কিশোরী আত্মহত্যা প্রতিরোধ
মরতে চেয়েছিলাম কারণ বাঁচার রাস্তা দেখিনি। রাস্তা ছিল, কেউ দেখায়নি।
১
মিম ট্যাবলেটগুলো গুনেছিল।
বারোটা। প্যারাসিটামল। মায়ের ড্রয়ার থেকে নিয়েছিল, মা জানত না। বারোটা যথেষ্ট কিনা মিম জানত না। সে ষোলো বছর, দশম শ্রেণি, ফার্মাকোলজি পড়েনি। শুধু জানত ওষুধ বেশি খেলে মানুষ মরে। কতটা বেশি, সেটা জানা ছিল না। কিন্তু সেই মুহূর্তে জানার দরকারও মনে হয়নি। সেই মুহূর্তে শুধু একটাই চিন্তা: এটা শেষ হোক।
এটা। "এটা" মানে কী? এটা মানে ক্লাসে ফিসফিসানি। এটা মানে ফোনে নোটিফিকেশন যেটা দেখতে ভয় লাগে। এটা মানে ফেসবুকে একটা ছবি, যেটা মিমের না, কিন্তু মিমের মুখ লাগানো হয়েছে, ফটোশপে, অন্য কারো শরীরে মিমের মুখ। ভুয়া ছবি। কিন্তু ভুয়া হলেও মানুষ বিশ্বাস করে, কারণ মানুষ দেখতে চায়, বিশ্বাস করতে চায়, বিচার করতে চায়।
ছবিটা ছড়িয়েছিল মিমের ক্লাসমেট রাজু। মিম রাজুর প্রপোজাল প্রত্যাখ্যান করেছিল। "না" বলেছিল। সোজা "না।" মেয়েরা "না" বললে ছেলেরা অপমানিত হয়। ছেলেদের অপমান বিপজ্জনক, কারণ অপমানিত ছেলেরা প্রতিশোধ নেয়। রাজু বলেছিল, "তুই পরে দেখবি।" মিম ভাবেনি "দেখবি" মানে এটা। ভাবেনি প্রত্যাখ্যানের শাস্তি এত বড়। ভাবেনি "না" বলার মূল্য এত ভারী।
ছবিটা ক্লাসের গ্রুপে গেল। তারপর স্কুলের গ্রুপে। তারপর পাড়ার গ্রুপে। তারপর কে কোথায় পাঠিয়েছে কেউ জানে না। ইন্টারনেটে একটা ছবি একবার ছড়ালে ফেরানো যায় না। পানিতে কালি পড়লে যেমন আর তোলা যায় না।
মিমের মা জানতেন না। বাবা জানতেন না। মিম বলেনি। কাকে বলবে? মা বলবে, "ফোন দিয়ে কী করিস সারাদিন?" বাবা বলবে, "মেয়েমানুষের এত ফেসবুক কেন?" সমস্যাটা যে ফেসবুক না, সমস্যাটা যে রাজু, সেটা কেউ বুঝবে না। কারণ বাংলাদেশে মেয়ের সমস্যা মানে মেয়ের দোষ। মেয়ের ছবি ছড়ালে দোষ মেয়ের। মেয়ের নাম উঠলে দোষ মেয়ের। মেয়ে "কেন ছেলেটার সাথে কথা বলেছিল" এই প্রশ্ন আসবে, "ছেলেটা কেন ছবি বানাল" এই প্রশ্ন আসবে না।
২
স্কুলে মিম একা হয়ে গেল।
একা। শব্দটা ছোট, কিন্তু ভারী। একা মানে টিফিনে কেউ নেই। একা মানে ক্লাসে পাশে কেউ বসে না। একা মানে স্কুলের পথে কেউ হাঁটে না সাথে। একা মানে জগতের সবচেয়ে ভিড়ের মধ্যেও কেউ নেই।
যারা বান্ধবী ছিল, তারা দূরে সরে গেল। একে একে। প্রথমে সুমি বলল, "আমার মা বলেছে তোর সাথে মিশতে না।" তারপর রিতা বলল, "তুই স্কুলে আসিস কেন? লজ্জা নেই?" তারপর আর কেউ বলল না, কিন্তু কেউ কথাও বলল না। নীরবতা। সেই নীরবতা যেটা উপেক্ষা, যেটা অদৃশ্য করে দেয়, যেটা একটা ষোলো বছরের মেয়েকে বলে: তুমি নেই।
ক্লাসে ঢুকলে ফিসফিসানি শুরু হয়। বের হলে হাসি। টিফিনে একা বসে খায়, কেউ পাশে বসে না। টয়লেটে গেলে দেয়ালে লেখা দেখে: মিমের নাম, তার পাশে গালাগালি। কে লিখেছে জানে না। কেউ মুছেও দেয় না।
মিম পড়াশোনায় ভালো ছিল। গণিতে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেত। বিজ্ঞানে। ইংরেজিতে। এখন পড়তে পারে না। বই খুললে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে যায়, কারণ চোখে পানি আসে। পরীক্ষায় বসলে হাত কাঁপে, কারণ ভয় লাগে কে পেছন থেকে তাকিয়ে আছে।
ঘুম হয় না। রাতে শুয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে, নোটিফিকেশন আসে কিনা দেখে, নতুন কমেন্ট, নতুন শেয়ার, নতুন অপমান। ফোন বন্ধ করতে পারে না, কারণ না দেখলে আরো ভয় লাগে। দেখলেও ভয়। না দেখলেও ভয়। দুদিকে অন্ধকার।
মিমের হাতে আঁচড়ের দাগ পড়ল। ব্লেড দিয়ে। ব্যথা দিলে অন্য ব্যথা ভুলে যায়, এটা মিম শিখেছে নিজে নিজে। কেউ শেখায়নি। শরীরের ব্যথা মনের ব্যথার চেয়ে সহজ, কারণ শরীরের ব্যথা দেখা যায়, ওষুধ দেওয়া যায়, ব্যান্ডেজ দেওয়া যায়। মনের ব্যথায় কোনো ব্যান্ডেজ নেই।
মিম ফুল হাতা জামা পরতে শুরু করল। গরমেও। মা ভেবেছে ধর্মীয় কারণে। মা খুশি হয়েছে। মিম কিছু বলেনি।
মিমের ওজন কমেছে। মা লক্ষ করেছে, বলেছে, "কিছু খাস না কেন?" মিম বলেছে, "ক্ষুধা লাগে না।" সত্যি। ক্ষুধা লাগে না। ঘুম হয় না। হাসি আসে না। সবকিছু ধূসর, যেন পৃথিবীতে রঙ ফুরিয়ে গেছে। এটাকে বিষণ্নতা বলে, কিন্তু বাংলাদেশে এই শব্দটা কেউ ব্যবহার করে না কিশোরীদের জন্য। কিশোরীরা বিষণ্ন হয় না, কিশোরীরা "নাটক করে।" কিশোরীরা কাঁদলে বলা হয়, "বড় হচ্ছে, ওসব হবে।" কিশোরীদের ভেতর কী চলছে সেটা কেউ জানতে চায় না।
মিম ভাবল, এই অন্ধকার থেকে বের হওয়ার একটাই রাস্তা।
বারোটা ট্যাবলেট।
মিম ট্যাবলেটগুলো হাতে নিল। টিফিনের সময়। ক্লাসরুমে কেউ নেই, সবাই বাইরে। মিম সবসময় ক্লাসে থাকে টিফিনে, কারণ বাইরে গেলে হাসি শুনতে হয়, ফিসফিসানি শুনতে হয়। ক্লাসরুম তার আশ্রয়, চার দেয়ালের ভেতর অন্তত কেউ তাকাচ্ছে না।
হাতে ট্যাবলেট। মিম ভাবল, এটা খেলে কী হবে? ঘুমিয়ে যাব। চিরকালের জন্য। আর কেউ হাসবে না। আর কেউ ফিসফিস করবে না। আর কোনো নোটিফিকেশন আসবে না। আর কোনো ছবি ছড়াবে না। সব শেষ। সব শান্ত।
শান্তি। মিম শান্তি চেয়েছিল। মৃত্যু চায়নি, শান্তি চেয়েছিল। কিন্তু ষোলো বছরে মৃত্যু আর শান্তি একই জিনিস মনে হয়, কারণ অন্য কোনো রাস্তা দেখা যায় না।
৩
নাজমা ম্যাম দেখে ফেলেছিলেন।
বাংলার শিক্ষিকা। টিফিনের সময়। মিম ক্লাসরুমে একা বসে আছে, হাতে ট্যাবলেটের প্যাকেট। নাজমা ম্যাম টিফিনের পর ক্লাসরুমে এসেছিলেন বোর্ড মোছার জন্য। দেখলেন মিমকে। দেখলেন হাত কাঁপছে। দেখলেন চোখ ফাঁকা, যেন কেউ নেই ভেতরে।
"মিম?"
মিম তাকাল। নাজমা ম্যামের দিকে। চোখে একটা শূন্যতা ছিল যেটা নাজমা ম্যাম আগে কখনো দেখেননি কোনো ছাত্রীর চোখে। সেই শূন্যতা যেটা বলে: আমি এখানে নেই। আমি কোথাও নেই। আমি শেষ।
তারপর মিম কাঁদল। এত জোরে কাঁদল যে পাশের ক্লাসে শোনা গেল। এত জোরে কাঁদল যেন শরীরের ভেতর থেকে কিছু একটা ভেঙে বেরিয়ে আসছে, যেটা অনেকদিন ধরে আটকে ছিল, চাপা ছিল, লুকানো ছিল। মাসের পর মাস চাপা দিয়ে রাখা কান্না একবারে বেরিয়ে এলো, বাঁধ ভেঙে, নিয়ন্ত্রণ ছাড়া।
নাজমা ম্যাম ট্যাবলেটগুলো নিয়ে নিলেন। নিজের ব্যাগে রাখলেন। মিমকে ধরলেন। চুপ করে ধরে রইলেন। কিছু বললেন না। কিছু জিজ্ঞেস করেননি। কেন কাঁদছো, কী হয়েছে, এসব না। কারণ কিছু কিছু মুহূর্তে কথা কাজ করে না, ছোঁয়া কাজ করে। একটা হাত কাঁধে, একটা মাথায় হাত বুলানো, এটুকুই যথেষ্ট। এটুকুই বলে: তুমি আছো, আমি দেখছি, তুমি একা না।
নাজমা ম্যাম পরে বলেছিলেন, "সেদিন আমি যদি বোর্ড মুছতে না আসতাম, তাহলে কী হতো?" এই "কী হতো" প্রশ্নটা নাজমা ম্যামকে রাতে জাগিয়ে রাখে। কারণ উত্তরটা ভয়ংকর।
নাজমা ম্যাম প্রধান শিক্ষকের কাছে গেলেন। প্রধান শিক্ষক বললেন, "এসব ছেলেমেয়েদের ব্যাপার, আমরা কী করব?" নাজমা ম্যাম বললেন, "একটা মেয়ে মরতে চাইছে, আমরা কী করব না সেটাই প্রশ্ন?"
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন কাউন্সেলর আছেন। সাপ্তাহিক ভিজিটে আসেন। বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্কুলে কোনো কাউন্সেলর নেই, কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই, কোনো কথা বলার জায়গা নেই। মেয়েরা কষ্ট পেলে চুপ থাকে, কারণ কথা বলার কেউ নেই। ছেলেরাও থাকে, কিন্তু ছেলেদের অন্তত মাঠ আছে, বন্ধু আছে, বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা আছে। মেয়েদের ঘর আছে, চার দেয়াল আছে, আর নীরবতা আছে।
কাউন্সেলর রুবিনা আপা এলেন। মিমের সাথে কথা বললেন। একটা ঘরে। দরজা বন্ধ। শুধু দুজন।
রুবিনা আপা প্রথমে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। চা দিয়েছিলেন। দুই কাপ চা। একটা মিমের, একটা নিজের। চা খেতে খেতে নিজের গল্প বলেছিলেন। নিজেও একবার অন্ধকারে ছিলেন, নিজেও একবার মনে হয়েছিল সব শেষ। মিম শুনেছিল। প্রথমবার কেউ তার সাথে সমানে কথা বলেছে, উপর থেকে না, পাশ থেকে। প্রথমবার কেউ বলেছে, "আমিও।"
"আমিও" শব্দটা ছোট। কিন্তু এই ছোট শব্দটা দেয়াল ভাঙে। একাকীত্বের দেয়াল। "আমিও" মানে তুমি একা না। "আমিও" মানে এই অন্ধকার শুধু তোমার না, অন্যেরাও দেখেছে, এবং তারা বেরিয়ে এসেছে। বেরিয়ে আসা সম্ভব।
৪
মিম বলেছিল, "মরতে চেয়েছিলাম কারণ বাঁচার রাস্তা দেখিনি।"
রুবিনা আপা বলেছিলেন, "রাস্তা ছিল। কেউ দেখায়নি।"
এই কথাটা মিমের মাথায় ঢুকল। ধীরে ধীরে। পানি যেমন শুকনো মাটিতে ঢোকে, ফোঁটায় ফোঁটায়, সময় নিয়ে। রাস্তা ছিল। সে দেখেনি, কারণ কেউ দেখায়নি। সে অন্ধকারে ছিল, কিন্তু অন্ধকার মানেই রাস্তা নেই তা নয়। অন্ধকার মানে আলো নেই। আলো আনতে হয়। কেউ আনে, অথবা নিজে খোঁজে।
কাউন্সেলিং চলল। সপ্তাহে একদিন। রুবিনা আপা আসতেন, মিমের সাথে কথা বলতেন, শুনতেন। শুনতেন সবচেয়ে বেশি। কারণ মিমকে কেউ শোনেনি। মা শোনেনি, বাবা শোনেনি, বান্ধবীরা শোনেনি, স্কুল শোনেনি। রুবিনা আপা শুনলেন। আর সেই শোনাটাই ছিল প্রথম ওষুধ।
রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে। নাজমা ম্যাম করেছিলেন। মিমের বাবা-মা জানলেন পুরো ঘটনা। মা কেঁদেছিলেন। বাবা চুপ করে ছিলেন অনেকক্ষণ, তারপর বলেছিলেন, "আমি জানতামই না।" এই বাক্যটা বাংলাদেশের বেশিরভাগ বাবা-মায়ের। আমি জানতামই না। কারণ কেউ জিজ্ঞেসও করে না। "পড়াশোনা কেমন?" এই প্রশ্ন হয়। "তুই কেমন আছিস?" এই প্রশ্ন হয় না। অথবা হলেও উত্তর শোনার ধৈর্য নেই।
মিমের বাবা রাতে মিমের ঘরে এসেছিলেন। মিম শুয়ে ছিল। বাবা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ, তারপর বলেছিলেন, "মিম, আমি তোর বাবা। তুই আমাকে বলতে পারতি।" মিম কিছু বলেনি। কারণ কীভাবে বলবে? বাবাকে বলবে, "বাবা, আমার নামে ভুয়া ছবি ছড়িয়েছে"? বাবা কী করবে? বাবা রাগ করবে, কিন্তু কার ওপর? মেয়ের ওপর না ছেলেটার ওপর? বাংলাদেশে এই উত্তর সবসময় পরিষ্কার না। কিছু বাবা মেয়ের পাশে দাঁড়ায়। কিছু বাবা মেয়েকে দোষ দেয়। মিম জানত না তার বাবা কোন দলে। সেই অনিশ্চয়তাই তাকে চুপ করিয়ে রেখেছিল।
মিমের বাবা সেদিন রাতে কেঁদেছিলেন। মিম শুনেছিল। দেয়ালের ওপাশ থেকে। বাবার কান্না শুনলে সন্তানের ভেতর কিছু একটা বদলায়, চিরতরে। বাবা যে কাঁদতে পারে, এই জ্ঞানটা ভারী।
৫
দুই বছর পর।
মিম এখন দ্বাদশ শ্রেণি। বিজ্ঞান বিভাগ। গণিতে এখনো সবচেয়ে বেশি নম্বর পায়। ঘুম হয়। রাতে ফোন বন্ধ করে ঘুমায়। ফেসবুক ডিঅ্যাক্টিভেট করেছে, ফিরে যায়নি।
মিম এখন হাসে। আসল হাসি। পেটের ভেতর থেকে আসা হাসি, মুখের ওপরে আটকানো নকল হাসি না। এটা ফিরে পেতে সময় লেগেছে, কিন্তু ফিরে এসেছে।
স্কুলে একটা জিনিস বদলেছে। নাজমা ম্যামের উদ্যোগে একটা "পিয়ার সাপোর্ট গ্রুপ" তৈরি হয়েছে। দশজন ছাত্রী। তারা অন্য মেয়েদের সাথে কথা বলে, শোনে, সমস্যা থাকলে শিক্ষকদের জানায়। মিম সেই গ্রুপের একজন। মিম এখন অন্য মেয়েদের কথা শোনে। অন্য মেয়েদের বলে, "কথা বল। চুপ থেকো না। চুপ থাকা সমাধান না।"
একদিন একটা নবম শ্রেণির মেয়ে এসেছিল। নাম লামিয়া। চোখ ফোলা। হাতে আঁচড়ের দাগ। মিম চিনে ফেলেছিল সেই চেহারা। দুই বছর আগে আয়নায় নিজেরটা দেখেছিল।
মিম লামিয়াকে ধরেছিল। যেমন নাজমা ম্যাম তাকে ধরেছিলেন।
"কী হয়েছে?"
লামিয়া কাঁদল। মিম শুনল। পুরোটা শুনল।
তারপর বলল, "আমিও একবার ওষুধ হাতে নিয়ে বসেছিলাম। বারোটা ট্যাবলেট। জানিস কেন খাইনি? কারণ একজন মানুষ সেই মুহূর্তে আমাকে দেখেছিল। শুধু দেখেছিল। সেটুকুই যথেষ্ট ছিল।"
লামিয়া তাকাল।
মিম বলল, "আমিও ভেবেছিলাম এটা চিরস্থায়ী। এই অন্ধকার, এই একাকীত্ব, এই লজ্জা। কিন্তু চিরস্থায়ী না। কমে। সময় লাগে, কিন্তু কমে। তুই এখন ভাবছিস পৃথিবীতে কেউ নেই। কিন্তু আমি আছি। আমি তোর সাথে কথা বলছি। আমি তোকে শুনছি। এটুকুই এখন যথেষ্ট।"
লামিয়া কাঁদছিল। মিম ছুঁয়ে ছিল তার কাঁধ। যেমন নাজমা ম্যাম ছুঁয়েছিলেন। স্পর্শের একটা ভাষা আছে যেটা শব্দের চেয়ে পুরোনো। সেই ভাষায় বলা হয়: তুমি একা না।
মিম বলল, "আমি তোকে দেখছি। তুই আছিস।"
রাতে মিম বাড়িতে ফিরে ছাদে দাঁড়াল। আকাশে তারা। মিম তারা দেখে, এখন দেখতে পারে। দুই বছর আগে পারত না, কারণ তখন আকাশের দিকে তাকানোর মানে ছিল না। এখন মানে আছে।
আমি বেঁচে আছি। এটাই আমার প্রতিবাদ।
মিম নিচে নামল। পড়তে বসল। পরীক্ষা সামনে। মেডিকেলে ভর্তি হতে চায়। ডাক্তার হতে চায়। কোন ধরনের ডাক্তার? মানসিক স্বাস্থ্যের। কারণ মিম জানে বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের ডাক্তার নেই বললেই চলে। প্রতি লক্ষ মানুষে এক জনেরও কম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। মিম সেই এক জন হতে চায়।
"মরতে চেয়েছিলাম কারণ বাঁচার রাস্তা দেখিনি। রাস্তা ছিল, কেউ দেখায়নি।"
মিম এখন রাস্তা দেখায়। অন্যদের।
বারোটা ট্যাবলেটের বদলে বারোটা মেয়ে। যাদের সাথে কথা বলেছে গত এক বছরে। যাদের শুনেছে। যাদের বলেছে: তুমি আছো। বারোটা। এই বারো অনেক বড়।
মিম জানে সব গল্পের সুখী সমাপ্তি হয় না। রাজু ছাড়া পেয়েছে, কারণ বাংলাদেশে এই মামলাগুলো দীর্ঘদিন চলে, সাক্ষী পাওয়া কঠিন, প্রমাণ জোগাড় করা কঠিন, আর "ছেলেটা ভুল করেছে, তবে ছেলে তো" এই যুক্তি সর্বত্র। ছবিটা এখনো ইন্টারনেটে আছে, কোথাও, কোনো সার্ভারে। মিম জানে। কিন্তু মিম আর সেই ছবি না। মিম এখন অন্য কেউ। মিম এখন সেই মেয়ে যে অন্য মেয়েদের বলে: তুমি একটা ছবি না, তুমি একটা মানুষ। ছবি মিথ্যা হতে পারে, তুমি সত্য।
রাতের আকাশে তারা। মিম গোনে না। শুধু দেখে। দেখাটাই যথেষ্ট। বেঁচে থাকাটাই যথেষ্ট। বেঁচে থাকাটাই প্রতিবাদ।
মিম জানে বাংলাদেশে প্রতি বছর কত কিশোরী আত্মহত্যা করে। সংখ্যাটা বড়। সংখ্যাটা ভয়ংকর। কিন্তু সংখ্যার পেছনে মুখ আছে, নাম আছে, গল্প আছে। প্রতিটা সংখ্যা একটা মেয়ে, যে একদিন স্কুলে যেত, একদিন হাসত, একদিন স্বপ্ন দেখত। তারপর কিছু একটা হলো, ছবি ছড়াল, গুজব ছড়াল, বুলিং হলো, আর সে ভাবল আর পারবে না। কেউ তাকে বলেনি, "পারবে।" কেউ তাকে দেখায়নি রাস্তা।
মিম সেই রাস্তা দেখাতে চায়। একজন একজন করে। ধীরে ধীরে। কারণ মিম জানে তাড়াহুড়ো করা যায় না। ভাঙা মানুষকে জোড়া লাগাতে সময় লাগে। ধৈর্য লাগে। ভালোবাসা লাগে।
মিম ঘরে ফিরল। মা ডাকছে, "খেতে আয়।" মিম যায়। খায়। মায়ের রান্না। গরম ভাত, ডাল, সবজি। সাধারণ খাবার। কিন্তু দুই বছর আগে মিম এই খাবারের স্বাদ পেত না। এখন পায়। স্বাদ ফিরে এসেছে। ক্ষুধা ফিরে এসেছে। ঘুম ফিরে এসেছে। জীবন ফিরে এসেছে।
মিম মায়ের দিকে তাকায়। মা ব্যস্ত, রান্নাঘরে। মিম বলে, "মা, খাবার ভালো হয়েছে।" মা হাসে। ছোট্ট কথা। কিন্তু মায়ের কাছে এটা অনেক।
জীবনে ছোট কথাগুলোই অনেক।
মিম ঘুমায়। ঘুম আসে এখন। রাত শান্ত। ফোন বন্ধ। নোটিফিকেশন নেই। ফিসফিসানি নেই। শুধু ঘুম। শুধু শান্তি।
সেই শান্তি যেটা মিম চেয়েছিল। ট্যাবলেটে না, জীবনে।
বারোটা ট্যাবলেট নয়। বারোটা মেয়ে। বারোটা রাস্তা দেখানো। বারোটা "তুমি আছো।"
মিম বেঁচে আছে। এটাই তার প্রতিবাদ। এটাই তার উত্তর। রাজুর কাছে, সমাজের কাছে, সেই অন্ধকারের কাছে যেটা তাকে গ্রাস করতে চেয়েছিল।
মিম বেঁচে আছে। আর থাকবে।