মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে
এই কাগজটা ভাত দেয় না। কিন্তু এটা আমার গর্ব।
১
টিনের বাক্সটা লাভলী বিছানার নিচে রাখে।
বাক্সটা পুরোনো। ডালডার টিনের তৈরি। বাবা একবার বলেছিল, "এই ডালডার টিনে তোর মায়ের গয়না রাখা ছিল। গয়না বিক্রি হয়ে গেছে, টিনটা থেকে গেছে।" লাভলী জিজ্ঞেস করেনি গয়না কেন বিক্রি হলো। জানত। সংসার। অসুখ। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা। যে কারণেই হোক, গয়না গেছে, টিন রয়ে গেছে। এখন সেই টিনে একটা কাগজ। একটাই মাত্র কাগজ।
মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র।
লাভলী মাঝে মাঝে বাক্সটা খোলে। কাগজটা বের করে। ভাঁজ খোলে। পড়ে। যদিও মুখস্থ জানে। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন, নিচের সিল, তারিখ, সই। কাগজটা হলুদ হয়ে গেছে। কিনারায় একটু ছিঁড়ে গেছে। কিন্তু শব্দগুলো আছে। শব্দ মরে না। শব্দ হলুদ হয়, কিন্তু মরে না।
বাবা আবদুল করিম যুদ্ধ করেছিল। একাত্তরে। সেক্টর ইলেভেন। সিলেটের কোনো এক গ্রাম থেকে হেঁটে গিয়েছিল সীমান্তে। তখন বাবার বয়স আঠারো। না, সতেরো। বাবা বয়স বাড়িয়ে বলেছিল আঠারো। সতেরো বছরের ছেলে রাইফেল ধরেছিল। রাইফেলের ওজন জানত না। যুদ্ধের মানে জানত না। শুধু জানত দেশকে মুক্ত করতে হবে। এই একটা কথা।
লাভলী বাবার মুখে গল্প শুনেছে। বারবার শুনেছে। বাবা বলতে ভালোবাসত। রাতে খাওয়ার পরে, উঠানে বসে, আকাশের তারা দেখতে দেখতে। "আমরা রাতে হাঁটতাম। দিনে লুকিয়ে থাকতাম। ভাত পেতাম না। কাঁচা আলু খেতাম। নদী সাঁতরে পার হতাম।" বাবার চোখ তখন অন্যরকম হতো। দূরে তাকাত। যেন দেখছে সেই নদী, সেই রাত, সেই আলু।
লাভলী ছোটবেলায় গর্ব করত। স্কুলে বলত, "আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা।" সবাই বলত, "ওহ।" কেউ কেউ বলত, "আমার বাবাও।" কিন্তু লাভলীর বাবার মতো কারো বাবা ছিল না। কারণ লাভলীর বাবা গল্প বলত। গল্প বলা মানে মনে রাখা। মনে রাখা মানে বেঁচে থাকা। যুদ্ধটা বাবার ভেতরে বেঁচে ছিল। প্রতিটা রাতে, প্রতিটা গল্পে, প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসে।
২
বাবা জমি পায়নি।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জমি বরাদ্দ ছিল। তালিকা ছিল। নীতিমালা ছিল। কিন্তু কাগজে যা থাকে, মাটিতে তা পৌঁছায় না। বাবা আবেদন করেছিল। ফরম পূরণ করেছিল। লাইনে দাঁড়িয়েছিল। অফিসে গিয়েছিল। বারবার গিয়েছিল। প্রতিবার একই উত্তর: "পরে আসেন।" "ফাইল প্রসেস হচ্ছে।" "উপরে পাঠানো হয়েছে।"
উপরে মানে কোথায়? বাবা জানত না। লাভলীও জানে না। "উপরে" একটা জায়গা যেখানে কাগজ যায় কিন্তু ফিরে আসে না। "উপরে" একটা শূন্যতা। ব্ল্যাকহোলের মতো। সব গিলে খায়, কিছু বের হয় না।
বাবা পেনশনও পায়নি। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, যেটার কথা বলা হয়, সেটা বাবার নামে কখনো আসেনি। তালিকায় নাম ছিল, কিন্তু ব্যাংকে টাকা আসেনি। বাবা ব্যাংকে গিয়ে জিজ্ঞেস করত, "আমার টাকা কই?" ব্যাংকের লোক কম্পিউটারে দেখত, মাথা নাড়ত, "আসেনি তো।" বাবা ফিরে আসত। খালি হাতে। খালি পায়ে। কারণ জুতোটাও পুরোনো হয়ে গিয়েছিল। নতুন জুতো কেনার টাকা ছিল না।
লাভলী দেখেছে বাবাকে। ষাট বছর বয়সে ভ্যান চালাতে দেখেছে। মুক্তিযোদ্ধা, যে মানুষটা রাইফেল চালিয়েছে, সে ভ্যান চালাচ্ছে। লাভলীর ভেতরে একটা কিছু ভেঙে গিয়েছিল সেদিন। সেটা কী, সে আজও ঠিক বলতে পারে না। ক্রোধ? দুঃখ? লজ্জা? না। লজ্জা নয়। বাবার জন্য কোনো লজ্জা নেই। লজ্জা দেশের। লজ্জা ব্যবস্থার। লজ্জা সেই "উপরে"-র, যেখানে কাগজ গেছে কিন্তু ফেরেনি।
বাবা মারা গেছে। তিন বছর হলো। কিডনি। ডায়ালাইসিসের টাকা ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফ্রি চিকিৎসার কথা বলা হয়। বাবা হাসপাতালে গিয়েছিল। "মুক্তিযোদ্ধার কার্ড দেখান।" বাবা দেখিয়েছিল। "এই কার্ড পুরোনো। নতুন কার্ড করান।" নতুন কার্ড করতে গেলে আবার সেই লাইন, সেই অফিস, সেই "উপরে পাঠানো হয়েছে।" বাবা কার্ড করার আগেই মারা গেল।
৩
লাভলী এখন পঞ্চাশ।
চুলে পাক ধরেছে। হাঁটুতে ব্যথা। চোখে চশমা লাগে। বাবার মেয়ে, কিন্তু বাবার কাছ থেকে কিছু পায়নি। জমি নেই, পেনশন নেই, চিকিৎসা নেই। শুধু সনদপত্র আছে। একটা হলুদ কাগজ, একটা ডালডার টিনে।
লাভলী নিজে কাজ করে। একটা প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক্ষক। বেতন সতেরো হাজার টাকা। দুই ছেলেমেয়ে। স্বামী রিকশা চালায়। সংসার চলে, কিন্তু দৌড়ায় না। হাঁটে। ধীরে ধীরে হাঁটে। কখনো কখনো হোঁচট খায়।
মানুষ জিজ্ঞেস করে, "তোমার বাবা তো মুক্তিযোদ্ধা ছিল। তুমি তো সুবিধা পাওয়ার কথা।" লাভলী হাসে। সেই হাসি যেটা হাসি নয়। সেটা একটা ঢাল। সেটা দিয়ে সে প্রশ্নকে আটকায়। উত্তর দেওয়ার শক্তি নেই। কারণ উত্তরটা এত দীর্ঘ, এত জটিল, এত ক্লান্তিকর, যে শুধু হাসাটাই সহজ।
বাবা দেশের জন্য লড়েছেন। দেশ বাবার জন্য কিছু করেনি।
এই বাক্যটা লাভলী মনে মনে বলে। জোরে বলে না। জোরে বললে মানুষ বলবে, "রাজনীতি করো?" লাভলী রাজনীতি করে না। লাভলী শুধু সত্যি বলে। কিন্তু এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের সত্যি বলা মানে রাজনীতি। ইতিহাস বলা মানে রাজনীতি। ক্ষোভ প্রকাশ করা মানে রাজনীতি। তাই লাভলী চুপ থাকে।
৪
রাতে লাভলী বাক্সটা খোলে।
ছেলেমেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। স্বামী এখনো ফেরেনি, রাতের ভাড়া। ঘরে লাভলী একা। বিছানার নিচ থেকে বাক্সটা টানে। ভেতরে সনদপত্র। পাশে একটা ছবি। বাবার ছবি। সাদাকালো। বাবা তরুণ, চোখে আগুন, হাতে কিছু নেই কিন্তু চোখে সবকিছু আছে।
লাভলী ছবিটা দেখে। বাবার চোখের দিকে তাকায়। সেই চোখে কী ছিল? স্বপ্ন ছিল। একটা স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। একটা ন্যায্য দেশের স্বপ্ন। যেখানে মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে। যেখানে যুদ্ধ করলে সম্মান পাবে। যেখানে সনদপত্র শুধু কাগজ থাকবে না, সেটা একটা দরজা হবে, সম্মানের দিকে, সুযোগের দিকে।
সেই দরজা কখনো খোলেনি।
লাভলী কাগজটা ভাঁজ করে রাখে। টিনের ঢাকনা বন্ধ করে। বিছানার নিচে ঠেলে দেয়। কাল আবার সকালে উঠতে হবে। স্কুলে যেতে হবে। ক্লাস নিতে হবে। বাচ্চাদের পড়াতে হবে। "বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালে হয়। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য লড়েছেন। তাদের ত্যাগ আমাদের গর্ব।"
লাভলী এই লাইনগুলো পড়ায়। পাঠ্যবইয়ের লাইন। গর্বের লাইন। কিন্তু যখন পড়ায়, গলায় একটা কাঁটা বিঁধে। কারণ লাভলী জানে গর্বের পেছনে কী আছে। গর্বের পেছনে ভ্যান আছে। পেনশনহীন বুড়ো বয়স আছে। ডায়ালাইসিসের টাকা নেই এমন মৃত্যু আছে। ডালডার টিনে রাখা একটা কাগজ আছে যেটা ভাত দেয় না।
৫
লাভলীর ছেলে সুমন। বয়স চৌদ্দ। ক্লাস এইটে পড়ে।
সুমন একদিন জিজ্ঞেস করল, "আম্মা, নানা কেমন মানুষ ছিল?"
লাভলী থামল। কী বলবে? বলবে, তোর নানা বীর ছিল? হ্যাঁ, ছিল। বলবে, তোর নানা গরীব ছিল? হ্যাঁ, ছিল। বলবে, তোর নানা অবহেলিত ছিল? হ্যাঁ, ছিল। একই মানুষ বীর, গরীব, আর অবহেলিত। একসাথে তিনটা। এটা কীভাবে সম্ভব? এটা সম্ভব এই দেশে। এই দেশে বীর হওয়া আর গরীব হওয়া পরস্পরবিরোধী নয়।
"তোর নানা ভালো মানুষ ছিল।"
এটুকুই বলল। বাকিটা বলল না। বাকিটা বলতে গেলে কান্না আসবে। কান্না এলে সুমন ভয় পাবে। মায়ের কান্না ছেলে সহ্য করতে পারে না। তাই মা কান্না চেপে রাখে। মায়ের আরেকটা মিথ্যা। আরেকটা পবিত্র মিথ্যা।
রাত গভীর। লাভলী ঘুমায় না।
ভাবে, বাবা কি ভুল করেছিল? যুদ্ধে যাওয়া কি ভুল ছিল? না। কখনো না। যুদ্ধে যাওয়া সঠিক ছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছে। পতাকা আছে। জাতীয় সংগীত আছে। মানচিত্র আছে। এগুলো বাবার রক্তে কেনা। কিন্তু বাবা নিজে কিছু কিনতে পারেনি। বাবার রক্তে দেশের দাম শোধ হয়েছে, কিন্তু দেশ বাবার দাম শোধ করেনি।
এই কাগজটা ভাত দেয় না। কিন্তু এটা আমার গর্ব।
লাভলী এটা জানে। এটা বুঝে। এটা মানে। কারণ গর্ব ছাড়া আর কিছু নেই। জমি নেই, পেনশন নেই, সুবিধা নেই। শুধু একটা হলুদ কাগজ। আর সেই কাগজের ভেতরে একটা মানুষের নাম। আবদুল করিম। মুক্তিযোদ্ধা। বাবা।
লাভলী বাক্সটা বুকে ধরে শোয়। ঠান্ডা টিন। ভেতরে উষ্ণ কাগজ। সেই কাগজে একটা দেশের ঋণ লেখা আছে যেটা কোনোদিন শোধ হবে না।
ঘুম আসে। ঘুমের ভেতরেও বাবা যুদ্ধ করে। আর লাভলী দেখে। দূর থেকে। পঞ্চাশ বছর পরের দূর থেকে।