মেয়ে মেধাবী

একটা রেজাল্ট বাবার মন বদলে দিয়েছে। কিন্তু মা এর আগেই বদলে ছিলেন।

পর্ব ৮৮ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রেজাল্ট বের হলো সকাল দশটায়।

ঐশী ফোনে দেখল। হাত কাঁপছিল। স্ক্রিনে অক্ষরগুলো নাচছিল, চোখে পানি এসে গিয়েছিল দেখার আগেই। কারণ ঐশী জানত এটা আসবে। জানত GPA 5.00 আসবে। কিন্তু জানা আর দেখা এক কথা নয়। জানা মাথায় থাকে, দেখা বুকে আসে।

GPA 5.00। বোর্ডে তৃতীয়।

ঐশী প্রথমে মাকে ডাকল। "আম্মা!" একটাই শব্দ। মা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলো। ঐশীর মুখ দেখে বুঝে গেল। মা ঐশীকে জড়িয়ে ধরল। কোনো কথা নেই। শুধু জড়িয়ে ধরা। মায়ের হাত ঐশীর পিঠে, ঐশীর মাথায়, ঐশীর চুলে। মা কাঁদছিল। ঐশী কাঁদছিল। দুজনেই কাঁদছিল, কিন্তু কান্নাটা সুখের। সেই সুখ যেটা ব্যথার পর আসে। দীর্ঘ, নিঃশব্দ ব্যথার পর।

বাবা তখন বাজারে। বাবাকে ফোন করল মা। "তোমার মেয়ে GPA 5 পেয়েছে। বোর্ডে থার্ড।" বাবা কী বলল, ঐশী শুনতে পায়নি। মা ফোন রাখল। মুখটা অদ্ভুত ছিল। একটু হাসি, একটু তিক্ততা, একটু ক্লান্তি। ঐশী জিজ্ঞেস করল, "বাবা কী বলল?" মা বলল, "খুশি হয়েছে।"

মা মিথ্যা বলেছে কিনা, ঐশী জানে না। মায়ের মুখ দেখে মনে হলো মিথ্যা। কিন্তু কিছু বলল না। কিছু সত্য প্রমাণ করার চেয়ে না জানাই ভালো।

বাবা রহমত আলী রিকশা চালায়।

সারাদিন রিকশা চালায়। সকালে বের হয়, রাতে ফেরে। পিঠ ঝুঁকে গেছে। হাতের তালুতে কড়া পড়ে গেছে। বয়স পঁয়তাল্লিশ, কিন্তু দেখতে ষাটের মতো। রিকশা এভাবে বুড়ো করে। রিকশা শুধু যাত্রী বহন করে না, চালকের জীবনও বহন করে, আর সেই ভারে চালকের পিঠ ভাঙে।

বাবা চায়নি ঐশী পড়ুক। না, সেটা ঠিক না। বাবা চেয়েছিল ঐশী পড়ুক, কিন্তু একটা সীমা পর্যন্ত। এসএসসি পাস করলেই যথেষ্ট। মেয়ে, পড়ে কী করবে? বিয়ে দিতে হবে। পড়ালেখায় টাকা খরচ করে কী হবে? বিয়েতে টাকা লাগবে।

"মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে? বিয়ে দিই।"

বাবা এটা বলেছিল সেই রাতে যেদিন ঐশী বলেছিল BUET-এ পড়তে চায়। ঐশী HSC-র জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন। বাবা জানত ঐশী ভালো পড়ে। কিন্তু ভালো পড়া আর BUET, এটা দুটো আলাদা জিনিস। BUET মানে কোচিং। কোচিং মানে টাকা। টাকা মানে যেটা নেই।

ঐশী সেই রাতে কাঁদেনি। কাঁদলে বাবা বলত, "দেখ, মেয়েরা এরকমই, কান্না ছাড়া কিছু পারে না।" ঐশী কান্না চেপে রাখল। বালিশে মুখ গুঁজে রাখল। চোখ থেকে পানি গড়াল, কিন্তু শব্দ হলো না। নিঃশব্দ কান্না, এটা মেয়েরা শেখে। কেউ শেখায় না, নিজে থেকেই শেখে।

মা রেহানা বেগম। গৃহিণী।

গৃহিণী মানে সবকিছু করে কিন্তু কোনো কিছুর নাম নেই। রান্না করে, কাপড় ধোয়, ঘর মোছে, সবাইকে খাওয়ায়, সবার পরে খায়। এটা কাজ নয়, এটা "দায়িত্ব।" কাজের বেতন হয়, দায়িত্বের হয় না।

রেহানা বেগম একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গোপনে। কাউকে না জানিয়ে।

পাড়ায় পাড়ায় মেয়েদের কাপড় সেলাই করে রেহানা বেগম। স্বামী জানে না। স্বামী ভাবে রেহানা সারাদিন ঘরে থাকে। কিন্তু রেহানা দুপুরে, যখন স্বামী রিকশায়, তখন সেলাই করে। একটা পুরোনো সিঙ্গার মেশিন। পায়ে চাপ দিয়ে চালায়। একটা সালোয়ার কামিজ সেলাই করলে একশো পঞ্চাশ টাকা পায়। একটা ব্লাউজে আশি। একটা থ্রি-পিসে দুইশো।

টাকাটা রেহানা বেগম রাখে চালের ড্রামের তলায়। একটা পলিথিনে মুড়িয়ে। কেউ জানে না। স্বামী জানে না। মেয়ে জানে না। ছেলে জানে না। এটা রেহানার গোপন কোষাগার। এটা ঐশীর কোচিংয়ের টাকা।

তিন বছর ধরে জমিয়েছে। একশো পঞ্চাশ, একশো পঞ্চাশ, আশি, দুইশো। টাকায় টাকায়। সুইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে। প্রতিটা ফোঁড় একটা স্বপ্নের দিকে। সেই স্বপ্ন রেহানার নিজের নয়। সেই স্বপ্ন ঐশীর। কিন্তু মায়ের কাছে মেয়ের স্বপ্ন নিজের স্বপ্নের চেয়ে বড়।

ঐশী BUET ভর্তি পরীক্ষায় বসল।

কোচিংয়ের টাকা দিয়েছে মা। ঐশী জিজ্ঞেস করেছিল, "আম্মা, টাকা কোথা থেকে?" মা বলেছিল, "আমার জমানো।" ঐশী আর জিজ্ঞেস করেনি। কারণ মায়ের "জমানো" মানে কী, সেটা ঐশী বোঝে। সেটা মানে মায়ের না খাওয়া। মায়ের না কেনা। মায়ের নিজের জন্য কিছু না রাখা।

বাবা জানত না ঐশী কোচিং করছে। ঐশী বলেছিল বান্ধবীর বাড়িতে পড়তে যাচ্ছে। আরেকটা মিথ্যা। আরেকটা মেয়ের মিথ্যা। এই দেশে মেয়েদের স্বপ্ন পূরণ করতে মিথ্যা বলতে হয়। সরাসরি বলা যায় না। কারণ সরাসরি বললে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ঘুরপথে যেতে হয়। পেছনের দরজা দিয়ে। জানালা দিয়ে। যেকোনো ফাঁক দিয়ে।

পরীক্ষা দিল। ফল বের হলো। ঐশী চান্স পেয়েছে। BUET। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং।

সেই সন্ধ্যায় বাবাকে বলল মা। "তোমার মেয়ে BUET-এ চান্স পেয়েছে।"

বাবা চুপ করে ছিল। এক মিনিট। দুই মিনিট। ঐশী ভেবেছিল বাবা রাগ করবে। চিৎকার করবে। বলবে, "আমাকে না জানিয়ে কোচিং করেছিস?" কিন্তু বাবা কিছু বলল না। বাবা ঐশীর দিকে তাকাল। তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে গেল। বাইরে গেল। দশ মিনিট পরে ফিরে এলো।

বাবার চোখ লাল ছিল।

পরেরদিন থেকে বাবা বদলে গেল।

পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বলে বেড়ায়, "আমার মেয়ে BUET-এ পড়ে।" চায়ের দোকানে বসে বলে। রিকশা চালাতে চালাতে যাত্রীকে বলে। ফোনে দূরের আত্মীয়দের বলে। যে মানুষটা বলেছিল "মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে?", সেই মানুষটা এখন বলে "আমার মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে।" একই শব্দ। একই বাক্য। কিন্তু স্বর বদলে গেছে। প্রশ্ন থেকে গর্বে বদলে গেছে।

ঐশী দেখে। বাবার এই বদল দেখে। মুখে হাসে। ভেতরে কিছু একটা খচখচ করে। কারণ এই বদল আসতে একটা রেজাল্ট লেগেছে। একটা BUET-এর সিল লেগেছে। এর আগে ঐশী সেই মেয়েই ছিল, একই মেধা, একই পরিশ্রম, একই স্বপ্ন। কিন্তু তখন বাবার চোখে সে ছিল "মেয়ে।" এখন সে "BUET-এর ছাত্রী।" পরিচয় বদলেছে। মানুষ বদলায়নি। শুধু একটা কাগজ যোগ হয়েছে।

একটা রেজাল্ট বাবার মন বদলে দিয়েছে। কিন্তু মা এর আগেই বদলে ছিলেন।

মা প্রথম থেকেই বিশ্বাস করত। কোনো রেজাল্টের দরকার ছিল না। কোনো BUET-এর দরকার ছিল না। মা জানত ঐশী পারবে। মা জানত কারণ মা দেখেছে। মধ্যরাতে ঐশীর ঘরে আলো জ্বলত, মা দেখত। পরীক্ষার আগে ঐশীর হাত কাঁপত, মা দেখত। ক্লাসে প্রথম হলে ঐশীর চোখ জ্বলত, মা দেখত। বাবা এসব দেখেনি। বাবা রিকশায় ছিল। রিকশার হ্যান্ডেলে ছিল। রাস্তায় ছিল। ঘরে ছিল না।

মায়ের বিশ্বাস রেজাল্টের আগে আসে। বাবার বিশ্বাস রেজাল্টের পরে।

ঐশী BUET-এ যাবে। ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু সে ভুলবে না। ভুলবে না সেই রাতের কথা যেদিন বাবা বলেছিল "বিয়ে দিই।" ভুলবে না মায়ের সেলাই মেশিনের কথা। ভুলবে না চালের ড্রামের তলায় রাখা টাকার কথা। ভুলবে না নিঃশব্দ কান্নার কথা। ভুলবে না ঘুরপথে স্বপ্ন পূরণের কথা।

কারণ এই ভুলে না যাওয়াটাই তার শক্তি। এই মনে রাখাটাই তার ইঞ্জিন। এই ব্যথাটাই তার জ্বালানি।

রাতে ঐশী মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। আঠারো বছরের মেয়ে, BUET-এর ছাত্রী, বোর্ডে তৃতীয়, কিন্তু মায়ের কোলে সে এখনো ছোট। মায়ের কোলে সবাই ছোট। সবসময়।

মা ঐশীর চুলে হাত বোলায়। ভাবে: আমার সেলাই মেশিন, আমার একশো পঞ্চাশ টাকা, আমার লুকিয়ে রাখা স্বপ্ন, এগুলো সফল হয়েছে। এই মেয়ে আমার কাজ। এই মেয়ে আমার সবচেয়ে সুন্দর সেলাই। কোনো ব্লাউজ, কোনো সালোয়ার, কোনো থ্রি-পিস এর ধারে আসে না।

রেহানা বেগম হাসে। অন্ধকারে। একা। কেউ দেখে না। কিন্তু সেই হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে পূর্ণ হাসি।