ঢাকার ওয়ার্কিং উইমেন

ঢাকায় একা মেয়ে থাকা মানে প্রতিদিন ছোট ছোট যুদ্ধ।

পর্ব ৭৩ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

অ্যালার্ম বাজে সকাল সাড়ে পাঁচটায়।

ঘুম ভাঙে না। ঘুম ভাঙতে চায় না। শরীর বলে, "আরো দশ মিনিট।" মাথা বলে, "বাস মিস হবে।" শরীর আর মাথার এই তর্ক প্রতিদিনের। প্রতিদিন মাথা জেতে, কারণ বাস মিস হলে অফিসে দেরি হয়, দেরি হলে বসের মুখ দেখতে হয়, বসের মুখ দেখা মানে সারাদিন খারাপ যায়।

আমার নাম সোনিয়া। বয়স উনত্রিশ। একা থাকি। ঢাকায়।

ঢাকায় একা মেয়ে থাকা মানে প্রতিদিন ছোট ছোট যুদ্ধ। বড় যুদ্ধ না। বড় যুদ্ধ হলে সবাই দেখত, সবাই সাহায্য করত, সবাই বলত "তুমি বীর।" ছোট যুদ্ধ কেউ দেখে না। ছোট যুদ্ধ নিজে নিজে লড়তে হয়, নিজে নিজে জিততে হয়, আর জেতার পরে কেউ বাহবা দেয় না। কারণ কেউ জানেই না যে যুদ্ধ হয়েছে।

বরিশাল থেকে এসেছিলাম পাঁচ বছর আগে। বাবা বলেছিলেন, "ঢাকায় গিয়ে কী করবি?" আমি বলেছিলাম, "চাকরি করব।" বাবা বলেছিলেন, "মেয়ে মানুষ একা ঢাকায়?" মা চুপ ছিলেন। মা জানতেন আমি যাব। মা জানতেন আমাকে যেতে হবে। গ্রামে অনার্স পাশ করে বসে থাকার কোনো মানে হয় না, যখন চাকরি ঢাকায়। মা চুপ করে আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যাগের তলায় আচারের বয়াম রেখে দিয়েছিলেন। সেই আচারের স্বাদ এখনো মনে আছে।

সাড়ে পাঁচটায় উঠি। ছটায় গোসল। ছ-পনেরোয় কাপড় পরি। ছ-তিরিশে চা খাই, সাথে একটা বিস্কুট। সকালে রান্না করার সময় নেই। সাতটায় বেরোই। বাস স্টপে দাঁড়াই। বাস আসতে পনেরো-বিশ মিনিট। কখনো ত্রিশ। কখনো বাস আসেই না, অটো নিতে হয়, অটোতে আশি টাকা, বাসে পঁচিশ। তিনগুণেরও বেশি। মাসে এই বাড়তি খরচ জমে জমে দুই-তিন হাজার হয়ে যায়।

অফিস মতিঝিলে। আমি থাকি মিরপুরে। দূরত্ব বারো কিলোমিটার। সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। কখনো দুই ঘণ্টা। ঢাকার ট্র্যাফিক দুনিয়ার সবচেয়ে ধীর ট্র্যাফিক। গতি আছে, কিন্তু কেবল দাঁড়িয়ে থাকার গতি।

দিনে তিন ঘণ্টা যাতায়াতে যায়। মাসে নব্বই ঘণ্টা। বছরে এক হাজার ঘণ্টারও বেশি। এক হাজার ঘণ্টায় একটা ভাষা শেখা যায়, একটা দক্ষতা রপ্ত করা যায়, একটা বই লেখা যায়। আমি সেই ঘণ্টাগুলো ব্যয় করি বাসের জানালা দিয়ে ঢাকার জ্যাম দেখতে। এটা কি অপচয়? হ্যাঁ। কিন্তু বিকল্প কী? অফিসের কাছে ভাড়া নিলে বিশ হাজার লাগবে। মিরপুরে বারো হাজার। পার্থক্যটা আট হাজার। আট হাজার টাকার বিনিময়ে আমি দিনে তিন ঘণ্টা বেচি। এটা আমার জীবনের হিসাব।

বাসে উঠি।

বাসে মেয়েদের জন্য তিনটা সিট বরাদ্দ। তিনটা। পুরো বাসে ত্রিশটা সিট, তার মধ্যে তিনটা মেয়েদের। বাকি সাতাশটা পুরুষের। এই অনুপাত কে ঠিক করেছে? কোন হিসাবে? মেয়েরা কি বাসের দশ ভাগের এক ভাগ যাত্রী? নাকি দশ ভাগের এক ভাগ মানুষ?

মেয়েদের সিটগুলো সামনের দিকে, দরজার কাছে। যেন মেয়েরা দ্রুত নামবে, বেশিক্ষণ থাকবে না। পুরুষদের সিট পেছনে, প্রশস্ত। মেয়েদের সিট সরু, কাছাকাছি। যেন মেয়েদের শরীর কম জায়গা নেবে, কম জায়গায় ফিট হবে, কম দাবি করবে।

তিনটা সিটও পাওয়া যায় না সবসময়। ভিড়ের সময় পুরুষেরা মেয়েদের সিটে বসে থাকে। বললে হয় ওঠে, নয়তো বলে "সামনে যান।" "সামনে যান" মানে দাঁড়িয়ে যান। আমি দাঁড়াই। এক পায়ে ভর, ব্যাগ বুকে চেপে ধরে, কারণ পেছন থেকে কেউ ধাক্কা দেবে, পাশ থেকে কেউ ঘেঁষে দাঁড়াবে। ঢাকার বাসে মেয়ে হয়ে দাঁড়ানো মানে শরীরটাকে একটা বর্ম বানানো। প্রতিটা স্পর্শ সন্দেহজনক। প্রতিটা ধাক্কা ইচ্ছাকৃত কিনা বোঝার চেষ্টা করা।

একদিন একজন পেছন থেকে ধাক্কা দিল। আমি ঘুরে তাকালাম। সে চোখ সরিয়ে নিল। কিছু বললাম না। কী বলব? বাসে চিৎকার করলে সবাই তাকায়, কিন্তু কেউ পাশে দাঁড়ায় না। বরং কেউ কেউ বলবে, "মেয়েমানুষ বাসে কেন ওঠে?" যেন বাস পুরুষের সম্পত্তি, যেন রাস্তা পুরুষের জায়গা, যেন শহর পুরুষের শহর।

অফিসে পৌঁছাই সাড়ে আটটায়।

অফিস একটা প্রাইভেট কোম্পানি। মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট। আমি এক্সিকিউটিভ। বেতন পঁয়তাল্লিশ হাজার। শুনতে ভালো লাগে, পঁয়তাল্লিশ হাজার। কিন্তু ঢাকায় পঁয়তাল্লিশ হাজারে কী হয়?

বাসা ভাড়া বারো হাজার। খাওয়া ছয় হাজার। যাতায়াত তিন হাজার। ফোন বিল দেড় হাজার। বিদ্যুৎ-গ্যাস দুই হাজার। কাপড়চোপড়, প্রসাধনী, ওষুধ, মিলিয়ে আরো চার হাজার। বাবা-মাকে পাঠাই পাঁচ হাজার। জমা থাকে দশ হাজার। দশ হাজার টাকা মাসে। বছরে এক লাখ কুড়ি হাজার। এই টাকা দিয়ে কী করা যায়? একটা ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্ট? না। একটা গাড়ি? না। বিয়ের খরচ? সেটাও না। ভবিষ্যৎ? ভবিষ্যৎ ঢাকায় পঁয়তাল্লিশ হাজারে কেনা যায় না।

অফিসে রাজনীতি আছে। সব অফিসে আছে। কিন্তু মেয়ে হলে রাজনীতিটা অন্যরকম। প্রমোশনের সময় বস বলেন, "সোনিয়া, তুমি তো বিয়ে করবে, তারপর বাচ্চা হবে, ছুটি নেবে।" এটা কি প্রশ্ন? নাকি কারণ? প্রমোশন না দেওয়ার কারণ?

রাকিব, আমার সহকর্মী, আমার চেয়ে ছয় মাস পরে জয়েন করেছে। প্রমোশন পেয়েছে আমার আগে। রাকিবের কাজ ভালো, আমি স্বীকার করি। কিন্তু আমার কাজও ভালো। পার্থক্য কোথায়? রাকিব রাতে অফিসে থাকতে পারে, আমি পারি না। রাকিব ক্লায়েন্ট ডিনারে যেতে পারে রাত দশটায়, আমি পারি না। কারণ রাত দশটায় মেয়ে একা রাস্তায় বেরোলে যা হয়, সেটা রাকিবের সাথে হয় না।

আমার ক্যারিয়ারের সিলিং আমার যোগ্যতা দিয়ে ঠিক হয় না। আমার ক্যারিয়ারের সিলিং ঠিক হয় রাতের রাস্তা আমার জন্য কতটা নিরাপদ, সেটা দিয়ে।

একদিন HR-এ গেলাম। বললাম, "আমার প্রমোশন হওয়া উচিত ছিল।" HR ম্যানেজার বললেন, "পারফরম্যান্স রিভিউ দেখতে হবে।" পারফরম্যান্স রিভিউ দেখলেন। আমার রেটিং ভালো। তবু বললেন, "পরের কোয়ার্টারে দেখা যাবে।" পরের কোয়ার্টার মানে ছয় মাস পর। ছয় মাস পরে আবার "পরের কোয়ার্টার।" মেয়েদের প্রমোশন সবসময় "পরের কোয়ার্টারে।" ছেলেদের প্রমোশন "এখনই।"

আমি চুপ করে চলে এলাম। চিৎকার করিনি, টেবিল ভাঙিনি। কারণ চিৎকার করলে "আবেগী" বলবে, টেবিল ভাঙলে "পাগল" বলবে। মেয়েদের রাগ করার অধিকার নেই অফিসে। রাগ করলে "ক্যারেক্টার ইস্যু।" ছেলেদের রাগ করলে "স্ট্রং পার্সোনালিটি।"

মেস।

আমি মেসে থাকি। তিনজন মিলে একটা ফ্ল্যাট। তামান্না ব্যাংকে কাজ করে, ফারজানা শিক্ষকতা করে। তিনজনের তিনটা জীবন, একটা রান্নাঘর, একটা বাথরুম, একটা বারান্দা। রান্নাঘরে পালা করে রান্না করি। বাথরুমে পালা করে গোসল করি। বারান্দায় কাপড় শুকাই, কিন্তু বাইরে থেকে দেখা যায়, তাই অন্তর্বাস ভেতরে শুকাতে হয়। এটাও এক ধরনের যুদ্ধ।

মেস পাওয়াটাই ছিল এক যুদ্ধ।

ঢাকায় মেয়ে একা বাসা ভাড়া নেবে, এটা বাড়িওয়ালাদের অনেকেই মানতে চান না। প্রথম বাড়িওয়ালা বলেছিলেন, "মেয়ে একা? না, আমরা দিই না।" দ্বিতীয় বাড়িওয়ালা বলেছিলেন, "ছেলে আসবে নাকি?" তৃতীয় বাড়িওয়ালা বলেছিলেন, "মেয়েদের ঝামেলা বেশি।" চতুর্থ বাড়িওয়ালা দিয়েছিলেন, কিন্তু ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। "মেয়ে হলে একটু বেশি," তিনি বলেছিলেন। কেন বেশি? "ঝুঁকি বেশি।" কার ঝুঁকি? আমার, নাকি বাড়িওয়ালার?

তামান্না বলে, "একটা কাপল হলে দশ হাজারে পেত। আমরা তিনজন মেয়ে, বারো হাজার দিচ্ছি।" ত্রিশ শতাংশ বেশি। মেয়ে হওয়ার সারচার্জ। কেউ রসিদ দেয় না এই সারচার্জের, কিন্তু প্রতি মাসে কেটে নেয়।

দুপুরে অফিসে খাই।

টিফিন আনি বাসা থেকে। ভাত, ডাল, একটু সবজি। কখনো একটা ডিম। টিফিনটা প্লাস্টিকের বক্সে। সেই বক্সটা সকালে ব্যাগে ভরতে গেলে মায়ের কথা মনে পড়ে। মা বলতেন, "টিফিন নিয়ে যা, বাইরেরটা খাসনি।" মা এখনো বলেন, ফোনে। মা জানেন না আমি কখনো কখনো টিফিন আনতে পারি না, কারণ রাতে রান্না হয়নি, কারণ রাতে খুব ক্লান্ত ছিলাম, কারণ ক্লান্তি ঢাকায় মেয়েদের সঙ্গী।

টিফিন না আনলে ক্যান্টিনে খাই। ক্যান্টিনের ভাত ষাট টাকা। ডাল দশ টাকা। একটুকরো মাছ চল্লিশ টাকা। মাসে কুড়িদিন ক্যান্টিনে খেলে দুই হাজার দুইশো টাকা। সেটা বাজেটে নেই। তাই টিফিন আনি। রাতে যতই ক্লান্ত থাকি, পরের দিনের জন্য ভাত তুলে রাখি। এটাও এক ধরনের শৃঙ্খলা। ক্লান্তির বিরুদ্ধে, অলসতার বিরুদ্ধে, বাজেটের বিরুদ্ধে।

সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরি।

ফেরার পথ যাওয়ার চেয়ে খারাপ। সন্ধ্যার ঢাকা সকালের চেয়ে আলাদা। আলো কমে, ছায়া বাড়ে, রাস্তায় মানুষ অন্যরকম হয়ে যায়। সকালে যে রাস্তায় অফিসগামী মানুষের ভিড়, সন্ধ্যায় সেই রাস্তায় আড্ডা দেওয়া ছেলেদের দল। ফুটপাতে বসে তাকায়। কখনো কিছু বলে, কখনো শুধু তাকায়। তাকানোটাই যথেষ্ট। তাকানোটাই অস্বস্তি।

একদিন একজন পেছন পেছন আসছিল। তিনটা গলি। আমি হাঁটার গতি বাড়ালাম। সে বাড়াল। আমি একটা দোকানে ঢুকলাম। কিছু কিনলাম না, দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানদার জিজ্ঞেস করলেন, "কী লাগবে?" আমি বললাম, "একটু দাঁড়াই।" দোকানদার বুঝলেন। কিছু বললেন না। আমি দশ মিনিট দাঁড়ালাম। সে চলে গেল।

এটা প্রতিদিন হয় না। কিন্তু যেদিন হয়, সেদিন ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে একটু সময় লাগে নিজেকে স্বাভাবিক করতে। হাত কাঁপে। হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়। ভয় থাকে। ভয়টা পরের দিনও থাকে। পরের সপ্তাহেও। সেই গলিটা এড়িয়ে যাই তারপর থেকে। অন্য পথে যাই। দশ মিনিট বেশি লাগে, কিন্তু ভয় কম।

ঢাকার মেয়েদের মানসিক মানচিত্র আলাদা। কোন রাস্তায় আলো আছে, কোন রাস্তায় নেই। কোন গলি নিরাপদ, কোন গলি না। কোন সময়ে কোন পথে যেতে হয়। এই মানচিত্র কোনো অ্যাপে নেই। এটা মেয়েদের মাথায় থাকে, প্রতিদিন আপডেট হয়, অভিজ্ঞতায়।

রাত দশটায় রান্না করি।

আজ আমার পালা। ভাত, ডাল, আলু ভর্তা। সরল রান্না। মায়ের মতো রান্না করতে পারি না। মা ফোনে জিজ্ঞেস করেন, "কী খেলি?" আমি বলি, "ভালো খেয়েছি।" মায়ের মিথ্যা আমিও শিখেছি।

রাতে একা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ভাবি, এটাই কি জীবন? সকালে ওঠা, বাসে চাপা, অফিস করা, বাসে ফেরা, রান্না করা, ঘুমানো, আবার সকালে ওঠা? সোমবার থেকে শনিবার। রবিবার কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, একটু বিশ্রাম, তারপর সোমবার।

চক্র। ঢাকার ওয়ার্কিং উইমেনের চক্র। এই চক্রের ভেতর ঢুকলে বের হওয়ার রাস্তা দেখা যায় না। মাসের শেষে বেতন আসে, মাসের শুরুতে ভাড়া যায়। আসা আর যাওয়ার মাঝখানে একটু টাকা থাকে, সেটুকু দিয়ে বাকি মাসটা কোনোরকমে টানা।

কখনো কখনো রাতে ভাবি, দশ বছর পর কোথায় থাকব? এই মেসে? এই চাকরিতে? এই বাসে? নাকি কিছু একটা বদলাবে? বদলটা কী হবে, জানি না। কিন্তু জানি যে বদলটা আমাকে নিজে আনতে হবে। কেউ এসে বলবে না, "সোনিয়া, এই নাও তোমার ভালো জীবন।" ভালো জীবনটা আমাকে বানাতে হবে, পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার ইট দিয়ে, একটা একটা করে।

মা বলেন, "বিয়ে কর, একা থাকিস কেন?" আত্মীয়রা বলেন, "বয়স হয়ে যাচ্ছে।" আমি কী বলব? বিয়ে করলে কি যুদ্ধ শেষ হবে? নাকি নতুন যুদ্ধ শুরু হবে? শ্বশুরবাড়ির যুদ্ধ, সংসারের যুদ্ধ, নিজের ক্যারিয়ার আর সংসারের মাঝখানে যুদ্ধ?

আমি একা আছি কারণ আমি আমার শর্তে বাঁচতে চাই। সেই শর্ত কঠিন। ঢাকায় কঠিন। মেয়ে হয়ে কঠিন। একা হয়ে আরো কঠিন। কিন্তু অন্যের শর্তে বাঁচার চেয়ে নিজের শর্তে কষ্ট পাওয়া ভালো।

শুক্রবার সন্ধ্যায় তামান্না বলল, "চল, বাইরে খাই।"

আমরা তিনজন বেরোলাম। ধানমণ্ডিতে একটা ছোট রেস্তোরাঁ। বিরিয়ানি খেলাম। তিনশো টাকার বিরিয়ানি, মাসের বাজেটে ছিল না, কিন্তু কখনো কখনো বাজেটের বাইরে যেতে হয়। কখনো কখনো নিজেকে একটু পুরস্কার দিতে হয়। কেউ দেবে না, নিজেকে নিজে দিতে হয়।

তিনজন মিলে হাসলাম। গল্প করলাম। তামান্না বলল তার ব্যাংকের একটা ক্লায়েন্ট তাকে "আপু" বলে ডাকে, আবার পরে ফোনে ফ্লার্ট করে। ফারজানা বলল তার স্কুলের এক অভিভাবক বলেছেন, "আপনি অবিবাহিত? তাহলে আমার ছেলেকে কী শেখাবেন?" আমি বললাম বসের কথা। তিনজন হাসলাম। তিক্ত হাসি। কিন্তু হাসি।

এই হাসি ছোট। কিন্তু এই হাসি দিয়েই চলে। সপ্তাহে একটা সন্ধ্যা, তিনটা বিরিয়ানি, তিনজন মেয়ের তিনটা গল্প, তিনটা তিক্ত হাসি। এটুকু দিয়ে পরের সপ্তাহটা পার করা যায়।

রবিবার সকালে কাপড় ধুই।

বালতিতে কাপড় ভিজিয়ে হাতে কচলাই। ওয়াশিং মেশিন নেই, জায়গা নেই, টাকা নেই। হাতে ধোয়া মানে ঘণ্টাখানেক লাগে। সপ্তাহের সব কাপড়। অফিসের কুর্তা, সালোয়ার, ওড়না, ভেতরের কাপড়। ওড়না সবচেয়ে বেশি ময়লা হয়, কারণ ওড়না ঢাকার ধুলো প্রথম ধরে। বাসে দাঁড়িয়ে থাকলে ওড়নায় পেছনের মানুষের ঘাম লাগে। সেই ওড়না ধুতে ধুতে মনে হয়, আমি কি শুধু ওড়না ধুচ্ছি, নাকি সারাদিনের অপমান ধুচ্ছি?

কাপড় শুকাতে দিই বারান্দায়। বারান্দা ছোট, তিনজনের কাপড়ে ভরে যায়। রোদ পায় অল্প, ঢাকায় বিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে রোদ আসে, সরু, কৃপণ। গ্রামে রোদ ছিল প্রচুর, উদার, সারা উঠান ভরে যেত। এখানে রোদ বিলাসিতা।

রবিবার বিকেলে একটু বিশ্রাম। বিছানায় শুয়ে ফোনে স্ক্রল করি। অন্যদের জীবন দেখি। ইনস্টাগ্রামে কেউ ঘুরতে গেছে কক্সবাজারে, কেউ বিয়ে করেছে, কেউ বাচ্চার ছবি দিয়েছে। সবার জীবন সুন্দর, স্ক্রিনে। আমার জীবনটা স্ক্রিনে দিলে কেমন দেখাত? একটা মেয়ে, মিরপুরের একটা ছোট ঘরে, বালতিতে কাপড় ধুচ্ছে, একা রান্না করছে, বাসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ লাইক দিত না। কিন্তু এই জীবনটাই আমার।

ফোন রাখি। জানালার কাছে দাঁড়াই। বিকেলের আলো। ঢাকার আকাশ ছোট, বিল্ডিংয়ের ফ্রেমে আটকানো। কিন্তু আকাশ আকাশই। ছোট হলেও আকাশ। আমি এই ছোট আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছি, একা, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছি।

পাশের ফ্ল্যাটে একটা মেয়ে গান গাইছে। চেনা গান, রবীন্দ্রসংগীত। "আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।" গলা সুন্দর। কে জানে সেও একা থাকে কিনা, সেও প্রতিদিন এই ছোট ছোট যুদ্ধ লড়ে কিনা। ঢাকায় কত মেয়ে একা, কত মেয়ে লড়ছে, কত মেয়ে টিকে আছে, কেউ গোনে না। কেউ জানে না। কিন্তু আমরা আছি। পাশাপাশি ফ্ল্যাটে, পাশাপাশি বাসে, পাশাপাশি অফিসে। আলাদা আলাদা, কিন্তু একই যুদ্ধে।

১০

রাত বারোটায় ঘুমাই।

বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকাই। ফ্যান ঘুরছে। পাশের ঘরে তামান্নার ফোনে কথা বলার শব্দ। জানালা দিয়ে ঢাকার আওয়াজ, ঢাকা কখনো ঘুমায় না, হর্ন বাজে, কুকুর ডাকে, কোথাও মাইকে গান চলছে।

ভাবি, বাড়ির কথা। বরিশালের কথা। মায়ের কথা। বাবার কথা। পুকুরপাড়ের কথা। সন্ধ্যায় মায়ের সাথে বারান্দায় বসার কথা। সেই জীবন আর নেই। সেই জীবনে টাকা ছিল না, ক্যারিয়ার ছিল না, কিন্তু একটা জিনিস ছিল যেটা ঢাকায় নেই: নিরাপত্তা। শুধু শারীরিক নিরাপত্তা নয়, মানসিক। সেই নিশ্চিন্ততা যে "আমি এখানে আছি, এখানে আমার মানুষ আছে, এখানে কেউ আমাকে 'মেয়ে একা' বলে ভাড়া বাড়াবে না।"

ঢাকায় একা মেয়ে থাকা মানে প্রতিদিন ছোট ছোট যুদ্ধ। বাসের যুদ্ধ। অফিসের যুদ্ধ। রাস্তার যুদ্ধ। বাসা ভাড়ার যুদ্ধ। রান্নার যুদ্ধ। একাকীত্বের যুদ্ধ।

কিন্তু আমি ফিরব না। বরিশালে ফিরলে কী করব? বিয়ে হবে, সংসার হবে, শেষ। আমি আরো কিছু চাই। কী চাই, পুরোটা জানি না। কিন্তু জানি এটুকু: নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। নিজের টাকায় খেতে চাই। নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চাই। এই "নিজের" শব্দটা ঢাকায় খুব দামি, আর মেয়ে হলে আরো দামি।

গতকাল মা ফোনে বলেছিলেন, "সোনিয়া, তুই কি সুখে আছিস?" আমি একটু থেমেছিলাম। সুখ? সুখ কী? সুখ কি নিজের ঘর থাকা? সুখ কি কারো পাশে থাকা? সুখ কি নিশ্চিন্তে ঘুমানো? আমার কাছে কোনোটাই নেই। কিন্তু আমার কাছে আছে স্বাধীনতা। আমার সকালের অ্যালার্ম আমি নিজে সেট করি। আমার রাতের খাবার আমি নিজে বেছে নিই। আমার জীবনের প্রতিটা সিদ্ধান্ত আমার। এটা সুখ কিনা জানি না, কিন্তু এটা আমার।

আমি বলেছিলাম, "হ্যাঁ মা, ভালো আছি।"

মায়ের মিথ্যা? হয়তো। হয়তো না। "ভালো আছি" মানে আমি বেঁচে আছি, লড়ছি, হারিনি। এটুকুই "ভালো" এখন।

আমি সোনিয়া। উনত্রিশ। একা। ঢাকায়।

বরিশালের মেয়ে। অনার্স পাশ। পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকায় একটা জীবন চালাই। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ। ভেতরে দেখলে প্রতিটা দিন একটা ছোট বিজয়।

ঢাকা আমাকে কিছু দেয়নি যেটা আমি চাইনি। ঢাকা আমাকে সব কিছু দিয়েছে যেটা আমি অর্জন করেছি। প্রতিটা টাকা, প্রতিটা দক্ষতা, প্রতিটা অভিজ্ঞতা।

কারণ আমি টিকে আছি। ঢাকায়, একা, মেয়ে হয়ে, টিকে আছি।

এটুকুই যথেষ্ট আপাতত।