতে গিয়ে কাঁপছিল।
আনোয়ার কাগজটা ধরল। দুই হাতে। যেমন করে মানুষ পবিত্র কিছু ধরে।
"এই কাগজটার জন্য আমি চার বছর রিকশা চালিয়েছি।"
সাথী বাবার দিকে তাকাল।
"এই কাগজটার জন্য আমি চার বছর লড়েছি।"
দুজনেই সত্য বলছিল। দুজনের চার বছর আলাদা, কিন্তু একই জায়গায় এসে মিশেছে। এই কাগজে। এই মুহূর্তে।
৮
আনোয়ার সার্টিফিকেটটা ফেরত দিতে চায় না।
সাথী হাসল। "বাবা, দাও। ফ্রেম করাব।"
"কোথায় রাখবি?"
"দেয়ালে। ঘরের দেয়ালে।"
আনোয়ার একটু ভাবল। "আমার রিকশার পেছনে লাগাব।"
সবাই হাসল। আনোয়ারও হাসল। কিন্তু সাথী বুঝতে পারল যে বাবা পুরোপুরি ঠাট্টা করছে না। বাবা সত্যিই চায় পৃথিবী জানুক। রিকশার পেছনে যেমন ফুলের স্টিকার থাকে, সিনেমার ছবি থাকে, তেমন করে মেয়ের সার্টিফিকেট থাকুক। যাতে যে যাত্রী বসবে সে দেখবে। যাতে যে পথচারী দেখবে সে জানবে। এই রিকশাচালকের মেয়ে গ্র্যাজুয়েট।
সাথী বাবাকে জড়িয়ে ধরল। আনোয়ারের শরীর থেকে রিকশার গন্ধ আসে। ঘামের গন্ধ, ধাতুর গন্ধ, রোদের গন্ধ। এই গন্ধে সাথী বড় হয়েছে। এই গন্ধ তার কাছে সবচেয়ে পরিচিত গন্ধ।
"বাবা, তুমি আর রিকশা চালাবে না।"
আনোয়ার কিছু বলল না।
"আমি চাকরি পাব। তুমি আর চালাবে না।"
আনোয়ার মেয়ের মাথায় হাত রাখল। সেই হাত, রিকশার হ্যান্ডেলে বাঁকা হয়ে যাওয়া হাত, সেই হাত মেয়ের মাথায় যখন পড়ল, তখন হাতটা কাঁপছিল না। স্থির ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে স্থির হাত।
৯
বাসায় ফেরার পথে সাথী রিকশায় বসেছিল। বাবার রিকশায় না, ভাড়ার রিকশায়। আনোয়ার পাশে বসেছিল।
সাথী জানালা দিয়ে রাস্তা দেখছিল। মিরপুরের রাস্তা। ধুলো, গাড়ি, মানুষ, হকার। এই রাস্তায় বাবা চল্লিশ বছর রিকশা চালিয়েছে। এই রাস্তার প্রতিটা গর্ত বাবা চেনে। প্রতিটা বাঁক চেনে। প্রতিটা ট্রাফিক সিগন্যাল চেনে।
এবং এই রাস্তার কেউ বাবাকে চেনে না।
চল্লিশ বছর রিকশা চালিয়ে আনোয়ার অদৃশ্য। রিকশাচালকেরা অদৃশ্য। তারা ঢাকা শহরকে চালায়, কিন্তু ঢাকা শহর তাদের দেখে না। তারা পেশি, তারা চাকা, তারা যন্ত্রের অংশ। মানুষ না।
সাথী ভাবল: আমি এই অদৃশ্যতা ভাঙতে চাই। একটা সার্টিফিকেট দিয়ে পুরো ব্যবস্থা বদলানো যায় না। কিন্তু একটা সার্টিফিকেট দিয়ে একটা পরিবার বদলানো যায়। একটা প্রজন্ম বদলানো যায়।
আমার পরে আর কেউ প্রথম হবে না। আমার পরে এটা স্বাভাবিক হবে। আমার ছেলে বা মেয়ে যখন ভর্তি ফর্ম পূরণ করবে, সে লিখবে, "মায়ের পেশা: শিক্ষিকা" অথবা "মায়ের পেশা: কর্মকর্তা।" সে কাঁপবে না। সে লজ্জা পাবে না। সে ব্যথা পাবে না।
সেই মুহূর্তটা আমার জয়। আজকের সার্টিফিকেট না, সেই ভবিষ্যতের মুহূর্ত আমার আসল জয়।
১০
রাতে। টিনের ঘরে।
আনোয়ার সার্টিফিকেটটা দেয়ালে টানিয়ে দিয়েছে। পেরেক দিয়ে। দেয়ালে আগে একটা ক্যালেন্ডার ছিল, ওষুধের কোম্পানির। সেটা সরিয়ে সেখানে সার্টিফিকেট।
রোকেয়া বলল, "ফ্রেম করা লাগবে।"
আনোয়ার বলল, "পরে করব। আপাতত এভাবেই থাক।"
সে সার্টিফিকেটের দিকে তাকিয়ে আছে। পড়তে পারে না। অক্ষরগুলো চেনে না। কিন্তু জানে এটা কী। এটা তার মেয়ের নাম। এটা তার মেয়ের জয়। এটা তার রিকশার চাকার ঘূর্ণন, চল্লিশ বছরের ঘূর্ণন, একটা কাগজে রূপান্তরিত।
সাথী নিজের ঘরে বসে আছে। ঘর মানে একটা চৌকি, একটা টেবিল, একটা বই রাখার তাক। দেয়ালে পোস্টার, আইনস্টাইনের। সেটা ক্লাস নাইনে কিনেছিল, দশ টাকায়।
সাথী ভাবছে: আমি প্রথম প্রজন্মের গ্র্যাজুয়েট। শব্দটা বড়। কিন্তু এর মানে শুধু এটুকু যে আমার আগে কেউ পারেনি। আমার পরে সবাই পারবে। আমি দরজা। আমি নিজে দরজা না, আমি দরজা খুলেছি। এবং দরজা একবার খুললে বন্ধ হয় না।
বাইরে মিরপুরের রাত। ট্রাকের হর্ন। দূরে মসজিদের আজান। কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।
সাথী শুয়ে পড়ল। কাল থেকে চাকরির আবেদন শুরু করতে হবে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ, এখন আসল লড়াই শুরু।
কিন্তু আজকের রাত শুধু আজকের। আজকের রাত সেই রাত যেখানে রিকশাচালকের মেয়ে গ্র্যাজুয়েট হয়ে ঘরে ফিরেছে। এই রাত একবারই আসে। এই রাত আর আসবে না। সাথী এই রাতকে বুকে রাখল, পুরোটা, কিছু বাদ না দিয়ে।
বাবার কাঁপা হাত। মায়ের কান্না। ভাইয়ের লাল চোখ। দেয়ালে পেরেক দিয়ে লাগানো সার্টিফিকেট।
এই কাগজটার জন্য একটা পরিবার সবকিছু দিয়েছে।
এই কাগজটার জন্য একটা মেয়ে সবকিছু লড়েছে।