যৌতুকের বলি
যৌতুক একবারে শেষ হয় না। যৌতুক একটা চলমান ব্যবসা।
১
সাবিনার বিয়ের রাতে আকাশে তারা ছিল।
সে মনে রাখে কারণ মায়ের চোখও সেরকম জ্বলছিল। আনন্দে না। ভেজা চোখে তারা প্রতিফলিত হলে যে আলো হয়, সেটা আনন্দ না, সেটা ত্যাগের আলো। মা জানত মেয়ে চলে যাচ্ছে। মেয়েও জানত। কিন্তু দুজনেই হাসছিল, কারণ বিয়েতে হাসতে হয়। বিয়ে মানে হাসি। বিয়ে মানে গায়ে হলুদ, বিয়ে মানে শাড়ির ভাঁজ, বিয়ে মানে মেহেদির গন্ধ।
বিয়ে মানে যৌতুকও।
সাবিনার বাবা আবদুল করিম দুই লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন। জমি বিক্রি করে। তিন বিঘার মধ্যে এক বিঘা। বাকি দুই বিঘায় ধান হয়, সেই ধানে সংসার চলে। এক বিঘা কমে গেলে সংসারও কমে। কিন্তু মেয়ের বিয়ে, মেয়ের বিয়ে মানে যে কোনো মূল্যে। মেয়ে ঘরে থাকলে সমাজ কথা বলে। "মেয়ে কেন বিয়ে হচ্ছে না?" এই প্রশ্ন বাবার পিঠে পাথরের মতো চাপে। যতদিন মেয়ে ঘরে, ততদিন পাথর ভারী হয়।
সাবিনা চব্বিশ। বিয়ের সময় বাইশ ছিল। মানবিক বিদ্যায় স্নাতক। পরীক্ষা দিয়েছে, রেজাল্ট আসেনি। বিয়ে এসে গেছে আগে। রেজাল্ট পরে এসেছে। ফার্স্ট ক্লাস। সার্টিফিকেটটা বাবার বাড়িতে পড়ে আছে, আলমারির ভেতর, মায়ের শাড়ির নিচে। সাবিনা সেটা আনেনি। আনার দরকার হয়নি। শ্বশুরবাড়িতে সার্টিফিকেটের চেয়ে রান্নাঘরের বেশি দাম।
সাবিনার মা রোকেয়া বিয়ের দিন মেয়েকে একটা কথা বলেছিল। গোসলের সময়, যখন আর কেউ ছিল না, শুধু মা আর মেয়ে। রোকেয়া বলেছিল, "শ্বশুরবাড়িতে সবসময় হাসি মুখে থাকবি। কষ্ট পেলেও বলবি না।" সাবিনা জিজ্ঞেস করেছিল, "কেন?" রোকেয়া বলেছিল, "কারণ তুই বললে আমরা কষ্ট পাব, আর আমাদের কিছু করার থাকবে না। যে কষ্টের কোনো সমাধান নেই, সেটা ভাগ করলে দুজনেই কষ্ট পায়।"
এই শিক্ষা বাংলাদেশের মায়েরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দেয়। চুপ থাকো। সহ্য করো। হাসো। এটাকে ভালোবাসা বলে, নাকি আত্মসমর্পণ বলে, সাবিনা এখনো বুঝতে পারেনি।
২
বিয়ের ছয় মাস পর প্রথম কথাটা উঠল।
শাশুড়ি বলল, কথাটা সরাসরি না। শাশুড়িরা সরাসরি বলে না। তারা ঘুরিয়ে বলে, হেঁয়ালি করে, বাতাসে ছুড়ে দেয়। "তোমার বাবা তো ভালো মানুষ, তবে সংসারী মানুষের একটু সাহায্য করা উচিত, তাই না?" সাবিনা বুঝতে পারেনি। প্রথমবার বুঝতে পারেনি। ভেবেছে শাশুড়ি সাধারণ কথা বলছে।
দ্বিতীয়বার বুঝল।
রফিক, সাবিনার স্বামী, রাতে বলল। বিছানায়। অন্ধকারে। যৌতুকের কথা অন্ধকারে বলা হয়, কারণ আলোতে বলতে লজ্জা লাগে। "বাবার কাছে বল, আরো তিন লক্ষ।" সাবিনা বলল, "কেন?" রফিক বলল, "মোটরসাইকেল কিনব। ব্যবসার জন্য।" সাবিনা বলল, "বাবার কাছে তো আর টাকা নেই।" রফিক বলল, "জমি আছে।"
জমি আছে। দুই বিঘা আছে। সেই দুই বিঘায় ধান হয়। সেই ধানে বাবা-মা খায়। সেই ধানে ছোট ভাই পড়ে। সেই দুই বিঘা বিক্রি করলে বাবা-মা কী খাবে?
রফিক বলল, "না দিলে তালাক।"
তালাক। শব্দটা ঘরের ভেতর পড়ল, ভারী পাথর পানিতে পড়ার মতো। তালাক মানে মেয়ে ফেরত আসা। তালাক মানে সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। তালাক মানে বাবার মাথা নিচু। তালাক মানে "ও তো তালাকপ্রাপ্তা" এই তকমা সারাজীবন।
সাবিনা বাবাকে ফোন করল। রাত এগারোটায়। বাবা জেগে ছিল কিনা জানে না, কিন্তু ফোন ধরল। বাবা সবসময় ফোন ধরে। মেয়ের ফোন মানে কিছু একটা হয়েছে। মেয়ে রাতে ফোন করলে মানে বড় কিছু।
"বাবা..."
আবদুল করিম চুপ করে শুনল। পুরোটা শুনল। তারপর বলল, "ঠিক আছে মা, আমি ব্যবস্থা করব।"
ব্যবস্থা। বাংলাদেশের বাবাদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ। ব্যবস্থা মানে কোনো না কোনোভাবে টাকা জোগাড় করা। ব্যবস্থা মানে নিজে না খেয়ে, ব্যবস্থা মানে ধার করে, ব্যবস্থা মানে শেষ সম্বল বিক্রি করে। ব্যবস্থা শব্দটার পেছনে একটা মানুষের ভেঙে পড়া আছে, কিন্তু সেই ভাঙার শব্দ কেউ শোনে না।
সাবিনা ফোন রেখে চুপচাপ শুয়ে রইল। পাশে রফিক ঘুমাচ্ছে। নিশ্চিন্তে। কারণ সে জানে বাবা ব্যবস্থা করবে। বাবারা সবসময় ব্যবস্থা করে। রফিকের বাবাও করেছে, রফিকের জন্য। কিন্তু রফিকের বাবা কখনো মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা আনায়নি। রফিকের বোন নেই, তাই এই অভিজ্ঞতা নেই। যৌতুক নেওয়া সহজ যখন তুমি দেওয়ার দিকে থাকো না।
সাবিনা ভাবল, আমার বাচ্চা হলে, মেয়ে হলে, তাকেও কি এভাবে বিক্রি করতে হবে? এই ভাবনাটা এত তীক্ষ্ণ ছিল যে সাবিনা চোখ বন্ধ করেও ঘুমাতে পারল না। সারারাত জেগে রইল। ছাদের দিকে তাকিয়ে। টিনের ছাদ। সেই টিনও একদিন কারো জমির দামে কেনা।
৩
আবদুল করিম শেষ বিঘাটা বিক্রি করল।
দুই বিঘার মধ্যে এক বিঘা। বাকি এক বিঘা রাখল। এক বিঘায় কী হয়? এক বিঘায় এক মৌসুমে বারো মণ ধান হয়। বারো মণ ধানে দুজন মানুষ ছয় মাস চলতে পারে। বাকি ছয় মাস? বাকি ছয় মাস অন্যের জমিতে কাজ করে, দিনমজুরি করে, অথবা ধারে চলে।
তিন লক্ষ টাকা। সাবিনার হাতে দিল। সাবিনা শ্বশুরবাড়িতে দিল। রফিক মোটরসাইকেল কিনল। ইয়ামাহা। নতুন। চকচক করে। সাবিনা সেই মোটরসাইকেলের দিকে তাকায় আর ভাবে, এটা বাবার জমি। এটা বাবার ঘাম। এটা মায়ের না-খাওয়া। দুটো চাকা, একটা ইঞ্জিন, আর একটা পরিবারের ভাঙন।
কিছুদিন ভালো গেল। রফিক হাসে। শাশুড়ি খুশি। সাবিনা রান্না করে, ঘর মোছে, কাপড় ধোয়, স্বামীর সেবা করে। এটাই তো স্ত্রীর কাজ, তাই না? সমাজ তাই বলে।
এক বছর পর দ্বিতীয় দাবি এলো।
এবার শ্বশুর বলল। সরাসরি। শ্বশুরেরা সরাসরি বলে, কারণ তারা মনে করে এটা তাদের অধিকার। "বাড়িটা মেরামত করতে হবে। টিন পাল্টাতে হবে। তোমার বাবাকে বল।"
সাবিনা বলল, "বাবার কাছে আর কিছু নেই।"
শ্বশুর বলল, "শেষ বিঘা আছে।"
শেষ বিঘা। শেষ। এই শব্দটার মানে কি তারা বোঝে? শেষ মানে আর নেই। শেষ মানে এটার পর শূন্য। শেষ বিঘা বিক্রি করলে আবদুল করিম ভূমিহীন। ভূমিহীন মানে গ্রামে কেউ না। ভূমিহীন মানে পরিচয়হীন।
সাবিনা এবার কাঁদল। প্রথমবার কাঁদল শ্বশুরবাড়িতে। শাশুড়ি বলল, "কান্না দিয়ে কী হবে? জমি দিয়ে বাবা কী করবে? মেয়ের সংসার বাঁচানোটাই তো বাবার দায়িত্ব।"
মেয়ের সংসার বাঁচানো বাবার দায়িত্ব। এই বাক্যটা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ ঘরে বলা হয়। এই বাক্যটা একটা অস্ত্র। এই অস্ত্র দিয়ে বাবার পিঠ ভাঙা হয়, মেয়ের আত্মসম্মান ভাঙা হয়, আর যৌতুকের ব্যবসা চালু থাকে।
সাবিনা ভাবে, শাশুড়িও তো একসময় বউ ছিল। শাশুড়িও তো শ্বশুরবাড়িতে এসেছিল, হয়তো তার বাবাও জমি বিক্রি করেছিল। তাহলে শাশুড়ি কেন বোঝে না? কেন যে ব্যথা নিজে সহ্য করেছে, সেই ব্যথা অন্যকে দেয়? এটা কি ক্ষমতার নেশা? বউ থেকে শাশুড়ি হলে ক্ষমতা বদলায়, আর ক্ষমতা মানুষকে বদলায়। যে ব্যথা পেয়েছে, সে ব্যথা দিতে শেখে, কারণ ব্যথাই একমাত্র ভাষা যেটা সে জানে।
নাকি এটা প্রতিশোধ? আমি সহ্য করেছি, তুমিও করবে? পৃথিবী আমার জন্য সুন্দর ছিল না, তোমার জন্যও হবে না?
সাবিনা জানে না। শুধু জানে এই চক্র ঘুরছে। মা থেকে বউ, বউ থেকে শাশুড়ি, শাশুড়ি থেকে আবার বউ। চক্রের কোনো শেষ নেই। চক্রের কোনো শুরুও নেই। শুধু ঘোরে।
৪
সাবিনা বাবাকে এবার ফোন করল না।
নিজে গেল। বাবার বাড়িতে। বাস ভাড়া বাইশ টাকা। সাবিনার কাছে বাইশ টাকা ছিল না। শাশুড়ির কাছ থেকে নিল, বলল বাজারে যাচ্ছে। মিথ্যা বলল। মেয়েরা মিথ্যা বলতে শেখে শ্বশুরবাড়িতে, কারণ সত্য বললে শাস্তি আছে।
বাবার বাড়ি। টিনের চাল। উঠানে একটা আমগাছ, সেটাও বিক্রির কথা উঠেছিল একবার কিন্তু মা বলেছিল, "গাছটা রাখো, ছায়া দেয়।" বাবা বারান্দায় বসে আছে। বুড়ো হয়ে গেছে। দুই বছরে দশ বছর বুড়ো হয়েছে। চুল সাদা, পিঠ বাঁকা, চোখে একটা ক্লান্তি যেটা ঘুমিয়েও যায় না।
সাবিনা বারান্দায় বসল। বাবার পাশে।
"বাবা, ওরা আরো চাইছে।"
আবদুল করিম কিছু বলল না। চুপ করে রইল। চা খেল। চায়ের কাপটা হাতে ধরে থাকল অনেকক্ষণ, যেন কাপটা একটা সম্বল, ধরে না রাখলে পড়ে যাবে, কাপ না, নিজে।
তারপর বলল, "কত?"
সাবিনা বলল, "দুই লক্ষ।"
আবদুল করিম হিসেব করল। শেষ বিঘা বিক্রি করলে দুই লক্ষ পাবে। কিন্তু শেষ বিঘা বিক্রি করলে সে ভূমিহীন। ভূমিহীন মানুষের কোনো ঠিকানা নেই গ্রামে। ভূমিহীন মানে ইউনিয়ন পরিষদে গেলে চেয়ার দেয় না। ভূমিহীন মানে মসজিদে প্রথম সারিতে জায়গা নেই।
কিন্তু মেয়ে। মেয়ের সংসার। মেয়ের মুখ। মেয়ের অশ্রু।
"ঠিক আছে মা।"
সাবিনা বাবার হাত ধরল। হাতটা শুকনো, রুক্ষ, ফাটা। মাটি কাটা হাত। ধান রোপা হাত। জমি চাষ করা হাত। এই হাত এখন জমি বিক্রি করবে। এই হাত নিজের শেষ সম্বল ছেড়ে দেবে।
সাবিনা কাঁদল। বাবা কাঁদল না। বাবারা কাঁদে না। বাবারা ভেঙে পড়ে ভেতর থেকে, বাইরে থেকে দেখা যায় না। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় শক্ত। ভেতরে ধুলো, শুধু ধুলো।
মা রোকেয়া ভেতরে ছিল। রান্নাঘরে। সাবিনা ভেতরে গেল। মা চুলার পাশে বসে আছে, আগুন নেই, কিন্তু বসে আছে। অভ্যাস। চুলার পাশে বসা রোকেয়ার অভ্যাস, যেমন নামাজের পর তসবিহ ধরা অভ্যাস। চুলা তার আশ্রয়।
"মা, তুমি কিছু বলো না?"
রোকেয়া তাকাল। চোখ শুকনো। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শেষ হয়ে যায় একসময়। রোকেয়ার শেষ হয়ে গেছে আগেই, যেদিন প্রথম বিঘা বিক্রি হয়েছিল সেদিন।
"কী বলব মা? তোর বাবা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আমি কি কোনোদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি?"
সত্যি। রোকেয়া কোনোদিন সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিয়ে কার সাথে হবে, বাবা ঠিক করেছিল। সন্তান কয়টা হবে, স্বামী ঠিক করেছে। জমি কোনটা বিক্রি হবে, সেটাও। রোকেয়ার সিদ্ধান্ত শুধু রান্নাঘরে: কতটা লবণ, কতটা হলুদ, কতটা তেল। এটুকুই তার এখতিয়ার। এটুকুই তার রাজত্ব।
সাবিনা মায়ের পাশে বসল। দুজনে চুপ করে বসে রইল। চুলার পাশে। ঠান্ডা চুলা। দুজন নারী। দুই প্রজন্ম। একই নীরবতা।
৫
তৃতীয় দাবি আসবে। সাবিনা জানে।
কারণ যৌতুক একবারে শেষ হয় না। যৌতুক একটা চলমান ব্যবসা। যৌতুক একটা কূপ, যেখানে বাবা-মা পড়তেই থাকে, আর শ্বশুরবাড়ি তুলতেই থাকে। কূপের তলা নেই। চাহিদার তলা নেই। আজ মোটরসাইকেল, কাল টিন, পরশু ফ্রিজ, তারপর জমি, তারপর ফ্ল্যাট, তারপর কী? তারপর আর কিছু থাকবে না, তখন বলবে, "তোমার বাবা তো কিছুই দেয়নি।"
সাবিনা রাতে শুয়ে ভাবে।
সে পড়াশোনা করেছে। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। একটা চাকরি পেতে পারত। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু বিয়ের পর চাকরি করতে দেয়নি। "মেয়েমানুষের চাকরি কিসের? সংসার সামলাও।" রফিক বলেছিল। শাশুড়ি বলেছিল। সাবিনা চুপ করে গিয়েছিল, কারণ চুপ থাকতে শিখেছে। মেয়েরা চুপ থাকতে শেখে শ্বশুরবাড়িতে, ঠিক যেভাবে মাছ পানিতে থাকতে শেখে। এটা বেঁচে থাকার কৌশল।
কিন্তু রাতে, যখন সবাই ঘুমায়, সাবিনা জেগে থাকে। আর ভাবে। বাবার মুখ ভাবে। মায়ের চোখ ভাবে। শেষ বিঘার ধানক্ষেত ভাবে, যেখানে সে ছোটবেলায় দৌড়াত, যেখানে ফড়িং ধরত, যেখানে বৃষ্টিতে ভিজত।
সেই ধানক্ষেত আর নেই। সেটা এখন অন্য কারো। সেখানে এখন অন্য কেউ ধান রোপে। সেখানে এখন অন্য কারো সন্তান দৌড়ায়।
সাবিনা হিসেব করে। দুই লক্ষ আর তিন লক্ষ, মোট পাঁচ লক্ষ। পাঁচ লক্ষ টাকায় তিন বিঘার মধ্যে দুই বিঘা গেছে। বাবা এখন ভূমিহীন। এক বিঘা যেটা আছে, সেটাও যেকোনোদিন যেতে পারে। তৃতীয় দাবি আসবে, সাবিনা জানে। কারণ এই খেলার নিয়ম সে বুঝে গেছে।
ছোট ভাই রাশেদ ফোন করেছিল কদিন আগে। বলেছিল, "আপা, বাবার শরীর ভালো না।" সাবিনা জানে কেন ভালো না। শরীরে রোগ নেই, আত্মায় ক্ষত আছে। যে মানুষ সারাজীবন জমি কিনেছে, সে যখন একে একে বিক্রি করতে থাকে, তখন শরীরও একটু একটু করে বিক্রি হয়।
রাশেদ বলেছিল, "আপা, তুমি যদি একটা চাকরি পেতে..." কথা শেষ করেনি। কারণ দুজনেই জানে শ্বশুরবাড়ি থেকে চাকরি করতে দেবে না। রাশেদ বলেছিল আরো একটা কথা, চুপে চুপে, যেন কেউ শুনে না ফেলে: "আপা, যৌতুক নিষেধ, আইনে আছে।" সাবিনা হেসেছিল। আইনে অনেক কিছু আছে। আইন একটা বই। বইয়ের ভেতর অক্ষর আছে। অক্ষর গ্রামের মাটিতে পৌঁছায় না।
সাবিনার সার্টিফিকেট এখনো বাবার আলমারিতে। মায়ের শাড়ির নিচে। ধুলো জমছে। সেটাও এক ধরনের যৌতুক, যেটা কেউ নেয়নি, কেউ চায়নি, কিন্তু সেটাই আসল সম্পদ।
সাবিনা বলে, চুপে চুপে, নিজের কাছে: "যৌতুক একবারে শেষ হয় না। যৌতুক একটা চলমান ব্যবসা। আর আমি সেই ব্যবসার পণ্য।"
পণ্য। শব্দটা তিক্ত। কিন্তু সত্য। বিয়েতে মেয়ে একটা পণ্য, যার সাথে দাম আসে। দামটা যৌতুক। পণ্যের মান ভালো হলে দাম বেশি, মান খারাপ হলে দাম কম। মান মানে কী? মান মানে মেয়ে দেখতে কেমন, মেয়ে কত ফর্সা, মেয়ে কত পড়াশোনা করেছে (যদিও পড়াশোনার দাম শ্বশুরবাড়িতে নেই), মেয়ের বাবা কত ধনী। সাবিনা পড়াশোনা করেছে, ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে, কিন্তু সেটা তার মূল্য বাড়ায়নি, কমিয়েছে। কারণ পড়াশোনা করা মেয়ে "বেশি কথা বলে।" পড়াশোনা করা মেয়ে "বাধ্য হয় না।" পড়াশোনা করা মেয়ে "সমস্যা।"
সাবিনা সমস্যা। শ্বশুরবাড়ির চোখে। কিন্তু সাবিনা সমস্যা তৈরি করেনি। সাবিনা শুধু আছে। থাকাটাই সমস্যা হয়ে যায় যখন থাকার অধিকার কেউ স্বীকার করে না।
বাইরে রাত। মোটরসাইকেলটা উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোতে চকচক করছে। বাবার জমি। মায়ের না-খাওয়া। সাবিনার নীরবতা। সব মিলিয়ে একটা ইয়ামাহা মোটরসাইকেল।
চকচক করছে।
সাবিনা জানালা বন্ধ করে। মোটরসাইকেল দেখতে চায় না। ঘুমাতে চায়। কিন্তু ঘুম আসে না। ঘুম আসে না কারণ ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরছে, থামছে না: তৃতীয় দাবি কখন আসবে? আর সেটা আসলে বাবা কী বিক্রি করবে? শেষ বিঘা? বাড়ি? নিজেকে?
সাবিনা চোখ বন্ধ করে। অন্ধকার। সেই অন্ধকারে রফিকের কণ্ঠ ভেসে আসে: "না দিলে তালাক।" শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়। দেয়ালে ধাক্কা খায়। ফিরে আসে। আবার ধাক্কা খায়। থামে না।
থামে না।