পরকীয়ার শিকার

কোনো পথই আমার না।

পর্ব ৭৭ · ৬ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আরজু জানে রাত এগারোটার পরে ফয়সালের ফোনে মেসেজ আসে।

ফোনটা ভাইব্রেট করে। বালিশের নিচে। ফয়সাল পাশ ফিরে শোয়, পিঠ দিয়ে আরজুর দিকে, স্ক্রিনের আলো তার মুখে, ঠোঁটে একটা হাসি। সেই হাসি আরজু চেনে না। তিরিশ বছরের জীবনে, দশ বছরের সংসারে, ফয়সালের হাসি সে দেখেছে অনেক রকম। কিন্তু এই হাসি নতুন। এই হাসি তার জন্য নয়।

আরজু প্রথম বুঝেছিল তিন মাস আগে।

ফয়সালের শার্টে একটা গন্ধ। পারফিউমের। ফয়সাল পারফিউম ব্যবহার করে না। আরজু জিজ্ঞেস করেছিল, "নতুন পারফিউম?" ফয়সাল বলেছিল, "অফিসে কেউ স্প্রে করেছে।" আরজু বিশ্বাস করেছিল। বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কারণ অবিশ্বাসের পরের ধাপটা এত ভারী যে সেখানে যাওয়ার শক্তি তার ছিল না।

তারপর আরো চিহ্ন। ফোনে পাসওয়ার্ড বদলেছে। অফিস থেকে দেরিতে ফেরে। শনিবারে "মিটিং" থাকে। রবিবারে "ক্লায়েন্ট" দেখতে যায়। প্রতিটা মিথ্যার ওপর আরজু একটা করে ইট রাখে, যেন একটা দেয়াল তৈরি করছে, যেটার পেছনে সত্যিটা আটকে থাকবে, যেটা সে দেখতে চায় না।

কিন্তু সত্যি দেয়াল মানে না।

পাড়ার মানুষ আগে জানল।

আরজুর চেয়ে আগে। এটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর অংশ। নিজের সংসারের ভাঙন নিজে শেষে জানে। বাকি সবাই আগে। কারণ বাইরের চোখ বেশি, ভেতরের চোখ কম। ভেতরের চোখ ভালোবাসায় অন্ধ থাকে, অথবা ভয়ে।

পাশের বাড়ির খালেদা ভাবি একদিন বলল, "আরজু, তোর জামাইরে তো শুক্রবারে কামরাঙ্গীর চরে দেখলাম। একটা মেয়ের সাথে।" বলল এমনভাবে, যেন খবর দিচ্ছে, কিন্তু চোখে একটু আনন্দ ছিল। অন্যের সংসারের সমস্যায় একটা বিকৃত আনন্দ থাকে কিছু মানুষের। আরজু সেটা দেখল, কিন্তু কিছু বলল না।

তারপর আরো মানুষ। ফয়সালের দোকানের পাশের রকিব। আরজুর কলিগ তাসনিম, যে "শুনেছি" দিয়ে শুরু করে। ফয়সালের মা, যিনি বললেন, "ছেলেমানুষ, একটু আধটু হয়।" একটু আধটু। যেন বিশ্বাসঘাতকতা চিনির মতো, একটু বেশি হলে মিষ্টি, ক্ষতি নেই।

আরজু প্রতিটা কথা শুনল। প্রতিটা চোখের দিকে তাকাল। প্রতিটা কথার ভেতর থেকে একটা বার্তা বেরিয়ে এল, স্পষ্ট, পরিষ্কার: এটা তোমার দোষ।

তুমি ঠিকমতো রাখতে পারনি।

"ঠিকমতো রাখা" মানে কী?

আরজু ভাবে। রাত তিনটায়, যখন ফয়সাল ঘুমায়, যখন বাচ্চা দুটো ঘুমায়, যখন পুরো পৃথিবী ঘুমায়, আরজু জেগে থাকে এবং ভাবে।

ঠিকমতো রাখা মানে কি প্রতিদিন সাজগোজ করে থাকা? আরজু সাজে। ঘরে থেকেও চুল আঁচড়ায়, পরিষ্কার কাপড় পরে, ফয়সালের পছন্দের রঙের শাড়ি পরে। কিন্তু দুটো বাচ্চার মা, চাকরি করে, রান্না করে, ঘর গোছায়, তারপরেও কি সে সেই মেয়েটা থাকতে পারে যাকে ফয়সাল বিয়ে করেছিল? সময় তো সবাইকে বদলায়। কিন্তু পুরুষের বদলানো "পরিণত হওয়া," আর নারীর বদলানো "নিজেকে ছেড়ে দেওয়া।"

ঠিকমতো রাখা মানে কি বিছানায়? আরজু এটা ভাবতে চায় না, কিন্তু ভাবে, কারণ সমাজ তাকে এটা ভাবতে বাধ্য করে। "স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে পারনি।" এই বাক্যটা বাতাসে ভাসে, কেউ সরাসরি বলে না, কিন্তু সবাই বোঝায়। যেন পুরুষের বিশ্বাসঘাতকতার দায় নারীর শরীরের। যেন পুরুষ একটা পশু, যাকে খাওয়াতে না পারলে সে অন্য জায়গায় যাবেই, এটা প্রকৃতির নিয়ম।

কিন্তু ফয়সাল কি পশু? আরজু ফয়সালকে পশু ভাবে না। ফয়সাল একজন মানুষ। সিদ্ধান্ত নিয়ে, বুঝে-শুনে, জেনে, অন্য একটা সম্পর্কে গেছে। এটা দুর্বলতা নয়। এটা পছন্দ। কিন্তু সেই পছন্দের দায় নেয় আরজু।

আরজু থাকে।

সংসারে থাকে। কারণ রাফি সাত বছরের, রিমা চার বছরের। রাফি বাবাকে ভালোবাসে। রিমা বাবার কোলে ঘুমায়। বাচ্চারা জানে না। বাচ্চারা জানবে না। আরজু নিজের ভেতরের সব কিছু গিলে ফেলে, চিবিয়ে চিবিয়ে, তেতো, বিষাক্ত, তবু গেলে, কারণ বাচ্চাদের জন্য।

সকালে ফয়সালের জন্য নাশতা বানায়। ফয়সালের পছন্দমতো। ডিম, পরোটা, চা। ফয়সাল খায়, কিছু বলে না, ফোনে তাকিয়ে থাকে। আরজু টেবিলের ওপার থেকে দেখে। এই মানুষটা তার স্বামী। এই মানুষটা অন্য একটা মেয়ের সাথে রাত কাটায়। এই মানুষটার কাপড় আরজু ধোয়। এই মানুষটার জন্য আরজু রান্না করে। এই মানুষটাকে আরজু ঘৃণা করে, না, ঘৃণা নয়, ঘৃণা থেকেও জটিল কিছু, যেটার নাম নেই, যেটা ভালোবাসা আর অপমানের মাঝখানে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, স্থির, নড়ে না।

বিকেলে ফয়সালের জামা ইস্ত্রি করে। সেই জামা পরে ফয়সাল "মিটিংয়ে" যায়। আরজু জানে কোন মিটিং। কিন্তু সে ইস্ত্রি করে। কারণ না করলে বাচ্চারা প্রশ্ন করবে। না করলে শাশুড়ি প্রশ্ন করবেন। না করলে পাড়া বলবে, "সেই জন্যই ছেলেটা বাইরে গেছে।"

আরজু একটা ফাঁদে আটকে আছে। এই ফাঁদটা সমাজ বানিয়েছে, পুরুষের জন্য নয়, নারীর জন্য।

আরজুর মা বলেন, "সহ্য কর।"

আরজুর বাবা বলেন, "তোর ছেলেমেয়ের কথা ভাব।"

আরজুর শাশুড়ি বলেন, "পুরুষমানুষ, একটু হয়।"

আরজুর বান্ধবী তাসনিম বলে, "ডিভোর্স দিয়ে দে।"

চারটা মত। চারটা পথ। কিন্তু কোনো পথই আরজুর জন্য নিরাপদ নয়।

সহ্য করলে: নিজেকে হারায়। প্রতিদিন একটু একটু করে। যেমন জলে নুন গলে, তেমন। একদিন কিছু থাকবে না। শুধু একটা খোলস, যেটা রান্না করে, কাপড় ধোয়, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠায়, কিন্তু ভেতরে কেউ নেই।

ডিভোর্স দিলে: "খারাপ মেয়ে।" একটাই তকমা। ডিভোর্সি নারী বাংলাদেশে একটা দ্বীপ। কেউ কাছে আসে না। বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়া মানে বোঝা হওয়া। চাকরি করলেও "একটা মেয়ে একা থাকে" এটা পাড়ায় কথা। বাচ্চারা বাবাকে হারাবে, অথবা আরজু বাচ্চাদের হারাবে, কারণ আদালতে পুরুষের ক্ষমতা বেশি, টাকা বেশি, সামাজিক অবস্থান বেশি।

আরজু ভাবে।

যে পুরুষ বিশ্বাসঘাতকতা করে, সে নায়ক। "ছেলেমানুষ তো, হবেই।" তার চরিত্রে দাগ লাগে না। সে অফিসে যায়, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, মসজিদে নামাজ পড়ে, কেউ কিছু বলে না। যে নারী সহ্য করে, সে বোকা। "এত মেনে নেয় কেন?" যে নারী চলে যায়, সে খারাপ। "সংসার টেকাতে পারল না।"

কোনো পথই আমার না।

আজ সন্ধ্যায় ফয়সাল ঘরে আছে। বিরল ঘটনা।

রাফি বাবার কোলে বসে কার্টুন দেখছে। রিমা ঘুমিয়ে পড়েছে। ফয়সাল চা চায়। আরজু চা বানায়। দুধ চা, আদা দিয়ে, ফয়সালের পছন্দ।

চা নিয়ে আসে। ফয়সাল হাসে। সেই পুরোনো হাসি, আরজুর জন্য হাসি, যেটা এখন মাঝে মাঝে আসে, ফ্ল্যাশলাইটের মতো, জ্বলে আর নেভে। আরজু সেই হাসি দেখে একটু গলে যায়, তারপর মনে পড়ে, তারপর শক্ত হয়ে যায়, তারপর আবার গলে। এই চক্রটা প্রতিদিনের।

ফয়সাল বলে, "চা ভালো হইছে।"

আরজু বলে, "হুম।"

একটা শব্দ। হুম। এই শব্দের ভেতরে দশ বছরের সংসার আছে, দুটো বাচ্চা আছে, শত রাতের কান্না আছে, একটা মেয়ের ভাঙা আত্মসম্মান আছে, একটা "কেন" আছে যেটা সে কোনোদিন জিজ্ঞেস করবে না।

রাতে বিছানায়। ফয়সাল ঘুমিয়ে পড়ে। আরজু জেগে থাকে। ছাদের দিকে তাকায়। ছাদে একটা টিকটিকি চলাফেরা করছে।

আরজু ভাবে, টিকটিকির জীবন সহজ। খাবার খোঁজে, খায়, ঘুমায়। কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো বিশ্বাসঘাতকতা নেই। কোনো "ঠিকমতো রাখা" নেই।

আরজুর চোখ থেকে পানি গড়ায়। নিঃশব্দে। বালিশ ভেজে। সকালে বালিশ শুকিয়ে যাবে। কেউ জানবে না।

কেউ কোনোদিন জানবে না।