মায়ের দুধ

আমার স্তন আমার সন্তানের খাবারের উৎস।

পর্ব ৭৯ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সুমি বাচ্চাকে খাওয়ায়। এটাই তার কাজ। এটাই প্রকৃতির নির্দেশ।

আট মাসের আরাফ। দুপুরে খিদে পায়, কাঁদে, মুখ হাঁ করে, মায়ের দিকে হাত বাড়ায়। সুমি বুকে তুলে নেয়। আরাফ খায়। চুপ হয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে। ছোট্ট হাত দিয়ে সুমির জামা ধরে রাখে, যেন ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে।

এই দৃশ্যটা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো দৃশ্য। মানুষ যখন গুহায় থাকত, তখনো মা বুকে দুধ খাওয়াত। যখন নদীর তীরে ঘর বানাত, তখনো। যখন শহর বানাত, কারখানা বানাত, মহাকাশযান বানাত, তখনো। এই একটা জিনিস বদলায়নি। মায়ের দুধ। প্রকৃতির প্রথম খাবার।

কিন্তু এই দৃশ্যটা যখন ঘরের বাইরে যায়, তখন সমস্যা শুরু হয়।

বাসে ছিল ঘটনাটা।

সুমি মিরপুর থেকে মতিঝিলে যাচ্ছিল। আরাফকে নিয়ে। শ্বাশুড়ি আজ রাখতে পারেননি, তাই বাচ্চা সাথে। অফিসে একটা জরুরি মিটিং। সুমি চাকরি করে, একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, হিউম্যান রিসোর্সে। ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ, দুই মাস হলো অফিসে ফিরেছে।

বাসে আরাফ কাঁদতে শুরু করল। ক্ষুধার কান্না। সুমি চেনে এই কান্না। তীক্ষ্ণ, ছোট ছোট, ক্রমশ জোরে। খাওয়াতে হবে। এখনই।

সুমি ওড়নাটা গায়ে জড়াল। যতটা সম্ভব ঢেকে নিল। বাচ্চাকে বুকে ধরল। আরাফ খেতে শুরু করল। কান্না থামল।

পাশের সিটে একটা মধ্যবয়সী পুরুষ বসে ছিল। সে তাকাল। তারপর তাকাল আবার। তারপর মুখ ফিরিয়ে নিল, কিন্তু সেই ফিরিয়ে নেওয়ার ভেতরে একটা ভাব ছিল, অস্বস্তির, যেন সুমি কিছু একটা অশ্লীল করছে।

পেছনের সিট থেকে একটা মেয়ে বলল, ফোনে কথা বলতে বলতে, "বাসে বসে ব্রেস্টফিড করতেছে, ইস।"

সুমি শুনল। কিছু বলল না। কী বলবে? বলবে যে তার বাচ্চা ক্ষুধার্ত? বলবে যে বুকের দুধ একটা খাবার, যৌন বিষয় না? বলবে যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে দুই বছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত? বলবে যে সে একজন মা, এবং মায়ের কাজ বাচ্চাকে খাওয়ানো, এবং সে সেই কাজটাই করছে?

সুমি কিছু বলল না। চুপচাপ বাচ্চাকে খাওয়াল। মতিঝিলে নামল। হাঁটতে লাগল অফিসের দিকে। ভেতরে একটা আগুন জ্বলছিল, ধীরে ধীরে, নীল আঁচে।

অফিসে পাম্পিং রুম নেই।

সুমি এইচআর-এ কাজ করে। কোম্পানিতে চারশো কর্মচারী। পনেরো তলা বিল্ডিং। জিম আছে, ক্যান্টিন আছে, প্রেয়ার রুম আছে, স্মোকিং জোন আছে। পাম্পিং রুম নেই। কারণ কেউ ভাবেনি। কারণ যারা বিল্ডিং ডিজাইন করেছে তারা পুরুষ। কারণ যারা কোম্পানি চালায় তারা পুরুষ। তাদের স্ত্রীরা ঘরে বসে বুকের দুধ খাওয়ায়, অফিসে এই সমস্যাটা তাদের মাথায় আসে না।

সুমি বাথরুমে যায়। দরজা বন্ধ করে। ব্রেস্ট পাম্প বের করে। পাম্প করে। বোতলে রাখে। বোতলটা ফ্রিজে রাখতে হবে, কিন্তু অফিসের ফ্রিজে রাখলে সবাই দেখবে, প্রশ্ন করবে, "এটা কী?" বললে বিব্রত হবে। তাই সুমি একটা ছোট কুলার ব্যাগ আনে, নিজের ড্রয়ারে রাখে।

বাথরুমে পাম্প করতে বিশ মিনিট লাগে। দিনে দুইবার। চল্লিশ মিনিট। বসকে বলেছিল। বস বলেছিলেন, "ব্রেক তো আছে, তখন করো।" ব্রেক একটা, দুপুরে, এক ঘণ্টা। সেই এক ঘণ্টায় খাওয়া, পাম্পিং, নামাজ, সব। সময় কম পড়ে। সুমি খাওয়া বাদ দেয়। একটা বিস্কুট খায়, চা খায়, বাকি সময়ে পাম্প করে।

একজন কলিগ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "তুমি ব্রেকে কোথায় যাও?"

সুমি বলেছিল, "একটু কাজ আছে।"

কাজ। হ্যাঁ, এটা কাজ। সন্তানকে খাওয়ানো একটা কাজ। কিন্তু এই কাজটা অফিসে স্বীকৃত নয়। এই কাজটা দৃশ্যমান হতে পারে না। এই কাজটা বাথরুমে, লুকিয়ে, তাড়াহুড়ো করে করতে হয়, যেন এটা একটা গোপন, যেন এটা একটা লজ্জা।

শাশুড়ি বলেন, "বাচ্চা কি এখনো দুধ খায়?"

আরাফের বয়স আট মাস। হ্যাঁ, খায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে দুই বছর পর্যন্ত খাওয়ানো উচিত। ছয় মাসের পরে শক্ত খাবারের সাথে সাথে বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া দরকার। এটা বিজ্ঞান। এটা গবেষণার ফলাফল। এটা লক্ষ লক্ষ শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য প্রমাণিত সত্য।

কিন্তু শাশুড়ি বলেন, "এত বড় বাচ্চা এখনো দুধ খায়? ফর্মুলা দাও।"

ননদ বলেন, "ও দুধ না ছাড়লে তুমি কাজে মন দিতে পারবে না।"

স্বামী রাকিব বলে, "দেখ, তুমি জানো ভালো।" রাকিব নিরপেক্ষ। নিরপেক্ষতাও একটা অবস্থান, এবং এই ক্ষেত্রে সেটা সুমির পক্ষে নয়। কারণ শাশুড়ি আর ননদের কথার বিপক্ষে কেউ দাঁড়ায় না। নিরপেক্ষ মানে মা একা।

সুমি খাওয়ায়। রাতে, যখন সবাই ঘুমায়। ভোরে, যখন সবাই ঘুমায়। দিনে, অফিসে, বাথরুমে, লুকিয়ে। সন্ধ্যায়, বাসায় ফিরে, দরজা বন্ধ করে। খাওয়ানোটাকে সে এমনভাবে করে যেন এটা একটা গোপন মিশন। যেন সে একটা অবৈধ কাজ করছে।

অথচ সে শুধু তার বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছে।

সুমি রাতে আরাফকে খাওয়ায়।

রাত দুইটা। আরাফ কাঁদে। সুমি উঠে বসে। চোখ খুলতে পারে না, ঘুমে ভারী, শরীরটা ক্লান্ত, কিন্তু সে ওঠে। কারণ মা ওঠে। এটা মায়ের শরীরে লেখা আছে, জিনে, কোষে, সেই প্রথম মানুষের সময় থেকে।

আরাফ খায়। চোখ বন্ধ করে। ঘুমিয়ে পড়ে। সুমির কোলে, উষ্ণ, নিরাপদ।

সুমি তাকিয়ে থাকে। ছোট্ট মুখ। ছোট্ট হাত। ছোট্ট আঙুল যেটা তার জামা ধরে আছে।

আমার স্তন আমার সন্তানের খাবারের উৎস। কিন্তু সমাজ এটাকে যৌন অঙ্গ হিসেবেই দেখে।

এটাই সমস্যা। একটাই অঙ্গ, দুটো চোখ দিয়ে দেখা হয়। পুরুষের চোখ দেখে যৌনতা। বিজ্ঞাপনের চোখ দেখে পণ্য। সমাজের চোখ দেখে লজ্জা। শুধু বাচ্চার চোখ দেখে খাবার। শুধু বাচ্চার চোখই সত্য।

সুমি ভাবে, একটা দেশ যেখানে মা প্রকাশ্যে বাচ্চাকে খাওয়াতে পারে না, সেই দেশ কীভাবে বলে যে সে মাকে সম্মান করে? প্রতিটা বিজ্ঞাপনে, প্রতিটা বক্তৃতায়, প্রতিটা ওয়াজে: "মায়ের পায়ের নিচে বেহেশত।" কিন্তু সেই মা যখন বাসে বসে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায়, তখন সে অশ্লীল। সেই মা যখন অফিসে পাম্পিং রুম চায়, তখন সে "বাড়াবাড়ি করে।" সেই মা যখন আট মাসেও দুধ খাওয়ায়, তখন সে "অত দরকার নেই।"

মা শব্দটা বাংলাদেশে একটা মূর্তি। পূজা করা হয়, কিন্তু প্রয়োজনগুলো দেখা হয় না।

সকালে সুমি অফিসে যায়।

ব্যাগে কুলার, পাম্প, বোতল। পিঠে ল্যাপটপ ব্যাগ। ডান হাতে আরাফের ব্যাগ, যেটা শাশুড়ির কাছে রেখে যাবে। বাম হাতে ফোন, শাশুড়িকে কল করছে, আজ রাখতে পারবেন কিনা।

সুমি হাঁটে। ক্লান্ত। রাতে তিনবার উঠেছে। ঘুম হয়নি। চোখের নিচে কালো দাগ। কিন্তু সে হাঁটে। কারণ থামার উপায় নেই।

বাসে ওঠে। আজ আরাফ সাথে নেই, শাশুড়ি রাখতে পেরেছেন। কিন্তু বুক ভারী। দুধ জমেছে। অফিসে গিয়ে পাম্প করতে হবে। বাথরুমে। লুকিয়ে।

সুমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। ঢাকার রাস্তা। গাড়ি, রিকশা, মানুষ। কত মা আছে এই শহরে যারা সুমির মতো। যারা বাথরুমে পাম্প করে। যারা বাসে ওড়নায় মুখ ঢেকে খাওয়ায়। যারা "বাচ্চা কি এখনো দুধ খায়" শুনে চুপ করে থাকে।

সুমি চুপ করে থাকবে না।

আজ সে এইচআর ম্যানেজার হিসেবে একটা প্রস্তাব লিখবে। অফিসে একটা ঘর, ছোট একটা ঘর, একটা চেয়ার, একটা টেবিল, একটা পর্দা, একটা ফ্রিজ। পাম্পিং রুম। নতুন মায়েদের জন্য। এটুকু তো কঠিন নয়। স্মোকিং জোন বানাতে পারে, পাম্পিং রুম কেন পারবে না?

সুমি জানে, প্রস্তাব অনুমোদন নাও হতে পারে। বস হয়তো বলবেন, "বাজেট নেই।" কিন্তু সুমি লিখবে। কারণ না লিখলে কিছু বদলাবে না। কারণ চুপ থাকলে বাথরুমে পাম্পিং চিরকাল চলবে।

সুমি বাস থেকে নামে। অফিসে ঢোকে। লিফটে ওঠে। ডেস্কে বসে। কম্পিউটার খোলে।

টাইপ করতে শুরু করে।