সেনাবাহিনীতে নারী

আমি ম্যাডাম না, আমি ক্যাপ্টেন

পর্ব ৬৩ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

নুসরাতের ইউনিফর্ম ওজন করে সাড়ে তিন কেজি।

বুট দুই কেজি। বেল্ট আধা কেজি। ব্যারেট, ব্যাজ, র্যাঙ্ক ইনসিগনিয়া, সব মিলিয়ে আরেকটু। এই ওজন নুসরাত প্রতিদিন বহন করে। কিন্তু ইউনিফর্মের আসল ওজন কেজিতে মাপা যায় না। ইউনিফর্মের আসল ওজন সেই দৃষ্টিতে, যেটা প্রতিদিন নুসরাতকে মাপে। দেখে। বিচার করে।

ক্যাপ্টেন নুসরাত জাহান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

সেনানিবাসে হাঁটলে পুরুষেরা তাকায়। প্রথম দিনে ভেবেছিল স্বাভাবিক কৌতূহল, নতুন অফিসার, তাকাবেই। কিন্তু তাকানো থামেনি। দুই বছর হয়ে গেছে, এখনো তাকায়। তাকানোর ভাষা আলাদা আলাদা। কেউ বিস্ময়ে তাকায়: মেয়ে অফিসার? কেউ সন্দেহে: এই মেয়ে কমান্ড দেবে? কেউ অস্বস্তিতে: মেয়ের সামনে স্যালুট দিতে হবে? কেউ সম্মানে, কিন্তু সেই সম্মানের সাথে মিশে থাকে একটু আশ্চর্য, যেন সম্মান করাটাও তাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা।

নুসরাত সব দেখে। সব বোঝে। কিন্তু হাঁটা থামায় না। হাঁটা থামালে হারবে।

বিএমএ, ভাটিয়ারি। সেনা অফিসার ট্রেনিং।

নুসরাতের ব্যাচে মেয়ে ছিল চারজন। ছেলে একশো ছাব্বিশ। চারজন মেয়ে একশো ছাব্বিশ জন ছেলের মাঝে। অনুপাত: ১:৩১.৫। এটা গণিতের হিসেব। বাস্তবের হিসেব আরো তীব্র। কারণ চারজন মেয়ে মানে চারজন যারা প্রতিটা মুহূর্তে দেখা হচ্ছে, মূল্যায়ন হচ্ছে, তুলনা হচ্ছে। একশো ছাব্বিশ জন ছেলে ভিড়ে মিশে যেতে পারে। চারজন মেয়ে পারে না।

ফিজিক্যাল ট্রেনিং। পাঁচটায় উঠে দৌড়। দশ কিলোমিটার। ছেলেদের সাথে একই রুটে, একই সময়ে। নুসরাত দৌড়ায়। পেছনে পড়ে না। পেছনে পড়লে বলবে "মেয়ে তো, পারবে না।" এই "পারবে না" শব্দটা নুসরাতের জ্বালানি। যতবার কেউ বলেছে "পারবে না," ততবার নুসরাত পেরেছে।

অবস্ট্যাকল কোর্স। দেয়াল টপকানো, কাদায় হামাগুড়ি, দড়ি বেয়ে ওঠা। নুসরাতের হাতে ফোসকা পড়ত, দড়ির ঘর্ষণে চামড়া উঠে যেত। রাতে ব্যান্ডেজ করত, সকালে আবার দড়ি ধরত।

একদিন ইনস্ট্রাক্টর বলেছিলেন, "ক্যাডেট নুসরাত, তুমি ছেলেদের থেকে পেছনে আছো অবস্ট্যাকলে।"

নুসরাত বলেছিল, "স্যার, আমি আমার থেকে এগিয়ে আছি। গতকালের চেয়ে।"

ইনস্ট্রাক্টর কিছু বলেননি। কিন্তু পরের দিন থেকে নুসরাতকে আলাদা করে দেখেননি। সবার সাথে একই মানদণ্ডে দেখেছেন। এটাই নুসরাত চেয়েছিল। আলাদা হতে চায়নি, সমান হতে চেয়েছিল।

কমিশন পাওয়ার পরে প্রথম পোস্টিং। চট্টগ্রাম।

একটা প্লাটুন। তিরিশ জন সৈনিক। সব পুরুষ। নুসরাত তাদের কমান্ডার।

প্রথম দিন প্যারেডে দাঁড়ালে হাবিলদার মজিদ একটু হেসেছিল। স্পষ্ট হাসি না, ঠোঁটের কোণায়, যেটা অন্যরা দেখতে পায় না কিন্তু নুসরাত দেখেছিল। কারণ নুসরাত খোঁজে, এই দৃষ্টিগুলো। জানতে হয় কে কী ভাবছে। যুদ্ধক্ষেত্রেও জানতে হয়, সেনানিবাসেও।

দ্বিতীয় সপ্তাহে একটা ফিল্ড এক্সারসাইজে নুসরাত নির্দেশ দিল রাতে মুভমেন্টের। হাবিলদার মজিদ বলল, "ম্যাডাম, রাতে এই রুটে যাওয়া ঠিক হবে না। ম্যাডাম, আমরা ছেলেদের অধীনে থাকি।"

নুসরাত থামল। সবাই থামল। চোখ নুসরাতের দিকে।

"আমি ম্যাডাম না। আমি ক্যাপ্টেন। এবং রুটটা আমি রেকি করেছি দুপুরে। এই রুটে যাব। মুভ আউট।"

নুসরাতের গলা কাঁপেনি। ভেতরে কাঁপছিল। কিন্তু ভেতরের কাঁপুনি বাইরে আসতে দেওয়া যায় না। এটা ট্রেনিং, এটা অভ্যাস, এটা বেঁচে থাকার কৌশল।

প্লাটুন মুভ করেছিল। রাতের এক্সারসাইজ সফল হয়েছিল। পরের দিন হাবিলদার মজিদ "ম্যাডাম" বলেনি। "ক্যাপ্টেন স্যার" বলেছিল। নুসরাত সংশোধন করেনি। "ক্যাপ্টেন স্যার" ভুল, কিন্তু সেই ভুলের মধ্যে একটা স্বীকৃতি আছে। মজিদ জানে না মেয়ে অফিসারকে কী সম্বোধন করতে হয়, কারণ সে আগে কখনো মেয়ে অফিসারের অধীনে কাজ করেনি। ভাষায় শব্দ নেই এই অভিজ্ঞতার জন্য। শব্দ পরে তৈরি হবে। আগে অভিজ্ঞতাটা হতে হবে।

পরিবার।

নুসরাতের বাবা সরকারি কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত। মা গৃহিণী। ভাই একজন, প্রকৌশলী। বোন একজন, ডাক্তার।

নুসরাত যখন বলেছিল সেনাবাহিনীতে যাবে, বাবা প্রথমে চুপ ছিল। তারপর বলেছিল, "তুই পারবি?" নুসরাত বলেছিল, "পারব।" বাবা আবার চুপ। তারপর বলেছিল, "যা।"

মা কেঁদেছিল। "মেয়ে সেনাবাহিনীতে যাবে? লোকে কী বলবে?" নুসরাত বলেছিল, "লোকে কিছু বলুক। আমি জানি কী করতে চাই।" মা আরো কেঁদেছিল। কিন্তু মায়ের কান্না কখনো বাধা হয় না, মায়ের কান্না ভালোবাসা, আর ভালোবাসা দিয়ে কেউ থামে না।

ভাই বলেছিল, "তোকে কি বন্দুক ধরতে হবে?" নুসরাত বলেছিল, "হ্যাঁ।" ভাই কিছু বলেনি। তারপর বলেছিল, "ঠিক আছে, শিখে নিস।"

বোন বলেছিল, "তুই পাগল।" তারপর হেসে জড়িয়ে ধরেছিল। "তুই সবসময় পাগল।"

আত্মীয়রা আলাদা। খালারা বলেছিল, "বিয়ে হবে কেমনে? কোন ছেলে সেনাবাহিনীর মেয়ে বিয়ে করবে?" চাচারা বলেছিল, "মেয়েদের জায়গা না ওটা।" দাদি বলেছিল, "আমার আমলে মেয়েরা ঘর থেকে বের হতো না।"

নুসরাত শুনেছিল। প্রতিটা কথা। প্রতিটা মন্তব্য। এবং প্রতিটা কথাকে জ্বালানি বানিয়েছিল। যেমন চুল্লিতে কাঠ দিলে আগুন জ্বলে, তেমন এই কথাগুলো নুসরাতের ভেতরে আগুন জ্বালিয়েছিল। সেই আগুনে নুসরাত তৈরি হয়েছিল।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন। দক্ষিণ সুদান।

নুসরাত সিলেক্ট হয়েছিল মিশনে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে। গর্ব, ভয়, উত্তেজনা, সব একসাথে মিশে ছিল সেদিন।

জুবা বিমানবন্দরে নামার পরে প্রথম যেটা দেখেছিল: ধুলো। লাল ধুলো, সর্বত্র। আকাশে, মাটিতে, ফুসফুসে। আর রোদ। এমন রোদ যেটা চট্টগ্রামেও হয় না। এমন রোদ যেটা চামড়া পোড়ায়, মাথা ঘুরায়, চোখ ধাঁধায়।

এবং একটা জিনিস যেটা নুসরাত প্রথম দিনেই লক্ষ্য করেছিল: কেউ তাকে "মেয়ে অফিসার" হিসেবে দেখছে না। জাতিসংঘের নীল হেলমেটের নিচে সবাই অফিসার। কেনিয়ার মেজর, ভারতের লেফটেন্যান্ট কর্নেল, নেপালের ক্যাপ্টেন, কেউ নুসরাতকে আলাদা চোখে দেখেনি। কেউ "ম্যাডাম" বলেনি। কেউ ঠোঁটের কোণায় হাসেনি।

এখানে নুসরাত অফিসার। শুধু অফিসার। লিঙ্গ অপ্রাসঙ্গিক।

সেই অনুভূতিটা নুসরাত প্রথমবার অনুভব করেছিল। মুক্তির মতো। হালকা হয়ে যাওয়ার মতো। যেন ইউনিফর্মের সেই অতিরিক্ত ওজন, যেটা বাংলাদেশে বহন করে, সেটা এখানে নেই।

দক্ষিণ সুদানে এক বছর।

প্যাট্রোল ডিউটি। সিভিলিয়ান প্রটেকশন। কনভয় এসকর্ট। নুসরাত সব করেছে। সশস্ত্র গাড়িতে বসে ধুলোর রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলেছে। গ্রামে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের সাথে কথা বলেছে। শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বিতরণ করেছে। রাতে পোস্টে দাঁড়িয়ে পাহারা দিয়েছে, অন্ধকারে, আফ্রিকার আকাশের নিচে, যেখানে তারা এত স্পষ্ট যে মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়।

একটা ঘটনা। বোর শহরের কাছে। একটা গ্রামে সংঘর্ষের পরে। নুসরাতের টিম গিয়েছিল পরিস্থিতি মূল্যায়নে। গ্রামের মেয়েরা, নারীরা, নুসরাতকে দেখে এগিয়ে এসেছিল। তাদের মুখে ভাষা ছিল যেটা নুসরাত বুঝত না, দিনকা ভাষা, কিন্তু তাদের চোখে কিছু ছিল যেটা বুঝতে ভাষা লাগে না।

একজন বৃদ্ধা নুসরাতের হাত ধরেছিল। তার হাত শুকনো, রুক্ষ, কঠিন। সে নুসরাতের ইউনিফর্মের দিকে তাকিয়েছিল, তারপর নুসরাতের মুখের দিকে। এবং হেসেছিল। সেই হাসিতে কোনো ভাষার দরকার ছিল না।

একজন নারী বন্দুক ধরেছে। একজন নারী রক্ষা করতে এসেছে। এটাই যথেষ্ট ছিল সেই বৃদ্ধার জন্য।

নুসরাত সেই রাতে তাঁবুতে শুয়ে কেঁদেছিল। এই কান্না দুর্বলতার না। এই কান্না বুঝতে পারার। পৃথিবীর যেখানেই যাও, মেয়েরা একই যুদ্ধ করে। ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন ভূখণ্ডে, কিন্তু একই যুদ্ধ।

মিশন শেষে দেশে ফেরা।

বিমানবন্দরে মা এসেছিল। মাকে দেখে নুসরাত দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল। মা কাঁদছিল। নুসরাতও কাঁদছিল।

বাবা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখ লাল, কিন্তু কাঁদছিল না। বাবারা কাঁদে না, অন্তত সবার সামনে না। নুসরাত গিয়ে বাবাকে স্যালুট করেছিল। বাবা স্যালুট ফেরত দিয়েছিল। তারপর জড়িয়ে ধরেছিল।

গাড়িতে বসে মা জিজ্ঞেস করেছিল, "ভয় লাগেনি?"

নুসরাত বলেছিল, "লেগেছে।"

"তাহলে?"

"ভয় লাগলেও কাজ করতে হয়, মা। সেটাই সৈনিকের কাজ।"

মা আবার কেঁদেছিল। নুসরাত মায়ের হাত ধরে ছিল। মায়ের হাত নরম, ঘরের মানুষের হাত। নুসরাতের হাত শক্ত, রাইফেলের বাট ধরার হাত, দড়ি বাওয়ার হাত, ধুলোয় হামাগুড়ি দেওয়ার হাত। দুটো হাত ধরাধরি করে বসে আছে। দুটো পৃথিবী, পাশাপাশি।

দেশে ফিরে আবার একই যুদ্ধ।

সেনানিবাসে নতুন ব্যাচের সৈনিকেরা এসেছে। নতুন চোখ, নতুন দৃষ্টি, নতুন সন্দেহ। প্রতিটা নতুন ব্যাচের সাথে নুসরাতকে আবার প্রমাণ করতে হয়। আবার। প্রথম থেকে।

দক্ষিণ সুদানের মেডেল বুকে আছে। সেটা দেখে কিছু সৈনিক সম্মান করে। কিন্তু কিছু সৈনিক এখনো ভাবে: মেয়ে। মেয়ে মানে দুর্বল। মেয়ে মানে আবেগপ্রবণ। মেয়ে মানে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না চাপের মুখে।

নুসরাত ভাবে: আমি দক্ষিণ সুদানে সশস্ত্র এলাকায় প্যাট্রোল করেছি। আমি রাতের পাহারায় দাঁড়িয়েছি একা, যখন দূরে গুলির শব্দ আসছিল। আমি শরণার্থী শিবিরে মানুষের মৃত্যু দেখেছি, শিশুর মৃত্যু দেখেছি, এবং পরের দিন আবার কাজ করেছি। আর তুমি আমাকে বলছ আমি চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না?

কিন্তু এটা বলে না। বলার দরকার নেই। প্রমাণ কাজে, কথায় না।

দেশে আমাকে প্রমাণ করতে হয়। বিদেশে আমি অফিসার, শুধু অফিসার।

নুসরাত এই কথাটা একদিন ফোনে বোনকে বলেছিল। বোন বলেছিল, "তাহলে বিদেশে থেকে যা।" নুসরাত বলেছিল, "না। দেশেই থাকব। প্রমাণ করতে হলে করব। কিন্তু পালাব না।"

পালানো সহজ। থাকা কঠিন। যেখানে প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয়, সেখানে থাকা সবচেয়ে কঠিন। কিন্তু নুসরাত জানে, সে না থাকলে পরের মেয়ে অফিসারের জন্য আরো কঠিন হবে। প্রতিটা নারী অফিসার যে থাকে, সে পরের জনের জন্য পথ সহজ করে। এক ইঞ্চি। দুই ইঞ্চি। মিলিমিটার হিসেবে।

কিন্তু জমা হয়। একদিন এই ইঞ্চিগুলো মিলে পুরো পথ হবে।

১০

রাত। সেনানিবাসের কোয়ার্টারে।

নুসরাত ইউনিফর্ম খুলে রাখে। বুটের ফিতা খোলে, ধীরে ধীরে। প্রতিদিনের শেষে ইউনিফর্ম খুলে রাখা একটা আচার। দিনের ওজন নামানো।

আয়নায় নিজেকে দেখে। ইউনিফর্ম ছাড়া। শুধু নুসরাত। মেয়ে নুসরাত। আটাশ বছরের মেয়ে যে মাঝে মাঝে আইসক্রিম খেতে চায়, মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতে চায়, মাঝে মাঝে মায়ের কোলে মাথা রাখতে চায়।

কিন্তু সকালে আবার ইউনিফর্ম পরবে। আবার সেই ওজন। আবার সেই দৃষ্টি। আবার সেই প্রমাণ।

নুসরাত বিছানায় শোয়। সিলিং ফ্যান ঘুরছে। দক্ষিণ সুদানে ফ্যান ছিল না, তাঁবুতে ঘুমাত, গরমে ভিজে যেত ঘামে। সেই রাতগুলো কঠিন ছিল, কিন্তু সরল ছিল। কেউ জিজ্ঞেস করত না তুমি মেয়ে কেন। কেউ বলত না মেয়েদের অধীনে থাকি না। কেউ "ম্যাডাম" বলত না।

এই দেশে "ম্যাডাম" একটা প্রাচীর। ভদ্র প্রাচীর। শব্দটা সম্মানজনক, কিন্তু এটা একটা বাক্স। ম্যাডাম মানে মেয়ে। ক্যাপ্টেন মানে অফিসার।

নুসরাত ক্যাপ্টেন। শুধু ক্যাপ্টেন।

একদিন এই দেশেও শুধু ক্যাপ্টেন হবে। সেদিন আসতে সময় লাগবে। কিন্তু নুসরাত অপেক্ষা করতে জানে। সৈনিকেরা অপেক্ষা করতে জানে। রাতের পাহারায় ভোরের জন্য অপেক্ষা করে। ভোর আসেই।

সবসময় আসে।