রূপচর্চার ফাঁদ
আমি যেমন আছি, তেমনই থাকবো।
১
প্রিয়ার গায়ের রঙ তার নানির মতো।
নানি ছিলেন গাঢ় বাদামি, মাটির মতো, পলিমাটির মতো, যে মাটিতে ধান হয়, আম হয়, কাঁঠাল হয়। নানি সুন্দর ছিলেন। প্রিয়া নানির ছবি দেখেছে, সাদাকালো ছবি, তাতে রঙ বোঝা যায় না, কিন্তু চোখ বোঝা যায়, ঠোঁট বোঝা যায়, হাসি বোঝা যায়। নানি হাসতেন আর পুরো ঘর আলো হতো। এটা প্রিয়ার মা বলেছেন।
প্রিয়ার মা ফর্সা। বাবাও ফর্সা। প্রিয়ার বড় ভাই ফর্সা। ছোট বোন ফর্সা। শুধু প্রিয়া কালো। "কালো" শব্দটা পরিবারে কেউ ব্যবহার করে না, বলে "একটু শ্যামলা," যেটা একই কথা কিন্তু নরম মোড়কে। যেমন কেউ মারা গেলে বলে "চলে গেছে," মানে একই, কিন্তু সরাসরি বলতে কষ্ট লাগে।
প্রিয়ার বিশ বছর পূর্ণ হয়েছে গত মাসে। কুড়ি বছরে সে যতবার আয়নায় তাকিয়েছে, ততবার আয়না তাকে একটাই কথা বলেছে: তুমি কালো। আয়না নিরপেক্ষ, আয়না শুধু দেখায়, কিন্তু আয়নায় তাকানোর সময় প্রিয়ার চোখ তার নিজের নয়, সমাজের। সমাজের চোখে কালো মানে কম। কম সুন্দর, কম মূল্যবান, কম বিয়েযোগ্য।
২
ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি। টিউবটা গোলাপি আর সাদা।
প্রিয়া প্রথম ব্যবহার করেছিল তেরো বছরে। খালা দিয়েছিলেন। "এইটা লাগা, গায়ের রঙ ফর্সা হবে।" খালা ভালোবাসা থেকে দিয়েছিলেন। খালা জানতেন কালো মেয়ের কী কষ্ট, কারণ খালা নিজেও শ্যামলা, খালার বিয়ে দিতে নানা-নানিকে বেশি যৌতুক দিতে হয়েছিল। কালো মেয়ের দাম কম, তাই বাবাকে বেশি দিতে হয়। এটা বাজারের নিয়ম। মেয়ে পণ্য, রঙ তার গ্রেড।
সাত বছর ধরে প্রিয়া ফেয়ারনেস ক্রিম লাগিয়েছে। প্রতি রাতে। মুখে, গলায়, হাতে। প্যাকেটে লেখা: "৭ দিনে ফর্সা।" সাত দিনে হয়নি। সাত মাসেও না। সাত বছরেও না। কারণ মেলানিন রসায়ন, ক্রিম দিয়ে বদলায় না। কিন্তু বিজ্ঞাপন বলে বদলায়, আর বিজ্ঞাপনের মেয়েটা হাসে, ঝলমলে, সাদা, যেন ফর্সা হওয়ার আগে সে মানুষ ছিল না, ফর্সা হওয়ার পরে সে সম্পূর্ণ হয়েছে।
প্রিয়া হিসাব করেছে। সাত বছরে ফেয়ারনেস ক্রিমে সে খরচ করেছে প্রায় বিশ হাজার টাকা। বিশ হাজার টাকা দিয়ে সে কী করতে পারত? বই কিনতে পারত। একটা কোর্স করতে পারত। কিন্তু সে কিনেছে একটা মিথ্যার প্রতিশ্রুতি, টিউবে টিউবে, যেটা তার চামড়া পুড়িয়েছে, লাল করেছে, ব্রণ করেছে, কিন্তু ফর্সা করেনি।
ক্রিমের পাশাপাশি ডায়েট পিল। ইন্টারনেটে দেখা। "৩০ দিনে ১০ কেজি কমান।" প্রিয়া মোটা না। কিন্তু বিজ্ঞাপনের মেয়েটা চিকন, তাই প্রিয়ারও চিকন হওয়া দরকার। পিল খেয়ে পেট খারাপ হয়েছিল, তিন দিন বিছানায় ছিল, মা জিজ্ঞেস করেছিলেন কী হয়েছে, প্রিয়া বলেছিল "কিছু না।"
কিছু না। মেয়েরা সবসময় বলে "কিছু না।" কারণ আসল কথাটা বলার জায়গা নেই।
৩
"কালো মেয়ের বিয়ে হয় না।"
এটা কে প্রথম বলেছিল প্রিয়া মনে করতে পারে না। হয়তো কোনো আত্মীয়। হয়তো পাড়ার কেউ। হয়তো টেলিভিশন। কিন্তু এই বাক্যটা তার কানে এমনভাবে বসে গেছে যেমন পেরেক দেয়ালে বসে, তুলতে গেলে দেয়াল ভাঙে।
প্রিয়ার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে গত বছর। পাত্রী খোঁজার সময় প্রথম প্রশ্ন ছিল: "মেয়ে দেখতে কেমন?" দেখতে কেমন মানে রঙ কেমন। লম্বা না খাটো তারপর। মোটা না চিকন তারপর। কিন্তু প্রথমে রঙ। যেন মানুষ একটা রঙের নমুনা, পেইন্টের দোকানের মতো, হালকা থেকে গাঢ়, এবং হালকাটাই কাঙ্ক্ষিত।
প্রিয়ার জন্যও পাত্র খোঁজা শুরু হয়েছে। মা ঘটকদের সাথে কথা বলেন। ঘটক আসে, প্রিয়াকে দেখে, বলে, "মেয়ে তো একটু..." বাক্যটা শেষ করে না। শেষ করার দরকার নেই। সবাই বোঝে।
একটা পাত্র এসেছিল। ভালো চাকরি, ভালো পরিবার। প্রিয়াকে দেখে বলেছিল, "মেয়ে তো কালো।" সরাসরি। মায়ের সামনে। বাবার সামনে। প্রিয়ার সামনে। যেন প্রিয়া একটা পণ্য, যেটার রঙ ঠিক নেই, যেটা রিটার্ন করা যায়।
প্রিয়া সেদিন কিছু বলেনি। ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছিল। কাঁদেনি। কান্নার ওপারে একটা জায়গা আছে, যেখানে চোখ শুকনো থাকে কিন্তু ভেতরটা পুড়ে যায়। প্রিয়া সেই জায়গায় গিয়েছিল।
৪
পরিবর্তন একটা রাতে আসে।
রাত একটায়। প্রিয়া বাথরুমে। আয়নার সামনে। হাতে ফেয়ারনেস ক্রিমের টিউব। প্রতি রাতের মতো। ক্রিম বের করল। মুখে লাগাতে যাবে। হাত থামল।
আয়নায় তাকাল। নিজের মুখ। কালো মুখ। গোল চোখ, ঘন ভ্রু, পুরু ঠোঁট, চওড়া নাক। এই মুখ তার মায়ের মায়ের। এই মুখ শত বছরের। এই মুখে বাংলার মাটি আছে, রোদ আছে, বৃষ্টি আছে। এই মুখ প্রকৃতির।
কিন্তু প্রকৃতিকে কেউ সুন্দর বলে না।
মাটি সুন্দর না, মার্বেল সুন্দর। কালো সুন্দর না, সাদা সুন্দর। রাত সুন্দর না, দিন সুন্দর। কে ঠিক করল এই সৌন্দর্যের মাপকাঠি? কোন বিজ্ঞাপন? কোন ঔপনিবেশিক শাসক? কোন ক্রিমের কোম্পানি যেটা নারীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে টাকা কামায়?
প্রিয়া ক্রিমের টিউবটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
ছোট একটা কাজ। কিন্তু সেই মুহূর্তে প্রিয়ার ভেতরে কিছু একটা ভাঙল, এবং সেই ভাঙা থেকে কিছু একটা জন্মাল। সে জানে না এটাকে কী বলে। সাহস? প্রতিরোধ? আত্মসম্মান? শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনুভূতিটা গুরুত্বপূর্ণ।
আমি যেমন আছি, তেমনই থাকবো।
৫
ছয় মাস হয়ে গেছে। প্রিয়া ফেয়ারনেস ক্রিম ব্যবহার করে না।
ত্বক আসলে ভালো হয়েছে। ক্রিমের রাসায়নিক থেকে মুক্তি পেয়ে চামড়া নিজের স্বাভাবিক রূপে ফিরেছে। ব্রণ কমেছে। লালচে ভাব কমেছে। গায়ের রঙ একই আছে। কালো। কিন্তু সুস্থ কালো। উজ্জ্বল কালো। নিজের কালো।
মা বলেন, "একটু ক্রিম লাগা না? পাত্রপক্ষ আসবে।"
প্রিয়া বলে, "যে পাত্র আমার গায়ের রঙ দেখে বিয়ে করবে না, সেই পাত্র আমার দরকার নেই।"
মা চুপ করে যান। বাবা কিছু বলেন না। বাবা কখনো এসব নিয়ে কিছু বলেন না। বাবার জগতে মেয়ের গায়ের রঙ একটা সমস্যা যেটা মেয়ে আর তার মা মিলে সমাধান করবে, বাবার কিছু করার নেই।
পাত্র আসে। দেখে। চলে যায়। ফোন আসে না।
এক মাসে তিনটা পাত্র দেখল, তিনটাই "না।" ঘটক বলল, "মেয়েকে বলেন একটু ফর্সা করতে।" মা কাঁদলেন। প্রিয়া মায়ের কান্না দেখে ভাবল: এই কান্না কার জন্য? আমার জন্য, না সমাজের জন্য?
৬
প্রিয়া কলেজে পড়ে। অনার্স তৃতীয় বর্ষ। হিসাববিজ্ঞান।
ক্লাসে সে প্রথম পাঁচে থাকে। তার অ্যাসাইনমেন্ট সবচেয়ে পরিষ্কার। তার উপস্থাপনা সবচেয়ে ভালো। তার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট, তার চোখ সোজা তাকায়, তার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু এগুলো কেউ দেখে না। দেখে গায়ের রঙ।
প্রিয়া একদিন ক্লাসে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিল। "বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নারীর অবদান।" ভালো প্রেজেন্টেশন। তথ্য, চার্ট, বিশ্লেষণ। শেষে একটা ছেলে পেছন থেকে বলল, ফিসফিস করে, কিন্তু যথেষ্ট জোরে যে প্রিয়া শুনতে পেল: "বুদ্ধি আছে, কিন্তু চেহারা..."
প্রিয়া থামল না। প্রেজেন্টেশন শেষ করল। বসল। ভেতরে কিছু একটা জ্বলল, কিন্তু সে সেই আগুনকে দমাল না। সেই আগুন তার দরকার। সেই আগুন তাকে চালায়। সেই আগুন বলে: তুমি তোমার রঙ না। তুমি তোমার মাথা। তুমি তোমার কাজ। তুমি তোমার কথা।
বিয়ে না হলে মরবো না। কিন্তু নিজেকে ঘৃণা করলে মরবো।
প্রিয়া এটা বুঝেছে। কুড়ি বছর লেগেছে বুঝতে। সাত বছরের ক্রিম, তিন বছরের ডায়েট পিল, অসংখ্য কান্না, অসংখ্য আয়নায় তাকানো, অসংখ্য "তুমি কালো" শোনার পরে।
সে এখন আয়নায় তাকায়। একই মুখ। কালো। কিন্তু এখন সে নিজের চোখে দেখে, সমাজের চোখে নয়। এবং নিজের চোখে সে সুন্দর। সুন্দর কারণ সে নিজে। সুন্দর কারণ সে নানির মতো। সুন্দর কারণ সে মাটির মতো, যে মাটিতে সব কিছু জন্মায়।
আমার গায়ের রঙ প্রকৃতির। কিন্তু প্রকৃতিকে কেউ সুন্দর বলে না। তাই আমি নিজে বলি। আমি সুন্দর।
প্রিয়া আয়না থেকে চোখ সরায়। বই খোলে। পড়তে বসে। পরীক্ষা সামনে।
রঙ দিয়ে কেউ পরীক্ষা পাস করে না।