উত্তরাধিকার
জমি পেয়েছি। পরিবার হারিয়েছি। কোনটা বেশি দামি?
১
বাবা মারা গেলেন রবিবার সকালে।
রবিবার। সাধারণ দিন। বিশেষ কিছু না। বাবারা সাধারণ দিনে মারা যায়, কারণ মৃত্যু কোনো বিশেষ দিন বেছে আসে না।
ফজরের নামাজ পড়ে বিছানায় শুয়েছিলেন, আর উঠেননি। শাহানা খবর পেল দুপুরে। বড় ভাই কামাল ফোন করল, বলল, "বাবা নেই।" দুটো শব্দ। বাবা নেই। শাহানা ফোন ধরে দাঁড়িয়ে রইল রান্নাঘরে, হাতে পেঁয়াজ কাটার ছুরি, চোখে পানি, পেঁয়াজের না বাবার, বুঝতে পারল না।
শাহানা চল্লিশ। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন। বড় ভাই কামাল, মেজো ভাই জামাল, ছোট ভাই সোহেল। শাহানা দ্বিতীয়, কামালের পরে। বাবা মনিরুজ্জামান সাবেক স্কুলশিক্ষক, অবসরে গিয়েছিলেন দশ বছর আগে। মা আরো আগে গেছেন, শাহানার বিয়ের দুই বছর পর।
বাবার সম্পত্তি: নয় বিঘা জমি, একটা পাকা বাড়ি, দুটো পুকুর। গ্রামের হিসেবে সম্পদশালী। বাবা সারাজীবন জমিয়েছেন, কিনেছেন, এক টুকরো দুই টুকরো করে। শিক্ষকের বেতনে ধনী হওয়া যায় না, কিন্তু মিতব্যয়ী হলে সম্পদ জমে। বাবা মিতব্যয়ী ছিলেন। নিজের জন্য একটা লুঙ্গিও কেনেননি যতদিন পুরোনোটা ছিঁড়ে না গেছে।
শাহানা শেষবার বাবাকে দেখেছিল দুই মাস আগে। ঈদে এসেছিল। বাবা উঠানে বসে ছিলেন, পান খাচ্ছিলেন, নাতি-নাতনিদের সাথে কথা বলছিলেন। শাহানার মেয়ে রুবিনাকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন, "এই মেয়ে বড় হয়ে পড়াশোনা করবে, চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে।" শাহানা ভেবেছিল, বাবা শাহানার কথাই বলছেন, পরোক্ষে। শাহানাও পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, কিন্তু দশম শ্রেণির পর বিয়ে হয়ে গেল। বাবা তখন অন্যরকম ভাবতেন। বাবারাও বদলায়, সময়ের সাথে, কিন্তু বদলানো যখন আসে তখন দেরি হয়ে যায়।
জানাজার পর, কবরের মাটি শুকোনোর আগেই, সম্পত্তির কথা উঠল।
কামাল বলল, বৈঠকখানায়, তিন ভাই বসে, শাহানা রান্নাঘরে। শাহানাকে ডাকেনি। সম্পত্তির আলোচনায় মেয়েদের ডাকা হয় না। মেয়েরা রান্নাঘরে থাকবে, খাবার বানাবে, শোকের চা দেবে, আর পুরুষেরা ভাগাভাগি করবে।
শাহানা শুনেছিল। দেয়ালের ওপাশ থেকে। রান্নাঘর আর বৈঠকখানার মাঝে একটা পাতলা দেয়াল, শব্দ চলে আসে।
কামাল বলল, "নয় বিঘা তিন ভাগ, তিন বিঘা করে।"
তিন ভাগ। তিন ভাই। বোনকে বাদ দিয়ে।
২
ইসলামি আইনে মেয়ে পায় ছেলের অর্ধেক।
শাহানা জানে। পড়েছে। তিন ভাই আর এক বোন হলে হিসেবটা এরকম: প্রতিটা ভাই পায় দুই অংশ, বোন পায় এক অংশ। মোট সাত অংশ। নয় বিঘায় সাত ভাগ করলে প্রতি ভাগ এক বিঘা আর কিছুটা। ভাইয়েরা পাবে দুই বিঘা করে কিছু বেশি। শাহানা পাবে এক বিঘা কিছু বেশি।
কিন্তু ভাইয়েরা এক অংশও দিতে চায় না। তাদের হিসেবে নয় বিঘা তিন ভাগে ভাগ হবে, তিন বিঘা করে। বোন? বোন তো বিয়ে হয়ে গেছে। বোনের স্বামী আছে, শ্বশুরবাড়ি আছে। বোনের দায়িত্ব এখন স্বামীর।
এই যুক্তি বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে চলে। এই যুক্তি মসজিদের ইমামও বলেন, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানও বলেন, এমনকি কোনো কোনো উকিলও বলেন। এই যুক্তির সাথে আইনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা প্রথা। প্রথা আইনের চেয়ে পুরোনো। আইন বদলায়, প্রথা বদলায় না। প্রথা মাটির মতো, গভীরে গাঁথা, শত বছরের।
শাহানা বৈঠকখানায় গেল। তিন ভাই তাকাল। কামাল বলল, "তুমি কেন এখানে? যাও, মেহমানদের চা দাও।"
শাহানা বলল, "বাবার সম্পত্তিতে আমার ভাগ আছে।"
নীরবতা। সেই নীরবতা যেটা ক্রোধের আগে আসে, ঝড়ের আগে যেমন বাতাস থেমে যায়। তিন ভাই তাকাল শাহানার দিকে, যেন শাহানা কোনো বিদেশি ভাষায় কথা বলেছে। বোনের মুখে "আমার ভাগ" শব্দটা তাদের কানে অপরিচিত ঠেকল, যেন এই শব্দগুলো বোনের মুখে মানায় না।
জামাল বলল, "তুমি তো বিয়ে হয়ে গেছো।"
বিয়ে হয়ে গেছে। এই বাক্যটা বাংলাদেশের গ্রামে একটা আইনি রায়ের মতো। বিয়ে হয়ে গেছে মানে তুমি আর এই পরিবারের না। বিয়ে হয়ে গেছে মানে তোমার ঠিকানা বদলে গেছে। বিয়ে হয়ে গেছে মানে তোমার অধিকারও বদলে গেছে।
শাহানা বলল, "বিয়ে হলে কি বাবার মেয়ে থাকি না?"
সোহেল বলল, "আপা, ঝামেলা করো না। তোমার শ্বশুরবাড়ি আছে, তোমার স্বামী আছে। আমাদের এই জমিটুকুই সম্বল।"
শাহানার স্বামী আছে। রিকশা চালায়। তিনটা সন্তান। ভাড়া বাসায় থাকে। শ্বশুরবাড়ি আছে, সেখানেও কিছু নেই। শাহানা নিজে সেলাই করে, পাড়ার মেয়েদের জামা বানিয়ে দেয়, মাসে তিন-চার হাজার টাকা আয়। সেটা দিয়ে বাচ্চাদের স্কুলের খরচ চলে, আর কিছু চলে না।
কিন্তু ভাইয়েরা ভাবে বোন বিয়ে করে গেছে, বোনের দায়িত্ব শেষ, বোনের ভাগও শেষ।
৩
শাহানা আদালতে গেল।
এটা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। আদালত মানে টাকা। উকিলের ফি, আদালতের খরচ, যাতায়াত। শাহানার কাছে এই টাকা নেই। কিন্তু উপজেলায় একজন মহিলা আইনজীবী আছেন, সাজেদা খানম, যিনি দরিদ্র মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে মামলা করেন। শাহানা তার কাছে গেল।
সাজেদা খানম শুনলেন। পুরো গল্প। তারপর বললেন, "আইন তোমার পক্ষে। কিন্তু আইন পক্ষে থাকলেও সমাজ পক্ষে থাকবে না।"
শাহানা বলল, "জানি।"
মামলা হলো। কাগজপত্র জমা হলো। ওয়ারিশ সনদ, জমির দলিল, বাবার মৃত্যু সনদ। সাজেদা খানম বলেছিলেন, "তোমার কেস শক্ত, কিন্তু সময় লাগবে। বাংলাদেশে জমির মামলা দ্রুত শেষ হয় না।" শাহানা বলেছিল, "আমি অপেক্ষা করব। আমি যতদিন লাগে অপেক্ষা করব।"
ভাইয়েরা জানল। কামাল ফোন করল, "তুমি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছো? নিজের ভাইদের বিরুদ্ধে?"
শাহানা বলল, "আমি আমার অধিকারের জন্য মামলা করেছি।"
কামাল বলল, "তুমি মরে গেলেও এই জমি পাবে না।"
শাহানা কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু ফোন কেটে গেল। কামালের রাগ ফোনের তারের মধ্য দিয়ে এসেছিল, গরম, তীব্র। শাহানা ফোন ধরে বসে ছিল কিছুক্ষণ, তারপর রেখে দিল।
জামাল ফোন করল পরের দিন। জামাল শান্ত, কামালের মতো চেঁচায় না। জামাল বলল, "আপা, তুমি কী করছো জানো? পরিবারটা ভাঙছো। বাবা বেঁচে থাকলে কী বলতেন?" শাহানা বলল, "বাবা বেঁচে থাকলে আমাকে আমার ভাগ দিতেন।" জামাল চুপ করে গেল। হয়তো সত্য, হয়তো না, কেউ জানে না। কিন্তু শাহানা বিশ্বাস করে, কারণ বাবা শেষ দিনগুলোতে রুবিনাকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন, "এই মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।" বাবা হয়তো বোঝেননি, কিন্তু সেই কথাটা শাহানার জন্যও ছিল।
সোহেল ফোন করেনি। একটাও না। সেটাই সবচেয়ে কষ্টের।
তারপর থেকে কোনো ভাই ফোন করেনি। ঈদে দাওয়াত নেই। ভাতিজা-ভাতিজির খবর নেই। শাহানার বাচ্চারা জিজ্ঞেস করে, "মামারা কেন আসে না?" শাহানা বলে, "ব্যস্ত।" আরেকটা মিথ্যা। পরিবারের মিথ্যা। এই মিথ্যা রক্ষা করে না, এই মিথ্যা ঢেকে রাখে, ক্ষতের ওপর ব্যান্ডেজ, ক্ষত সারে না কিন্তু দেখা যায় না।
৪
পাঁচ বছর।
আদালতে মামলা পাঁচ বছর চলেছে। বাংলাদেশের আদালতে সবকিছু ধীরে চলে। তারিখ পড়ে, তারিখ বদলায়, তারিখ আবার পড়ে। উকিল আসে, বিচারক আসে, সাক্ষী আসে, কিন্তু ন্যায়বিচার আসতে সময় লাগে। ন্যায়বিচার হাঁটে, দৌড়ায় না।
পাঁচ বছরে শাহানা কতবার কোর্টে গেছে গুনতে পারে না। বাসে গেছে, রোদে দাঁড়িয়ে থেকেছে, কোর্টের বারান্দায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছে, তারিখ পেয়ে ফিরে এসেছে, আবার গেছে। প্রতিবার যাওয়া-আসায় দুইশো টাকা খরচ। পাঁচ বছরে কত হাজার টাকা? শাহানা হিসেব করে না। হিসেব করলে ভয় লাগে।
এই পাঁচ বছরে গ্রামে শাহানার নাম হয়ে গেছে "যে বোন ভাইদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।" মানুষ ফিসফিস করে। "ও তো পরের বাড়ি গেছে, বাবার সম্পত্তি নিয়ে কী করবে?" "মেয়েমানুষ জমি নিয়ে কী করবে?" "ভাইদের সাথে ঝগড়া, লজ্জা নেই?"
শাহানা শুনেছে। সব শুনেছে। শুনে শুনে কান পাথর হয়ে গেছে। প্রথমে কষ্ট পেত, এখন পায় না। কষ্ট একটা নির্দিষ্ট মাত্রার পর অনুভূতি হারায়। পানি যেমন শত ডিগ্রির পর আর গরম হয় না, বাষ্প হয়ে যায়, কষ্টও তেমন একটা সীমার পর বাষ্প হয়ে যায়। থাকে, কিন্তু অনুভব হয় না।
সবচেয়ে কষ্টের ছিল ঈদের দিনগুলো। ঈদে সবাই পরিবারে ফেরে। শাহানা ফিরতে পারে না। বাবার বাড়ি এখন ভাইদের বাড়ি, আর ভাইয়েরা শাহানাকে চায় না। প্রথম ঈদে শাহানা ঘরে বসে কেঁদেছিল সারাদিন। দ্বিতীয় ঈদে কম কেঁদেছিল। তৃতীয় ঈদে কাঁদেনি। চতুর্থ ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে পার্কে গিয়েছিল। পঞ্চম ঈদে সেলাইয়ের কাজ করেছিল, অর্ডার ছিল।
ঈদ থেকেও বড় কষ্ট ছিল বাবার কবর জিয়ারত। বাবার কবর গ্রামে। গ্রামে গেলে ভাইদের সামনে পড়তে হয়। প্রথমবার গিয়েছিল, কামাল দেখে অন্য দিকে চলে গিয়েছিল। সেই মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটা ছুরির চেয়ে তীক্ষ্ণ ছিল।
শাহানার স্বামী করিম বলেছিল, "ছেড়ে দাও। জমি ছাড়া বাঁচা যায়, পরিবার ছাড়া কঠিন।"
শাহানা বলেছিল, "আমি যদি ছেড়ে দিই, আমার মেয়ে বড় হয়ে কী শিখবে? শিখবে যে মেয়েদের অধিকার নেই? শিখবে যে চাইলেও পাওয়া যায় না? আমি আমার মেয়ের জন্য লড়ছি, আমার জন্য না।"
করিম আর কিছু বলেনি। করিম ভালো মানুষ। রিকশা চালিয়ে সংসার চালায়, কোনোদিন সাবিনাকে মারেনি, গালি দেয়নি। কিন্তু করিম ভাবে জমির জন্য পরিবার হারানো ঠিক না। করিম ভাবে সম্পর্ক দামি, জমি সস্তা। শাহানা ভাবে অন্যরকম। শাহানা ভাবে যে পরিবার তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সেই পরিবারের সম্পর্কের দাম কত? সম্পর্ক কি শুধু একদিক থেকে রক্ষা করতে হয়?
শাহানা ভাবে মেয়ে রুবিনার কথা। রুবিনা এখন আট। একদিন রুবিনাও বড় হবে। বিয়ে হবে। রুবিনার স্বামীও কি একদিন বলবে, "তোমার বাবা তো কিছু দেয়নি"? রুবিনাও কি একদিন বাবার কাছে এসে বলবে, "বাবা, ওরা চাইছে"? না। শাহানা সেটা হতে দেবে না। শাহানা লড়বে, এখন, যেন রুবিনাকে লড়তে না হয়।
৫
রায় এলো। শাহানার পক্ষে।
আদালত বলল, ইসলামি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী শাহানা বাবার সম্পত্তিতে তার ন্যায্য অংশ পাবে। এক বিঘা তেরো শতাংশ। নয় বিঘার সাত ভাগের এক ভাগ। আইন স্পষ্ট, আইন পরিষ্কার, আইন কোনো দিন অস্পষ্ট ছিল না। অস্পষ্ট ছিল মানুষের ইচ্ছা।
সাজেদা খানম ফোনে বলেছিলেন, "শাহানা, তুমি জিতেছো।" শাহানা বলেছিল, "জয়?" জয় শব্দটা মুখে আনতে পারেনি। জয় তখনই হয় যখন কিছু পাওয়া যায় আর কিছু হারায় না। শাহানা পেয়েছে জমি, হারিয়েছে পরিবার। এটা জয় না। এটা বিনিময়। এটা একটা জিনিসের বদলে আরেকটা।
রায়ের দিন শাহানা একা বাড়ি ফিরেছিল। করিম কাজে ছিল। বাচ্চারা স্কুলে। খালি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসেছিল। কাঁদেনি। কাঁদার শক্তি ছিল না। পাঁচ বছরের লড়াই শরীর থেকে সব রস নিংড়ে নিয়েছে। শাহানা শুকিয়ে গেছে, ভেতরে আর বাইরে। চোখের কোণে বলিরেখা, কপালে ভাঁজ, চুলে পাক। চল্লিশে পঞ্চাশের মতো দেখায়।
শাহানা জমি পেল।
কিন্তু সেই জমিতে পা রাখতে গেলে ভাইয়ের মুখ মনে পড়ে। কামালের রাগী চোখ। জামালের ঠান্ডা কণ্ঠ। সোহেলের নীরবতা, যেটা সবচেয়ে কষ্টের, কারণ সোহেলের সাথে শাহানার সবচেয়ে বেশি ভাব ছিল, ছোটবেলায় একসাথে খেলত, একসাথে স্কুলে যেত, সোহেল শাহানাকে "আপুনি" ডাকত।
সোহেল আর ডাকে না।
শাহানা জমিতে গেল। একা। ধানক্ষেত। সবুজ। বাতাসে ধান দুলছে। এই ধানের গন্ধ শাহানা চেনে, ছোটবেলার গন্ধ, বাবার জমির গন্ধ। বাবা এই জমিতে দাঁড়িয়ে বলতেন, "এই মাটি আমার সন্তানদের খাওয়াবে।" সন্তানদের। সব সন্তানের। মেয়ে সহ।
বাবা বেঁচে থাকলে কী করতেন? শাহানা জানে না। হয়তো বাবাও ভাইদের পক্ষ নিতেন। হয়তো না। মৃত মানুষের ইচ্ছে অনুমান করা যায়, প্রমাণ করা যায় না।
শাহানা মাটিতে বসল। হাতে একমুঠো মাটি তুলে নিল। ভেজা মাটি। উর্বর।
জমি পেয়েছি। পরিবার হারিয়েছি। কোনটা বেশি দামি?
শাহানা উত্তর জানে না। হয়তো কোনোদিন জানবে না। হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর নেই। হয়তো প্রশ্নটাই ভুল। প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল: কেন একজন মেয়েকে তার অধিকারের জন্য পরিবার হারাতে হয়?
শাহানা উঠে দাঁড়াল। মাটি ঝেড়ে ফেলল। বাড়ি ফিরতে হবে। বাচ্চারা অপেক্ষা করছে। মেয়ে রুবিনা জিজ্ঞেস করবে, "আম্মা, কোথায় গিয়েছিলে?" শাহানা বলবে, "দাদুর জমিতে।" রুবিনা বলবে, "আমিও যাবো।" শাহানা বলবে, "যাবি। এই জমি তোরও।"
এই জমি তোরও। এই কথাটা বলার জন্যই শাহানা পাঁচ বছর লড়েছে। এই কথাটা বলার জন্যই তিন ভাই হারিয়েছে।
বাড়ি ফেরার পথে শাহানা পেছন ফিরে তাকাল। ধানক্ষেত। বাবার জমি। তার জমি। এক বিঘা তেরো শতাংশ।
আকাশের নিচে খুব ছোট একটা টুকরো মাটি। কিন্তু সেই ছোট টুকরো মাটিতে একটা মেয়ের অধিকার দাঁড়িয়ে আছে। সোজা হয়ে। পাঁচ বছরের ক্ষত নিয়ে। তবু সোজা।
শাহানা জানে একদিন ভাইয়েরা হয়তো ফিরে আসবে। হয়তো না। সময় অনেক কিছু নরম করে, পাথরকেও। কিন্তু কিছু পাথর নরম হয় না। কিছু রাগ পুরোনো হলে বিদ্বেষে পরিণত হয়, আর বিদ্বেষ সময়ের সাথে কমে না, বাড়ে।
কিন্তু রুবিনা জানবে। রুবিনা জানবে যে তার মা লড়েছিল। রুবিনা জানবে যে মেয়েদের অধিকার আছে, আইনে আছে, এবং সেই অধিকার আদায় করা যায়, যদি লড়ার সাহস থাকে। রুবিনা জানবে যে মূল্য আছে, কিন্তু মূল্য দিলে পাওয়াও যায়।
শাহানা হাঁটে। ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে। বাবার জমি। তার জমি। রুবিনার জমি।
সন্ধ্যার আলো কমে আসছে। বাড়িতে ফিরতে হবে। করিম অপেক্ষা করছে। বাচ্চারা অপেক্ষা করছে। রান্না করতে হবে। সংসার চালাতে হবে। জমি আছে, কিন্তু সংসারও আছে। দুটোই চালাতে হবে। একা। কারণ মেয়েরা সবকিছু একা চালায়। সবসময় চালিয়েছে।
শাহানা হাঁটে। পায়ের নিচে মাটি। শক্ত মাটি। তার মাটি।
জমি পেয়েছি। পরিবার হারিয়েছি। কোনটা বেশি দামি?
উত্তর নেই। কিন্তু প্রশ্নটা আছে। প্রশ্নটা থাকবে। শাহানার সাথে, শাহানার মেয়ের সাথে, শাহানার মেয়ের মেয়ের সাথে। যতদিন মেয়েদের অধিকারের জন্য লড়তে হয়, ততদিন এই প্রশ্ন থাকবে।