রাঁধুনি

রান্নাঘর আমার ল্যাবরেটরি। মশলা আমার রাসায়নিক।

পর্ব ৬৬ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

কমলার হাত দেখলে বোঝা যায়।

আঙুলের ডগায় পুরোনো পোড়ার দাগ। তেলের ছিটে, উনুনের আঁচ, ভাজার কড়াইয়ের কিনারা। বাঁ হাতের তালুতে কাটাকাটির রেখা, যেগুলো হাতের রেখার সাথে মিশে গেছে, আলাদা করা যায় না। ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝখানে বঁটির চাপের ক্ষত, পঁচিশ বছরের পুরোনো, চামড়া সেখানে পুরু হয়ে গেছে, অনুভূতিশূন্য। কমলা সেই আঙুল দিয়ে গরম হাঁড়ি ধরতে পারে, অন্য কেউ পারে না।

পঞ্চাশ বছর বয়স। তিন গ্রামে তার নাম। কমলা রাঁধুনি। বিয়ের রান্না, মিলাদের রান্না, আকিকার রান্না, খতমের রান্না, শোকের রান্না। যে কোনো অনুষ্ঠান, দুশো মানুষের খাবার, একটা নাম আসে মানুষের মুখে। কমলা।

কমলা নিজে এই নামটা বেছে নেয়নি। নামটা তাকে বেছে নিয়েছে। যেভাবে নদী তার পথ বেছে নেয়, মানুষ ঠিক করে না, জল ঠিক করে। কমলার জীবনে রান্না এসেছে সেভাবে। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, নানির চুলার ধারে বসে বসে, না জেনে, না বুঝে, শরীরে ঢুকে গেছে। মশলার গন্ধে নাক তৈরি হয়েছে, আঁচের রঙে চোখ তৈরি হয়েছে, তরকারির ঘনত্বে আঙুল তৈরি হয়েছে।

কোনো লেখা রেসিপি নেই। কোনো বই নেই। কোনো মাপের চামচ নেই।

সব মাথায়।

আজ মজিদ সাহেবের মেয়ের বিয়ে।

সকাল পাঁচটায় কমলা পৌঁছেছে। ভোরের আলো তখনো আসেনি পুরোপুরি, পুবে একটু লালচে আভাস। উঠানে তিনটে বড় চুলা বানানো হয়েছে ইট দিয়ে, ওপরে লোহার রড, তার ওপর হাঁড়ি বসবে। কাঠ আছে স্তূপ করে রাখা, আম গাছের কাঠ, জ্বালানি ভালো, আঁচ সমান থাকে। কমলা কাঠ দেখে বুঝতে পারে রান্না কেমন হবে। ভেজা কাঠ হলে সমস্যা। ধোঁয়া বেশি হবে, আঁচ ওঠানামা করবে, পোলাওয়ের চাল সমান সিদ্ধ হবে না। আজকের কাঠ শুকনো। কমলা সন্তুষ্ট।

দুশো মানুষের মেনু। পোলাও, মুরগির রোস্ট, মাংসের কোর্মা, মিক্সড সবজি, ডাল, বোরহানি, জর্দা। সাতটা আইটেম। প্রতিটার জন্য আলাদা সময়, আলাদা আঁচ, আলাদা মশলার অনুপাত। কমলার মাথায় এই সবকিছু একটা ছকের মতো সাজানো। কোনটা আগে শুরু করতে হবে, কোনটা পরে, কোন হাঁড়িতে কতক্ষণ ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে, কখন খুলতে হবে, কখন নাড়তে হবে। এই ছক কেউ শেখায়নি। এটা তৈরি হয়েছে শত শত রান্নার অভিজ্ঞতায়, ব্যর্থতায়, পোড়া ভাতে, নোনতা তরকারিতে, কাঁচা মাংসে।

কমলা তার সাহায্যকারীদের নির্দেশ দেয়। তিনজন মেয়ে, গ্রামের, কমলার হাতে তৈরি। "রহিমা, পেঁয়াজ কাট। বারিক। চোখে জল আসবে, আসুক, থামো না। পেঁয়াজ কাটতে গেলে কাঁদতে হয়, এটাই নিয়ম।" "সখিনা, মশলা বাটো। আদা-রসুন আলাদা, জিরা-ধনে আলাদা। মেশাবো আমি, তুমি বাটো শুধু।" "ফাতেমা, চাল ধুয়ে ভিজিয়ে রাখো। বাসমতি। ঘণ্টাখানেক ভিজবে। তারপর ছেঁকে নেবে।"

নির্দেশগুলো সংক্ষিপ্ত, পরিষ্কার। কমলা বেশি কথা বলে না। রান্নাঘরে বেশি কথা বললে হাত থেমে যায়। হাত চলবে, মুখ কম চলবে।

রান্নাঘর আমার ল্যাবরেটরি। মশলা আমার রাসায়নিক।

কমলা এই কথাটা একবার বলেছিল মজিদ সাহেবের বড় ছেলেকে। ছেলেটা ঢাকায় পড়ে, কেমিস্ট্রি, ছুটিতে এসেছিল, রান্নাঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করেছিল, "কমলা খালা, এত মশলা কিভাবে মেলান?" কমলা হেসে বলেছিল কথাটা। ছেলেটা হেসেছিল। কিন্তু কমলা হাসেনি ভেতরে। কমলা জানে কথাটা সত্যি।

হলুদের পরিমাণ একটু বেশি হলে তরকারি তেতো হবে। একটু কম হলে রঙ আসবে না। ঠিক পরিমাণটা কত? কমলা বলতে পারবে না চামচে মেপে। কিন্তু হাতে নিলে বুঝবে। হাতের তালুতে যতটুকু হলুদ থাকলে সেটা "ঠিক" মনে হয়, সেটাই ঠিক। এই "মনে হওয়া" কোথা থেকে আসে? কমলা জানে না। শরীর জানে। শরীর শিখেছে মায়ের হাত দেখে, নানির হাত দেখে, তাদেরও আগে কারো হাত দেখে যাদের নাম কমলা জানে না।

লবণ চাখতে হয়। এটা কমলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। হাঁড়ি থেকে একটু ঝোল তুলে নেয় হাতার প্রান্তে, ফুঁ দেয়, জিভে ঠেকায়। এক সেকেন্ড। সেই এক সেকেন্ডে কমলার জিভ বলে দেয় লবণ ঠিক আছে কিনা, ঝাল ঠিক আছে কিনা, মশলা ঠিক আছে কিনা। এক সেকেন্ডে পুরো রান্নার বিচার। কোনো যন্ত্র নেই, কোনো মাপকাঠি নেই। শুধু জিভ। শুধু অভিজ্ঞতা।

কমলা ভাবে, ডাক্তারকে মানুষ শ্রদ্ধা করে। ডাক্তার রোগ নির্ণয় করে, ওষুধ দেয়। ইঞ্জিনিয়ারকে শ্রদ্ধা করে। সে বাড়ি বানায়, রাস্তা বানায়। কিন্তু রাঁধুনিকে কেউ শ্রদ্ধা করে? দুশো মানুষের খাবার, সাতটা পদ, একটা ভুল হলে পুরো বিয়ে মাটি। এই দায়িত্বটা কার কাঁধে? কমলার। কিন্তু কমলাকে কেউ "প্রফেশনাল" বলে না। বলে "রাঁধুনি।" শব্দটাই ছোট করে দেওয়া হয়েছে। রান্না করে যে, সে রাঁধুনি। রান্না তো কাজ, পেশা নয়। এটা পুরুষের ভাষা। পুরুষ যখন রান্না করে, সে "শেফ।" নারী যখন রান্না করে, সে "রাঁধুনি।" পার্থক্যটা ভাষায়। পার্থক্যটা মূল্যায়নে।

পোলাও চড়েছে।

কমলা চুলার সামনে বসে আঁচ দেখছে। পোলাওয়ের আঁচ সবচেয়ে কঠিন। শুরুতে তেজ আঁচ, ঘি গলবে, পেঁয়াজ ভাজা হবে সোনালি, মশলা ছড়ানো হবে, গন্ধ উঠবে। তারপর চাল পড়বে, পানি পড়বে, ঢাকনা দেওয়া হবে। এরপর আঁচ কমবে, ধীরে ধীরে, একটু একটু করে। চাল ফুলবে, পানি শুকোবে, বাষ্প ঘুরবে হাঁড়ির ভেতর। এই পর্যায়ে কমলা কান পেতে রাখে। হাঁড়ির ভেতর থেকে যে শব্দ আসে, সেটা বলে দেয় পোলাও কোন পর্যায়ে আছে। বুদবুদ করছে মানে পানি আছে। চুপ হয়ে গেলে মানে পানি শুকিয়েছে। একটু মচমচ শব্দ আসলে মানে তলায় ধরতে শুরু করেছে, এখন নামাতে হবে।

কমলা হাঁড়ির ভাষা বোঝে।

পোলাওয়ের পরে মাংসের কোর্মা। কোর্মার মশলা কমলা নিজে বাটে। দোকানের গুঁড়ো মশলা ব্যবহার করে না। "গুঁড়ো মশলায় ভেজাল। আর গুঁড়ো মশলায় গন্ধ থাকে না। মশলা তখনই বাটতে হয় যখন রান্না করবে। গন্ধ তাজা থাকে।" কমলার এই নিয়ম অনড়। কেউ কেউ বলে, "কমলা খালা, গুঁড়ো মশলা দিলে সময় বাঁচে।" কমলা বলে, "সময় বাঁচিয়ে স্বাদ কমাবো কেন?"

দুপুর হচ্ছে। রোদ তীব্র। রান্নাঘরে ধোঁয়া আর গরম। কমলার কপালে ঘাম। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নেয়। পেছনে রহিমা পেঁয়াজ ভাজছে, চোখ লাল। সখিনা মুরগি কাটছে, ধারালো বঁটিতে। ফাতেমা জর্দার জন্য চিনির শিরা তৈরি করছে। তিনটে মেয়ে, তিনটে কাজ, কমলার নির্দেশে।

কমলা ভাবে, এটা একটা অর্কেস্ট্রা। সে কন্ডাক্টর। কিন্তু কেউ তাকে কন্ডাক্টর বলবে না। বলবে "পাচক।" বলবে "বুয়া।" বলবে "ও যে রান্না করে।"

কমলার মা জয়গুন বিবি। মারা গেছে বারো বছর আগে।

জয়গুন বিবি ছিলেন এই এলাকার রাঁধুনি, কমলার আগে। তার আগে কমলার নানি। তার আগে কে ছিল কমলা জানে না। কিন্তু জানে এই জ্ঞান একটা নদীর মতো বয়ে এসেছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, মা থেকে মেয়ে, হাত থেকে হাত। কোনো বই লেখা হয়নি। কোনো স্কুল হয়নি। শুধু চুলার পাশে দাঁড়ানো, দেখা, শেখা, করা।

জয়গুন বিবি বলতেন, "রান্না হলো ধৈর্যের কাজ। তাড়াহুড়া করলে পোড়ে। ধৈর্য ধরলে সিদ্ধ হয়। জীবনও তাই।"

কমলা এই কথাটা মনে রাখে। রান্না করতে করতে জীবনের কথা ভাবে। তার স্বামী গফুর রিকশা চালায়। ভালো মানুষ, কিন্তু আয় কম। কমলার রান্নার রোজগার সংসারের বড় সম্বল। একটা বিয়ের রান্নায় দুই-তিন হাজার টাকা পায়। মাসে তিন-চারটা অনুষ্ঠান। মাসে আট-দশ হাজার। গফুরের রিকশার আয়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু কমলার আয়ের কথা কেউ বলে না। গফুর "উপার্জন করে।" কমলা "একটু রান্না করে দেয়।" ভাষাটা লক্ষ্য করার মতো। পুরুষের কাজ "উপার্জন।" নারীর কাজ "একটু করে দেওয়া।"

কমলার মেয়ে সুমি। ক্লাস নাইনে পড়ে। সুমি রান্না শিখতে চায় না। বলে, "আম্মা, আমি পড়াশোনা করবো। চাকরি করবো।" কমলা কিছু বলে না। ভেতরে দুটো অনুভূতি একসাথে। একটা গর্ব, মেয়ে পড়বে, এগিয়ে যাবে। আরেকটা ভয়, এই জ্ঞান কি এখানেই থেমে যাবে? জয়গুন থেকে কমলা, কমলার পরে কে? সুমি রান্নাঘরে ঢুকতে চায় না। তাহলে কি এই নদী এখানে শুকিয়ে যাবে?

কমলা জানে, জোর করা যায় না। কিন্তু কিছু কিছু জ্ঞান হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। বইয়ে লেখা জ্ঞান ফেরানো যায়। কিন্তু হাতের জ্ঞান? নাকের জ্ঞান? জিভের জ্ঞান? এগুলো শরীর থেকে শরীরে যায়। বই থেকে যায় না।

বিকেল চারটা। রান্না শেষ।

কমলা উঠানে বসে একটু জল খায়। শরীরটা ক্লান্ত। ভোর পাঁচটা থেকে দাঁড়িয়ে আছে। পিঠে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা, চোখ জ্বালা করছে ধোঁয়ায়। কিন্তু ভেতরে একটা তৃপ্তি আছে যেটা অন্য কোনো কাজে পায় না। দুশো মানুষ খাবে তার হাতের রান্না। দুশো মানুষের পেট ভরবে। দুশো মুখে স্বাদ থাকবে।

অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। পুরুষেরা সামনের দিকে বসবে, মেয়েরা পেছনে। এটাও নিয়ম। পুরুষেরা আগে খাবে, মেয়েরা পরে। কমলা জানে এই নিয়ম। কমলা জানে এই নিয়মটা অন্যায়। কিন্তু কমলা কিছু বলে না। কমলার কাজ রান্না, নিয়ম ভাঙা নয়।

প্রথম পাত পড়ে গেছে। কমলা জানালা দিয়ে দেখে। পুরুষেরা খাচ্ছে। পোলাও মুখে দিয়ে একজন বলল, "ওয়াহ, কী পোলাও!" আরেকজন বলল, "মাংসটা গলে যাচ্ছে।" কমলা শোনে। এটা তার পুরস্কার। টাকা নয়। টাকা তো পাবেই। কিন্তু এই "ওয়াহ," এই মুখের তৃপ্তি, এটা কমলার আসল পারিশ্রমিক।

কেউ জিজ্ঞেস করবে না কে রেঁধেছে। খাওয়ার সময় কেউ ভাবে না। খাওয়ার পরেও না। কমলা রান্নাঘরে থাকে, অতিথিরা সামনে। দুটো জগৎ। রান্নাঘর আর ডাইনিং। রান্নাঘরে নারী, ডাইনিংয়ে পুরুষ। নারী রান্না করে, পুরুষ খায়।

তারা পেট ভরায়। আমি পেট ভরাই। পার্থক্যটা ক্রিয়াপদে।

কমলা মনে মনে হাসে। এই পার্থক্যটা সে বোঝে। "পেট ভরায়" মানে নিজের পেট, নিজের জন্য। "পেট ভরাই" মানে অন্যের পেট, অন্যের জন্য। পুরো জীবনটা এই ক্রিয়াপদের পার্থক্যে আটকে আছে।

রাতে কমলা বাড়ি ফেরে।

গফুর রিকশা নিয়ে আসে। কমলা ওঠে। হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ, ভেতরে বিয়ের খাবার, একটু পোলাও, একটু মাংস, সুমির জন্য একটু জর্দা। কমলা নিজে খায়নি এখনো। দুশো মানুষকে খাইয়েছে, নিজে খায়নি। এটাও নিয়ম। রাঁধুনি শেষে খায়।

রিকশায় বসে কমলা ভাবে। আজকের পোলাওটা ভালো হয়েছে। চাল ঠিকমতো ফুলেছে, মশলা ঠিকমতো মিশেছে, ঘি-র গন্ধটা ঠিক ছিল। কোর্মায় একটু বেশি লবণ পড়েছিল, কমলা বুঝতে পেরেছিল, একটু চিনি দিয়ে সামলে নিয়েছে। কেউ বুঝতে পারেনি। এটাই দক্ষতা। ভুল হওয়া দক্ষতা নয়, ভুল সামলানো দক্ষতা।

গফুর বলে, "ক্লান্ত?"

কমলা বলে, "হ্যাঁ।"

"কত দিলো?"

"তিন হাজার।"

গফুর মাথা নাড়ে। তিন হাজার। এগারো ঘণ্টার কাজ, তিন হাজার। ঘণ্টায় আড়াইশো টাকারও কম। কিন্তু কমলা হিসেব করে না ঘণ্টায়। কমলা হিসেব করে অনুষ্ঠানে। একটা বিয়ে, একটা রান্না, একটা পারিশ্রমিক।

বাড়ি পৌঁছে সুমি দরজা খোলে। "আম্মা, জর্দা এনেছো?"

"এনেছি।"

সুমি খায়। কমলা দেখে। সুমির মুখে যে তৃপ্তি, সেটা দুশো অতিথির তৃপ্তির চেয়ে বেশি দামি। কমলার কাছে।

কমলা শেষে খায়। ঠান্ডা ভাত, একটু ডাল, গতকালের তরকারি। বিয়ের খাবার সুমি আর গফুরকে দিয়েছে। কমলা ঠান্ডা ভাত খায়। এটাই কমলার রাতের খাবার। যে নারী দুশো মানুষের জন্য সাত পদ রান্না করেছে, সে রাতে ঠান্ডা ভাত খায়। কেউ এই গল্পটা লেখে না। কেউ এই গল্পটা জানেও না।

কমলার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। ক্লান্তি। কাল ভোরে উঠতে হবে। পরশু আবদুল করিমের ছেলের আকিকা। দেড়শো মানুষ। কমলা ঘুমায়। তার হাতে মশলার গন্ধ লেগে আছে, সাবানে যায় না, জলে যায় না। সেই গন্ধ কমলার পরিচয়। সেই গন্ধ কমলার স্বাক্ষর।