মেয়েকে লেখা চিঠি

এই চিঠি রেখে দিস। একদিন তোর মেয়েকে দিস।

পর্ব ৭৫ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

মা তানিয়া,

এই চিঠি লিখতে বসেছি রাত এগারোটায়। তুই ঘুমিয়ে গেছিস। কাল সকালে তুই ঢাকায় যাবি। বাস সকাল সাতটায়। তোর ব্যাগ গোছানো হয়ে গেছে, আমি দেখেছি। একটা ব্যাগে তোর জামাকাপড়, বই, একটা বালিশ। আরেকটা ব্যাগে তোর স্বপ্ন। সেই ব্যাগটা তোকে নিজে গুছিয়ে নিতে হবে, সেটা আমি গুছিয়ে দিতে পারি না।

তুই আমার প্রথম সন্তান। তোকে বুকে ধরার পর আমি বুঝেছিলাম মা হওয়া মানে কী। মা হওয়া মানে একটা প্রাণের জন্য নিজের প্রাণ দিতে রাজি হওয়া, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে, কোনো শর্ত ছাড়া। তুই ছোট ছিলি, জ্বর হতো, আমি সারারাত জেগে তোর মাথায় পানি দিতাম। তুই বড় হলি, পরীক্ষার আগে টেনশনে খেতে পারতিস না, আমি জোর করে মুখে তুলে দিতাম। তুই আরো বড় হলি, নিজের জীবন নিজে চালাতে চাইলি, আমি পেছনে সরে গেলাম।

এখন তুই ঢাকায় যাচ্ছিস। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিস। কুড়ি বছর বয়স। আমি পঞ্চাশ। তিরিশ বছর আগে আমিও কুড়ি ছিলাম, কিন্তু আমি ঢাকায় যাইনি। আমার সেই সুযোগ ছিল না। তোকে সেই সুযোগ দিতে পেরেছি, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ।

ঢাকা বড় শহর। তুই এর আগে দুইবার গেছিস, খালার বাড়িতে, কিন্তু বেড়াতে যাওয়া আর থাকতে যাওয়া এক নয়। বেড়াতে গেলে শহরটাকে সুন্দর লাগে, রাস্তার আলো, বড় বড় বিল্ডিং, শপিংমল। থাকতে গেলে শহরটা আলাদা চেহারা দেখায়। রাস্তায় ভিড়, বাসে ধাক্কাধাক্কি, ভাড়ার তাগাদা, একাকীত্ব।

একাকীত্বের কথা আগে বলি। তুই এতদিন আমার সাথে ছিলি, বাবার সাথে ছিলি, ছোট ভাইয়ের সাথে ছিলি। ঢাকায় একা থাকবি। হলে থাকবি, কিন্তু হলে একশো মেয়ের মধ্যেও একা লাগে। কারণ একা লাগা মানে মানুষ না থাকা নয়, একা লাগা মানে নিজের মানুষ না থাকা। হলের মেয়েরা তোর বন্ধু হবে, কিন্তু মা হবে না।

রাতে একা লাগবে। লাগলে ফোন করিস। রাত যতই হোক, ফোন করিস। আমি জেগে থাকব। মা সবসময় জেগে থাকে। মায়ের ঘুম হালকা, ফোন বাজলেই ভাঙে। কারণ মায়ের কান সবসময় সন্তানের ডাকের জন্য খোলা থাকে।

তবে একটা কথা মনে রাখিস। প্রতিবার একা লাগলেই ফোন করতে হবে না। কখনো কখনো একা লাগাটা সহ্য করিস। সেই সহ্যের ভেতরে একটা শক্তি আছে। সেই শক্তি তোকে শেখাবে যে তুই নিজেই নিজের সঙ্গী হতে পারিস। অন্য সবাই আসবে যাবে, কিন্তু তুই তোর সাথে সবসময় থাকবি। নিজের সাথে ভালো থাকতে শেখ। নিজেকে চিনতে শেখ। একাকীত্ব সেই চেনার সুযোগ দেয়।

কিন্তু একটা কথা বলি। একা লাগাটা খারাপ না। একা লাগা মানে তুই বড় হচ্ছিস। একা লাগা মানে তুই নিজের জগত তৈরি করছিস। সেই জগতে আমি থাকব, কিন্তু কেন্দ্রে থাকব না। কেন্দ্রে তুই থাকবি। এটাই হওয়া উচিত।

এবার কিছু কথা বলি যেগুলো মা মেয়েকে মুখে বলতে পারে না। মুখোমুখি বলতে গেলে গলা আটকে যায়, চোখ ভিজে যায়, কথা হারিয়ে যায়। চিঠিতে সহজ। চিঠি ধৈর্য ধরে, চিঠি তাড়া দেয় না।

তোর শরীর তোর। কেউ তোর অনুমতি ছাড়া ছুঁতে পারবে না। কেউ ছুঁলে চিৎকার করিস। লজ্জা পাসনি। লজ্জা তোর নয়, লজ্জা তার যে ছুঁয়েছে। সমাজ বলবে "মেয়েটার দোষ," তুই জানবি দোষ তোর নয়। কখনো নয়।

ভালোবাসা আসবে। আসবেই। কুড়ি বছর বয়সে ভালোবাসা আসে, এটা স্বাভাবিক। আমিও কুড়িতে ভালোবেসেছিলাম, তোর বাবাকে। ভালোবাসা খারাপ নয়। কিন্তু ভালোবাসায় নিজেকে হারাসনি না। ভালোবাসা মানে অন্যকে পাওয়া নয়, ভালোবাসা মানে নিজেকে না হারিয়ে অন্যকে পাশে নেওয়া। যে ভালোবাসায় তুই ছোট হয়ে যাস, সেটা ভালোবাসা না। সেটা খাঁচা।

পড়াশোনাটা শেষ করিস। যাই হোক, যেই আসুক, পড়াশোনাটা শেষ করিস। পড়াশোনা মেয়েদের জন্য শুধু চাকরি পাওয়ার হাতিয়ার নয়, পড়াশোনা মেয়েদের জন্য মুক্তির চাবি। পড়া মেয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। না পড়া মেয়ে অন্যের সিদ্ধান্তে চলে।

আমি পড়তে পারিনি। SSC পাশ করে বিয়ে হয়ে গেছিল। পড়লে কী হতাম জানি না, কিন্তু জানি যে না পড়ে কী হয়েছি: অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তোর বাবা ভালো মানুষ, কিন্তু নির্ভরশীলতা ভালো মানুষের ওপরেও ভালো লাগে না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বাদ আলাদা। সেই স্বাদ তুই পাবি। আমি পাইনি।

জানিস, আমি কখনো কখনো ভাবি, আমি যদি পড়তে পারতাম, কী হতাম? শিক্ষক হতাম হয়তো। ছোটবেলায় স্কুলের শিক্ষিকাদের দেখতাম, তাদের সাদা শাড়ি, হাতে খড়ি, বোর্ডে লেখা, সেটা আমার ভালো লাগত। ভেবেছিলাম, আমিও একদিন পড়াব। সেই "একদিন" আসেনি। কিন্তু তোর জন্য আসতে পারে। তুই যা হতে চাস, হোস। শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, যা-ই হোক। আমার অসমাপ্ত স্বপ্নের ভার তোর ওপর চাপাব না, কিন্তু তোকে বলব: স্বপ্ন দেখিস। স্বপ্ন দেখা ফ্রি।

রান্নার কিছু কথা লিখি। তুই বলবি, "মা, এখন রান্নার কথা কেন?" কারণ রান্না জানা মানে বেঁচে থাকা জানা।

ভাত রান্না তুই জানিস। ডাল রান্নাও জানিস। কিন্তু কিছু কথা মনে রাখিস: ভাত চড়ানোর আগে চাল ভিজিয়ে রাখলে ভাত নরম হয়। ডালে এক চিমটি হলুদ বেশি দিলে স্বাদ বাড়ে। মাছ ভাজার তেলে পেঁয়াজ দিয়ে সেই তেলে সবজি রান্না করলে সবজি ভালো হয়। শীতকালে সরষে বাটা দিয়ে শাক রান্না করিস, আমার রেসিপি, তোর দাদি শিখিয়েছিলেন আমাকে।

হলে রান্নার সুযোগ কম পাবি। মেসে খাবি বা বাইরে খাবি। বাইরের খাবার খারাপ না, কিন্তু প্রতিদিন খেলে শরীর খারাপ করবে। মাঝে মাঝে নিজে কিছু বানিয়ে খাস। একটা ইলেকট্রিক স্টোভ কিনে নিস, ছোট একটা। সেটায় ডাল-ভাত হয়ে যায়।

আর একটা কথা: অসুখ হলে আমাকে বলিস। মাথা ব্যথা হলে প্যারাসিটামল খাস, কিন্তু তিনদিনের বেশি ব্যথা থাকলে ডাক্তার দেখাস। জ্বর হলে প্রচুর পানি খাস। পেটের অসুখ হলে ওরস্যালাইন খাস, ফার্মেসিতে পাওয়া যায়। আর পিরিয়ডের সময় গরম পানির বোতল পেটে দিস, ব্যথা কমে। এটা আমার মা শিখিয়েছিলেন।

ঢাকায় কিছু জিনিস শিখবি যেগুলো আমি শেখাতে পারিনি।

আমি গ্রামের মেয়ে। গ্রামের বাইরে বেশি যাইনি। দুনিয়া কত বড়, সেটা তুই দেখবি, আমি দেখিনি। তুই দেখবি বিভিন্ন ধরনের মানুষ, বিভিন্ন ধরনের চিন্তা, বিভিন্ন ধরনের জীবন। কেউ ধনী, কেউ গরিব, কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউ শহরের, কেউ গ্রামের। সবাইকে সমান চোখে দেখিস। আমি তোকে বৈষম্য শেখাইনি, তুই শিখিসনি। সেটা ধরে রাখিস।

মা তোকে যা শেখায়নি, সেটাও শেখ।

আমি তোকে শিখিয়েছি নামাজ পড়তে, রান্না করতে, বড়দের সালাম করতে, সত্য কথা বলতে। কিন্তু শেখাতে পারিনি কীভাবে নিজের জন্য লড়তে হয়। কীভাবে "না" বলতে হয়। কীভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে হয় যখন ঘরের সবাই অন্যমত। এগুলো আমি নিজেও জানি না। এগুলো তুই ঢাকায় গিয়ে শিখবি। বই থেকে, বন্ধুদের কাছ থেকে, জীবন থেকে।

ভুল করবি, করিস। ভুল ছাড়া শেখা হয় না। আমি তোকে ভুল করতে বারণ করব না। শুধু বলব, ভুল থেকে শিখিস। একই ভুল দুবার করিসনি। একবার ভুল করা মানে শেখা, দুবার করা মানে অভ্যাস।

আর একটা কথা। কেউ তোকে ছোট করবে, "গ্রামের মেয়ে" বলবে, "কিছু জানে না" বলবে। শুনিস, কিন্তু ভেতরে নিসনি। গ্রাম থেকে আসা দুর্বলতা নয়। গ্রাম থেকে আসা মানে শেকড় আছে, মাটি আছে, সত্যিকারের আকাশ দেখেছিস। শহরের অনেকে আকাশ দেখেনি, বিল্ডিংয়ের ফাঁক দেখেছে। তুই পুরো আকাশ দেখেছিস। সেটা তোর শক্তি।

তোর বাবার কথা বলি।

তোর বাবা ভালো মানুষ। তুই জানিস। কিন্তু তোর বাবা মেয়ের ঢাকায় যাওয়াটা সহজে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বললেন, "এখানে কলেজ আছে, ঢাকায় কেন?" আমি বললাম, "ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে, পড়তে দাও।" তিনি বললেন, "মেয়ে একা ঢাকায়?" আমি বললাম, "মেয়ে পড়বে না?"

তোর বাবার সাথে আমার এই তর্ক তুই শোনোনি। ঘরের ভেতরে হয়েছে, রাতে, তুই ঘুমানোর পরে। অনেক রাত ধরে হয়েছে। শেষে তোর বাবা রাজি হয়েছেন, কারণ তোর বাবা বুঝেছেন যে আমি ঠিক বলছি। কিন্তু সেই "বোঝা"টা সহজে আসেনি। সেটার জন্য আমাকে লড়তে হয়েছে, তোর পক্ষে, তোর ভেতরে।

তুই হয়তো ভাবিস বাবা এমনিতেই রাজি হয়েছেন। এমনিতে হয়নি। মায়েরা সন্তানের জন্য যে যুদ্ধ করে, সেটা সন্তান দেখে না। সেটা রাতের অন্ধকারে হয়, বন্ধ দরজার পেছনে হয়, ফিসফিসানিতে হয়। সেই যুদ্ধের কোনো স্মারক নেই, কোনো পুরস্কার নেই। শুধু ফলাফল আছে: তুই ঢাকায় যাচ্ছিস।

কিছু সতর্কতা।

রাতে একা বাইরে যাসনি। দরকার হলে কাউকে সাথে নিয়ে যাস। এটা ভয় দেখানো নয়, এটা বাস্তব। ঢাকার রাত মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। এটা হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু নয়। যেদিন হবে, সেদিন আমি এই কথা লিখব না। আজ লিখতে হচ্ছে।

টাকাপয়সা হিসাব করে খরচ করিস। তোর বাবা প্রতি মাসে পাঁচ হাজার পাঠাবেন। আমি আরো দুই হাজার পাঠাব, সেলাইয়ের আয় থেকে। সাত হাজার টাকায় চলতে হবে। কম, আমি জানি। কিন্তু কম দিয়ে চলা শেখাটাও দরকার। আমি সারাজীবন কম দিয়ে চলেছি। তুইও পারবি।

বন্ধু বেছে নিস। সবাই বন্ধু হওয়ার যোগ্য না। যে তোকে খারাপ পথে নিয়ে যায়, সে বন্ধু না। যে তোকে ভালো হতে সাহায্য করে, সে বন্ধু। বন্ধু কম হোক, কিন্তু আসল হোক।

আর শেষ কথা: কখনো মনে করিসনি যে তুই একা। তুই একা নস। তোর পেছনে একটা মা আছে, একটা বাবা আছে, একটা ভাই আছে, একটা গ্রাম আছে। তুই যেখানেই যাস, এই শেকড় তোর সাথে যাবে। শেকড় দেখা যায় না, কিন্তু টান দিলে টের পাওয়া যায়।

কিছু গোপন কথা। মা-মেয়ের মধ্যের কথা।

আমার জীবনে অনেক কিছু হয়েছে যেটা তোকে বলিনি। বলার সময় আসেনি, বা বলার সাহস হয়নি। এখন চিঠিতে বলি, কারণ চিঠিতে বলা সহজ, মুখোমুখি বলার চেয়ে।

আমি তোর বাবাকে ভালোবাসি। কিন্তু ভালোবাসা মানে সবসময় সুখ নয়। ভালোবাসার ভেতরেও কষ্ট থাকে, মতের অমিল থাকে, রাগ থাকে, হতাশা থাকে। আমি আর তোর বাবা অনেকবার ঝগড়া করেছি। তুই জানিস কিছু ঝগড়ার কথা, কিন্তু সব জানিস না। কিছু ঝগড়া তোর ঘুমানোর পরে হয়েছে, কিছু তুই স্কুলে থাকতে। আমি কেঁদেছি। তোর বাবাও কেঁদেছেন, যদিও তিনি স্বীকার করবেন না। তবু আমরা আছি। কারণ সংসার মানে রোদ আর ছায়া, দুটো একসাথে। শুধু রোদ কোথাও নেই।

তোর বিয়ের কথা উঠবে একদিন। আত্মীয়রা বলবে, পাড়ার লোকে বলবে। তুই তাড়াহুড়ো করিসনি। নিজের পড়াশোনা শেষ কর, নিজের পায়ে দাঁড়া, তারপর নিজে বেছে নিস। আমি বেছে নিইনি, আমার বাবা-মা বেছে দিয়েছিলেন। ভালো হয়েছে, কিন্তু সেই ভালোটা ভাগ্যের। তোর ভালো হবে পছন্দের।

তানিয়া, তুই ঘুমাচ্ছিস।

আমি তোর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ঘুমন্ত মুখ। শান্ত। নিশ্চিন্ত। কাল থেকে এই মুখে চিন্তা আসবে, অনিশ্চয়তা আসবে, ভয় আসবে। কিন্তু আজ রাতে, এই শেষ রাতে, তোর মুখে শান্তি আছে। আমি এই শান্তি মনে রাখব।

তুই চলে গেলে ঘর খালি লাগবে। তোর ঘরের দরজা আমি বন্ধ করে রাখব। খুলব না। তুই ফিরে আসা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তোর বিছানার চাদর বদলাব না। তোর জানালার পর্দা সরাব না। সব যেমন আছে তেমন রাখব, যেন তুই কাল ফিরবি, যেন তুই কোথাও যাসনি।

মায়েরা এই কাজটা করে। সন্তান চলে গেলে ঘর সাজিয়ে রাখে, যেন সন্তান আছে। এটা মিথ্যা, কিন্তু এই মিথ্যা মায়ের বেঁচে থাকার উপায়।

আমি কাল তোকে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেব। তোর ব্যাগ তুলে দেব। তোর মুখের দিকে তাকাব। হাসব। কাঁদব না। তোর সামনে কাঁদব না। কারণ মায়ের কান্না সন্তানকে দুর্বল করে। মা কাঁদলে সন্তান ফিরে আসতে চায়, আর আমি চাই না তুই ফিরে আসিস। আমি চাই তুই যাস। দূরে যাস। উপরে যাস। মায়ের কাজ সন্তানকে ছেড়ে দেওয়া, ধরে রাখা নয়। এটা সবচেয়ে কঠিন কাজ।

বাস ছেড়ে গেলে আমি বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকব। যতক্ষণ বাস দেখা যায়। তারপর ফিরব। খালি ঘরে। তোর ঘরের দরজা বন্ধ করব। চোখ বন্ধ করব। তখন কাঁদব। তোর অনুপস্থিতিতে।

১০

এই চিঠি রেখে দিস।

ব্যাগের ভেতরে রাখিস, যেখানে সহজে চোখে পড়বে না কিন্তু খুঁজলে পাবি। যেদিন খুব একা লাগবে, যেদিন ঢাকা খুব কঠিন লাগবে, যেদিন মনে হবে "আমি পারব না," সেদিন এই চিঠি পড়িস। আমার কথাগুলো পড়িস। মনে করিস যে তোর একটা মা আছে যে তোকে বিশ্বাস করে। সেই বিশ্বাস তোকে শক্তি দেবে।

আর একদিন, অনেক বছর পরে, যখন তোর মেয়ে হবে, যখন তোর মেয়ে বড় হবে, যখন তোর মেয়ে কোথাও যাবে, তখন তুই এই চিঠি তার হাতে দিস। বলিস, "তোর নানি লিখেছিলেন।" সে পড়বে। সে বুঝবে। সে জানবে যে মায়ের ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যায়, চিঠির কালির মতো, যেটা শুকিয়ে যায় কিন্তু মুছে যায় না।

১১

শেষ কথা।

তুই আমার মেয়ে। এটা আমার গর্ব। তুই মেয়ে হয়ে জন্মেছিস, এটা তোর শক্তি। মেয়ে হওয়া দুর্বলতা নয়, মেয়ে হওয়া মানে দুগুণ শক্তিশালী হওয়া, কারণ মেয়েদের দুগুণ কঠিন পথ পেরোতে হয়।

তুই পেরোবি। আমি জানি তুই পারবি। কারণ তুই আমার মেয়ে, আর আমি পেরেছি। আমি অনেক কম দিয়ে পেরেছি। তোর কাছে আরো বেশি আছে। তুই আরো বেশি পারবি।

আমি তোকে একটা জিনিস দিতে পারিনি: নিজের উদাহরণ। আমি পড়তে পারিনি, চাকরি করিনি, দুনিয়া দেখিনি। তুই দেখবি। তুই সেই মেয়ে হবি যে আমি হতে চেয়েছিলাম কিন্তু হতে পারিনি। তুই আমার অসমাপ্ত স্বপ্ন। কিন্তু তুই তোর নিজের স্বপ্নও দেখিস, আমার স্বপ্নের বোঝা নিসনি। তোর জীবন তোর। তোর স্বপ্ন তোর। আমি শুধু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকব।

যাস মা। যাস। ঢাকা তোর জন্য অপেক্ষা করছে। দুনিয়া তোর জন্য অপেক্ষা করছে।

আমি এখানে আছি। সবসময় আছি। তোর পেছনে। তোর ছায়ায়। তোর শ্বাসে।

কুড়ি বছর আগে আমিও একটা মেয়ে ছিলাম। এখন আমি মা। এই কুড়ি বছরে আমি কী পেয়েছি? তোকে পেয়েছি। তোর ভাইকে পেয়েছি। তোর বাবার সাথে একটা সংসার পেয়েছি। এটুকুই আমার জীবন। এটুকু কম না। এটুকু অনেক। কিন্তু তোর জীবন এর চেয়ে বড় হবে। তোর জীবনে সংসারও থাকবে, কিন্তু তার বাইরেও কিছু থাকবে। সেই "বাইরে"টা আমি দেখিনি। তুই দেখবি।

তোর মা, হাসনা।

জানুয়ারি, ২০২৫। কুষ্টিয়া।

পুনশ্চ: বাক্সে একটা কৌটা আছে, সেটায় আচার দিয়েছি। তোর পছন্দের আমের আচার। কাঁচা আম, সরষের তেল, মরিচ, মেথি। আমার রেসিপি, তোর নানির কাছ থেকে পাওয়া। হলের মেয়েদের দিয়ে খাস। ভাগ করে খেলে বন্ধু হয়। আমার মা বলতেন, "খাবার ভাগ করলে মানুষ কাছে আসে।" তোর নানি ঠিক বলতেন।

আরেকটা পুনশ্চ: চিঠি পড়ে কাঁদিসনি। কাঁদলে চোখ ফুলে যাবে, কাল সকালে বাসে উঠতে হবে। কাঁদবি পরে। যখন সময় হবে। এখন ঘুমা। কাল নতুন দিন। তোর নতুন দিন।

শেষ পুনশ্চ: ওড়নাটা গুছিয়ে নিয়ে যাস, তোর নীল ওড়নাটা। সেটা তোর নানির ছিল। নানি আমাকে দিয়েছিলেন, আমি তোকে দিচ্ছি। ওড়নাটা পুরোনো, রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, কিন্তু সুতোটা শক্ত। আমাদের বংশের মেয়েদের মতো। বাইরের রঙ বদলায়, ভেতরের শক্তি থাকে।

আজ রাতে একটা তারা দেখেছি জানালা দিয়ে। তোকে দেখাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুই ঘুমিয়ে গেছিস। ঢাকায় তারা দেখা কঠিন, আলো বেশি, ধোঁয়া বেশি। কিন্তু তারা আছে। আকাশের ওপাশে, মেঘের পেছনে, সবসময় আছে। তুই দেখতে না পেলেও আছে। আমার ভালোবাসার মতো। দেখা যায় না, কিন্তু আলো দেয়। সবসময় আলো দেয়।

তোর মা আবার, হাসনা।