পিরিয়ডের গল্প

প্রতি মাসে তিন দিন আমি অদৃশ্য।

পর্ব ৭৬ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

অন্তরার চোদ্দ বছরে প্রথম রক্ত আসে ফেব্রুয়ারির একটা মঙ্গলবারে।

ক্লাস সেভেনের তৃতীয় পিরিয়ড। গণিত। রহিম স্যার বোর্ডে ভগ্নাংশ লিখছিলেন। অন্তরা পেটের ভেতর একটা মোচড় পেল, অচেনা, গভীর, যেন কেউ ভেতর থেকে কাপড় মোচড়াচ্ছে। সে ভাবল পেট খারাপ। সকালে পান্তা খেয়েছিল, হয়তো সেটা। সে চুপ করে বসে রইল। স্কুলে পেটের ব্যথার কথা বলা যায় না। বললে ছেলেরা হাসে।

চতুর্থ পিরিয়ডের পরে টিফিন। অন্তরা উঠে দাঁড়াল। পেছনের বেঞ্চে শাহানা বলল, "অন্তরা, তোর পেছনে কী?"

অন্তরা ঘুরে তাকাল। দেখতে পেল না। শাহানা চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে। পাশের রিনা মুখ ফিরিয়ে নিল। সামনের সারি থেকে একটা ছেলে ঘুরে তাকাল, তারপর অন্য একটা ছেলেকে কনুই দিয়ে ঠেলা দিল।

অন্তরা বুঝল কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কী হয়েছে সেটা সে জানত না। কেউ তাকে বলেনি। মা বলেনি। বড় বোন নেই। খালা দূরে থাকেন। স্কুলে এসব পড়ানো হয় না। বইয়ে একটা চ্যাপ্টার আছে, "প্রজনন," সেটা স্যার বলেন, "তোমরা নিজেরা পড়ে নিও।" কেউ পড়ে না। পড়লেও বোঝে না। বুঝলেও জিজ্ঞেস করতে পারে না।

অন্তরা হাত দিয়ে পেছনে ইউনিফর্ম ধরল। ভেজা। আঠালো। সে হাতটা সামনে আনল। লাল।

সেই মুহূর্তে অন্তরার ভেতরে কী ঘটল সেটা শব্দে বলা যায় না। লজ্জা, ভয়, বিভ্রান্তি, এগুলো আলাদা আলাদা শব্দ, কিন্তু সেই মুহূর্তে এগুলো একসাথে এসেছিল, একটা ঢেউয়ের মতো, যেটা তাকে ভেতর থেকে ডুবিয়ে দিল।

সে দৌড়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।

স্কুল থেকে বাড়ি দেড় কিলোমিটার। পাকা রাস্তা, তারপর মাটির রাস্তা, তারপর আলপথ ধরে বাড়ি। অন্তরা দৌড়ায়নি, হাঁটতেও পারেনি ঠিকমতো। সে ইউনিফর্মের ওপর ব্যাগটা পেছনে ঝুলিয়ে নিয়েছিল, যেন ব্যাগ দিয়ে দাগটা ঢাকা যায়। কিন্তু ব্যাগ ছোট, দাগ বড় হচ্ছিল।

রাস্তায় দুজন মহিলা দেখল। একজন তাকাল, তারপর অন্যজনকে কিছু বলল। ফিসফিস করে। অন্তরা শুনতে পেল না, কিন্তু বুঝল।

বাড়িতে মা উঠানে মরিচ শুকাচ্ছিল। অন্তরাকে দেখে বলল, "এত তাড়াতাড়ি?" তারপর দেখল। চুপ করে গেল। অন্তরাকে ভেতরে নিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করল।

"এটা স্বাভাবিক।"

তিনটে শব্দ। এটা স্বাভাবিক। মা আর কিছু বলল না। একটা পুরোনো শাড়ি ছিঁড়ে কাপড় বানাল। দেখাল কীভাবে ভাঁজ করতে হয়, কীভাবে রাখতে হয়। বলল, "প্রতি মাসে হবে।" বলল, "কাউকে বলবি না।"

কাউকে বলবি না।

এটাই প্রথম শিক্ষা। রক্ত আসার আগে শেখায় না, রক্ত আসার পরে প্রথম যেটা শেখায় সেটা হলো চুপ থাকা। লুকানো। গোপন রাখা। যেন এটা একটা অপরাধ। যেন শরীর একটা অপরাধ করেছে।

অন্তরা গোসল করল। ইউনিফর্ম ভিজিয়ে রাখল। সাদা ইউনিফর্ম, মাড়ানো পরিষ্কার সাদা কাপড়, তার ওপর বাদামি-লাল দাগ। দাগটা যায় না। সাবান দিয়ে ঘষল, যায় না। ব্লিচ দিয়ে ঘষল, কিছুটা গেল, কিন্তু কাপড়ও গেল। ইউনিফর্ম একটাই। আরেকটা কেনার টাকা নেই।

মা বলল, "কাল থেকে পেটিকোট পরবি ভেতরে। কালো।"

সমাধান। কালো কাপড় দিয়ে লাল ঢাকা। এটাই বাংলাদেশের মেয়েদের প্রথম পাঠ।

গ্রামের দোকানে প্যাড পাওয়া যায়।

অন্তরা জানে। সে দেখেছে, দোকানের পেছনের তাকে, কালো পলিথিনে মোড়া। কিন্তু সেটা কিনবে কে? বাবা? বাবাকে বলা যায় না। বাবা জানেন না যে মেয়েরা প্রতি মাসে রক্তপাত করে, অথবা জানেন কিন্তু সেটা এমন একটা জানা যেটা না-জানার মতো, যেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না, যেমন ঘরে একটা মৃত মানুষ আছে কিন্তু কেউ সেটা স্বীকার করে না।

মা? মা কিনতে পারেন। কিন্তু দোকানদার মতিন মিয়া। পুরুষ। মাকে বলতে হবে, "একটা প্যাড দেন।" মতিন মিয়ার পেছনে আরো দুই-তিনজন বসে থাকে, চা খায়, গল্প করে। সবাই শুনবে। সবাই জানবে।

তাই কাপড়।

পুরোনো শাড়ির কাপড়, চার ভাঁজ, সেলাই দিয়ে ধরানো। ধোয়া, শুকানো, আবার ব্যবহার। শুকাতে দেওয়াটাও একটা সমস্যা। রোদে দিলে সবাই দেখবে। তাই ঘরের ভেতরে, খাটের নিচে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। ভেজা কাপড়, অন্ধকার জায়গা। ইনফেকশনের শুরু এখান থেকে। কিন্তু ইনফেকশনের কথা কে জানে? কে বলবে?

অন্তরার ক্লাসে বত্রিশজন মেয়ে। অন্তরা জানে, প্রায় সবারই একই অবস্থা। কেউ বলে না। কেউ জিজ্ঞেস করে না। ক্লাসে একটা মেয়ে, সুমাইয়া, প্রতি মাসে তিন-চার দিন আসে না। টিচার বলেন, "সুমাইয়া কই?" কেউ বলে, "অসুস্থ।" অসুস্থ। এটাই কোড। এটাই পাসওয়ার্ড। প্রতি মাসে তিন দিন মেয়েরা "অসুস্থ।" এই অসুস্থতার কোনো চিকিৎসা নেই, কারণ এটা অসুস্থতা নয়। কিন্তু সমাজ এটাকে অসুস্থতার মতো করে রেখেছে।

অন্তরা মাসে তিন দিন স্কুলে যায় না।

হিসাব সোজা। বছরে বারো মাস। প্রতি মাসে তিন দিন। বছরে ছত্রিশ দিন। ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস টেন, চার বছর। একশো চুয়াল্লিশ দিন। প্রায় পাঁচ মাস। পাঁচ মাসের ক্লাস, পাঁচ মাসের পড়া, পাঁচ মাসের শেখা, শুধু এই কারণে হারিয়ে যায় যে অন্তরার শরীর কাজ করে। শরীর যেটা করার কথা সেটাই করে। কিন্তু সেই কাজের জন্য অন্তরা শাস্তি পায়।

গণিতে সে পিছিয়ে পড়ে। ইংরেজিতেও। বিজ্ঞানে ল্যাব ক্লাস মিস হয়। পরীক্ষায় যে প্রশ্নগুলো সে পারে না, সেগুলো ঠিক সেই তিন দিনের ক্লাসে পড়ানো হয়েছিল। কেউ জানে না কেন অন্তরা পারছে না। কেউ জিজ্ঞেস করে না। রিপোর্ট কার্ডে লেখা থাকে: "Could do better." পারত। যদি প্রতি মাসে তিন দিন তাকে অদৃশ্য না হতে হতো।

অন্তরার বাবা রিপোর্ট কার্ড দেখে বলেন, "পড়াশোনায় মন নাই।" মা চুপ করে থাকেন। মা জানেন কারণটা। কিন্তু মা বাবাকে বলতে পারেন না। কারণ সেই কারণটা বলার মতো না। সেটা গোপন। নারীদের গোপন। যেটা পুরুষেরা জানবে না, জানতে চাইবে না, জানলে অস্বস্তি বোধ করবে।

অন্তরার পাশের বাড়ির রুমা গত বছর স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। বাবা বলেছে, "পড়ে কী হবে? বিয়ে দাও।" রুমার বয়স পনেরো। রুমাও প্রতি মাসে তিন দিন যেত না। রুমার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছিল। রুমার বাবা ভেবেছিলেন মেয়ে পড়তে পারে না। আসলে মেয়ে পারত। শুধু তার শরীরকে সমাজ অনুমতি দেয়নি।

রাতে অন্তরা খাটে শোয়।

পেটে ব্যথা। কোমরে ব্যথা। শরীরটা ভারী, ক্লান্ত, যেন কেউ ভেতর থেকে চেপে ধরেছে। মা একটা গরম পানির বোতল দিয়েছে। অন্তরা সেটা পেটের ওপর রেখেছে। একটু আরাম। কিন্তু আরাম শুধু পেটে, মাথায় নয়।

মাথায় ঘুরছে আজকের কথা। ক্লাসের ছেলেটা যে কনুই দিয়ে ঠেলেছিল। শাহানার চোখ। রাস্তার মহিলাদের ফিসফিস। এগুলো ছোট ছোট ঘটনা, কিন্তু এগুলো মিলে একটা দেয়াল তৈরি করে। সেই দেয়ালের এক পাশে অন্তরা, অন্য পাশে বাকি পৃথিবী।

অন্তরা ভাবে, ছেলেদের কি এমন কিছু হয়?

না। ছেলেদের শরীর প্রতি মাসে রক্তপাত করে না। ছেলেদের ইউনিফর্মে দাগ পড়ে না। ছেলেদের তিন দিন স্কুল মিস হয় না। ছেলেরা দোকানে গিয়ে যা দরকার তা কিনতে পারে, কোনো লজ্জা নেই। ছেলেদের শরীর "গোপন" না। ছেলেদের শরীর "স্বাভাবিক।" মেয়েদের শরীরও স্বাভাবিক, কিন্তু সেই স্বাভাবিকটাকে সমাজ অস্বাভাবিক করে রেখেছে।

অন্তরা জানে না যে পৃথিবীর অন্য দেশে মেয়েরা প্যাড কেনে যেমন সাবান কেনে। জানে না যে কোনো কোনো স্কুলে ফ্রি প্যাড দেওয়া হয়। জানে না যে "পিরিয়ড" শব্দটা জোরে বলা যায়, ফিসফিস করে না। সে শুধু জানে তার মা যেটা শিখিয়েছে: লুকাও।

কিন্তু অন্তরা এটাও জানে, নিজের ভেতরে, অস্পষ্টভাবে, যেটাকে সে এখনো ভাষা দিতে পারে না: এই লুকানোটা ঠিক না।

সকালে অন্তরা উঠে কাপড় ধোয়।

ভোর পাঁচটা। কেউ জাগেনি। অন্ধকারে, পুকুরঘাটে, ঠান্ডা পানিতে। কাপড় ধোয়, ঘষে, আবার ধোয়। রক্তের দাগ পানিতে মিশে যায়। পানি একটু লাল হয়, তারপর স্বচ্ছ। যেন কিছু হয়নি।

এটাই প্রত্যাশা। যেন কিছু হয়নি। প্রতি মাসে তিন দিন একটা মেয়ে রক্তপাত করবে, ব্যথায় কুঁকড়ে থাকবে, স্কুল মিস করবে, অন্ধকারে কাপড় ধোবে, তারপর চতুর্থ দিনে উঠে এমনভাবে ক্লাসে ঢুকবে যেন কিছু হয়নি। কেউ জিজ্ঞেস করবে না। সে বলবে না। জীবন চলবে।

অন্তরা পুকুরের পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। চোদ্দ বছরের একটা মুখ। ক্লান্ত চোখ। সে নিজেকে বলে, মনে মনে, ভেতরে ভেতরে, যেখানে কেউ শুনতে পায় না:

প্রতি মাসে তিন দিন আমি অদৃশ্য। কারণ আমার শরীর কাজ করে। কিন্তু সমাজ বলে লুকাও।

সে কাপড় নিংড়ায়। খাটের নিচে শুকাতে দেয়। ইউনিফর্ম পরে। ব্যাগ নেয়।

আজ চতুর্থ দিন। আজ সে স্কুলে যাবে। আজ সে দৃশ্যমান।

তিন দিন পরের দৃশ্যমানতা। যেন তিন দিন সে ছিল না। যেন তিন দিন সে মানুষ ছিল না।

অন্তরা হাঁটতে থাকে। পাকা রাস্তা, মাটির রাস্তা, আলপথ। স্কুলের দিকে। পিঠে ব্যাগ। পেটে এখনো একটু ব্যথা। কিন্তু সে হাঁটে। কারণ থামলে প্রশ্ন আসবে। হাঁটলে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না।

বত্রিশটা মেয়ে। প্রতি মাসে। প্রতি স্কুলে। প্রতি গ্রামে। সারা বাংলাদেশে।

অদৃশ্য হওয়ার এই চক্র চলতেই থাকে। কারণ কেউ দেখে না। কারণ কেউ দেখতে চায় না।