বোরকার আড়ালে

আমি যখন বেছে নিই, এটা স্বাধীনতা। যখন বাধ্য করা হয়, এটা কারাগার।

পর্ব ৮২ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ফারজানা ল্যাবে ঢোকার আগে বোরকা খোলে না।

ল্যাবকোট পরে তার ওপর। তাতে কোনো সমস্যা হয় না। হাতে গ্লাভস থাকে, চোখে সেফটি গগলস। যা দেখার চোখ দিয়ে দেখে, যা ধরার হাত দিয়ে ধরে। বোরকা কোনো যন্ত্রের সাথে লড়ে না। বোরকা কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বাধা দেয় না। বোরকা কোনো সমীকরণ ভুল করায় না।

কিন্তু মানুষ ভাবে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ফারজানা পিএইচডি করছে, তৃতীয় বর্ষ। গবেষণার বিষয়: আর্সেনিকদূষিত পানি থেকে আর্সেনিক অপসারণের জন্য ন্যানো-পার্টিকেল ফিল্টার। কাজটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক একটা মহামারি। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন বিষ খাচ্ছে, জানে না, অথবা জানলেও বিকল্প নেই। ফারজানার কাজ একটা সস্তা ফিল্টার বানানো যেটা গ্রামের মানুষ ব্যবহার করতে পারবে। পঞ্চাশ টাকার ফিল্টার, ছয় মাস চলবে।

ফারজানার পেপার পাবলিশ হয়েছে দুটো। একটা বাংলাদেশ কেমিক্যাল সোসাইটি জার্নালে, আরেকটা একটা আন্তর্জাতিক জার্নালে, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর তিন দশমিক দুই। সে জানে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কী, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কীভাবে কাজ করে, এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর দিয়ে আসলে কিছু মাপা যায় না কিন্তু একাডেমিয়া মাপে। এই দুটো পেপারে ফারজানার নাম প্রথম লেখক হিসেবে আছে। বোরকা পরা প্রথম লেখক। কিন্তু জার্নালে কোনো ছবি নেই, শুধু নাম আছে, আর নাম কোনো পোশাক পরে না।

ফারজানার সুপারভাইজর ড. হাসান বলেছিলেন, "তোমার কাজটা ভালো, কিন্তু আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্রেজেন্টেশন দিতে গেলে বোরকা খুলতে হবে।"

ফারজানা বলেছিল, "কেন?"

"ওরা সিরিয়াসলি নেবে না।"

"আমার কাজ সিরিয়াস হলে আমার পোশাক কেন সমস্যা?"

ড. হাসান কিছু বলেননি। কারণ ফারজানার কথায় যুক্তি ছিল। যুক্তির সামনে পক্ষপাত চুপ হয়ে যায়। সবসময় না, কিন্তু মাঝে মাঝে।

ক্যাম্পাসে ফারজানাকে দুই দিক থেকে আক্রমণ সহ্য করতে হয়।

প্রগতিশীলরা বলে, "তুমি মেধাবী মেয়ে, বোরকা পর কেন? এটা তো পুরুষতন্ত্রের শেকল।" তারা ধরে নেয় বোরকা মানেই জোর করে পরানো হয়েছে। ধরে নেয় বোরকা মানেই মস্তিষ্ক বন্ধ। ধরে নেয় বোরকা মানেই পিছিয়ে পড়া।

রক্ষণশীলরা বলে, "বোরকা পরো ভালো কথা, কিন্তু ল্যাবে পুরুষ সহকর্মীদের সাথে কাজ করো কেন? রাতে বাড়ি ফেরো না কেন?" তারা ধরে নেয় বোরকা পরলে ঘরেও থাকতে হবে। ধরে নেয় বোরকা পরলে জ্ঞানের সীমানাও সংকীর্ণ হওয়া উচিত। ধরে নেয় বোরকা মানেই সবকিছুতে "হ্যাঁ" বলা।

ফারজানা দুই দিকের কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারে না। সন্তুষ্ট করতে চায়ও না।

ফারজানা ভাবে, অদ্ভুত ব্যাপার, দুই পক্ষই তাকে বলে কী করতে হবে। দুই পক্ষই তাকে বলে কী পরতে হবে, কী না পরতে হবে। দুই পক্ষই ভাবে তারা জানে ফারজানার জন্য কোনটা ভালো। কেউ ফারজানাকে জিজ্ঞেস করে না ফারজানা কী চায়। প্রগতিশীলরা চায় ফারজানা বোরকা খুলুক, যেন সেটাই মুক্তি। রক্ষণশীলরা চায় ফারজানা ঘরে থাকুক, যেন সেটাই ধর্ম। দুই দলই ফারজানাকে ব্যবহার করতে চায়, নিজেদের বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে।

ফারজানা কারো প্রমাণ না। ফারজানা একজন মানুষ।

একদিন ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছিল। পাশের টেবিলে কয়েকজন ছেলে। একজন বলল, যথেষ্ট জোরে যেন ফারজানা শুনতে পায়, "ওই যে নিনজা যাচ্ছে।" হাসাহাসি।

ফারজানা চায়ের কাপ রাখল। উঠে দাঁড়াল। ছেলেটার কাছে গেল। বলল, শান্ত গলায়, "তুমি কোন সেমিস্টারে?"

"সেভেনথ।"

"সাবজেক্ট?"

"কেমিস্ট্রি।"

"তাহলে তুমি জানো আর্সেনিকের অক্সিডেশন স্টেট কত হতে পারে?"

ছেলেটা তাকাল। চুপ। সম্ভবত জানে, সম্ভবত জানে না, কিন্তু এই মুহূর্তে বলতে পারল না।

"মাইনাস থ্রি থেকে প্লাস ফাইভ। আমার রিসার্চ প্লাস থ্রি আর প্লাস ফাইভের ইন্টারকনভার্শন নিয়ে। তুমি যদি কখনো জানতে চাও, আমার ল্যাব সেকেন্ড ফ্লোরে, রুম ২০৪।"

ফারজানা ফিরে এসে চা শেষ করল। পেছনে নীরবতা। সেই নীরবতা যেটা যুক্তি তৈরি করে, লজ্জা নয়।

পরে সেই ছেলেটা ফারজানার ল্যাবে এসেছিল। রুম ২০৪। বলেছিল, "আপু, sorry।" ফারজানা বলেছিল, "Sorry বলার দরকার নেই। শিখো।" ছেলেটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, "আপু, আর্সেনিক ফিল্ট্রেশনে iron-based nanoparticles কেন ব্যবহার হয়?" ফারজানা ব্যাখ্যা করেছিল। পনেরো মিনিট। ছেলেটা শুনেছিল। চলে যাওয়ার সময় বলেছিল, "আপু, আপনার কাজটা সত্যিই impressive।"

ফারজানা হেসেছিল। বোরকার আড়ালে। কেউ দেখেনি সেই হাসি। কিন্তু হাসিটা ছিল।

ফারজানার মা বোরকা পরেন। বাবাও চান মেয়ে বোরকা পরুক। কিন্তু ফারজানা বোরকা পরেনি বাবার জন্য।

ফারজানা বোরকা পরেছে ক্লাস সেভেনে। নিজে। কেউ বলেনি। মা অবাক হয়েছিলেন, বাবা খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু দুজনেই জানতেন মেয়ে একগুঁয়ে, মেয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়। ছোটবেলায় লাল জুতো কিনতে চেয়েছিল, বাবা নীল দিতে চেয়েছিলেন, ফারজানা দোকানে বসে ছিল ঘণ্টাখানেক যতক্ষণ না লাল জুতো এলো। সেই মেয়ে বোরকার সিদ্ধান্তও নিজে নিয়েছে।

কেন পরে?

ফারজানা বলে, "আমি চাই না মানুষ আমার চেহারা দেখে আমাকে বিচার করুক। আমি চাই তারা আমার কথা শুনুক, আমার কাজ দেখুক। বোরকা আমাকে সেই স্বাধীনতা দেয়। মানুষ আমার মুখ দেখে না বলে আমার মুখের কথা শুনতে বাধ্য হয়।"

এটা সবার যুক্তি না। এটা ফারজানার যুক্তি। ফারজানা জানে অন্য কারো যুক্তি আলাদা হতে পারে। সেটাও ঠিক।

ফারজানার বাবা মোস্তফা একজন মসজিদের ইমাম। ছোট মসজিদ, পুরান ঢাকায়। বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে আলেমা হোক। ফারজানা বলেছিল, "আমি বিজ্ঞানী হব।" বাবা প্রথমে রাজি হননি। মা বুঝিয়েছিলেন। মা বলেছিলেন, "বিজ্ঞান শেখাও ইবাদত, যদি মানুষের কাজে লাগে।" বাবা ভেবেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, "ঠিক আছে, পড়ো। কিন্তু আল্লাহকে ভুলো না।"

ফারজানা ভোলেনি। ফজরের নামাজ পড়ে ল্যাবে যায়। মাগরিবের আগে ফেরে। জুমার নামাজ কখনো মিস করে না। ফারজানা বিজ্ঞান আর ধর্মের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব দেখে না। দ্বন্দ্ব তারা দেখে যারা দুটোর একটাকে অসম্পূর্ণভাবে বোঝে। ফারজানা দুটোকেই বোঝে, নিজের মতো করে, আর সেই বোঝাটাই তার শক্তি।

কিন্তু ফারজানা একটা কথাও জানে। একটা কথা যেটা সে ভোলে না।

তার খালাতো বোন রুমানা। রুমানার বাবা জোর করে বোরকা পরিয়েছিল। রুমানা পরতে চায়নি। রুমানা চিত্রকর, ছবি আঁকে, রঙ ভালোবাসে, আলো ভালোবাসে। তাকে বলা হলো, "মেয়েমানুষের মুখ ঢাকো।" রুমানা ঢেকেছে। রুমানার ক্যানভাসে তারপর থেকে শুধু কালো। কালো রঙ। কালো আকাশ। কালো মাঠ। যেন সে নিজেই একটা ঢাকা ক্যানভাস।

ফারজানা রুমানার কথা ভাবে। আর ভাবে, একই কাপড়, দুটো গল্প। একই বোরকা, দুটো অর্থ।

ফারজানা একটা কথা বুঝেছে যেটা অনেকে বোঝে না: পছন্দের মূল্য তখনই থাকে যখন না-পছন্দ করার অধিকারও থাকে। ফারজানা বোরকা পরে কারণ না পরতেও পারত। সেই "পারত" টাই স্বাধীনতা। রুমানা না পরতে পারত না। সেই "পারত না" টাই কারাগার।

একই কাপড়। একই রঙ। একই আকৃতি। কিন্তু একটায় পছন্দ আছে, আরেকটায় বাধ্যতা। এই তফাৎটা বাইরে থেকে দেখা যায় না। বাইরে থেকে দুটোই একইরকম দেখায়। তাই মানুষ বিভ্রান্ত হয়। তাই মানুষ ফারজানাকে দেখে রুমানা ভাবে, আর রুমানাকে দেখে ফারজানা ভাবে।

রাতে হোস্টেলে ফিরে ফারজানা বোরকা খুলে রাখে।

ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। নিজের মুখ দেখে। গোল মুখ, কালো চোখ, ঠোঁটের কোণে একটা তিল। সাধারণ মুখ। সুন্দর না কুৎসিত না, সাধারণ। এই মুখ পৃথিবী দেখে না। এই মুখ শুধু ফারজানা দেখে, আর আল্লাহ দেখেন। ফারজানার কাছে এটা যথেষ্ট।

রুমমেট তানিয়া বোরকা পরে না। ছোট জামা পরে, জিন্স পরে, চুল খোলা রাখে। ফারজানা আর তানিয়া একসাথে পড়ে, একসাথে চা খায়, একসাথে পরীক্ষার আগে রাত জাগে। কেউ কাউকে জাজ করে না। কারণ দুজনেই বুঝেছে, পোশাক একটা পছন্দ, পোশাক একটা পরিচয়ের অংশ, কিন্তু পোশাক পুরো পরিচয় নয়।

তানিয়া একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "তোর গরম লাগে না?"

ফারজানা হেসেছিল। "লাগে। তবে গরম সহ্য করা যায়। মানুষের বিচার সহ্য করা কঠিন।"

তানিয়া ভেবেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, "তুই ঠিক বলেছিস।"

ফারজানা জানে সবাই তানিয়ার মতো বোঝে না। ফারজানার এক শিক্ষক, ড. রহমান, একবার বলেছিলেন সেমিনারে, সবার সামনে, "আমাদের মেয়েরা যদি এখনো মধ্যযুগে থাকতে চায়, তাহলে আমরা কীভাবে এগিয়ে যাব?" চোখ ফারজানার দিকে। সবাই বুঝেছে কার কথা বলছেন।

ফারজানা সেদিন কিছু বলেনি। বলার দরকার মনে করেনি। কারণ ফারজানা জানে তার উত্তর তার গবেষণায়, তার পেপারে, তার ডেটায়। একজন বিজ্ঞানী কথা দিয়ে প্রমাণ করে না, ফলাফল দিয়ে করে। ফারজানার ফলাফল পিয়ার-রিভিউড জার্নালে। ড. রহমানের মন্তব্য সেমিনার হলের বাতাসে।

কোনটা টেকে? ফারজানা জানে।

আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে ফারজানা গেল। সিঙ্গাপুর। প্রথমবার দেশের বাইরে।

বোরকা পরেই গেল।

প্রেজেন্টেশন দিল। স্লাইডে ডেটা, গ্রাফ, ন্যানো-পার্টিকেলের SEM ইমেজ, ফিল্ট্রেশন এফিসিয়েন্সির তুলনামূলক চার্ট। কথা বলল পরিষ্কার ইংরেজিতে। প্রশ্নোত্তরে সব উত্তর দিল।

একজন জাপানি প্রফেসর পরে এসে বলেছিলেন, "Your work is remarkable. The low-cost filtration approach could save thousands of lives."

বোরকার কথা বলেননি। কাজের কথা বলেছিলেন। কারণ কাজ যখন কথা বলে, পোশাক চুপ হয়ে যায়।

কনফারেন্সে আরো একজন এসেছিলেন, মালয়েশিয়ার একজন প্রফেসর, তিনিও হিজাব পরেন। তিনি ফারজানাকে বলেছিলেন, "I've been in academia for twenty years. It gets easier, but it never fully stops." ফারজানা বুঝেছিল কী "it" মানে। "It" মানে তাকানো। "It" মানে প্রশ্ন। "It" মানে প্রমাণ করতে হওয়া, বারবার, যে তুমি যোগ্য, তোমার পোশাক সত্ত্বেও।

"সত্ত্বেও।" এই শব্দটাই সমস্যা। পোশাক "সত্ত্বেও" যোগ্য কেন? পোশাক "নিয়ে" যোগ্য কেন না? পোশাক তো একটা জিনিস, যোগ্যতা আরেকটা। দুটোর মধ্যে সম্পর্ক কোথায়? একজন পুরুষ বিজ্ঞানী স্যুট পরলে কেউ বলে না, "স্যুট পরা সত্ত্বেও ভালো গবেষণা করে।" কিন্তু একজন নারী বোরকা পরলে "সত্ত্বেও" লাগে। যেন বোরকা একটা প্রতিবন্ধকতা। যেন বোরকা পরলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যায়।

ফারজানা হাসে এই ভাবনায়। তিক্ত হাসি না। ক্লান্ত হাসি। যে হাসি আসে যখন তুমি একই প্রশ্নের উত্তর শতবার দিয়ে ক্লান্ত।

ফারজানা হোটেলে ফিরে জানালার পাশে দাঁড়াল। সিঙ্গাপুরের আকাশ। আলো দিয়ে ভরা। ঢাকার আকাশ অন্ধকার, এখানে আকাশ জ্বলে। আলাদা দেশ, আলাদা আকাশ, কিন্তু ফারজানা একই ফারজানা। বোরকায়, ল্যাবকোটে, সেফটি গগলসে, অথবা জানালার পাশে একা দাঁড়িয়ে।

সে ভাবে রুমানার কথা। রুমানা এখনো কালো ছবি আঁকে। রুমানার বোরকা রুমানার পছন্দ নয়। রুমানার বোরকা রুমানার কারাগার।

ফারজানা বলে, নিজের কাছে, নিঃশব্দে: "আমি যখন বেছে নিই, এটা স্বাধীনতা। যখন বাধ্য করা হয়, এটা কারাগার। একই কাপড়, দুটো অর্থ।"

বোরকা আমার পোশাক। আমার মস্তিষ্ক বোরকা পরে না। আমার হাত বোরকা পরে না যখন ল্যাবে কাজ করে। আমার চোখ বোরকা পরে না যখন মাইক্রোস্কোপে তাকায়। আমার মন বোরকা পরে না যখন সমীকরণ সমাধান করে।

একটা কাপড়। শুধু একটা কাপড়। কিন্তু এই কাপড় নিয়ে পৃথিবী কত কথা বলে, কত বিতর্ক করে, কত রাজনীতি করে। ফারজানা ক্লান্ত এই বিতর্কে। কিন্তু থামবে না। থামলে মানে হেরে যাওয়া। ফারজানা হারে না।

ফারজানা আলো নিভিয়ে দেয়। কাল সকালে ল্যাবে যেতে হবে। আর্সেনিকের সাথে লড়াই চলছে। সেই লড়াইয়ে বোরকা কোনো বাধা নয়।

কোনোদিন ছিল না।

ফারজানা শুয়ে শুয়ে ভাবে, একদিন তার ফিল্টার তৈরি হবে। পঞ্চাশ টাকার ফিল্টার। গ্রামের মানুষ সেটা টিউবওয়েলে লাগাবে। আর্সেনিকমুক্ত পানি পাবে। মানুষ সুস্থ থাকবে। কেউ জানবে না ফিল্টারটা কে বানিয়েছে। জানলেও দেখবে না ফারজানার মুখ। কিন্তু পানি পরিষ্কার থাকবে। পানি জানে না কে পরিষ্কার করেছে। পানি জানে না পরিষ্কারকের পোশাক কী ছিল।

পানি শুধু পরিষ্কার হয়। এটুকুই যথেষ্ট।

ফারজানার শেষ ভাবনা ঘুমানোর আগে: রুমানাকে ফোন করতে হবে। রুমানা ফোন ধরে না সবসময়, কিন্তু চেষ্টা করতে হবে। রুমানাকে বলতে হবে, তুমি ছবি আঁকো, রঙিন ছবি আঁকো, কালো ছবি থেকে বেরিয়ে এসো। তোমার বোরকা যদি তোমার পছন্দ না হয়, তাহলে খোলো। কেউ তোমাকে আটকাতে পারে না, যদি তুমি নিজে সিদ্ধান্ত নাও। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত তোমার হতে হবে, আমার না, তোমার বাবার না, সমাজের না।

তোমার।

ফারজানা ঘুমায়। বোরকা ভাঁজ করে রাখা চেয়ারে। কাল সকালে আবার পরবে। নিজের পছন্দে। নিজের সিদ্ধান্তে। যেমন প্রতিদিন পরে। যেমন সেই ক্লাস সেভেন থেকে পরে আসছে।

বাইরে ঢাকার রাত। হর্নের শব্দ। কুকুরের ডাক। দূরে মসজিদ থেকে এশার আজান শেষ হয়ে গেছে। ফারজানা নামাজ পড়ে ঘুমায়। আল্লাহর কাছে দোয়া করে: "আমার গবেষণা কবুল করো। আমার ফিল্টার যেন কাজ করে। মানুষ যেন বিষমুক্ত পানি পায়।"

বোরকার কোনো উল্লেখ নেই দোয়ায়। কারণ বোরকা নিয়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার নেই। বোরকা ফারজানার ব্যাপার। আল্লাহ আর ফারজানার মধ্যে বোরকা একটা কাপড় মাত্র। আর কিছু না।