গ্রামের ডাক্তার
আমাকে প্রমাণ করতে ৫ বছর লেগেছে। একজন পুরুষ ডাক্তারের ৫ দিন লাগতো।
১
রওশন আরা সকাল ছয়টায় ওঠে।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের হোস্টেলে এর চেয়ে দেরিতে উঠত। কিন্তু গ্রামে ছয়টা মানে ইতিমধ্যে দেরি। রোগী আসতে শুরু করে সাড়ে ছয়টায়। কেউ কেউ আরো আগে এসে বসে থাকে, চেম্বারের বাইরে, বারান্দায়, মাটিতে বসে। তারা অপেক্ষা করতে জানে। গ্রামের মানুষ অপেক্ষার শিল্পী। ফসলের জন্য অপেক্ষা, বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা, ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা।
রওশন আরার চেম্বার একটা টিনের ঘর। আগে এটা ছিল তার বাবার মুদি দোকান। বাবা দোকান গুটিয়ে দিয়ে বলেছিল, "তুই ডাক্তার হয়েছিস, ডাক্তারি কর। আমি আরেকটা জায়গায় দোকান দেব।" বাবা আরেকটা জায়গা পায়নি। দোকানও আর দেয়নি। নিজের মেয়ের চেম্বারের জন্য দোকান ছেড়ে দেওয়া, এটা বাবার গর্ব। নিজের ক্ষতি, কিন্তু গর্ব। বাংলাদেশের বাবারা এরকম। নিজে কমে গিয়ে সন্তানকে বাড়ান।
চেম্বারে একটা টেবিল। একটা চেয়ার। দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার রোগীর জন্য। দেয়ালে এমবিবিএস-এর সার্টিফিকেট। পাশে স্টেথোস্কোপ ঝোলানো। একটা বিপি মেশিন। একটা থার্মোমিটার। একটা ওজন মাপার যন্ত্র। এটুকুই। ঢাকার ক্লিনিকে যেসব মেশিন থাকে, সিটি স্ক্যান, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, সেসব এখানে নেই। রওশন আরা হাত দিয়ে পেট টিপে বোঝে। চোখ দেখে বোঝে। জিহ্বা দেখে বোঝে। শরীরের রঙ, নখের রঙ, চোখের নিচের কালি। এগুলো যন্ত্রের আগে আসে। যন্ত্র থাকলে ভালো, না থাকলে শরীর নিজেই যন্ত্র। ময়মনসিংহ মেডিকেলের প্রফেসর করিম স্যার শিখিয়েছিলেন: "মেশিন দিয়ে যেকোনো ডাক্তার রোগ ধরতে পারে। হাত দিয়ে ধরতে পারাটাই আসল।"
রওশন আরা হাত দিয়ে ধরে।
২
ঢাকায় থাকতে পারত।
ব্যাচের সবাই ঢাকায় গেছে। কেউ মোহাম্মদপুরে চেম্বার খুলেছে, কেউ ধানমন্ডিতে, কেউ গুলশানে। ফি পাঁচশো টাকা, হাজার টাকা, কেউ কেউ দুই হাজার। রোগী আসে গাড়ি করে। এসি চেম্বার। রিসেপশনিস্ট। অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম। সবকিছু গুছানো, পরিষ্কার, পেশাদার।
রওশন আরার ফি পঞ্চাশ টাকা। কখনো কখনো শূন্য। কখনো কখনো রোগী টাকার বদলে চাল দেয়। একবার একজন মুরগি দিয়ে গিয়েছিল। রওশন আরা ফেরত দিতে পারেনি। মুরগি ফেরত দেওয়া মানে অপমান করা। গ্রামে এটা বোঝা দরকার।
ঢাকায় এক লাখ ডাক্তার। আমার গ্রামে শূন্য ছিল।
এই একটা লাইন। এই একটা কারণ। রওশন আরা যখন গ্রামে ফিরে এলো, সবাই অবাক হয়েছিল। মা কেঁদেছিল, কিন্তু সেটা আনন্দের কান্না নয়। সেটা ভয়ের কান্না। "তুই এখানে থেকে কী করবি? ঢাকায় থাক, ভালো প্র্যাকটিস হবে, ভালো বিয়ে হবে।" রওশন আরা বলেছিল, "আম্মা, ভালো প্র্যাকটিস মানে কী? যেখানে মানুষ মরছে ডাক্তার ছাড়া, সেখানে দাঁড়ানো মানেই ভালো প্র্যাকটিস।"
মা বোঝেনি। গ্রামের কেউ বোঝেনি। তারা ভেবেছিল রওশন আরা ঢাকায় টিকতে পারেনি, তাই ফিরে এসেছে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। কে বিশ্বাস করবে যে একজন এমবিবিএস ডাক্তার স্বেচ্ছায় গ্রামে থাকতে চায়? কেউ না। কারণ এই দেশে "উন্নতি" মানে ঢাকায় যাওয়া। "সফলতা" মানে শহরে থাকা। গ্রামে থাকা মানে পিছিয়ে পড়া। রওশন আরা এই সংজ্ঞা মানে না। কিন্তু সংজ্ঞা না মানলেও সংজ্ঞা তাকে মাপে।
৩
প্রথম বছর সবচেয়ে কঠিন ছিল।
পুরুষ রোগীরা আসত না। "মেয়ে ডাক্তারের কাছে যাবো না।" এটা তারা সরাসরি বলত। লজ্জা ছিল না বলতে। কারণ তাদের কাছে এটা স্বাভাবিক। মেয়ে ডাক্তার মানে মেয়ে। ডাক্তার অংশটা গৌণ, মেয়ে অংশটা প্রধান। তারা বিশ্বাস করত না যে একটা মেয়ে তাদের বুকে ব্যথার কারণ বলতে পারবে। পেটের অসুখ ধরতে পারবে। জ্বরের ওষুধ দিতে পারবে। যেন ওষুধের কার্যকারিতা ডাক্তারের লিঙ্গের ওপর নির্ভর করে।
রওশন আরা তবু বসে থাকত। চেম্বারে একা। সকাল থেকে দুপুর। দুপুর থেকে সন্ধ্যা। কখনো একজনও আসত না। সেইদিনগুলোতে সে বই পড়ত। মেডিকেল জার্নাল। ল্যানসেট, বিএমজে, যেগুলোর পিডিএফ ফোনে ডাউনলোড করে রাখত। গ্রামে বসে আন্তর্জাতিক জার্নাল পড়া, এটা একটা বিদ্রোহ। নিঃশব্দ বিদ্রোহ।
মেয়ে রোগীরা আসত। তারা আসত লুকিয়ে। স্বামীকে না জানিয়ে। শাশুড়িকে না জানিয়ে। কারণ অনেক ঘরে মেয়েদের ডাক্তার দেখানো "অপ্রয়োজনীয়।" "মেয়েদের কী হয়? একটু জ্বর, সেরে যাবে।" কিন্তু সেই "একটু জ্বর" কখনো টাইফয়েড, কখনো ডেঙ্গু, কখনো ইউটিআই যেটা কিডনিতে চলে গেছে। রওশন আরা দেখত, চিকিৎসা দিত, কিন্তু মনে একটা ক্রোধ জমত। এই ক্রোধ সেই মেয়েদের প্রতি নয়। এই ক্রোধ সেই ব্যবস্থার প্রতি যেটা মেয়েদের শরীরকে গুরুত্বহীন মনে করে।
৪
মোড় ঘুরল করিম চাচার সাথে।
করিম চাচা গ্রামের প্রভাবশালী মানুষ। বয়স সত্তরের কাছে। একদিন রাত দুটোয় লাভলী, করিম চাচার ছেলে, দৌড়ে এলো। "আপা, বাবার বুকে ব্যথা। শ্বাস নিতে পারছে না।" রওশন আরা গেল। হাতে শুধু স্টেথোস্কোপ আর বিপি মেশিন। দেখল, বুঝল। সম্ভবত এনজাইনা। নাইট্রোগ্লিসারিন দিল জিভের নিচে। অক্সিজেনের ব্যবস্থা করল যেটুকু সম্ভব। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে পাঠানোর ব্যবস্থা করল। করিম চাচা বাঁচল।
পরেরদিন থেকে পুরুষ রোগী আসতে শুরু করল। করিম চাচা নিজে বলেছিল, "আমার জান বাঁচাইছে ওই মেয়ে। তোরা যাইতে চাস না? যা, গিয়ে দেখা।" গ্রামে প্রভাবশালী মানুষের কথা ধর্মগ্রন্থের মতো। করিম চাচা বললে সবাই যায়।
কিন্তু রওশন আরা জানে, এটা তার যোগ্যতার স্বীকৃতি নয়। এটা করিম চাচার অনুমোদন। একজন পুরুষের সার্টিফিকেট, তার এমবিবিএস-এর চেয়ে বেশি ওজন রাখে এই গ্রামে। এটা তিক্ত সত্য। রওশন আরা এটা গিলে নেয়। কারণ তিক্ত সত্য গিলতে না পারলে গ্রামে ডাক্তারি করা যায় না।
আমাকে প্রমাণ করতে পাঁচ বছর লেগেছে। একজন পুরুষ ডাক্তারের পাঁচ দিন লাগতো।
৫
পাঁচ বছর পরে রওশন আরা এখন গ্রামের মানুষ।
শুধু ডাক্তার নয়। মানুষ। মানে, তারা এখন তাকে ডাকে শুধু অসুখে নয়। বিয়েতে ডাকে। ঈদে ডাকে। কারো ছেলেমেয়ের পরীক্ষার আগে ডাকে, "একটু দোয়া করেন।" রওশন আরা ডাক্তার, দোয়া করা তার কাজ নয়, কিন্তু সে করে। কারণ গ্রামে ডাক্তার আর মানুষের মধ্যে দেয়াল নেই। শহরে আছে। শহরে ডাক্তার একটা পদবি। গ্রামে ডাক্তার একটা সম্পর্ক।
রওশন আরার বিয়ে হয়নি। বয়স পঁয়ত্রিশ। মা প্রতি মাসে বলে, "তোর বিয়ের কী হবে?" রওশন আরা বলে, "আম্মা, আমি ব্যস্ত।" মা বলে, "ব্যস্ততা তো সারাজীবন থাকবে। বিয়ে না করলে বুড়ো বয়সে কে দেখবে?" রওশন আরা উত্তর দেয় না। কারণ উত্তরটা মা শুনতে চায় না। উত্তরটা হলো: আমি নিজেকে দেখব। যেমন এতদিন দেখেছি।
রাতে চেম্বার বন্ধ করে বাড়ি ফেরে। রাস্তায় অন্ধকার। টর্চ জ্বালিয়ে হাঁটে। মাঝে মাঝে কেউ ডাকে, "আপা, একটু দাঁড়ান, আম্মার পেটে ব্যথা।" রওশন আরা দাঁড়ায়। যায়। দেখে। ওষুধ দেয়। ফেরে। আবার হাঁটে। আবার কেউ ডাকে। রাস্তাটা ক্লিনিকের এক্সটেনশন। গ্রামের পুরোটাই তার চেম্বার। দেয়াল নেই। ছাদ নেই। শুধু মানুষ আর তাদের শরীর।
ঘরে ফিরে ভাত খায়। একা। চুলার আগুন নিজে জ্বালায়। তরকারি নিজে রাঁধে। থালা নিজে ধোয়। ডাক্তার রাতে বাড়িতে রান্না করে, থালা ধোয়। কেউ দেখে না। কেউ জানে না। এটাও একটা সত্য যেটা কেউ বলে না।
রওশন আরা ঘুমানোর আগে ভাবে: কাল সকালে কারা আসবে? সাতটায় সেই বুড়ো মানুষটা আসবে যার ডায়াবেটিস, সুগার মাপতে হবে। আটটায় সেই গর্ভবতী মেয়েটা আসবে যার প্রথম বাচ্চা, ভয় পাচ্ছে। নয়টায় সেই বাচ্চাটা আসবে যার কানে পুঁজ।
ঢাকায় থাকলে কী হতো? বেশি টাকা হতো। এসি চেম্বার হতো। গাড়ি হতো। কিন্তু রাত দুটোয় কেউ দৌড়ে আসত না। "আপা, বাবা মরে যাচ্ছে।" আর রওশন আরা দৌড়ে যেত না। আর বাবা বাঁচত না। সেই বাঁচানো, সেটার কোনো দাম নেই টাকায়। সেটার দাম শুধু রওশন আরা জানে। রাতে, একা, ভাত খেতে খেতে।