চরের মেয়ে

চর ভাঙে। আমি ভাঙি না।

পর্ব ৭২ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আমাদের চরের কোনো নাম নেই মানচিত্রে।

মানচিত্র বানায় যারা, তারা শহরে বসে বানায়। তারা জানে না যে ব্রহ্মপুত্রের বুকে একটা চর আছে, যেটা বর্ষায় ডুবে যায়, শীতে জেগে ওঠে, আর তার ওপরে মানুষ থাকে। গরু থাকে। ঘর থাকে। একটা স্কুল থাকে। একটা মসজিদ থাকে। একটা বাজার থাকে, যেখানে সপ্তাহে দুদিন হাট বসে। মানচিত্রে এসবের চিহ্ন নেই। যেন আমরা নেই।

আমার নাম ময়না। বয়স ষোলো। আমি চরের মেয়ে।

চরে জন্ম নেওয়া মানে নদীর সাথে জন্ম নেওয়া। নদী আমাদের দিয়েছে এই মাটি, নদী কেড়েও নেয় এই মাটি। নদীর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। নদী বলে না "এবার ভাঙব" বা "এবার ভাঙব না।" নদী যা করে চুপচাপ করে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি উঠানের একটা কোণা নদীতে গেছে। গতকাল যেখানে বাবা ধান শুকাতেন, আজ সেখানে পানি। এটা আমাদের জীবন। এটা প্রতি বছরের জীবন।

মা বলেন, "আমরা নদীর ভাড়াটিয়া। নদী চাইলে উচ্ছেদ করে।"

মা ঠিক বলেন। আমরা ভাড়াটিয়া। জমির মালিক নদী। আমরা শুধু থাকি, যতক্ষণ নদী থাকতে দেয়।

আমাদের স্কুলটা টিনের। তিনটা ঘর। একটায় ক্লাস ওয়ান থেকে থ্রি, একটায় ফোর থেকে ফাইভ, একটায় সিক্স থেকে এইট। নয় থেকে দশ নেই। তার জন্য যেতে হয় ওপারে, মূল ভূখণ্ডে, যেখানে হাইস্কুল আছে।

বর্ষায় স্কুল বন্ধ থাকে চার মাস। জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর। কখনো অক্টোবরও। পানি ওঠে, স্কুলের মেঝে ডুবে যায়, বেঞ্চ ভাসে। গত বছর ব্ল্যাকবোর্ডটা ভেসে গিয়েছিল। নতুন ব্ল্যাকবোর্ড আসতে তিন মাস লেগেছিল। তিন মাস আমরা ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া পড়েছি। স্যার মুখে বলতেন, আমরা কানে শুনতাম, খাতায় লিখতাম।

বছরে আট মাস স্কুল হয়। কখনো সাত। এই সাত মাসে বারো মাসের পড়া শেষ করতে হয়। শহরের মেয়েরা বারো মাস পড়ে। আমরা সাত মাস পড়ে তাদের সাথে একই পরীক্ষা দিই। একই প্রশ্নপত্র। একই সময়।

এটা ন্যায্য কিনা, আমি জানি না। কিন্তু এটাই আছে। যা আছে তা নিয়েই চলতে হয়। চরের মানুষ অভিযোগ করে না। অভিযোগ করার জায়গা নেই। কাকে করবে? নদীকে?

ক্লাস নাইনে ভর্তি হতে হলো ওপারের হাইস্কুলে। দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার। তিন কিলোমিটার চরের ভেতর দিয়ে, বাকি দুই কিলোমিটার নৌকায়। শুকনো মৌসুমে হেঁটে যাওয়া যায়, পানি কম থাকে, হাঁটু পর্যন্ত। বর্ষায় কোমর পর্যন্ত, কখনো বুক পর্যন্ত।

আমি হেঁটে যাই।

সকাল ছটায় বেরোই। স্কুল শুরু দশটায়। চার ঘণ্টা আগে বেরোতে হয়, কারণ পথ সোজা নয়। কোথাও পানি গভীর, ঘুরে যেতে হয়। কোথাও কাদা, পা বসে যায়, জুতো খুলে হাতে নিয়ে যেতে হয়। কোথাও সাপ থাকে, সাবধানে পা ফেলতে হয়। বর্ষায় সাপ বেশি, পানির সাথে আসে, কোথায় লুকিয়ে আছে বোঝা যায় না।

আমার সাথে আর দুটো মেয়ে যায়। রেশমা আর পারুল। রেশমা ক্লাস নাইনে, পারুল ক্লাস এইটে। তিনজন একসাথে। একা গেলে ভয় লাগে। তিনজন গেলে ভয় কম, কিন্তু পানি তো তিনজনের জন্য কমে না।

একদিন বর্ষায় যাচ্ছিলাম। পানি কোমর পর্যন্ত। ব্যাগ মাথায়। বইগুলো পলিথিনে মোড়া, তবু ভিজে যায়। সেদিন স্রোত বেশি ছিল। পারুলের পা পিছলে গেল। পারুল চিৎকার করল। আমি ধরলাম। রেশমা ধরল। তিনজন একসাথে দাঁড়ালাম স্রোতের মধ্যে, পানি ঠেলে যাচ্ছে, আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

পারুল কাঁদতে শুরু করল। "আর যাব না স্কুলে।"

আমি বললাম, "পানি যাবে। আমরা যাব।"

সেদিন স্কুলে পৌঁছাতে সাড়ে চার ঘণ্টা লেগেছিল। পৌঁছে দেখি জামা ভেজা, বই ভেজা, খাতা ভেজা। স্যার বললেন, "এই অবস্থায় এসেছিস?" আমি বললাম, "এসেছি তো।"

চরে বিদ্যুৎ নেই।

সোলার প্যানেল আছে কিছু ঘরে। আমাদের ঘরে একটা ছোট প্যানেল, সেটা দিয়ে একটা বাতি জ্বলে আর ফোন চার্জ হয়। এটুকু আলো দিয়ে পড়ি। বাতির আলো কম, চোখ কষ্ট পায়, কিন্তু পড়া তো থামানো যায় না।

বর্ষায় যখন স্কুল বন্ধ থাকে, তখন আমি ঘরে পড়ি। নিজে নিজে পড়ি। স্যার নেই, বই আছে। বই থাকলেই যথেষ্ট। বই থেকে যা বুঝি না, সেটা বুঝতে চেষ্টা করি। বারবার পড়ি। একবার না বুঝলে দুইবার। দুইবারে না বুঝলে তিনবার। তিনবারেও না বুঝলে রেখে দিই, পরে ফিরে আসি। ফিরে আসলে বোঝা যায় কখনো কখনো। সময় দিলে বোঝা যায়।

ইন্টারনেট নেই। শহরের মেয়েরা ইউটিউবে ভিডিও দেখে পড়ে। আমি বই দেখে পড়ি। তারা গুগলে সার্চ করে উত্তর পায়। আমি বই উলটে উত্তর খুঁজি। তারা অনলাইনে কোচিং করে। আমি একটা গাইড বই কিনে নিজে নিজে করি।

পার্থক্যটা বিশাল। কিন্তু পরীক্ষার খাতায় কেউ জিজ্ঞেস করে না, "তুমি কীভাবে পড়েছ?" পরীক্ষার খাতায় শুধু জিজ্ঞেস করে, "উত্তর কী?"

উত্তর আমি জানি। যেভাবেই পড়ি, উত্তর আমি জানি।

গত বছর চর ভেঙেছিল।

আমাদের ঘরের পেছনে যে জায়গাটা ছিল, যেখানে মায়ের পেঁপে গাছ ছিল, যেখানে আমি ছোটবেলায় খেলতাম, সেটা নদীতে গেছে। একরাতে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পেছনের দেয়ালের কাছে ফাটল। বাবা বলেছিলেন, "সরতে হবে।" ঘর তুলে সামনের দিকে সরেছি। পঞ্চাশ হাত সামনে। এটা তৃতীয়বার।

তৃতীয়বার ঘর সরানো। প্রতিবার ঘর ছোট হয়। প্রতিবার জমি কমে। প্রতিবার নদী এগিয়ে আসে। আমরা পিছিয়ে যাই।

বন্ধুরা বলে, "ময়না, শহরে চলে যা।" আমি বলি, "কোথায় যাব?" গ্রামে মাটি আছে, যতক্ষণ আছে। শহরে মাটি নেই। শহরে কংক্রিট আছে, আর কংক্রিটের ওপর দাঁড়াতে টাকা লাগে।

চর ভাঙে। মানুষ সরে। আবার জেগে ওঠে চর, আবার মানুষ ফেরে। এটা চক্র। নদীর চক্র। আমরা সেই চক্রের অংশ।

কিন্তু আমি ভাঙি না।

চর ভাঙে, আমি ভাঙি না। নদী ওঠে, আমি থাকি। পানি আসে, আমি হাঁটি। পানি যায়, আমি যাই। আমার পড়া থামে না। আমার হাঁটা থামে না। আমার যাওয়া থামে না।

HSC পরীক্ষা সামনে।

ছয় মাস বাকি। আমি প্রস্তুত নই। কেউ প্রস্তুত নয় চর থেকে। কিন্তু প্রস্তুত না হয়েও পরীক্ষা দিতে হয়। পরীক্ষা অপেক্ষা করে না। পরীক্ষা বলে না, "তোমার স্কুল চার মাস বন্ধ ছিল, তাই তোমাকে বেশি সময় দিচ্ছি।" পরীক্ষা সবাইকে একই তারিখ দেয়। ঢাকার মেয়ে আর চরের মেয়ে, একই তারিখ। একই ঘণ্টা। একই খাতা।

আমার টার্গেট GPA-5 নয়। আমার টার্গেট পাশ করা। পাশ করাটাই এখানে বিজয়। চর থেকে HSC পাশ করা মানে সাগর সাঁতরে পার হওয়া। কেউ বিশ্বাস করে না যে সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি।

আমার আগে এই চর থেকে কোনো মেয়ে HSC পাশ করেনি। ছেলে করেছে, দুজন। মেয়ে কেউ করেনি। মেয়েরা ক্লাস এইট-নাইনে বিয়ে হয়ে যায়। রেশমার বিয়ে হয়ে গেছে গত মাসে। ক্লাস নাইনে। বাবা বলেছিলেন, "পানি উঠলে মেয়ে রাখা মুশকিল।" রেশমা কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে শাড়ি পরেছিল। আমি দেখেছিলাম দূর থেকে। কিছু বলতে পারিনি।

পারুল এখনো আছে। পারুল বলে, "ময়না, তুই যদি পাশ কর, আমিও করব।" আমি বলি, "আমি পাশ করব।" পারুল জিজ্ঞেস করে, "কীভাবে?" আমি বলি, "পড়ে।"

উত্তর সরল। পদ্ধতি সরল। পড়ো, পাশ করো। কিন্তু চরে এই সরল কাজটা সবচেয়ে কঠিন। কারণ পড়ার আগে হাঁটতে হয়, সাঁতরাতে হয়, ভিজতে হয়, শুকাতে হয়, তারপর পড়তে হয়।

আজ সকালে বেরিয়েছিলাম স্কুলে। পানি নামছে, অক্টোবরের শেষ, কিন্তু এখনো হাঁটু পর্যন্ত কোথাও কোথাও। আকাশ পরিষ্কার। রোদ আছে। পথে একটা শালিক পাখি দেখলাম, মাটিতে বসে কী যেন খুঁটছিল। শালিক পাখি চরে অনেক। তারা চর ভাঙলেও উড়ে যায় না। থেকে যায়। পাখিরাও জানে, যেখানে জন্ম সেখানেই থাকতে হয়।

স্কুলে পৌঁছে দেখি ক্লাসে সাতজন। আগে পঁচিশজন ছিল। এগারোজন মেয়ে বিয়ে হয়ে গেছে। পাঁচজন শহরে চলে গেছে বাবার সাথে। দুজন আসেনি, কারণ পানি বেশি, ভয় পেয়েছে। সাতজন। সাতজন দিয়ে কী হয়?

সাতজন দিয়ে ক্লাস হয়। স্যার পড়ান, সাতজন শোনে। সাতজনের মধ্যে চারজন মেয়ে। চারজন মেয়ে, পুরো চরের, পুরো নদীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে, বেঞ্চে বসে, খাতা খুলে, লিখছে।

এটা বিপ্লব না? চারজন মেয়ে, চরের মেয়ে, বন্যার মেয়ে, ভাঙনের মেয়ে, বেঞ্চে বসে বীজগণিত শিখছে। এটা কেউ পত্রিকায় লেখে না। এটা কোনো এনজিও-র রিপোর্টে আসে না। কিন্তু এটা ঘটছে। প্রতিদিন ঘটছে। নিঃশব্দে ঘটছে।

রাতে ঘরে বসে পড়ি। সোলার বাতির আলো। পাশে মা ভাত বাড়ছেন। বাবা বাইরে বসে হুক্কা টানছেন। ছোট ভাই ঘুমিয়ে গেছে।

আমি রসায়ন পড়ছি। পর্যায় সারণি। মৌলগুলোর নাম মুখস্থ করছি। হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম। এই নামগুলো চরের ভাষা নয়। এই নামগুলো অন্য কোনো পৃথিবীর ভাষা, যেখানে ল্যাবরেটরি আছে, টেস্ট টিউব আছে, বুনসেন বার্নার আছে। আমি টেস্ট টিউব দেখিনি কোনোদিন। বইয়ে ছবি দেখেছি। ছবি দেখে পড়ি। ছবি থেকে কল্পনা করি। কল্পনা থেকে পরীক্ষার খাতায় লিখি।

কল্পনা দিয়ে বিজ্ঞান শেখা, এটা চরের মেয়েদের বিশেষ ক্ষমতা।

মা বলেন, "ময়না, খা।"

আমি বলি, "একটু পরে।"

মা বলেন, "ভাত ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।"

ভাত ঠাণ্ডা হয়। কিন্তু পড়া ঠাণ্ডা হতে দেওয়া যায় না। ঠাণ্ডা ভাত খাওয়া যায়, ঠাণ্ডা পড়া পাশ করায় না।

বাবা বলেন, "ময়না, তুই পড়ে কী হবি?"

আমি বলি, "শিক্ষক হব।"

বাবা হাসেন। সেই হাসি বিশ্বাসের হাসি না, সন্দেহের হাসি। চরের মেয়ে শিক্ষক হবে, এটা বাবার কাছে রূপকথা। বাবা রূপকথা শোনেন, কিন্তু বিশ্বাস করেন না। বাবা বিশ্বাস করেন বাস্তবে। বাস্তবে চরের মেয়েরা বিয়ে করে, সংসার করে, বাচ্চা মানুষ করে, বুড়ো হয়ে যায়। এটাই চক্র। বাবা এই চক্রের বাইরে কিছু কল্পনা করতে পারেন না।

কিন্তু আমি পারি।

আমি কল্পনা করি একটা ক্লাসরুম, যেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি, সামনে ত্রিশটা মুখ, আমি পড়াচ্ছি। হয়তো এই চরেই। হয়তো এই স্কুলে। যেই স্কুলে আমি পড়েছি, সেই স্কুলে আমি পড়াব। পানি আসলে বন্ধ থাকবে, পানি গেলে খুলবে। কিন্তু স্কুল থাকবে। আমি থাকব। মেয়েরা পড়বে।

এটা স্বপ্ন। চরের মেয়ের স্বপ্ন। চরের স্বপ্ন নদীর মতো, কখনো ভাসে, কখনো ডোবে। কিন্তু স্বপ্ন নদীর চেয়ে শক্ত। নদী মাটি ভাঙে, স্বপ্ন ভাঙে না। যদি না তুমি নিজে ভাঙো।

আমি নিজে ভাঙব না।

১০

পানি আসে, স্কুল ডুবে। পানি যায়, আমি যাই।

এটাই আমার জীবনের ছন্দ। এটাই আমার ক্যালেন্ডার। শহরের মেয়েদের ক্যালেন্ডারে জানুয়ারি-ডিসেম্বর। আমার ক্যালেন্ডারে পানি আসা আর পানি যাওয়া। পানি আসে মানে অপেক্ষা। পানি যায় মানে দৌড়। অপেক্ষা আর দৌড়, এই দুটো দিয়ে আমার বছর।

আমি HSC পাশ করব। চর ডুবলেও করব। নদী ভাঙলেও করব। স্কুল বন্ধ থাকলেও করব। কারণ আমি চরের মেয়ে, আর চরের মেয়ে জানে কীভাবে ডুবে গিয়েও ভেসে থাকতে হয়।

চর ভাঙে। প্রতি বছর ভাঙে। কখনো একটু, কখনো অনেকটা। মানুষ সরে যায়, ঘর সরে যায়, গাছ ভেসে যায়। কিন্তু চর আবার জাগে। নদীর অন্য কোথাও, নতুন পলি জমে, নতুন মাটি ওঠে, নতুন চর হয়। মানুষ আবার আসে। আবার ঘর বানায়। আবার থাকে।

চর ভাঙে। আমি ভাঙি না।

এটা আমার প্রতিজ্ঞা। নদীর কাছে। নিজের কাছে। রেশমার কাছে, যে পড়তে পারল না। পারুলের কাছে, যে আমাকে দেখে সাহস পায়।

আমি ভাঙব না। পানি যতই উঠুক, আমি দাঁড়িয়ে থাকব। যতদিন পা আছে, হাঁটব। যতদিন চোখ আছে, পড়ব। যতদিন নিঃশ্বাস আছে, চেষ্টা করব।

চরের মাটি নরম। পায়ের নিচে দেবে যায়। কিন্তু আমার সংকল্প নরম নয়।

আমি ময়না। চরের মেয়ে। ষোলো বছর। আর আমি HSC পাশ করব।

এমনকি এই চর ডুবে গেলেও।