মেনোপজ
নারীর শরীর সবসময় একটা গোপন বিষয়।
১
রেহানার শরীর আগুন হয়ে যায় রাত তিনটায়।
হঠাৎ। কোনো কারণ নেই। ঘরে ফ্যান চলছে, জানালা খোলা, শীতের শেষ, তাপমাত্রা আরামদায়ক। কিন্তু রেহানার শরীর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এই মুহূর্তে তাপমাত্রা বাড়াতে হবে। ভেতর থেকে। যেন কেউ চুলা জ্বালিয়ে দিয়েছে বুকের মাঝখানে, আর সেই আঁচ ছড়িয়ে যাচ্ছে গলায়, মুখে, কানে, মাথায়।
রেহানা বিছানায় উঠে বসে। ঘাম। সারা গায়ে ঘাম। বালিশ ভেজা। জামা ভেজা। চুল ভেজা। পাশে জাহিদ ঘুমায়, নিশ্চিন্তে, গভীরে, জাহিদের শরীরে কোনো আগুন নেই, জাহিদের শরীর ঠিকমতো কাজ করে, কারণ জাহিদ পুরুষ, পুরুষের শরীর পঞ্চাশ বছরে এমন কোনো বিদ্রোহ করে না।
রেহানা উঠে বাথরুমে যায়। মুখে পানি দেয়। ঠান্ডা পানি। আয়নায় তাকায়। পঞ্চাশ বছরের একটা মুখ। ক্লান্ত চোখ। ঘামে ভেজা কপাল। সে নিজেকে চেনে না। এই শরীরটা তার, কিন্তু এই শরীর তার কথা শোনে না। এই শরীর নিজের নিয়মে চলে, এবং সেই নিয়মটা বদলে যাচ্ছে, আর কেউ রেহানাকে বলেনি যে এটা হবে, কীভাবে হবে, কতদিন চলবে, কতটা কষ্ট হবে।
হট ফ্ল্যাশ। ইংরেজি নাম। বাংলায় এর কোনো নাম নেই। যেটার নাম নেই, সেটা কীভাবে বলবে? যেটা বলতে পারে না, সেটার চিকিৎসা কীভাবে চাইবে?
২
রেহানার ঋতুস্রাব অনিয়মিত হতে শুরু করেছে দুই বছর আগে।
প্রথমে ভেবেছিল অন্য কিছু। হয়তো দুশ্চিন্তা। হয়তো ক্লান্তি। বড় মেয়ে তানিয়ার বিয়ে হয়েছে, ছেলে তৌফিক বিদেশে পড়ে, সংসারের চিন্তা, টাকার চিন্তা, সব মিলিয়ে শরীর একটু এলোমেলো হতেই পারে। কিন্তু তারপর একটু একটু করে বুঝল: এটা ক্লান্তি নয়। এটা বদল। শরীরের বদল। হরমোনের বদল। জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হচ্ছে, যে অধ্যায়ে সে নারী ছিল সমাজের চোখে, প্রজননক্ষম নারী, এবং সেই অধ্যায় শেষ হলে সে কী হবে, সেটা কেউ বলে না।
ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। মহিলা ডাক্তার, ধানমন্ডিতে। ডাক্তার শুনলেন, পরীক্ষা করলেন, বললেন, "মেনোপজ। এটা স্বাভাবিক।"
এটা স্বাভাবিক।
রেহানা এই বাক্যটা জীবনে অনেকবার শুনেছে। চোদ্দ বছরে প্রথম পিরিয়ড হলে মা বলেছিলেন, "এটা স্বাভাবিক।" বিয়ের রাতে ব্যথা হলে শাশুড়ি বলেছিলেন, "এটা স্বাভাবিক।" প্রথম সন্তানের প্রসবব্যথায় চিৎকার করলে ধাত্রী বলেছিলেন, "এটা স্বাভাবিক।" এখন মেনোপজে হট ফ্ল্যাশ, মুড সুইং, হাড়ের ব্যথা, ঘুম না হওয়া, ক্লান্তি, বিষণ্নতা, সব "স্বাভাবিক।"
স্বাভাবিক মানে কী? স্বাভাবিক মানে কি সহ্য করো? স্বাভাবিক মানে কি চুপ থাকো? স্বাভাবিক মানে কি এটা নিয়ে কথা বলার দরকার নেই?
ডাক্তার কিছু ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট দিলেন। বললেন, "হাঁটাহাঁটি করবেন।" আর কিছু না। কাউন্সেলিং নেই। সাপোর্ট গ্রুপ নেই। বই নেই। কোনো তথ্য নেই। কারণ মেনোপজ বাংলাদেশে একটা শব্দ যেটা কেউ উচ্চারণ করে না।
৩
জাহিদ বোঝে না।
জাহিদ ভালো মানুষ। ত্রিশ বছরের সংসার, কখনো হাত তোলেনি, চিৎকার করেনি, অন্য মেয়ের দিকে তাকায়নি। কিন্তু জাহিদ বোঝে না কেন রেহানার মেজাজ এত খারাপ।
"তোমার মেজাজ কেন খারাপ সবসময়?"
রেহানা কী বলবে? বলবে যে তার শরীরে ইস্ট্রোজেন কমে যাচ্ছে? বলবে যে হরমোনের পরিবর্তনে তার মস্তিষ্কের রসায়ন বদলে যাচ্ছে? বলবে যে সে কোনো কারণ ছাড়াই কাঁদতে চায়, রাগ করতে চায়, চিৎকার করতে চায়, আবার পরমুহূর্তে সব ঠিক হয়ে যায়, আবার এলোমেলো হয়ে যায়? এই কথাগুলো বলার ভাষা কোথায়? জাহিদ কি বুঝবে?
জাহিদ বলে, "আগে তো এরকম ছিলে না।"
আগে রেহানা এরকম ছিল না। আগে রেহানা শান্ত ছিল, ধৈর্যশীল ছিল, হাসিখুশি ছিল। কিন্তু আগে রেহানার শরীরে অন্য রসায়ন ছিল। এখন সেই রসায়ন বদলে যাচ্ছে, এবং সেই বদলের সাথে সে নিজেও বদলে যাচ্ছে, এবং এই বদলটা তার পছন্দ নয়, এটা তার নিয়ন্ত্রণে নয়, এটা প্রকৃতির সিদ্ধান্ত।
কিন্তু সমাজ বলে এটা তার দোষ। "মেজাজ খারাপ" মানে "তুমি ভালো না।" "আগে এরকম ছিলে না" মানে "তুমি বদলে গেছ, এবং বদলটা খারাপ।"
রেহানা চুপ করে থাকে। চুপ থাকাটাও একটা শক্তি খরচ করে। কারণ চুপ থাকতে গেলে ভেতরের সব কথা গিলতে হয়, এবং সেই গেলা কথাগুলো জমে যায়, ভারী হয়, এবং একদিন হয়তো ফেটে পড়বে, অথবা ভেতরেই পচে যাবে।
৪
হাড়ের ব্যথা রাতে বেশি হয়।
হাঁটু, কোমর, কাঁধ, হাতের আঙুল। ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ায় হাড়ের ঘনত্ব কমছে। অস্টিওপোরোসিসের শুরু। ডাক্তার বলেছেন ক্যালসিয়াম খেতে, ভিটামিন ডি খেতে, রোদে হাঁটতে। রেহানা ক্যালসিয়াম খায়। কিন্তু রোদে হাঁটে কখন? সকালে রান্না, দুপুরে ঘর, বিকেলে বাজার, সন্ধ্যায় আবার রান্না। পঞ্চাশ বছরে রেহানার রুটিন বদলায়নি। বাচ্চারা বড় হয়ে চলে গেছে, কিন্তু কাজ কমেনি। জাহিদের কাপড় এখনো সে ইস্ত্রি করে। জাহিদের চা এখনো সে বানায়। জাহিদ বলে, "করতে হয় না," কিন্তু না করলে কে করবে?
রাতে ব্যথায় ঘুম আসে না। ঘুম না হলে সকালে ক্লান্তি। ক্লান্তিতে মেজাজ খারাপ। মেজাজ খারাপে জাহিদ অস্বস্তি বোধ করে। জাহিদের অস্বস্তিতে রেহানা অপরাধবোধে ভোগে। অপরাধবোধে আরো ঘুম হয় না। একটা চক্র। বন্ধ হয় না।
তানিয়া ফোন করে। "মা, কেমন আছো?"
"ভালো।"
মিথ্যা। সেই চিরকালের মিথ্যা। মায়ের মিথ্যা।
তানিয়া কি বুঝবে? তানিয়ার বয়স ছাব্বিশ। তানিয়ার শরীর তরুণ, ইস্ট্রোজেনে ভরপুর, তানিয়া মেনোপজ কল্পনাও করতে পারে না। যেমন রেহানাও চোদ্দ বছরে কল্পনা করতে পারেনি পঞ্চাশ বছরে কী হবে। নারীর শরীরের এই যাত্রা কেউ আগে থেকে বলে দেয় না। প্রতিটা পর্যায় আসে আকস্মিকভাবে, এবং প্রতিটা পর্যায়ে নারী একা।
৫
রেহানার বান্ধবী নাসরিন একদিন বলল, "আমারও হচ্ছে।"
এটাই প্রথমবার। পঞ্চাশ বছরের জীবনে প্রথমবার কেউ মেনোপজের কথা বলল রেহানাকে। নাসরিন বলল হট ফ্ল্যাশের কথা, রাতের ঘামের কথা, মেজাজের কথা, ঘুমের কথা। রেহানা শুনল। এবং প্রতিটা কথায় মাথা নাড়ল। হ্যাঁ। আমারও। আমারও ঠিক এমন।
দুজন বসে ছিল নাসরিনের বারান্দায়। চা খাচ্ছিল। বিকেলের রোদ। দুই পঞ্চাশ বছরের নারী, ত্রিশ বছরের বন্ধু, এবং এই প্রথম তারা তাদের শরীরের কথা বলছে। কারণ আগে বলার দরকার হয়নি? না, দরকার ছিল, কিন্তু ভাষা ছিল না, অনুমতি ছিল না, জায়গা ছিল না।
নাসরিন বলল, "আমার স্বামী বলে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।"
রেহানা বলল, "আমার স্বামী বলে আমার মেজাজ খারাপ।"
দুজন চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। চায়ের কাপ ধরে। দুজনের চোখে একই ক্লান্তি। একই অবোঝ হওয়ার যন্ত্রণা। একই একাকীত্ব।
নাসরিন বলল, "আমাদের মায়েরা কি এটা বলেছিল?"
রেহানা মাথা নাড়ল। "না।"
"আমাদের নানিরা?"
"না।"
কেউ বলেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, নারীরা এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে একা, নীরবে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়া, কোনো সমর্থন ছাড়া। প্রতিটা নারী ভেবেছে সে একাই এমন, তার শরীরে সমস্যা, সে অস্বাভাবিক। অথচ এটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের অভিজ্ঞতা।
৬
রাতে রেহানা বারান্দায় দাঁড়ায়।
হট ফ্ল্যাশ আবার এসেছে। ভেতরে আগুন। বাইরে হাওয়া। হাওয়ায় একটু আরাম। রেহানা রেলিং ধরে দাঁড়ায়, শহরের আলোর দিকে তাকায়।
পঞ্চাশ বছর। জীবনের অর্ধেকের বেশি পার হয়ে গেছে। এই পঞ্চাশ বছরে তার শরীর কতবার বদলেছে, কতবার তাকে নতুন নিয়ম শিখতে হয়েছে, কতবার সে নিজেকে নতুন করে চিনেছে। চোদ্দতে পিরিয়ড শুরু, লুকাও। বিশে বিয়ে, মানিয়ে নাও। বাইশে গর্ভধারণ, সহ্য করো। তেইশে প্রসব, চিৎকার কোরো না। চব্বিশে দুধ খাওয়াও, লুকিয়ে। পঁচিশে দ্বিতীয় সন্তান, আবার। তারপর বছরের পর বছর, শরীরকে অন্যের জন্য ব্যবহার করো, অন্যের জন্য বাঁচাও, অন্যের জন্য ক্ষয় করো। এবং পঞ্চাশে, যখন শরীর বলে "আমি ক্লান্ত, আমি বদলাচ্ছি," তখনো লুকাও।
ঋতুস্রাব শুরু হলে লুকাও। ঋতুস্রাব শেষ হলেও লুকাও। নারীর শরীর সবসময় একটা গোপন বিষয়।
রেহানা ভাবে, কেন?
কেন নারীর শরীর সবসময় লজ্জার? কেন পিরিয়ডের কথা বলা যায় না? কেন গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা শুধু "সুখবর" হিসেবে উদযাপন করা হয়, কিন্তু বমি, ক্লান্তি, ভয়, ব্যথা, এগুলো চুপচাপ সহ্য করতে হয়? কেন বুকের দুধ একটা গোপন বিষয়? কেন মেনোপজ একটা ট্যাবু?
কারণ নারীর শরীর পুরুষের জন্য বানানো হয়নি। নারীর শরীর নারীর। কিন্তু সমাজ সেটা মানতে রাজি নয়।
জাহিদ বারান্দায় এল। "ঘুম হচ্ছে না?"
রেহানা বলল, "হট ফ্ল্যাশ।"
প্রথমবার বলল। সরাসরি। লুকালো না। জাহিদ একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, "কী করা যায়?"
রেহানা তাকাল। জাহিদের চোখে কৌতূহল আছে, বিরক্তি নেই। হয়তো বোঝে না, কিন্তু বুঝতে চাইছে। এটুকুই যথেষ্ট। এই মুহূর্তে এটুকুই যথেষ্ট।
রেহানা বলল, "পাশে দাঁড়াও। ঠিক হয়ে যাবে।"
হয়তো ঠিক হবে। হয়তো হবে না। কিন্তু চুপ থাকার চেয়ে বলাটা ভালো। লুকানোর চেয়ে দেখানোটা ভালো। একা সহ্য করার চেয়ে বলাটা ভালো, এমনকি যদি শ্রোতা পুরোটা না বোঝে তাহলেও।
রেহানা বারান্দায় দাঁড়ায়। জাহিদ পাশে। হাওয়া বয়ে যায়। শরীরের আগুন ধীরে ধীরে কমে। যেমন সবসময় কমে। যেমন আবার আসবে। যেমন চলতে থাকবে।
নারীর শরীর চলতে থাকে। সবসময়। সব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। সব নীরবতার মধ্য দিয়ে। সব গোপনের মধ্য দিয়ে।
কিন্তু হয়তো, ধীরে ধীরে, একটু একটু করে, নীরবতাটা ভাঙবে।