সবজি বাগানের নারী
পুরুষ মাঠে চাষ করে, বড় কথা। আমি উঠানে চাষ করি, কেউ গোনে না।
১
মর্জিনার বাড়ির আঙিনাটা ছোট।
চল্লিশ ফুট বাই ত্রিশ ফুট, মোটামুটি। উত্তরে টিনের ঘর, দক্ষিণে বাঁশের বেড়া, পূবে পুকুর, পশ্চিমে কাঁচা রাস্তা। এই চল্লিশ বাই ত্রিশ ফুটের ভেতরে মর্জিনা একটা পৃথিবী তৈরি করেছে। লাউয়ের মাচা উত্তর দিকে, ঘরের চালের কাছাকাছি, লতা উঠে গেছে বাঁশের খুঁটি বেয়ে, ঝুলছে তিনটে লাউ, সবুজ, মোটা, তৈরি। দক্ষিণের বেড়া ধরে পুঁইশাক, লাল ডাঁটা, পাতায় পাতায় ঘন, এক টান দিলে আধা কেজি আসে। পূব দিকে কুমড়ার ক্ষেত, মাটিতে বিছিয়ে আছে, হলুদ ফুল ফুটেছে, মৌমাছি ঘুরছে। পশ্চিমে ডাঁটাশাক, সারি সারি, সোজা, যেন কেউ স্কেল দিয়ে মেপে লাগিয়েছে। মর্জিনাই লাগিয়েছে। স্কেল ছাড়া। চোখে মেপে।
পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স। চারটে সন্তান। স্বামী জলিল রাজমিস্ত্রির কাজ করে, যখন কাজ থাকে। কাজ না থাকলে বাড়িতে বসে থাকে। মর্জিনার বাগান কোনোদিন বসে থাকে না। বাগানে সবসময় কিছু না কিছু হচ্ছে। কিছু না কিছু গজাচ্ছে, বাড়ছে, ফলছে, পাকছে।
মর্জিনা সকালে উঠে প্রথমে বাগানে যায়। নামাজের পরে, চা-র আগে। খালি পায়ে মাটিতে দাঁড়ায়। মাটি ভেজা কিনা দেখে। গাছের পাতায় পোকা আছে কিনা দেখে। কোন লাউ তৈরি হয়েছে কিনা ছুঁয়ে দেখে। এটা তার মর্নিং রাউন্ড। ডাক্তার যেমন ওয়ার্ডে রোগী দেখে, মর্জিনা তেমন বাগান দেখে।
২
পুরুষ মাঠে চাষ করে, বড় কথা। আমি উঠানে চাষ করি, কেউ গোনে না।
মর্জিনা এটা ভাবে প্রায়ই। জলিল যখন তিন বিঘা জমিতে ধান লাগায়, সবাই বলে, "জলিল ভাই চাষ করছে।" কৃষি কর্মকর্তা আসে, সার দেয়, পরামর্শ দেয়। সরকারের প্রকল্প আছে, ভর্তুকি আছে, প্রশিক্ষণ আছে। জলিলের নামে। মর্জিনার আঙিনার বাগান? কেউ গোনে না। কৃষি কর্মকর্তা আসেনি কোনোদিন। ভর্তুকি নেই। প্রশিক্ষণ নেই। কারণ এটা "মাঠের চাষ" নয়। এটা "বাড়ির কাজ।" মাঠের চাষ কৃষি। বাড়ির চাষ গৃহকর্ম। একটার পরিসংখ্যান হয়, আরেকটার হয় না। একটা GDP-তে যায়, আরেকটা অদৃশ্য থাকে।
কিন্তু মর্জিনার বাগান থেকে যে সবজি আসে, সেটা দিয়ে পরিবারের বারো মাসের তরকারি হয়। বারো মাস। বাজার থেকে সবজি কিনতে হয় না। এটা যদি টাকায় মাপা হয়, মাসে দেড়-দুই হাজার টাকার সবজি। বছরে কুড়ি হাজার। এই কুড়ি হাজার টাকা কেউ গোনে না। কারণ এটা "সঞ্চয়," "আয়" নয়। যেটা বাজার থেকে কেনা হচ্ছে না, সেটার মূল্য নেই। শুধু যেটা কেনা হচ্ছে, সেটার মূল্য।
মর্জিনা হিসেব করে। বারো মাস পরিবারের সবজি, এটা এক। এর বাইরে উদ্বৃত্ত। লাউ বেশি ফললে, কুমড়া বেশি ধরলে, পুঁইশাক বেশি হলে, সেটা হাটে নিয়ে যায়। প্রতি হাটবারে দুইশো-তিনশো টাকা। মাসে দুই-তিন হাজার। এটা মর্জিনার নিজের আয়। এটা জলিলের হাত দিয়ে যায় না। এটা মর্জিনার।
সেই টাকা দিয়ে মর্জিনা মেয়েদের খাতা-কলম কেনে। ছেলেদের জুতো কেনে। মাঝে মাঝে একটু তেল, একটু মশলা। ছোট ছোট খরচ যেগুলো জলিলের কাছে চাইতে হয় না। "চাইতে না হওয়া" মর্জিনার কাছে বড় ব্যাপার। চাওয়া মানে নির্ভরতা। না চাওয়া মানে স্বাধীনতা। মর্জিনার বাগান তাকে এই স্বাধীনতাটুকু দিয়েছে।
৩
মর্জিনার মা সাজেদা বেগম শিখিয়েছিলেন কোন মাটিতে কী হয়।
এঁটেল মাটিতে লাউ ভালো হয়। দো-আঁশে কুমড়া। বেলে মাটিতে মুলা। মাটি চেনা মর্জিনার প্রথম পাঠ। মাটি হাতে নিয়ে টিপে দেখলে বোঝা যায়। আঠালো হলে এঁটেল, ঝুরঝুরে হলে বেলে, মাঝামাঝি হলে দো-আঁশ। সাজেদা বেগম বলতেন, "মাটি মিথ্যা বলে না। তুই ভালো দিলে ভালো ফেরত দেবে। খারাপ দিলে কিছু দেবে না।"
মর্জিনা জৈব সার ব্যবহার করে। গোবর, পচা পাতা, ছাই, মাছের কাঁটা পচানো জল। রাসায়নিক সার দেয় না। টাকা নেই বলে নয়। মা শেখাননি বলে। "তোর নানি রাসায়নিক সার চিনত না। তবু ক্ষেতে ফসল হতো। মাটিকে খাওয়া, মাটি তোকে খাওয়াবে।"
এই জ্ঞান কেউ স্বীকার করে না। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানীরা যখন "জৈব চাষ" নিয়ে কথা বলে, সেমিনার করে, পেপার লেখে, তখন মর্জিনাদের কথা ওঠে না। মর্জিনারা জৈব চাষ করে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, নাম ছাড়া, স্বীকৃতি ছাড়া, শুধু অভ্যাসে, শুধু উত্তরাধিকারে।
মর্জিনা বীজ রাখে। এটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি মৌসুমে ভালো লাউ থেকে বীজ বের করে শুকায়, রাখে টিনের কৌটায়। কুমড়ার বীজ, ডাঁটার বীজ, পুঁইশাকের বীজ। বাজারে বীজ কিনতে যায় না। কারণ বাজারের বীজে কী আছে সে জানে না। কিন্তু নিজের বীজে কী আছে সে জানে। সে জানে এই বীজ তার মায়ের বাগান থেকে এসেছে, তার নানির বাগান থেকে, তারও আগে কোনো নারীর হাত থেকে যার নাম আর কেউ মনে রাখেনি।
৪
মর্জিনার বাগানে মৌসুম আছে। প্রতিটা মৌসুমে বাগানের চেহারা বদলায়।
বর্ষায় লাউ আর কুমড়ার রাজত্ব। পানি পেলে এরা পাগলের মতো বাড়ে, লতা ছড়ায় চারদিকে, পাতায় পাতায় ঢেকে যায় মাটি। মর্জিনাকে ছাঁটাই করতে হয়, নইলে একটা গাছ আরেকটাকে চাপা দেবে। বর্ষায় পোকার উপদ্রব বেশি। শামুক আসে, পাতা খায়। মর্জিনা ছাই ছিটায় গোড়ায়, নিমপাতা সেদ্ধ করে স্প্রে করে। এগুলো মায়ের কাছ থেকে শেখা। রাসায়নিক কীটনাশকের নাম মর্জিনা জানে, কিন্তু ব্যবহার করে না। "বিষ দিয়ে সবজি ফলিয়ে ছেলেমেয়েদের খাওয়াবো?"
শরতে বাগান একটু বিশ্রাম নেয়। পুরোনো গাছ শেষ হয়, নতুন লাগানোর প্রস্তুতি চলে। মর্জিনা মাটি খোঁড়ে, গোবর মেশায়, রোদে শুকাতে দেয়। মাটি তৈরি করা মানে পরের মৌসুমের ভিত গড়া। এই কাজটা কেউ দেখে না। ফসল দেখে সবাই, মাটি তৈরির কাজ কেউ দেখে না। শুরুর কাজ সবসময় অদৃশ্য।
শীতে বাগানের সবচেয়ে ভালো সময়। ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, পালংশাক, লালশাক। মর্জিনার বাগান তখন রঙিন হয়ে ওঠে। সবুজের ভেতরে সাদা ফুলকপি, বেগুনি বাঁধাকপি, লাল পালংশাকের ডাঁটা। মর্জিনা এই রঙ দেখে খুশি হয়। এই খুশিটা কেউ বোঝে না। একটা ফুলকপি তৈরি হতে তিন মাস লাগে। সেই তিন মাসের পানি দেওয়া, পোকা মারা, আগাছা তোলা, সব মিলিয়ে যখন একটা গোল, সাদা, ভারী ফুলকপি হাতে আসে, সেই মুহূর্তটা মর্জিনার।
গরমে করলা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা। এগুলো মাচায় ওঠে, ছায়া দেয়। মর্জিনার উঠান তখন সবুজ ছাউনি, ভেতরে ঢুকলে ঠান্ডা। বাচ্চারা খেলে সেই ছাউনির নিচে। মর্জিনা ভাবে, এই ছাউনি সে তৈরি করেছে। একটা বীজ থেকে। একটু মাটি, একটু পানি, একটু ধৈর্য।
৫
হাটবার। শনিবার।
মর্জিনা সকালে তিনটে লাউ, দুই আঁটি পুঁইশাক, এক ঝুড়ি ডাঁটা নিয়ে হাটে যায়। দুই কিলোমিটার হেঁটে। মাথায় ঝুড়ি। হাটে পৌঁছে জায়গা নেয় এক কোণায়, বড় দোকানদারদের পাশে নয়, কিনারায়। বড় দোকানদাররা পুরুষ, পাইকারি কেনে, ট্রাকে আনে, বড় বড় স্তূপ। মর্জিনা তিনটে লাউ আর দুই আঁটি শাক নিয়ে বসে। ছোট।
কিন্তু মর্জিনার লাউ ভালো। এটা ক্রেতারা জানে। "ও মর্জিনা আফার লাউ। টাটকা। বাগানে থিকা আনছে।" মর্জিনার সবজি আর পাইকারি সবজির পার্থক্য ক্রেতারা বোঝে। পাইকারি সবজি দুই দিন আগে তোলা, ট্রাকে ঘুরেছে, ধুলো খেয়েছে। মর্জিনার সবজি আজ সকালে তোলা। শিশিরের জল এখনো লেগে আছে।
তিনশো টাকা হয় আজকে। লাউ দুটো চল্লিশ টাকা করে, একটা পঞ্চাশ, পুঁইশাক দুই আঁটি ষাট করে, ডাঁটা সত্তর। মর্জিনা টাকাটা শাড়ির খুঁটে বাঁধে। এই তিনশো টাকার ওজন তার কাছে তিন হাজারের সমান। কারণ এটা তার। সম্পূর্ণ তার। মাটি থেকে আনা, হাত দিয়ে বড় করা, রোদে-জলে পালন করা।
বাড়ি ফিরে মর্জিনা হিসেব করে। মাসে তিনটা হাটবার, গড়ে আড়াইশো টাকা করে। মাসে সাতশো-আটশো। কখনো বেশি, কখনো কম। মৌসুমে নির্ভর করে। বর্ষায় লাউ-কুমড়া বেশি, দাম কম। শীতে ফুলকপি-বাঁধাকপি করে, দাম ভালো। গরমে পুঁইশাক-ডাঁটা, চাহিদা বেশি।
মর্জিনা একটা খাতায় লেখে না। মাথায় রাখে। কোন মাসে কত আয় হলো, কোন সবজি কত দামে গেল, কোথায় বেশি লাভ, কোথায় কম। এই হিসেব তার মাথায় চলে, সবসময়।
৫
একদিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেব এসেছিলেন মর্জিনার বাগান দেখতে। কে যেন বলেছিল। চেয়ারম্যান ঘুরে দেখলেন, বললেন, "ভালো করেছ মর্জিনা। সরকারের একটা প্রকল্প আছে, হোমস্টেড গার্ডেনিং, তোমাকে দিয়ে মডেল বানাবো।" মর্জিনা খুশি হয়েছিল। মনে হয়েছিল কেউ দেখছে, কেউ গুনছে।
তারপর কিছু হয়নি। চেয়ারম্যান আর আসেননি। প্রকল্পের কথা আর শোনা যায়নি। মর্জিনা অপেক্ষা করেছে কিছুদিন, তারপর অপেক্ষা ছেড়ে দিয়েছে। বাগান চালিয়ে গেছে। স্বীকৃতি ছাড়াই। স্বীকৃতি পেলে ভালো, না পেলেও বাগান থেমে থাকবে না। বাগান মর্জিনার প্রয়োজন, চেয়ারম্যানের নয়।
মর্জিনা ভাবে, তার মতো কতজন নারী আছে এই দেশে যারা আঙিনায় সবজি করে, পরিবার খাওয়ায়, হাটে বেচে, আয় করে। লাখ লাখ। কিন্তু কোনো পরিসংখ্যানে এরা নেই। কৃষি শুমারিতে জমির হিসেব আছে, মাঠের ফসলের হিসেব আছে। আঙিনার বাগান? নেই। কারণ আঙিনা "কৃষি জমি" নয়। আঙিনা "বাড়ির অংশ।" আর বাড়ির কাজ অর্থনীতির বাইরে। এই সীমানাটা কে টেনেছে? কে ঠিক করেছে মাঠ পর্যন্ত কৃষি, উঠান থেকে গৃহকর্ম? কেউ ঠিক করেনি হয়তো। ধীরে ধীরে এসেছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম, যতক্ষণ না সীমানাটা "স্বাভাবিক" হয়ে গেছে। স্বাভাবিক মানে অদৃশ্য। স্বাভাবিক মানে প্রশ্নহীন।
৬
বিকেলে মর্জিনা বাগানে পানি দেয়।
টিউবওয়েল থেকে পানি তুলে বালতিতে ভরে বাগানে ঢালে। একটা একটা গাছের গোড়ায়। লাউয়ের গোড়ায় বেশি পানি, লাউ পানি বেশি খায়। কুমড়ায় কম, কুমড়া সহ্য করতে পারে। পুঁইশাকে মাঝারি। প্রতিটা গাছের চাহিদা আলাদা, মর্জিনা সেটা জানে। এটা কেউ শেখায়নি, নিজে দেখেছে। কোন গাছে পানি কম দিলে পাতা নেতিয়ে পড়ে, কোনটায় বেশি দিলে গোড়া পচে।
জলিল বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে। মর্জিনা পানি দিচ্ছে। জলিল বলে, "ওই বাগান নিয়ে এত মাথা ঘামাস ক্যান? দুই টেকা আয় হয়।"
মর্জিনা কিছু বলে না। এটা তার উত্তর না দেওয়ার অভ্যাস। কিছু কথার উত্তর দিলে তর্ক হয়। তর্ক করে লাভ নেই। বাগান তার কাজ দেখিয়ে দেবে। যখন সবজি বাজার থেকে কিনতে হবে না, যখন হাটে থেকে টাকা আসবে, তখন জলিল বুঝবে। আসলে জলিল বোঝে। কিন্তু স্বীকার করে না। স্বীকার করলে মর্জিনার কাজের মূল্য দিতে হয়। মূল্য দিলে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলায়। পুরুষ সেটা চায় না।
মর্জিনার বড় মেয়ে রুবি। ক্লাস সেভেনে পড়ে। রুবি মাঝে মাঝে বাগানে আসে, মায়ের সাথে। পানি দেয়, আগাছা তোলে। মর্জিনা চুপচাপ শেখায়। "এইটা আগাছা, এইটা চারা। ভালো কইরা দেখ, পার্থক্য বুঝ।" রুবি শিখছে। হয়তো একদিন রুবিরও একটা বাগান হবে। হয়তো হবে না। কিন্তু অন্তত সে জানবে মাটি থেকে কিভাবে খাদ্য আসে। এই জানাটা মর্জিনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
৭
রাতে মর্জিনা রান্না করে নিজের বাগানের সবজি দিয়ে।
লাউ দিয়ে ডাল। পুঁইশাক ভাজা। ডাঁটার তরকারি চিংড়ি দিয়ে, পুকুর থেকে চিংড়ি ধরেছে ছোট ছেলে রাসেল। পুরো থালা ভর্তি, সবকিছু নিজের। চাল ছাড়া সবকিছু এই আঙিনা থেকে, এই পুকুর থেকে। মর্জিনা থালার দিকে তাকিয়ে একটা গোপন গর্ব অনুভব করে যেটা সে কাউকে বলে না। এই থালা তার সৃষ্টি। মাটি থেকে থালা পর্যন্ত, পুরো যাত্রা তার হাতের।
জলিল খায়। বাচ্চারা খায়। কেউ বলে না, "আম্মা, এই সবজি তুমি লাগিয়েছিলে।" কেউ ভাবে না। সবজি আছে, খাচ্ছে। কোথা থেকে এলো, কে বড় করলো, কে পানি দিলো, কে পোকা মারলো, এসব প্রশ্ন ওঠে না। খাবারের উৎস নিয়ে কেউ ভাবে না যতক্ষণ খাবার আছে। খাবার শেষ হলে প্রশ্ন ওঠে। তখন "কেন নেই?" ওঠে। "কে দিয়েছিল" ওঠে না।
মর্জিনা থালা গোছায়। বাসন মাজে। রান্নাঘর পরিষ্কার করে। তারপর বারান্দায় বসে। আকাশে চাঁদ আছে, পাতলা। বাগানের ওপর চাঁদের আলো পড়েছে। লাউয়ের মাচার ছায়া মাটিতে পড়েছে জালের মতো। কুমড়ার হলুদ ফুলগুলো রাতে বন্ধ হয়ে গেছে, সকালে আবার খুলবে।
মর্জিনা ভাবে, এই বাগান তার সন্তান। পঞ্চম সন্তান। চারটে মানুষের, একটা মাটির। মানুষের সন্তানরা বড় হয়ে চলে যাবে, ঘর ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে। কিন্তু এই সন্তান থাকবে। মাটি থাকবে। লাউ থাকবে। কুমড়া থাকবে। মর্জিনা যতদিন পানি দেবে, ততদিন।
চোখ বন্ধ করে। আগামীকাল সকালে আবার বাগানে যেতে হবে। নতুন ডাঁটার বীজ বুনতে হবে। লাউয়ের মাচায় নতুন বাঁশ দিতে হবে, পুরোনোটা পচে গেছে। কুমড়ার পাতায় সাদা পোকা দেখেছে, ছাই দিতে হবে গোড়ায়।
মর্জিনার মাথায় সবসময় বাগান। ঘুমের ভেতরেও। বৃষ্টির স্বপ্ন দেখলে ভালো লাগে, বাগানের জন্য ভালো। খরার স্বপ্ন দেখলে উদ্বেগ হয়। মর্জিনার স্বপ্ন পর্যন্ত বাগানের।