পাইলট
আকাশে কোনো লিঙ্গ নেই
১
তামান্নার ককপিট ত্রিশ হাজার ফুট উপরে।
নিচে বাংলাদেশ। সবুজ, ছোট, ধানক্ষেতের জমি, নদীর রেখা, গ্রামের ছাদ। এত উপরে থেকে দেশটাকে দেখলে মনে হয় একটা কুইল্ট, একটা শীতলপাটি, রঙে রঙে বোনা। কিন্তু তামান্না জানে ওই সবুজের নিচে কী আছে। ওই সবুজের নিচে মেয়েরা আছে যারা সাইকেল চালাতে পারে না। ওই সবুজের নিচে গ্রাম আছে যেখানে মেয়েদের একা হাটে যাওয়া নিষেধ। ওই সবুজের নিচে ঘর আছে যেখানে মেয়ের জন্ম হলে বাবা চুপ করে থাকে।
আর এখানে, ত্রিশ হাজার ফুট উপরে, তামান্না বিমান চালাচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ঢাকা থেকে দুবাই।
ককপিটে দুজন। তামান্না আর ক্যাপ্টেন রহমান। রহমান সিনিয়র, বিশ বছরের অভিজ্ঞতা। তামান্না ফার্স্ট অফিসার, দুই বছরের। রহমান ভালো মানুষ, কখনো তামান্নাকে আলাদা করে দেখেনি। কিন্তু রহমান ব্যতিক্রম। সব ক্যাপ্টেন রহমানের মতো না।
তামান্না থ্রটল ধরে আছে। যন্ত্রপাতির প্যানেল জ্বলজ্বল করছে। অল্টিমিটার, এয়ারস্পিড ইনডিকেটর, আর্টিফিশিয়াল হরাইজন। এই যন্ত্রগুলো লিঙ্গ বোঝে না। এই যন্ত্রগুলো শুধু পদার্থবিদ্যা বোঝে। লিফট, ড্র্যাগ, থ্রাস্ট, ওয়েট। পাইলটের হাত পুরুষের না নারীর, সেটা যন্ত্রের কাছে অপ্রাসঙ্গিক।
আকাশে কোনো লিঙ্গ নেই। শুধু মেঘ আছে।
২
তামান্নার ছোটবেলা কুমিল্লায়।
বাবা ব্যাংকে চাকরি করতেন। মা শিক্ষিকা। মধ্যবিত্ত পরিবার, ভালো স্কুলে পড়েছে, পরীক্ষায় ভালো করেছে। এ পর্যন্ত সাধারণ। কিন্তু একটা জিনিস অসাধারণ ছিল: তামান্না আকাশ দেখত।
অন্য বাচ্চারা মাটিতে খেলত। তামান্না আকাশে তাকাত। বিমান গেলে দৌড়ে বাইরে আসত। বিমানের শব্দ শুনতে পেত ঘরের ভেতর থেকেই, সেই গর্জন যেটা আস্তে আস্তে বড় হয়, তারপর মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়, তারপর আস্তে আস্তে ছোট হয়। তামান্না সেই শব্দ শুনত আর ভাবত: ওই ভেতরে কে বসে আছে? ওই ভেতরে কে চালাচ্ছে?
দশ বছর বয়সে বাবাকে বলেছিল, "আমি পাইলট হব।"
বাবা হেসেছিলেন। ভালোবাসার হাসি, কিন্তু সেই হাসিতে একটু অবিশ্বাসও ছিল। কুমিল্লার ব্যাংকারের মেয়ে পাইলট হবে? দেশে কজন মেয়ে পাইলট আছে? আঙুলে গোনা যায়।
মা বলেছিলেন, "পড়ালেখা ভালো করে কর। তারপর যা ইচ্ছে হবি।"
তামান্না পড়ালেখা ভালো করেছে। বিজ্ঞানে, গণিতে, পদার্থবিদ্যায়। এইচএসসিতে জিপিএ ফাইভ। তারপর? তারপর সবাই ভেবেছিল ডাক্তার হবে, অথবা ইঞ্জিনিয়ার। মেয়েরা ডাক্তার হয়, এটা সবাই মানে। মেয়েরা ইঞ্জিনিয়ার হয়, এটাও ধীরে ধীরে মানছে। কিন্তু মেয়ে পাইলট? সেটা অন্য গল্প।
৩
বাংলাদেশ বিমান চালনা প্রশিক্ষণ একাডেমি।
তামান্নার ব্যাচে মেয়ে ছিল দুজন। বাকি ছাব্বিশজন ছেলে। পরিচিত অনুপাত, পরিচিত দৃশ্য।
ফ্লাইট ট্রেনিং। প্রথম দিন সিমুলেটরে বসে তামান্নার হাত কাঁপছিল। ভয়ে না, উত্তেজনায়। ইয়োক ধরেছিল, রাডার প্যাডেলে পা রেখেছিল, এবং প্রথমবারের মতো অনুভব করেছিল: এটাই আমার জায়গা। এই সিটে, এই কন্ট্রোলে, এই আকাশে।
প্রথম সোলো ফ্লাইট। একটা ছোট সেসনা বিমান। তামান্না একা। ইনস্ট্রাক্টর মাটিতে। রানওয়ে থেকে টেকঅফ, এবং হঠাৎ মাটি সরে যাচ্ছে, ঘরবাড়ি ছোট হচ্ছে, গাছগুলো সবুজ বিন্দু হয়ে যাচ্ছে।
তামান্না একা আকাশে।
সেই মুহূর্তে তামান্না বুঝেছিল: স্বাধীনতা কী। স্বাধীনতা মাটিতে নেই। মাটিতে আছে নিয়ম, প্রথা, দৃষ্টি, সীমানা। আকাশে কিছু নেই। আকাশে শুধু বাতাস আছে, আর বাতাসের কোনো মতামত নেই।
ল্যান্ডিংয়ের পরে ইনস্ট্রাক্টর বলেছিলেন, "গুড জব।" দুটো শব্দ। কিন্তু সেই দুটো শব্দে "মেয়ে হয়ে" বলে কোনো উপসর্গ ছিল না। শুধু "গুড জব।" এটাই চায় তামান্না। শুধু কাজের মূল্যায়ন। কাজের, শরীরের না।
৪
প্রথম কমার্শিয়াল ফ্লাইট। বিমান বাংলাদেশ।
চব্বিশ বছর বয়সে তামান্না প্রথম কমার্শিয়াল ফ্লাইটে উঠেছিল ফার্স্ট অফিসার হিসেবে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম। ছোট রুট, পঞ্চান্ন মিনিট।
ককপিটে ঢোকার আগে একজন যাত্রী দেখেছিল তামান্নাকে। ইউনিফর্ম পরা, ক্যাপ মাথায়। যাত্রী একটু থেমেছিল, তারপর পাশের যাত্রীকে বলেছিল, "মেয়ে পাইলট? নিরাপদ তো?"
তামান্না শুনেছিল। হাঁটা থামায়নি।
ককপিটে বসে ক্যাপ্টেনের সাথে চেকলিস্ট রান করেছিল। প্রি-ফ্লাইট, ইঞ্জিন স্টার্ট, ট্যাক্সি, টেকঅফ। বিমান আকাশে উঠেছিল। পঞ্চান্ন মিনিট পরে চট্টগ্রামে ল্যান্ড করেছিল। মসৃণ ল্যান্ডিং।
সেই যাত্রী নামার সময় জানত না যে মেয়ে পাইলটের হাতে নিরাপদে পৌঁছেছে। জানার দরকারও নেই। পৌঁছেছে, এটাই যথেষ্ট।
কিন্তু তামান্না মনে রেখেছে। প্রতিটা "মেয়ে পাইলট?" মনে রাখে। প্রশ্নচিহ্নটা। সেই প্রশ্নচিহ্ন যেটা শুধু তার জন্য। পুরুষ পাইলটকে কেউ জিজ্ঞেস করে না "পুরুষ পাইলট?" কারণ পুরুষ পাইলট ডিফল্ট। মেয়ে পাইলট ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রমকে প্রশ্ন করা হয়। ডিফল্টকে না।
তামান্না চায় একদিন "মেয়ে পাইলট" শব্দটাই অপ্রাসঙ্গিক হোক। শুধু "পাইলট" থাকুক।
৫
ফ্লাইটের মাঝে, ক্রুজ অল্টিচিউডে, যখন বিমান নিজে নিজে চলে, অটোপাইলটে, তখন তামান্না জানালা দিয়ে তাকায়।
মেঘ। সাদা, ধূসর, কখনো সোনালি যখন সূর্যের আলো পড়ে। মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া মানে পৃথিবীর ওপরে থাকা। শাব্দিক অর্থে ওপরে। সমাজের ওপরে না, প্রকৃতির ওপরে।
এই উচ্চতায় কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো সন্দেহ নেই। কোনো "মেয়ে হয়ে" নেই। এই উচ্চতায় শুধু পদার্থবিদ্যা আছে। বার্নুলির সূত্র, নিউটনের তৃতীয় সূত্র, এরোডাইনামিকস। এই সূত্রগুলো লিঙ্গ দেখে না। এই সূত্রগুলো শুধু জিজ্ঞেস করে: তুমি কি পারো?
তামান্না পারে। প্রতিদিন পারে। প্রতিটা ফ্লাইটে পারে।
নিচে বাংলাদেশ। ষোলো কোটি মানুষ। তাদের মধ্যে অর্ধেক মেয়ে। তাদের মধ্যে কতজন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে এই মুহূর্তে? কতজন ভাবছে "আমিও পারব"? কতজন ভাবছে "আমাকে তো বলেছে পারব না"?
তামান্না ভাবে: আমি উড়ছি। আমি এই দেশের মেয়ে, এই দেশ যেখানে মেয়েদের ডানা ছাঁটা হয়। কিন্তু আমি উড়ছি। এটা সম্ভব। এটা হচ্ছে। এই মুহূর্তে হচ্ছে।
৬
মায়ের সাথে ফোনে কথা হয়। প্রতিদিন না, কিন্তু সপ্তাহে তিনবার।
মা জিজ্ঞেস করে, "আজকে কোথায় উড়লি?"
"সিঙ্গাপুর।"
"সিঙ্গাপুর! কত দূর?"
"চার ঘণ্টা।"
মা চুপ করে থাকে। চার ঘণ্টা আকাশে থাকা, এটা মায়ের কল্পনার বাইরে। মা কুমিল্লা থেকে ঢাকা আসতে ভয় পান বাসে। আকাশে চার ঘণ্টা? মা ভাবতেই পারেন না।
বাবা ফোনে জিজ্ঞেস করেন, "বিমান কত বড়?"
"বাবা, তুমি তো দেখেছ।"
"দেখেছি, কিন্তু তুই চালাস, সেটা আলাদা।"
সেটা আলাদা। বাবা ঠিক বলেছেন। দেখা আর চালানো আলাদা। যাত্রী হওয়া আর পাইলট হওয়া আলাদা। বাবা দশ বছর আগে হেসেছিলেন যখন তামান্না বলেছিল পাইলট হবে। এখন সেই হাসি গর্বে বদলে গেছে। বাবা সবাইকে বলেন, "আমার মেয়ে পাইলট।" ব্যাংকে, আত্মীয়দের কাছে, পাড়ায়। বারবার বলেন, যেন বারবার বললে আরো সত্যি হয়।
৭
একটা ঘটনা।
ল্যান্ডিংয়ের পরে ককপিট থেকে বের হচ্ছিল। একটা ছোট মেয়ে, বছর ছয়-সাত, মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল গেটের কাছে। তামান্নাকে দেখে থমকে গেল।
"মা, আন্টি পাইলট?"
মা বললেন, "হ্যাঁ।"
মেয়েটা তামান্নার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ বড় বড়। সেই চোখে বিস্ময়, কিন্তু সেটার চেয়ে বেশি কিছু আছে। সেই চোখে একটা সম্ভাবনা জন্ম নিচ্ছে। সেই চোখ বলছে: তাহলে আমিও পারব?
তামান্না নিচু হয়ে বলল, "তুমি কি বিমান পছন্দ কর?"
মেয়েটা মাথা নাড়ল।
"বড় হয়ে কী হবে?"
মেয়েটা তামান্নার ক্যাপের দিকে তাকাল। তারপর বলল, "তোমার মতো।"
তামান্না হাসল। মেয়েটার মাথায় হাত রাখল। সেই মুহূর্তটা ত্রিশ হাজার ফুটের চেয়ে উঁচু ছিল। কারণ একটা ছোট মেয়ে দেখল যে মেয়েরাও উড়তে পারে। এই দেখাটাই সবকিছু। পুরো লড়াইয়ের সারাংশ একটা বাচ্চার একটা বাক্যে: "তোমার মতো।"
৮
রাতের ফ্লাইট।
ঢাকা শহর নিচে জ্বলছে। হাজার হাজার আলো। কমলা, সাদা, হলুদ। রাস্তার আলো, বাড়ির আলো, গাড়ির হেডলাইট। ওপর থেকে শহরটাকে একটা জীবন্ত প্রাণী মনে হয়, শিরা-উপশিরায় আলো বইছে।
ঐ আলোগুলোর প্রতিটার পেছনে একটা করে গল্প। একটা আলো হয়তো একটা রান্নাঘরের, যেখানে একজন মা রাতের খাবার রান্না করছে। একটা আলো হয়তো একটা পড়ার টেবিলের, যেখানে একটা মেয়ে পরীক্ষার জন্য পড়ছে। একটা আলো হয়তো একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির, যেখানে হাজার মেয়ে সেলাই করছে রাতের শিফটে।
তামান্না এই আলোগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে যায়। প্রতিদিন। প্রতিরাতে।
নিচে যারা আছে তারা জানে না ওপরে কে চালাচ্ছে। জানার দরকার নেই। বিমান সময়মতো পৌঁছালেই হলো। কিন্তু তামান্না জানে। তামান্না জানে সে ওপরে আছে। এবং সে নিচে থেকে এসেছে। সেই আলোগুলোর একটা থেকে। কুমিল্লার একটা বাড়ির একটা জানালার একটা আলো থেকে।
৯
ককপিটে একটা ছবি আছে তামান্নার ব্যাগে।
ছোটবেলার ছবি। তামান্না আর বাবা। বাবার কোলে বসে আছে, আর আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। বিমান যাচ্ছিল মাথার ওপর দিয়ে। বাবা ছবি তুলেছিলেন।
সেই মেয়ে এখন সেই বিমানের ভেতরে বসে আছে। আঙুল তুলে দেখানোর দরকার নেই। নিজেই চালাচ্ছে।
কুমিল্লা থেকে আকাশ। রান্নাঘর থেকে ককপিট। মেয়ে থেকে পাইলট। পথটা লম্বা। পথটা একা।
কিন্তু আকাশে কোনো লিঙ্গ নেই। আকাশে শুধু মেঘ আছে। আর মেঘের ওপরে সূর্য। সবসময়। মেঘ যতই ঘন হোক, মেঘের ওপরে সূর্য আছে। এটা পাইলটরা জানে। মাটির মানুষ জানে না। মাটির মানুষ মেঘ দেখে ভাবে রোদ নেই। পাইলট জানে রোদ সবসময় আছে, শুধু মেঘের ওপরে উঠতে হয়।
তামান্না উঠেছে।