মায়ের কাছে ফেরা

টাকা কমেছে। মা বেড়েছে। হিসাব মিলেছে।

পর্ব ৭৪ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ঢাকা ছাড়ার দিন বৃষ্টি হচ্ছিল।

পনেরো বছর ঢাকায় ছিলাম। পনেরো বছরে ঢাকা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। দুই হাতে দিয়েছে, দুই হাতে কেড়ে নিয়েছে। টাকা দিয়েছে, সময় কেড়ে নিয়েছে। অভিজ্ঞতা দিয়েছে, তারুণ্য কেড়ে নিয়েছে। পরিচয় দিয়েছে, মাকে কেড়ে নিয়েছে।

মাকে পুরোপুরি কেড়ে নেয়নি। মা বেঁচে আছেন। সত্তর বছর। কুষ্টিয়ার গ্রামে। একা। কিন্তু পনেরো বছর ধরে মাকে বছরে দুবার দেখেছি, ঈদে। বাকি দশ মাস ফোনে কথা বলেছি। ফোনে মায়ের গলা শুনেছি, কিন্তু মায়ের চোখ দেখিনি। মায়ের গলা মিথ্যা বলতে পারে, চোখ পারে না। মা ফোনে বলেন "ভালো আছি," কিন্তু চোখ দেখলে বুঝতাম ভালো নেই।

আমার নাম নাজনীন। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স। গার্মেন্টস-এ কাজ করতাম। সুপারভাইজার ছিলাম। এখন আর নেই।

কুড়ি বছর বয়সে ঢাকায় এসেছিলাম।

গ্রাম থেকে সোজা। কুষ্টিয়ার ছোট গ্রাম, যেখানে ধানক্ষেত আছে, পুকুর আছে, আমবাগান আছে, আর কাজ নেই। বাবা ছিলেন না, বাবা আমার আট বছর বয়সে গেছেন, যক্ষ্মায়। মা একা বড় করেছেন। মায়ের সেলাই আর অন্যের বাড়িতে কাজ করে। আমি আর ছোট ভাই। ভাই স্কুলে পড়ত, আমি SSC পাশ করে বসে ছিলাম। কাজ নেই, টাকা নেই, আর মায়ের শরীর ভাঙছে।

পাশের বাড়ির রহিমা আপা ঢাকার গার্মেন্টসে কাজ করতেন। ছুটিতে গ্রামে এলে বলতেন, "ঢাকায় আয়, কাজ আছে।" আমি গেলাম। মা কেঁদেছিলেন। আমিও কেঁদেছিলাম। কিন্তু কান্না দিয়ে ভাত হয় না।

ঢাকায় প্রথম রাত। রহিমা আপার ঘরে মেঝেতে শুয়ে ছিলাম। বাইরে রিকশার ঘণ্টা, গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার। গ্রামে রাতে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে, এখানে মানুষ ডাকে। ঘুম আসেনি। মায়ের কথা ভেবেছিলাম। মা এখন একা শুয়ে আছেন। আমি এখানে। মাঝখানে কত রাস্তা, কত নদী, কত দূরত্ব।

আমি চলে এসেছিলাম উঠতে। উপরে উঠতে। গরিবের মেয়ে উঠতে চাইলে ঢাকায় আসতে হয়। গ্রামে ওপরে ওঠার সিঁড়ি নেই।

গার্মেন্টসে প্রথম দিন।

হেল্পার হিসেবে শুরু। সুতো কাটা, বোতাম লাগানো, ভাঁজ করা। দিনে বারো ঘণ্টা। মাসে পাঁচ হাজার টাকা। পাঁচ হাজার। গ্রামে মায়ের কাছে দুই হাজার পাঠাতাম, তিন হাজারে ঢাকায় চলতাম। তিন হাজারে ঢাকায় চলা মানে ভাত-ডালে চলা, বাস না নিয়ে হেঁটে যাওয়া, এক জোড়া চটি দিয়ে বছর পার করা।

দুই বছরে অপারেটর হলাম। মেশিনে বসলাম। সেলাই করতে শিখলাম। শার্ট, প্যান্ট, জ্যাকেট। বিদেশে যাবে এই কাপড়, ইউরোপে, আমেরিকায়। আমি যে শার্ট সেলাই করি, সেটা কোনো সাহেব পরবে নিউইয়র্কে। সে জানবে না যে এই শার্টের প্রতিটা সেলাইয়ে একটা বাংলাদেশি মেয়ের ঘাম আছে।

পাঁচ বছরে সিনিয়র অপারেটর। আট বছরে লাইন লিডার। বারো বছরে সুপারভাইজার। পনেরো বছরে, এখন, বেতন বাইশ হাজার। বাইশ হাজার টাকা মাসে। পনেরো বছরের অভিজ্ঞতায়, দিনে দশ ঘণ্টা খাটুনিতে, বাইশ হাজার। এটা কি যথেষ্ট? না। এটা কি ন্যায্য? না। কিন্তু এটাই আছে। আর এই বাইশ হাজারে আমি মাকে প্রতি মাসে আট হাজার পাঠাতাম, ভাইকে পড়িয়েছি HSC পর্যন্ত, নিজে একটা ছোট ঘরে থেকেছি মিরপুরে।

গত মাসে গ্রামে গিয়েছিলাম।

মাকে দেখে চিনতে পারিনি প্রথমে। ছয় মাস আগে ঈদে দেখেছিলাম, তখনো মা চলাফেরা করতেন, রান্না করতেন, উঠানে ঘোরাঘুরি করতেন। ছয় মাসে মা ভেঙে পড়েছেন। চুল সব সাদা, মুখে হাড় বেরিয়ে এসেছে, হাত কাঁপে, পা টলে। সত্তর বছরের শরীরে আশি বছরের ক্লান্তি।

মা আমাকে দেখে হাসলেন। সেই হাসি আমি চিনি। সেই হাসি যেটা বলে "তুই এসেছিস, আর কিছু দরকার নেই।" মায়ের হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ হাসি। সেই হাসিতে কোনো শর্ত নেই, কোনো প্রত্যাশা নেই, কোনো হিসাব নেই।

আমি মায়ের হাত ধরলাম। হাত শীর্ণ, হাড় বোঝা যায়। এই হাত আমাকে ভাত বেড়ে দিয়েছে ত্রিশ বছর। এই হাত আমার জ্বরে মাথায় পানি দিয়েছে। এই হাত সেলাই মেশিনে কাপড় ধরেছে রাত জেগে, আমার আর ভাইয়ের খাওয়ার জন্য।

"মা, কেমন আছো?"

"ভালো আছি রে।"

মিথ্যা। আমি জানি মিথ্যা। মায়ের চোখে সেই কথা লেখা যেটা মুখে বলেন না। একা থাকার কথা। রাতে একা ঘরে শোয়ার কথা। অসুখ হলে কাকে ডাকবেন সেই চিন্তার কথা। পড়ে গেলে কে তুলবে সেই ভয়ের কথা।

পাশের বাড়ির জরিনা আপা বলেছিলেন, "তোর মা গত মাসে পড়ে গেছিল। রান্নাঘরে। আমি গিয়ে তুলেছি।" মা আমাকে বলেননি। ফোনে বলেননি। কারণ বললে আমি চিন্তা করব। মায়ের কাজ সন্তানকে চিন্তামুক্ত রাখা, নিজে চিন্তায় পুড়ে গেলেও।

সেই রাতে ঘুমাতে পারিনি।

মায়ের পাশে শুয়ে ছিলাম। মা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। মায়ের শ্বাসের শব্দ শুনছিলাম। ধীর, অসমান, কখনো একটু থামে, তারপর আবার চলে। আমি গুনছিলাম শ্বাস। এক, দুই, তিন। প্রতিটা শ্বাস একটা নিশ্চয়তা যে মা আছেন। প্রতিটা শ্বাসের ফাঁকে একটা ভয় যে পরেরটা আসবে তো?

আমি চলে এসেছিলাম উঠতে। পনেরো বছর ধরে উঠেছি। হেল্পার থেকে সুপারভাইজার। পাঁচ হাজার থেকে বাইশ হাজার। কিন্তু উঠতে উঠতে মাকে ফেলে এসেছি। মা নিচে রয়ে গেছেন, একা, গ্রামে, ভাঙা ঘরে।

এখন ফিরে যাচ্ছি মাকে ধরতে।

এটা সিদ্ধান্ত। রাতারাতি নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। পনেরো বছর ধরে জমে থাকা অপরাধবোধের সিদ্ধান্ত। প্রতিটা ঈদে মাকে রেখে আসার সময় যে ভার বুকে চেপে বসত, সেই ভারের সিদ্ধান্ত। মায়ের ফোনে "ভালো আছি" শোনার পরে যে সন্দেহ হতো, সেই সন্দেহের সিদ্ধান্ত।

গার্মেন্টসে রেজিগনেশন দিলাম।

ম্যানেজার বললেন, "নাজনীন, তুমি আমাদের সেরা সুপারভাইজার। কেন যাচ্ছ?" আমি বললাম, "মা অসুস্থ।" তিনি বললেন, "ছুটি নাও।" আমি বললাম, "ছুটি দিয়ে হবে না। মায়ের কাছে থাকতে হবে।" তিনি বললেন, "গ্রামে গিয়ে কী করবে?" আমি বললাম, "মায়ের সেবা করব।"

তিনি বুঝলেন না। একজন পুরুষ ম্যানেজার কেন বুঝবেন? তার মায়ের সেবা তার স্ত্রী করেন। তাকে চাকরি ছাড়তে হয় না।

মেয়েদের জীবনে এই মুহূর্তটা আসে। যখন ক্যারিয়ার আর পরিবারের মধ্যে বেছে নিতে হয়। পুরুষদের জীবনে এই মুহূর্ত আসে না, কারণ পুরুষদের পক্ষে কেউ একজন সবসময় পরিবার সামলায়। মেয়েদের পক্ষে কেউ নেই। মেয়ে নিজেই পক্ষ।

আমি পক্ষ বদলালাম। ক্যারিয়ারের পক্ষ থেকে মায়ের পক্ষে।

গ্রামে ফিরলাম।

ব্যাগ একটাই। পনেরো বছরের সম্বল একটা ব্যাগে ধরে যায়। কিছু কাপড়, কিছু কাগজপত্র, একটা সেলাই মেশিন। সেলাই মেশিনটা নিজে কিনেছিলাম ঢাকায়, ছোট, পোর্টেবল। এটাই আমার পুঁজি। এটা দিয়ে গ্রামে দোকান খুলব।

মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে কিছু বলেননি। শুধু তাকিয়ে ছিলেন। মায়ের চোখে পানি ছিল, কিন্তু কান্না ছিল না। আনন্দ ছিল, কিন্তু হাসি ছিল না। সেই মাঝামাঝি জায়গা, যেখানে আবেগ এত বেশি যে কোনো একটা রূপ নিতে পারে না, সব রূপ একসাথে চেপে ধরে মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়।

"মা।"

"আয়।"

একটা শব্দ। "আয়।" এই শব্দের ভেতরে পনেরো বছরের অপেক্ষা। পনেরো বছরের একাকীত্ব। পনেরো বছরের "ভালো আছি" মিথ্যা।

আমি ভেতরে ঢুকলাম। ঘর ছোট, পুরোনো, দেয়ালে স্যাঁতা ধরেছে, চালে ফুটো আছে। কিন্তু ঘরে মায়ের গন্ধ। সেই গন্ধ যেটা আমি পনেরো বছর ধরে খুঁজেছি ঢাকার কোনো ঘরে, কোনো মেসে, কোনো রাস্তায়, কোথাও পাইনি।

দোকান খুললাম। বাজারের কাছে একটা ছোট ঘর ভাড়া নিলাম। মাসে দুই হাজার টাকা। সেলাই মেশিন বসালাম। সাইনবোর্ড লাগালাম: "নাজনীন টেইলার্স।"

গ্রামে সেলাইয়ের কাজ কম। শহরের মতো অর্ডার আসে না। সপ্তাহে তিন-চারটা অর্ডার। একটা ব্লাউজ, একটা সালোয়ার, কখনো একটা জামা। মাসে আয় আট-দশ হাজার। ঢাকায় বাইশ হাজার পেতাম। অর্ধেকেরও কম।

টাকা কমেছে।

কিন্তু সকালে উঠে মায়ের মুখ দেখি। মা চা বানান, আমি পাশে বসে খাই। দুপুরে মা ভাত রান্না করেন, আমি মাকে সাহায্য করি। বিকেলে মায়ের সাথে উঠানে বসি। সন্ধ্যায় মা নামাজ পড়েন, আমি পাশে বসে থাকি। রাতে মায়ের পাশে শুই।

মা বেড়েছে।

টাকা কমেছে। মা বেড়েছে। হিসাব মিলেছে।

কখনো কখনো রাতে জেগে থাকি। ভাবি, ঠিক করেছি তো? পনেরো বছরের ক্যারিয়ার, সুপারভাইজারের পদ, বাইশ হাজার টাকা, ঢাকার জীবন, সব ছেড়ে এসেছি। গ্রামে। আট হাজার টাকায়। ঠিক করেছি তো?

তারপর মায়ের দিকে তাকাই। মা ঘুমাচ্ছেন। মুখে শান্তি আছে। সেই শান্তি যেটা আগে ছিল না। আগে মায়ের ঘুমের মধ্যেও চিন্তার ভাঁজ থাকত কপালে। এখন নেই। কারণ মা জানেন, পাশে কেউ আছে। পড়ে গেলে কেউ তুলবে। অসুখ হলে কেউ ধরবে।

সেই "কেউ" আমি। মেয়ে।

গার্মেন্টসের মেয়েরা ফোন করে মাঝে মাঝে। "নাজনীন আপা, কেমন আছেন?" ভালো আছি বলি। তারা বলে, "আপনার লাইনটা মিস করি।" আমিও মিস করি। সেই লাইন, সেই মেশিনের আওয়াজ, সেই সুইয়ের ছন্দ, সুতোর টান, কাপড়ের গন্ধ। পনেরো বছর একটা জায়গায় থাকলে সেই জায়গা শরীরে ঢুকে যায়। গার্মেন্টস আমার শরীরে আছে। আঙুলের ডগায় আছে সেলাইয়ের স্মৃতি, কাঁধে আছে ঝুঁকে বসার ব্যথা, চোখে আছে সুইয়ের ফুটোর দিকে তাকিয়ে থাকার ক্লান্তি।

কিন্তু এখন সেই আঙুল মায়ের মাথায় তেল দেয়। সেই কাঁধ মায়ের ভার বহন করে। সেই চোখ মায়ের মুখ দেখে।

গ্রামে ফিরে আসার পর পাড়ার কেউ কেউ বলেছে, "নাজনীন ঢাকা থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে।" আমি শুনেছি। কিছু বলিনি। তারা বুঝবে না যে ফিরে আসা ব্যর্থতা নয়। ফিরে আসা পছন্দ। সবচেয়ে কঠিন পছন্দ।

ঢাকায় থাকা সহজ ছিল। অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। গার্মেন্টসে যাওয়া, কাজ করা, বেতন পাওয়া, মায়ের কাছে টাকা পাঠানো। এটা সিস্টেম ছিল। সিস্টেম চালাতে সাহস লাগে না। সিস্টেম ভাঙতে সাহস লাগে।

আমি সিস্টেম ভেঙেছি। মায়ের জন্য।

১০

ভাই ফোনে বলল, "আপু, তুই পাগল হয়ে গেছিস।"

ভাই ঢাকায় থাকে। একটা কোম্পানিতে কাজ করে। ভাই বোঝে না কেন আমি ফিরে এসেছি। ভাই বলে, "আমি তো মাকে টাকা পাঠাই।" হ্যাঁ, পাঠায়। প্রতি মাসে পাঁচ হাজার। কিন্তু টাকা কি মা? টাকা কি মায়ের মাথায় তেল দিতে পারে? টাকা কি মায়ের জ্বরে পাশে বসে থাকতে পারে? টাকা কি রাতে মায়ের পাশে শুয়ে শ্বাসের শব্দ গুনতে পারে?

ভাই ছেলে। ছেলেদের কাছে "মায়ের সেবা" মানে টাকা পাঠানো। মেয়েদের কাছে "মায়ের সেবা" মানে পাশে থাকা। দুটো আলাদা ভাষা। দুটো আলাদা পৃথিবী।

আমি ভাইকে দোষ দিই না। ভাইয়ের চাকরি আছে, সংসার আছে। কিন্তু মায়ের পাশে আমি আছি। এটা আমার পছন্দ। এই পছন্দের দাম আমি দিচ্ছি, মাসে চোদ্দ হাজার টাকা কম আয়ে। সেই দাম আমি দিতে রাজি।

১১

আজ সকালে মা বললেন, "নাজনীন, তুই আসার পর আমার ঘুম ভালো হয়।"

একটা বাক্য। কিন্তু এই বাক্যের দাম বাইশ হাজার টাকার চেয়ে বেশি। সুপারভাইজারের পদের চেয়ে বেশি। ঢাকার জীবনের চেয়ে বেশি।

মায়ের ঘুম ভালো হয়েছে। এটাই আমার প্রমোশন। এটাই আমার বোনাস।

দোকানে বসে সেলাই করি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। ধানক্ষেত দেখা যায়। আমবাগান দেখা যায়। পুকুরপাড়ে একটা গরু ঘাস খাচ্ছে। ঢাকায় জানালা দিয়ে তাকালে দেখতাম পাশের বিল্ডিং, নিচে গাড়ির জ্যাম, ওপরে ধোঁয়াশা।

এখানে আকাশ দেখা যায়। পুরো আকাশ।

আমি চলে এসেছিলাম উঠতে। এখন ফিরে এসেছি নামতে। কিন্তু এই নামা আসলে ওঠা। মায়ের কাছে ফেরা আসলে নিজের কাছে ফেরা।

টাকা কমেছে। মা বেড়েছে। হিসাব মিলেছে।

আর কোনো হিসাব বাকি নেই।