বুড়ো বয়সের প্রেম

প্রেমের কোনো বয়স নেই। কিন্তু সমাজ বয়স দেখে, প্রেম দেখে না।

পর্ব ৮৯ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

জোবেদার স্বামী মারা গিয়েছিল পনেরো বছর আগে।

হার্ট অ্যাটাক। নামাজ পড়তে গিয়েছিল মসজিদে। ফিরে আসেনি। মসজিদ থেকে খবর এলো, "আপনার স্বামী মেঝেতে পড়ে আছেন।" জোবেদা দৌড়ে গিয়েছিল। জুতো পরেনি। খালি পায়ে। রাস্তার কাঁকর পায়ে বিঁধেছিল, টের পায়নি। মসজিদের দরজায় মানুষের ভিড়। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকেছিল। স্বামী শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। মুখে একটা শান্তি, যেন ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ঘুমন্ত মানুষের বুক ওঠানামা করে। এই বুক স্থির। এই বুক শেষ হয়ে গেছে।

জোবেদা কাঁদেনি তখন। কাঁদতে পারেনি। শক। মানুষ যখন সবচেয়ে বড় ধাক্কা পায়, তখন কাঁদতে পারে না। কান্না পরে আসে। কান্না আসতে জোবেদার তিনদিন লেগেছিল। তিনদিন পরে, সবাই চলে গেছে, ঘর খালি, আর জোবেদা স্বামীর বালিশের কাছে বসে কাঁদল। সেই কান্না থেকে আর কখনো পুরোপুরি ওঠেনি। কান্না থামে, তারপর আবার আসে। মাসে একবার, বছরে কয়েকবার। হঠাৎ, কোনো কারণ ছাড়া। একটা গান শুনে, একটা গন্ধ পেয়ে, একটু ঠান্ডা বাতাসে। কান্না ফিরে আসে যেন কোথাও লুকিয়ে ছিল।

পনেরো বছর।

পনেরো বছর মানে পাঁচ হাজার চারশো পঁচাত্তরটা দিন। প্রতিটা দিন একা। প্রতিটা সকাল একা। প্রতিটা রাত একা। প্রতিটা খাবারে একটা প্লেট। প্রতিটা চায়ে একটা কাপ। প্রতিটা কথোপকথন নিজের সাথে। জোবেদা নিজের সাথে কথা বলে। জোরে বলে। "আজকে কী রাঁধব? মাছ রাঁধি। না, ডাল দিই।" এটা পাগলামি নয়। এটা বেঁচে থাকা। নিজের সাথে কথা না বললে নীরবতা গিলে খায়। নীরবতা একটা প্রাণী। ক্ষুধার্ত প্রাণী। তাকে শব্দ দিয়ে দূরে রাখতে হয়।

আফতাব মিয়া পাশের বাড়ির লোক।

বয়স আটষট্টি। স্ত্রী মারা গেছে তিন বছর আগে। ক্যান্সার। দীর্ঘদিন ভোগার পরে। আফতাব মিয়া স্ত্রীর সেবা করেছে শেষ পর্যন্ত। হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ওষুধ কিনে এনেছে। খাইয়েছে। গোসল করিয়েছে। সেই মানুষটা, যে এতদিন স্ত্রীকে "তুমি রান্না করো, আমি বাইরে যাই" বলত, সেই মানুষটা শেষ দুই বছরে রান্না শিখেছে, কাপড় ধুতে শিখেছে, ঘর মুছতে শিখেছে। মৃত্যু শেখায়। মৃত্যু সবচেয়ে কঠোর শিক্ষক।

আফতাব মিয়া জোবেদার সাথে কথা বলত আগে থেকেই। পাশের বাড়ি, দেয়ালের ওপর দিয়ে কথা হয়। "আপা, আজকে বাজারে আলুর দাম বেড়েছে।" "আপা, বৃষ্টি হবে মনে হয়, কাপড় তুলে নেন।" সাধারণ কথা। প্রতিবেশীর কথা। কিন্তু স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে কথা বেড়েছে। "আপা, আজকে একটু ভালো লাগছে না।" "আপা, রাতে ঘুম হয়নি।" এগুলো প্রতিবেশীর কথা নয়। এগুলো একা মানুষের কথা। একা মানুষ চেনে একা মানুষকে। তাদের মধ্যে একটা ভাষা আছে যেটা সংসারী মানুষ বোঝে না।

একদিন আফতাব মিয়া বলল, "আপা, আমি একটা কথা বলতে চাই।"

জোবেদা বুঝল। মানুষ যখন "একটা কথা" বলে, তখন সেই কথাটা সাধারণ হয় না। সাধারণ কথা বলার আগে অনুমতি নেওয়া লাগে না। অনুমতি তখনই লাগে যখন কথাটা ভারী। যখন কথাটা জীবন বদলে দিতে পারে।

"বলেন।"

"আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।"

জোবেদা চুপ করে রইল। এক মিনিট। দুই মিনিট। বাতাসে নিমগাছের পাতা নড়ছিল। দূরে একটা কাক ডাকল। জোবেদা ভাবল: পঁয়ষট্টি বছর বয়সে একজন মানুষ আমাকে বিয়ে করতে চায়। এটা কী? প্রেম? সঙ্গ? অভ্যাস? নাকি শুধু একাকীত্বের ভয়?

"ভাবব।"

জোবেদা এটুকু বলে চলে গেল। কিন্তু ভেতরে কিছু নড়ল। কিছু যেটা পনেরো বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল। সেটা কী, জোবেদা ঠিক জানে না। কিন্তু সেটা জেগে উঠেছে।

ছেলেমেয়ে জানল।

জোবেদার তিন সন্তান। বড় ছেলে জাহিদ, ঢাকায় থাকে, ব্যাংকে চাকরি করে। মেজো মেয়ে নাজমা, পাশের উপজেলায়, স্বামীর সংসারে। ছোট ছেলে ফারুক, দুবাইতে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে।

জাহিদ প্রথমে বলল, "মা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো?"

নাজমা বলল, "আম্মা, এই বয়সে বিয়ে? লোকে কী বলবে?"

ফারুক ফোনে বলল, "আম্মা, আব্বার কথা ভুলে গেছো?"

তিনটা সন্তান। তিনটা প্রশ্ন। একটাও প্রশ্ন নয় আসলে। তিনটাই বিচার। তিনটাই রায়। তারা জোবেদাকে জিজ্ঞেস করছে না, তারা জোবেদাকে বলছে: তুমি এটা করতে পারো না। তোমার অধিকার নেই। তুমি মা। মায়ের বিয়ে হয় না। মায়ের প্রেম হয় না। মায়ের শরীরে আকাঙ্ক্ষা থাকে না। মা শুধু মা। মায়ের আর কোনো পরিচয় নেই।

জোবেদা শুনল। চুপ করে শুনল। তারপর বলল, "আমি পাগল হইনি। তোমাদের আব্বাকে ভুলিনি। লোকে যা বলে বলুক। আমি পনেরো বছর একা আছি। একটা দিনও তোরা আমার সাথে থাকিসনি। জাহিদ ঢাকায়, নাজমা শ্বশুরবাড়িতে, ফারুক দুবাইতে। আমি কার জন্য একা থাকব? তোদের জন্য? তোরা তো নেই।"

ছেলেমেয়ে চুপ হয়ে গেল। কারণ এটা সত্য। সত্যের সামনে চুপ ছাড়া আর কিছু করা যায় না।

বিয়ে হলো। শান্তভাবে।

কাজি এলো। দুজন সাক্ষী। জোবেদার পাশে নাজমা দাঁড়িয়ে ছিল। নাজমাই একমাত্র এসেছিল। জাহিদ আসেনি, "অফিস আছে" বলে। ফারুক আসতে পারেনি, দুবাই থেকে ছুটি পায়নি। কিন্তু জোবেদা জানে, অফিস আর ছুটি অজুহাত। ছেলেরা মেনে নিতে পারেনি। ছেলেরা ভাবছে, মা বাবাকে প্রতারণা করছে। মৃত বাবাকে। যেন মৃত্যুর পরেও বিয়ের শর্ত বলবৎ থাকে। যেন কবরের ভেতর থেকেও স্বামী স্ত্রীকে বেঁধে রাখতে পারে।

জোবেদা কবুল বলল। তিনবার। "কবুল। কবুল। কবুল।"

প্রতিটা "কবুল" একটু ভারী ছিল। প্রথমটা স্বাভাবিক। দ্বিতীয়টায় গলা কাঁপল, কারণ মনে পড়ল প্রথম বিয়ের কবুল। পনেরো বছরের মেয়ে ছিল তখন। গায়ে হলুদের গন্ধ। হাতে মেহেদি। চোখে লজ্জা আর ভয়। তৃতীয় কবুলে চোখে পানি এলো। কিন্তু সেটা দুঃখের পানি নয়। সেটা ক্লান্তির পানি। পনেরো বছরের একাকীত্বের ক্লান্তি। সেই ক্লান্তি শেষ হচ্ছে, এই স্বস্তির পানি।

আফতাব মিয়া জোবেদার হাত ধরল। আটষট্টি বছরের হাত পঁয়ষট্টি বছরের হাত ধরেছে। দুটো হাতেই শিরা দেখা যায়। দুটো হাতেই চামড়া পাতলা হয়ে গেছে। দুটো হাতেই জীবনের দাগ। কিন্তু হাত ধরায় বয়সের কী আসে যায়? হাত ধরা মানে "আমি আছি।" এটা বলতে বয়স লাগে না।

পাড়ায় কথা হলো।

"বুড়ি বিয়ে করেছে!" "এই বয়সে লজ্জা নেই?" "ছেলেমেয়ে থাকতে আবার বিয়ে!" "মরা স্বামীর সাথে বেঈমানি।"

জোবেদা শুনেছে। প্রতিটা কথা। গ্রামে কথা লুকানো যায় না। কথা বাতাসে ভেসে আসে। দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ঢোকে। জানালার পর্দা ভেদ করে। কথা সর্বত্র। কথা অস্ত্র।

কিন্তু জোবেদা ঠিক আছে।

কারণ রাতে আফতাব মিয়া পাশে শোয়। পনেরো বছর পরে বিছানার ডান পাশটা ভরাট। পনেরো বছর পরে রাতে একটা নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়। পনেরো বছর পরে "ভাত হয়েছে?" প্রশ্নটা অন্য কেউ করে। পনেরো বছর পরে জোবেদা দুটো কাপে চা বানায়। দুটো প্লেটে ভাত দেয়। দুজনের জন্য রান্না করে।

দুজনের জন্য রান্না করা, এটা একটা ছোট কথা। কিন্তু যে মানুষ পনেরো বছর একজনের জন্য রান্না করেছে, সে জানে এটা কত বড়। দ্বিতীয় প্লেটটা একটা উদযাপন। দ্বিতীয় কাপটা একটা বিপ্লব।

ছয়ষট্টি বছর বয়সে প্রেম? হ্যাঁ। প্রেমের কোনো বয়স নেই। কিন্তু সমাজ বয়স দেখে, প্রেম দেখে না।

সমাজ দেখে জোবেদার সাদা চুল। সমাজ দেখে জোবেদার কুঁচকানো হাত। সমাজ দেখে জোবেদার বয়স। কিন্তু সমাজ দেখে না জোবেদার বুকের ভেতর কী আছে। সেখানে পনেরো বছরের একাকীত্ব আছে। পাঁচ হাজার রাতের নিঃশব্দতা আছে। নিজের সাথে কথা বলার অভ্যাস আছে। আর এখন, সেই সবকিছুর পাশে, একটু উষ্ণতা আছে। একটু সঙ্গ আছে। একটু "আমি আছি" আছে।

জোবেদা সন্ধ্যায় উঠানে বসে। আফতাব মিয়া পাশে। দুজনে চুপ করে বসে থাকে। কথা নেই। কথার দরকার নেই। এই বয়সে কথা কমে যায়। নীরবতা বাড়ে। কিন্তু একা নীরবতা আর দুজনের নীরবতা এক নয়। একা নীরবতা গিলে খায়। দুজনের নীরবতা জড়িয়ে ধরে।

আকাশে তারা ওঠে। জোবেদা তাকায়। আফতাব মিয়া তাকায়। একই আকাশ, একই তারা। কিন্তু একসাথে দেখলে আকাশটা বড় হয়। তারাগুলো উজ্জ্বল হয়। কারণ সৌন্দর্য ভাগ করলে বাড়ে। একা দেখলে কমে।

জাহিদ ফোন করে। "মা, কেমন আছো?"

"ভালো আছি।"

এবার মিথ্যা নয়। এবার সত্যি।