বৃষ্টির দিনের মেয়ে

বই ভিজলে আবার কিনতে পারবো না। আমি ভিজলে শুকিয়ে যাবো।

পর্ব ৮৫ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

শিউলির একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ আছে।

সাদা ব্যাগ। বাজারের ব্যাগ। মা বাজার থেকে পেঁয়াজ এনেছিল যে ব্যাগে, সেটা। পেঁয়াজের গন্ধ এখনো আছে একটু, কিন্তু শিউলি পরোয়া করে না। গন্ধ মুছে যায়, ব্যাগ থাকে। এই ব্যাগটাই শিউলির সবচেয়ে দামি জিনিস।

বই রাখে এতে।

স্কুলের বই। তৃতীয় শ্রেণি। বাংলা, গণিত, পরিবেশ পরিচিতি। তিনটা বই। পাতলা, সরকারি বই, বিনামূল্যে পাওয়া। কিন্তু বিনামূল্যে মানে আবার পাওয়া যাবে না। এই বই হারালে, ছিঁড়লে, ভিজলে আর আসবে না। পরের বছর নতুন ক্লাসের বই আসবে, কিন্তু এই বছরের বই এই বছরেই শেষ। তাই শিউলি বই রাখে প্লাস্টিকের ব্যাগে। সেটাই তার স্কুলব্যাগ।

শিউলি আট বছর। কিশোরগঞ্জের একটা চরের স্কুলে পড়ে। চর মানে নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা মাটি, যেটা বর্ষায় ডুবে যেতে পারে, যেটা ভাঙতে পারে, যেটা স্থায়ী না। চরের মানুষ জানে কিছুই স্থায়ী না। ঘর স্থায়ী না, জমি স্থায়ী না, এমনকি মাটি স্থায়ী না। তবু মানুষ থাকে। কারণ অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

শিউলির ঘর তিনবার ভেঙেছে। প্রথমবার সে জন্মানোর আগে, মা বলেছে। দ্বিতীয়বার সে তিন বছর, মনে নেই। তৃতীয়বার গত বছর, মনে আছে। নদী খেয়েছে। নদী ক্ষুধার্ত, নদী সবসময় ক্ষুধার্ত, চরের মাটি খায়, ঘর খায়, গাছ খায়, স্মৃতি খায়। তৃতীয়বার ঘর ভাঙলে বাবা নতুন জায়গায় ঘর তুলেছে, একই চরে, কয়েকশো গজ ভেতরে। কতদিন টিকবে জানে না। চরে কেউ জানে না কতদিন কিছু টিকবে।

স্কুলটা টিনের চালের। চারটা বাঁশের খুঁটি, ওপরে টিনের চাদর, তিন দিকে টিনের দেয়াল, একদিক খোলা। মেঝে মাটির। বেঞ্চ আছে তিনটা, বাকি বাচ্চারা মাটিতে বসে। ব্ল্যাকবোর্ড আছে একটা, চক আছে, কিন্তু চক শেষ হলে স্যার নিজের পকেট থেকে কেনেন। স্যার একজন, নাম মতিন স্যার, তিনি একা ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত পড়ান। একটা ঘরে পাঁচটা ক্লাস। একটা গলায় পাঁচটা বিষয়।

শিউলি সামনের সারিতে বসে। মাটিতে। পা ভাঁজ করে। খাতা হাঁটুতে রেখে লেখে। খাতাটা পাতলা, ত্রিশ পাতার, দুই টাকায় কেনা। শিউলি ছোট ছোট করে লেখে, যেন পাতা বেশিদিন থাকে। বড় অক্ষরে লিখলে পাতা শেষ হয়ে যায়, ছোট অক্ষরে লিখলে টেকে। দারিদ্র্য মানুষকে ছোট করতে শেখায়, অক্ষরকেও।

শিউলির পেন্সিলটা আধা ইঞ্চি লম্বা। ছোট হতে হতে আঙুলে ধরতে কষ্ট হয়। কিন্তু শিউলি ধরে। বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝে চেপে ধরে। নতুন পেন্সিল কিনতে পাঁচ টাকা লাগে। পাঁচ টাকা মানে একদিনের তরকারি। মা বলেছে মাস শেষে কিনে দেবে। মাস শেষে আরো পনেরো দিন। পনেরো দিন এই আধা ইঞ্চি দিয়ে চালাতে হবে। শিউলি চালায়। কারণ শিউলি জানে চালিয়ে নিতে। চরের মেয়েরা সব চালিয়ে নিতে জানে।

বৃষ্টি শুরু হলে স্কুলটা একটা ড্রামে পরিণত হয়।

টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে, শব্দ হয়, এত শব্দ যে মতিন স্যারের গলা শোনা যায় না। স্যার চেঁচিয়ে পড়ান, বাচ্চারা চেঁচিয়ে পড়ে, কিন্তু বৃষ্টি সবার চেয়ে জোরে। বৃষ্টি সবসময় জেতে।

শ্রাবণ মাসে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হয়। কখনো সকালে, কখনো দুপুরে, কখনো হঠাৎ, কোনো সতর্কতা ছাড়া। আকাশ কালো হয়, বাতাস ঠান্ডা হয়, তারপর নামে। ঝমঝম করে নামে। টিনের চাল কাঁপে। মাটির মেঝে ভেজে। তিনদিকে টিনের দেয়াল, কিন্তু একদিক খোলা, সেদিক দিয়ে পানি ঢোকে। বাচ্চারা পা তুলে বসে। কেউ কেউ উঠে দাঁড়ায়। কেউ কেউ ভিজে যায়।

শিউলি বই বের করে প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখে। প্রথমে। বইয়ের কথা প্রথমে ভাবে। নিজের কথা পরে। নিজে ভিজুক, বই শুকনো থাকুক। বই ভিজলে পাতা ফুলে যায়, অক্ষর ঝাপসা হয়, বই নষ্ট হয়। বই নষ্ট হলে আর কেনা যাবে না। নিজে ভিজলে? শুকিয়ে যাবে। রোদ উঠলে শুকিয়ে যাবে। মানুষ শুকায়, বই শুকায় না। ভেজা বই চিরকাল ভেজা, পাতায় দাগ থেকে যায়, কুঁচকে যায়, আর সোজা হয় না।

"বই ভিজলে আবার কিনতে পারবো না। আমি ভিজলে শুকিয়ে যাবো।"

শিউলি এই কথাটা মতিন স্যারকে বলেছিল একদিন। মতিন স্যার চুপ করে ছিলেন অনেকক্ষণ। তারপর নিজের চোখ মুছেছিলেন। ঘাম মুছছেন বলেছিলেন, কিন্তু ঘাম ছিল না, বৃষ্টির দিনে ঘাম হয় না।

স্কুল থেকে বাড়ি এক কিলোমিটার। কাঁচা রাস্তা। বৃষ্টি হলে কাদা হয়। কাদায় পা ডোবে, স্যান্ডেল থাকলে খুলে যায়। শিউলির স্যান্ডেল নেই। খালি পায়ে হাঁটে। খালি পায়ে কাদায় হাঁটা একটা শিল্প, শিউলি সেই শিল্প জানে। পায়ের আঙুল মাটিতে গেঁথে রাখতে হয়, নইলে পিছলে যায়। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত কাদা লাগে, বাড়ি গিয়ে পুকুরে ধুয়ে ফেলে।

বই মাথার ওপরে ধরে হাঁটে। প্লাস্টিকের ব্যাগে বই, ব্যাগ মাথার ওপরে। দুই হাতে ধরে। নিজে ভিজে যায়, মাথা থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত, কিন্তু বই শুকনো।

এই দৃশ্য প্রতিদিনের। বর্ষাকালে প্রতিদিন। কেউ দেখে না, কারণ চরে সবাই একইরকম, সবার একই অবস্থা, সবাই ভেজে, সবাই কাদায় হাঁটে। এটা অসাধারণ না, এটা সাধারণ। দারিদ্র্যের মধ্যে অসাধারণ কিছু নেই, সব সাধারণ, সব প্রতিদিনের।

একদিন রাস্তায় একটা সাপ দেখেছিল শিউলি। পানিতে ভেসে আসছিল, বর্ষার পানিতে সাপ আসে, ব্যাঙ আসে, কেঁচো আসে। শিউলি থামেনি। সাপকে এড়িয়ে হেঁটে গেছে। চরের মেয়েরা সাপকে ভয় পায় না, কারণ সাপের চেয়ে বেশি ভয়ংকর জিনিস আছে। বন্যা আছে, নদীভাঙন আছে, দারিদ্র্য আছে। সাপ কামড়ালে ওষুধ আছে, দারিদ্র্যের কোনো ওষুধ নেই।

শিউলির বান্ধবী রিমা একদিন স্কুল ছেড়ে দিল। রিমার বাবা বলেছে, "মেয়ে আর পড়বে না। বাড়িতে কাজ করবে।" রিমা দশ বছর, চতুর্থ শ্রেণি। এখন মায়ের সাথে ধান সেদ্ধ করে, অন্যের বাড়িতে। শিউলি রিমাকে মিস করে। টিফিনে একসাথে বসত, পাতিলের ভাত ভাগ করে খেত। এখন শিউলি একা খায়।

শিউলি ভাবে, আমিও কি একদিন স্কুল ছেড়ে দেব? বাবা কি একদিন বলবে, "আর পড়তে হবে না"? শিউলি জানে না। কিন্তু যতদিন পড়তে পারে, পড়বে। যতদিন বই আছে, পড়বে। যতদিন প্লাস্টিকের ব্যাগ আছে, বই রক্ষা করবে।

শিউলির নানি বলে, "আমাদের সময় মেয়েরা স্কুলে যেত না। তোর মা-ও যায়নি। তুই যাচ্ছিস, এটা অনেক।" অনেক। নানির কাছে অনেক। শিউলির কাছেও অনেক, যদিও শিউলি জানে না কতটা অনেক। সে জানে না তিন প্রজন্ম আগে এই চরের কোনো মেয়ে অক্ষর চিনত না। সে জানে না সে প্রথম। প্রথম হওয়ার ভার সে বোঝে না এখনো। একদিন বুঝবে। একদিন গর্ব করবে।

কিন্তু আপাতত শিউলি শুধু ভেজে। আর বই রক্ষা করে।

শিউলির বাবা দিনমজুর। নদীতে মাছ ধরে, অন্যের জমিতে কাজ করে। মা ঘরে থাকে, ছোট ভাইকে দেখে, রান্না করে, পাড়ার বাড়িতে ধান সেদ্ধ করতে যায়। দুজনের আয়ে সংসার চলে, কোনোরকমে। ভাত হয়, তরকারি সবসময় না। মাছ মাঝে মাঝে, যেদিন বাবা ধরে আনে। মাংস ঈদে।

শিউলি স্কুলে যায় কারণ সরকারি স্কুলে খরচ নেই। বই ফ্রি। উপবৃত্তি পায় মেয়ে বলে, মাসে তিনশো টাকা। সেই তিনশো টাকা মা রাখে, শিউলির জন্য। খাতা কেনে, পেন্সিল কেনে। বাকিটা জমায়। কিসের জন্য জমায়? মা বলে, "তোর ভবিষ্যতের জন্য।" ভবিষ্যৎ কী, শিউলি জানে না। ভবিষ্যৎ মানে আগামীকাল, আগামীকাল মানে আবার স্কুল, আবার বৃষ্টি, আবার কাদা।

মতিন স্যার একদিন ক্লাসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোমরা বড় হয়ে কী হতে চাও?"

বাচ্চারা বলেছিল। ডাক্তার। ইঞ্জিনিয়ার। পাইলট। শিক্ষক। পুলিশ। চরের বাচ্চারাও স্বপ্ন দেখে, শহরের বাচ্চাদের মতোই। স্বপ্ন দেখতে টাকা লাগে না।

শিউলি বলেছিল, "একটা ছাতা চাই।"

ক্লাস হেসেছিল। মতিন স্যার হাসেননি।

"ছাতা কেন, শিউলি?"

"বৃষ্টিতে ভিজি। বই ভেজে। ছাতা থাকলে ভিজতাম না।"

"আর কিছু চাও?"

শিউলি ভেবেছিল। "একটা ব্যাগ। আসল স্কুলব্যাগ। জিপওয়ালা। যেটায় বই রাখলে ভিজবে না।"

পুতুল চায়নি। চকলেট চায়নি। ফোন চায়নি। টিভি চায়নি। একটা ছাতা আর একটা স্কুলব্যাগ। এই দুটো জিনিস যেটা শহরের যেকোনো বাচ্চার কাছে এত সাধারণ যে ভাবেও না, সেটাই শিউলির স্বপ্ন।

ছাতার দাম কত? বাজারে সস্তায় পাওয়া যায় একশো পঞ্চাশ টাকায়। একটু ভালোটা দুইশো। স্কুলব্যাগ তিনশো থেকে শুরু। মোট চারশো থেকে পাঁচশো টাকা। শিউলির বাবা দিনে দুইশো টাকা রোজগার করে, প্রতিদিন না, যেদিন কাজ পায় সেদিন। চারশো টাকা মানে দুদিনের রোজগার। দুদিনের রোজগার মানে দুদিন পরিবার খাবে না।

ছাতা কি খাবারের চেয়ে দামি? শিউলির বাবার কাছে না। শিউলির কাছে হয়তো হ্যাঁ, কিন্তু শিউলি সেটা বলে না। কারণ আট বছরের শিউলিও জানে খাবার আগে। সবকিছুর আগে খাবার। ছাতা পরে। স্বপ্ন পরে। সবকিছু পরে।

মতিন স্যার সেই রাতে বাড়িতে ফিরে ভেবেছিলেন শিউলির কথা। ভেবেছিলেন, একটা মেয়ে ছাতা চায়, পুতুল না, আর আমরা সেটাও দিতে পারি না। মতিন স্যারের বেতন মাসে আট হাজার টাকা। সরকারি না, এটা এনজিওর স্কুল, বেতন কম। মতিন স্যার নিজের পকেট থেকে চক কেনেন, মার্কার কেনেন, কখনো কখনো খাতা কেনেন দরিদ্র ছাত্রদের জন্য। কিন্তু সব ছাত্রকে ছাতা কিনে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না।

মতিন স্যার ভেবেছিলেন, একটা ছাতার দাম একশো পঞ্চাশ টাকা। একটা শিশুর স্বপ্নের দাম একশো পঞ্চাশ টাকা। এত সস্তা স্বপ্ন, অথচ এত দুর্লভ।

মতিন স্যার পরের সপ্তাহে একটা ছাতা কিনে এনেছিলেন। নিজের পকেট থেকে। কালো ছাতা, সাধারণ, একশো পঞ্চাশ টাকার। শিউলিকে দিয়েছিলেন। শিউলি ছাতা হাতে নিয়ে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ, যেন একটা মহাকাশযান পেয়েছে। তারপর বলেছিল, "স্যার, এটা আমার?"

"হ্যাঁ, তোমার।"

শিউলি সেই ছাতা নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল। ভিজেনি। প্রথমবার বর্ষায় ভিজেনি। বই ব্যাগে ছিল, ছাতা হাতে ছিল, দুই হাত মুক্ত ছিল না কারণ এক হাতে ছাতা ধরতে হচ্ছিল, কিন্তু তবু ভিজেনি। সেই না-ভেজাটা ছিল একটা বিপ্লব। ছোট্ট বিপ্লব। কিন্তু বিপ্লব।

ছাতা টিকল তিন মাস। তারপর ভাঙল। বর্ষার ঝড়ে। শিউলি ছাতা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করল, তার দিয়ে, কিন্তু আর খোলে না ঠিকমতো। ছাতা গেল। শিউলি আবার ভেজে। আবার প্লাস্টিকের ব্যাগে বই, মাথার ওপরে।

কিন্তু তিন মাস সে জেনেছে ছাতা কেমন লাগে। তিন মাস সে জেনেছে না-ভেজা কেমন। সেই জ্ঞান আর যায় না। সেই জ্ঞান ভেতরে থাকে, আর বলে: এটা সম্ভব। একটা ছাতা সম্ভব। একটা ভালো জীবন সম্ভব।

শিউলি একটা জিনিস জানে যেটা তার বয়সের অনেক বাচ্চা জানে না: জীবন কঠিন। এটা কেউ শেখায়নি। এটা সে দেখেছে। বাবাকে দেখেছে সারাদিন খাটতে, মাকে দেখেছে রান্না করতে একটুখানি চাল দিয়ে, দাদিকে দেখেছে অসুখে শুয়ে থাকতে ওষুধ ছাড়া। জীবন কঠিন, কিন্তু শিউলি জানে না এটা অন্যরকম হতে পারে। সে ভাবে সবার জীবন এরকম। সবাই কাদায় হাঁটে। সবাই ভেজে। সবাই প্লাস্টিকের ব্যাগে বই রাখে।

শিউলি ভুল ভাবে। কিন্তু এই ভুল তাকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ তুলনা না থাকলে কষ্টের বোধ কম থাকে। তুলনা এলে কষ্ট আসে। একদিন তুলনা আসবে, যখন শিউলি বড় হবে, শহরে যাবে, দেখবে অন্য বাচ্চাদের জীবন। তখন সে বুঝবে সে কতটা কম পেয়েছে। সেই বোধ তাকে রাগী করবে, নাকি শক্ত করবে, সেটা সময় বলবে।

আজ বৃষ্টি হচ্ছে।

শিউলি স্কুলে বসে আছে। টিনের চালে ঝমঝম শব্দ। মতিন স্যারের গলা শোনা যাচ্ছে না। বোর্ডে লেখা: "আমার দেশ বাংলাদেশ।" শিউলি খাতায় লিখছে, ছোট ছোট অক্ষরে, পাতা বাঁচিয়ে।

বৃষ্টি থামবে। স্কুল ছুটি হবে। শিউলি বই প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখবে। মাথার ওপরে ধরবে। এক কিলোমিটার হাঁটবে। কাদায়। খালি পায়ে। ভিজে।

বাড়ি গিয়ে পুকুরে পা ধোবে। জামা বদলাবে। ভেজা জামা শুকাতে দেবে দড়িতে। বই বের করবে ব্যাগ থেকে। বই শুকনো। শিউলি হাসবে। ছোট্ট হাসি। দাঁত দেখিয়ে। সামনের দুটো দাঁত পড়ে গেছে, নতুন আসছে। সেই ফাঁকা মুখের হাসি। সেই হাসি যেটা জয়ের পর আসে, ছোট জয়, কিন্তু জয়। বই বাঁচানোর জয়। জ্ঞান বাঁচানোর জয়। ভবিষ্যৎ বাঁচানোর জয়।

মা ভাত দেবে। শিউলি খাবে। তারপর পড়বে। হারিকেনের আলোতে, কারণ বিদ্যুৎ নেই চরে। হারিকেনের কাচ কালো, ধোঁয়ায় ময়লা হয়ে যায়, শিউলি মুছে পরিষ্কার করে। আলো কম, কিন্তু যথেষ্ট। শিউলির চোখ অভ্যস্ত। অন্ধকারে পড়তে পড়তে চোখ শিখে গেছে কম আলোতে দেখতে। দারিদ্র্য চোখকেও প্রশিক্ষণ দেয়।

রাতে শোয়ার আগে শিউলি বই গুছিয়ে রাখে। প্লাস্টিকের ব্যাগে। ব্যাগটা মাথার কাছে রাখে। যেন কাছে থাকে। যেন নিরাপদ থাকে।

ছোট ভাই সোহাগ পাশে ঘুমায়। পাঁচ বছর। সোহাগ স্কুলে যায় না এখনো। শিউলি সোহাগকে অক্ষর শেখায়, নিজে যা শেখে। "অ" তে অজগর। "আ" তে আম। সোহাগ মুখস্থ করে, ভুলে যায়, আবার শেখে। শিউলি ধৈর্য ধরে শেখায়। কারণ মতিন স্যার ধৈর্য ধরে শেখান, শিউলি সেটা দেখেছে।

মা বলে, "শিউলি, তুই এত পড়িস কেন? মেয়েমানুষের এত পড়ার কী আছে?" শিউলি উত্তর দেয় না। কারণ উত্তর দিলে মা বুঝবে না। মা পড়তে পারে না। মা স্কুলে যায়নি। মায়ের মা-ও যায়নি। শিউলি প্রথম, এই বংশে, যে স্কুলে যাচ্ছে। প্রথম মেয়ে। এটা ছোট কিছু না। এটা বিশাল। কিন্তু বিশাল জিনিসগুলো চরের জীবনে ছোট দেখায়, কারণ চরে সবকিছু ছোট। ঘর ছোট, স্বপ্ন ছোট, আয়ু ছোট।

শিউলি চোখ বন্ধ করে। কাল আবার স্কুল। কাল আবার বৃষ্টি হতে পারে। কাল আবার কাদায় হাঁটতে হবে। কিন্তু কাল আবার বই পড়াও হবে, অক্ষর শেখাও হবে, গণিতের অঙ্কও হবে।

শিউলির স্বপ্ন ছোট। একটা ছাতা। পুতুল না, ফোন না, সুন্দর জামা না। একটা ছাতা। যেটা ধরলে বৃষ্টি মাথায় পড়বে না। যেটা ধরলে বই মাথায় না রেখে ব্যাগে রাখা যাবে। যেটা ধরলে দুই হাত মুক্ত থাকবে। একটা ছাতা মানে দুটো মুক্ত হাত। দুটো মুক্ত হাত মানে আরো কিছু ধরতে পারা। আরো কিছু মানে হয়তো আরেকটা বই।

শিউলি ঘুমায়। ছোট্ট শরীর, পাতলা কাঁথা, মাটির ঘর, বাইরে বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। সেই শব্দ শিউলির ঘুমের সাথে মেশে। বৃষ্টি ঘুমপাড়ানি গান হয়ে যায়।

কাল সকালে উঠে শিউলি আবার প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে নেবে। আবার এক কিলোমিটার হাঁটবে। আবার ভিজবে।

কিন্তু বই শুকনো থাকবে।

প্লাস্টিকের ব্যাগে, পেঁয়াজের গন্ধ মাখা, একটু ছেঁড়া, কিন্তু এখনো কাজ করে। এই ব্যাগটাই শিউলির ছাতা। এই ব্যাগটাই শিউলির স্কুলব্যাগ। এই ব্যাগটাই শিউলির ভবিষ্যৎ।

একদিন হয়তো শিউলি একটা আসল ছাতা পাবে। হয়তো না। হয়তো ছাতা না পেয়েই সে বড় হবে, ভিজতে ভিজতে, শুকাতে শুকাতে, কাদায় হাঁটতে হাঁটতে। কিন্তু বই শুকনো থাকবে। বই সবসময় শুকনো থাকবে। কারণ শিউলি সেটা নিশ্চিত করবে। নিজে ভিজে হলেও।

শিউলি জানে না ছাতার ইংরেজি কী। Umbrella। সে এই শব্দটা শেখেনি এখনো। কিন্তু একদিন শিখবে। একদিন সে অনেক কিছু শিখবে যেটা এখন জানে না। একদিন হয়তো জানবে পৃথিবীতে এমন জায়গা আছে যেখানে সব বাচ্চার ছাতা আছে, ব্যাগ আছে, জুতো আছে। সেই জ্ঞানটা তাকে কষ্ট দেবে, নাকি আশা দেবে, এখনো বলা যায় না। তবে শিউলি ছোট, শিউলি এখনো তুলনা করতে শেখেনি। সে জানে না অন্য বাচ্চারা কেমন থাকে। সে জানে শুধু নিজের জীবন। সেই জীবনে বৃষ্টি আছে, কাদা আছে, আধা ইঞ্চি পেন্সিল আছে, আর একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ আছে।

এটুকুই তার পৃথিবী। এটুকু নিয়েই সে প্রতিদিন স্কুলে যায়। এটুকু নিয়েই সে প্রতিদিন বাড়ি ফেরে। এটুকু নিয়েই সে স্বপ্ন দেখে।

একটা ছাতা।

এটুকুই যথেষ্ট। আপাতত এটুকুই।

বাইরে বৃষ্টি। টিনের চালে। চরের রাতে।

বাবা বারান্দায় বসে আছে। জাল সেলাই করছে। কাল নদীতে যাবে। মা রান্নাঘরে, কালকের ভাতের চাল ধুচ্ছে। সোহাগ ঘুমাচ্ছে শিউলির পাশে, মুখে আঙুল দিয়ে। সাধারণ রাত। চরের সাধারণ রাত। কোটি কোটি এরকম রাত আছে বাংলাদেশে, যেখানে ছোট ছোট মেয়েরা ঘুমায় ছোট ছোট ঘরে, মাথার কাছে বই, স্বপ্নে একটা ছাতা।

আট বছরের একটা মেয়ে ঘুমাচ্ছে, মাথার কাছে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ, ব্যাগের ভেতর তিনটা বই, বইয়ের ভেতর অক্ষর, অক্ষরের ভেতর একটা পৃথিবী যেটা শিউলি এখনো দেখেনি কিন্তু দেখবে। একদিন দেখবে।