প্রোগ্রামার

আমি লজিক দিয়ে ৫০ হাজার মেয়ের জীবন সহজ করেছি

পর্ব ৬৫ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সুমাইয়ার স্ক্রিনে সবুজ অক্ষর।

কোড। লাইনের পর লাইন। ভেরিয়েবল, ফাংশন, লুপ, কন্ডিশন। মানুষ পড়লে বুঝবে না, কিন্তু কম্পিউটার বুঝবে। সুমাইয়া দুটো ভাষায় কথা বলে: মানুষের ভাষায় আর মেশিনের ভাষায়। মানুষের ভাষায় সে চুপচাপ, কম কথা বলে, কোণায় বসে থাকে। মেশিনের ভাষায় সে স্পষ্ট, নির্ভুল, শক্তিশালী।

সুমাইয়া আক্তার। পঁচিশ বছর। সেলফ-টট প্রোগ্রামার। কোনো কম্পিউটার সায়েন্সের ডিগ্রি নেই। কোনো বুটক্যাম্প নেই। কোনো মেন্টর নেই। ইউটিউব, স্ট্যাক ওভারফ্লো, গিটহাব, ডকুমেন্টেশন। এটাই তার বিশ্ববিদ্যালয়।

গিটহাব প্রোফাইলে পাঁচশোর বেশি কন্ট্রিবিউশন। সবুজ বক্সে ভরা ক্যালেন্ডার, প্রায় প্রতিদিন কমিট। প্রতিটা সবুজ বক্স একটা দিন যেদিন সুমাইয়া কোড লিখেছে। প্রতিটা সবুজ বক্স একটা উত্তর, তাদের জন্য যারা বলে "মেয়েদের লজিক কম।"

পাঁচশো উত্তর। এবং গোনা চলছে।

সুমাইয়ার শুরু ক্লাস নাইনে।

বাবার পুরনো কম্পিউটার। পেন্টিয়াম ফোর, সিআরটি মনিটর, উইন্ডোজ এক্সপি। বাবা ব্যবহার করতেন অফিসের কাজে, এক্সেল, ওয়ার্ড। সুমাইয়া বাবার অনুপস্থিতিতে কম্পিউটারের সামনে বসত।

প্রথমে গেম খেলত। সবাই খেলে। তারপর একদিন ভুল করে নোটপ্যাড খুলে এইচটিএমএল লিখেছিল। ইন্টারনেটে দেখেছিল কীভাবে ওয়েবপেজ বানাতে হয়। কোড লিখেছিল, ব্রাউজারে খুলেছিল, এবং স্ক্রিনে নিজের নাম দেখেছিল। সাদা পাতায় কালো অক্ষরে "সুমাইয়া।"

সেই মুহূর্তটা। সেই মুহূর্তে সুমাইয়া বুঝেছিল: আমি কিছু বানাতে পারি। কিছু লিখলে কিছু হয়। আমার আদেশে স্ক্রিন বদলায়। আমার কথায় মেশিন শোনে।

ক্ষমতা। এটা ক্ষমতা। যে মেয়ে ঘরে কথা বলতে পারে না, স্কুলে হাত তুলতে পারে না, রাস্তায় চোখ তুলতে পারে না, সে কম্পিউটারকে আদেশ দিতে পারে। কম্পিউটার শোনে। কম্পিউটার মানে।

কিন্তু কম্পিউটার ছাড়া বাকি পৃথিবী শোনে না।

"মেয়ে কোডিং করে?"

এই প্রশ্ন সুমাইয়া শুনেছে অসংখ্যবার। স্কুলে, যখন কম্পিউটার ক্লাসে বলেছিল প্রোগ্রামিং শিখতে চায়। শিক্ষক বলেছিলেন, "তুমি অফিস শেখো, প্রোগ্রামিং ছেলেদের জন্য।" কলেজে, যখন বলেছিল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। বন্ধুরা হেসেছিল। আত্মীয়রা বলেছিল, "মেয়েদের লজিক কম।"

মেয়েদের লজিক কম। এই বাক্যটা একটা প্রাচীর। এই বাক্যটা একটা তালা। এই বাক্যটা দিয়ে হাজার হাজার মেয়ের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রাচীর ভাঙা যায়। তালা খোলা যায়। কোড দিয়ে।

সুমাইয়া ক্লাস টেনে থাকতে পাইথন শিখেছিল। ইউটিউবে ফ্রি টিউটোরিয়াল দেখে। "পাইথন ফর বিগিনার্স।" রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে বাবার কম্পিউটারে বসত। স্ক্রিনের আলো কম করে রাখত যাতে কেউ টের না পায়।

লুকিয়ে কোডিং করত। যেমন অনেক মেয়ে লুকিয়ে বই পড়ে, লুকিয়ে ডায়েরি লেখে, লুকিয়ে স্বপ্ন দেখে, সুমাইয়া লুকিয়ে কোড লিখত।

প্রথম প্রোগ্রাম: একটা ক্যালকুলেটর। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ। সরল, কিন্তু সুমাইয়ার কাছে সেটা পৃথিবী জয় করার মতো ছিল। আমি মেশিনকে বলেছি হিসেব করতে, সে করেছে। আমার লজিক কাজ করেছে। আমার লজিক।

সুমাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে পড়েছে।

কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। পরিবারের সামর্থ্য ছিল না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর, আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই-তে চান্স পায়নি। বাংলায় পেয়েছিল। পড়েছে।

কিন্তু কোডিং থামায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ত দিনে, রাতে কোড লিখত। জাভাস্ক্রিপ্ট শিখেছিল। রিঅ্যাক্ট শিখেছিল। নোড.জেএস শিখেছিল। ডেটাবেস শিখেছিল।

ক্লাসে সাহিত্য পড়ত, ঘরে সফটওয়্যার বানাত। দুটো জগৎ। দুটো ভাষা। রবীন্দ্রনাথ আর পাইথন। জীবনানন্দ আর জাভাস্ক্রিপ্ট।

কেউ জানত না। বন্ধুরা জানত না সুমাইয়া কোড লিখে। পরিবার জানত, কিন্তু গুরুত্ব দিত না। "ওসব নিয়ে কী হবে? চাকরি পাবি?" সুমাইয়া উত্তর দিত না। উত্তর দিত কোড দিয়ে।

অ্যাপ।

আইডিয়াটা এসেছিল নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। সুমাইয়া মাসিকের হিসেব রাখত ক্যালেন্ডারে, হাতে লিখে। কিন্তু ক্যালেন্ডার হারিয়ে যেত, ভুলে যেত, আর কাউকে দেখাতে পারত না কারণ লজ্জা।

বাংলাদেশে মেয়েদের পিরিয়ড নিয়ে কথা বলা নিষেধ। পিরিয়ড ট্র্যাক করা? সেটা তো আরো নিষেধ। কিন্তু ট্র্যাক না করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনিয়মিত পিরিয়ড ধরা পড়ে না। গর্ভধারণ পরিকল্পনা করা যায় না। শরীরের ভাষা বোঝা যায় না।

সুমাইয়া ভাবল: আমি একটা অ্যাপ বানাব। বাংলায়। সহজ। ফ্রি। মেয়েরা ফোনে ট্র্যাক করবে, কেউ দেখবে না, কেউ জানবে না।

ছয় মাস লেগেছিল বানাতে। একা। রাতে কোড লিখত, সকালে টেস্ট করত, বিকেলে বাগ ফিক্স করত। ইউআই বানিয়েছিল নিজে, ব্যাকেন্ড বানিয়েছিল নিজে, ডেটাবেস ডিজাইন করেছিল নিজে।

অ্যাপের নাম রেখেছিল "নিশ্চিন্তা।"

নিশ্চিন্তা। কারণ এই অ্যাপ ব্যবহার করলে মেয়েরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে। কখন পিরিয়ড আসবে জানবে। শরীরের প্যাটার্ন বুঝবে। ডাক্তারকে ডেটা দেখাতে পারবে।

গুগল প্লে স্টোরে আপলোড করেছিল। প্রথম সপ্তাহে ডাউনলোড: সাতচল্লিশ।

সাতচল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার।

তিন বছরে। মুখে মুখে ছড়িয়েছে। ফেসবুক গ্রুপে শেয়ার হয়েছে। মেয়েরা মেয়েদের বলেছে। হোয়াটসঅ্যাপে লিংক পাঠিয়েছে। একটা অদৃশ্য নেটওয়ার্ক, মেয়েদের নেটওয়ার্ক, যেটা পুরুষেরা দেখতে পায় না, সেই নেটওয়ার্কে "নিশ্চিন্তা" ছড়িয়েছে।

পঞ্চাশ হাজার মেয়ে এই অ্যাপ ব্যবহার করে। পঞ্চাশ হাজার। শহরে, গ্রামে, বস্তিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। প্রতিদিন তারা অ্যাপ খোলে, তারিখ দেয়, লক্ষণ নোট করে, আর অ্যাপ তাদের বলে পরেরটা কখন আসবে।

সুমাইয়া ডেটা দেখে। অ্যানালিটিক্স। কতজন ব্যবহার করে, কখন ব্যবহার করে, কোন ফিচার বেশি ব্যবহার করে। সংখ্যা, প্যাটার্ন, গ্রাফ। সুমাইয়ার কাছে এগুলো শুধু সংখ্যা না। প্রতিটা সংখ্যা একজন মেয়ে। প্রতিটা ডেটা পয়েন্ট একটা শরীর। প্রতিটা নোটিফিকেশন একটা জীবন যেটা একটু সহজ হয়েছে।

"মেয়েদের লজিক কম।"

পঞ্চাশ হাজার ডাউনলোড। এটাই উত্তর।

চাকরি পেয়েছিল একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে।

ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করেছিল, "আপনার ডিগ্রি বাংলা সাহিত্যে?" সুমাইয়া বলেছিল, "হ্যাঁ।" ইন্টারভিউয়ার একটু থেমেছিল। "কম্পিউটার সায়েন্সে না?" "না।" আরো একটু চুপ। "তাহলে কোডিং কোথায় শিখলেন?" "নিজে।"

গিটহাব প্রোফাইল দেখিয়েছিল। "নিশ্চিন্তা" অ্যাপ দেখিয়েছিল। কোড রিভিউ হয়েছিল। ইন্টারভিউয়ার কোড দেখে কিছুক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলেছিল, "ক্লিন কোড।"

দুটো শব্দ। কিন্তু সেই দুটো শব্দে "মেয়ে হয়ে" বলে কোনো উপসর্গ ছিল না। শুধু কোডের মূল্যায়ন। কোড লিঙ্গ দেখে না। কোড দেখে লজিক, স্ট্রাকচার, এফিশিয়েন্সি। কোডের কাছে সবাই সমান।

চাকরি পেয়েছিল। জুনিয়র ডেভেলপার। বেতন: ত্রিশ হাজার টাকা। বাংলা সাহিত্যের গ্র্যাজুয়েটের জন্য এটা অকল্পনীয়। কিন্তু সুমাইয়া বাংলা সাহিত্যের গ্র্যাজুয়েট হলেও প্রোগ্রামার। এবং প্রোগ্রামারের মূল্য কোডে, ডিগ্রিতে না।

অফিসে সুমাইয়া দশজনের টিমে একমাত্র মেয়ে।

পরিচিত পরিস্থিতি। বাংলাদেশে সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে মেয়ে কম। খুব কম। মিটিংয়ে সুমাইয়া কথা বললে কেউ কেউ একটু অবাক হয়। যেন মেয়ে টেকনিক্যাল কথা বললে সেটা আলাদা ঘটনা।

একদিন কোড রিভিউতে একটা ছেলে বলেছিল, "এই অ্যাপ্রোচ কাজ করবে না।" সুমাইয়া জিজ্ঞেস করেছিল, "কেন?" ছেলেটা ব্যাখ্যা দিয়েছিল। সুমাইয়া ভুল ধরিয়ে দিয়েছিল, ব্যাখ্যায়, ডেটা দিয়ে, পারফরম্যান্স টেস্টের ফলাফল দিয়ে।

ছেলেটা চুপ হয়ে গিয়েছিল। তারপর বলেছিল, "ঠিক আছে, তোমার অ্যাপ্রোচ ভালো।"

সুমাইয়া জানে: এই যুদ্ধ প্রতিদিনের। প্রতিটা মিটিংয়ে, প্রতিটা কোড রিভিউতে, প্রতিটা প্রজেক্টে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু সুমাইয়ার অস্ত্র আছে। কোড। কোড মিথ্যা বলে না। কোড কাজ করলে কাজ করে, না করলে করে না। কোনো তর্ক নেই, কোনো মতামত নেই, কোনো পক্ষপাত নেই। কোড চূড়ান্ত সত্য।

রাতে সুমাইয়া "নিশ্চিন্তা" অ্যাপের আপডেট করে।

অফিসের কাজ শেষে। নিজের সময়ে। কোনো পারিশ্রমিক নেই। অ্যাপটা ফ্রি, বিজ্ঞাপন নেই, ইন-অ্যাপ পার্চেজ নেই। সুমাইয়া চায় না মেয়েদের স্বাস্থ্য দিয়ে ব্যবসা করতে। এই অ্যাপ তার দান। তার কোডের দান। তার লজিকের দান।

ইউজাররা রিভিউ লেখে। প্লে স্টোরে।

"অনেক কাজের অ্যাপ। আগে হিসেব রাখতে পারতাম না।"

"বাংলায় এরকম অ্যাপ আগে পাইনি।"

"আমার ছোট বোনকেও ইনস্টল করে দিয়েছি।"

"এই অ্যাপ বানানোর জন্য ধন্যবাদ।"

সুমাইয়া রিভিউগুলো পড়ে। প্রতিটা। একটাও বাদ দেয় না। কারণ প্রতিটা রিভিউ একজন মেয়ের কাছ থেকে। প্রতিটা রিভিউ বলছে: তোমার লজিক কাজ করেছে। তোমার লজিক আমার জীবন সহজ করেছে।

তারা বলে মেয়েদের লজিক কম। আমি লজিক দিয়ে পঞ্চাশ হাজার মেয়ের জীবন সহজ করেছি।

১০

সুমাইয়ার ঘরে একটা পোস্টার আছে দেয়ালে।

নিজে বানিয়েছে। সাদা কাগজে কালো মার্কার দিয়ে লেখা। একটা লাইন:

`if (gender == "female") { logic = "less"; } // This is a bug. Fix it.`

কোডের ভাষায় লেখা একটা সত্য। যদি লিঙ্গ মেয়ে হয়, তাহলে লজিক কম, এটা একটা বাগ। এটা ঠিক করো।

সুমাইয়া বাগ ফিক্স করে। প্রতিদিন। কোডের বাগ, সমাজের বাগ। কোডের বাগ সহজ, কয়েক লাইন ঠিক করলেই হয়। সমাজের বাগ কঠিন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম লাগে।

কিন্তু শুরু করতে হয়। কোথাও থেকে শুরু করতে হয়। সুমাইয়া শুরু করেছে। পাঁচশো কন্ট্রিবিউশন। পঞ্চাশ হাজার ইউজার। একটা অ্যাপ। একটা চাকরি। একটা প্রমাণ।

রাত গভীর হয়। সুমাইয়া ল্যাপটপ বন্ধ করে। স্ক্রিন অন্ধকার হয়। ঘরে নীরবতা।

কাল সকালে আবার কোড লিখবে। আবার লজিক তৈরি করবে। আবার বাগ ফিক্স করবে। কোডের বাগ। সমাজের বাগ।

একটা একটা করে। একটা লাইন একটা লাইন করে। কারণ কোডও একটা একটা লাইন করে লেখা হয়। আর পঞ্চাশ হাজার লাইন জমা হলে একটা অ্যাপ হয়। পঞ্চাশ হাজার মেয়ে জমা হলে একটা আন্দোলন হয়।

সুমাইয়া লাইন লেখে। ধৈর্য ধরে। একটা একটা করে।