মেয়েদের হোস্টেল
রক্তের পরিবার দূরে। পছন্দের পরিবার এখানে।
১
ঘরটা দশ বাই বারো।
পাঁচটা বিছানা। তিনটা বাংক বেড, দুটো সিঙ্গেল। মাঝখানে হাঁটার জায়গা দুই ফুট। দেয়ালে পেরেক দিয়ে ব্যাগ ঝোলানো। দড়ি বাঁধা এক কোণ থেকে আরেক কোণে, তাতে কাপড় শুকায়। একটা ছোট টেবিল, পাঁচজনের পড়ার জায়গা। টেবিলে বই, খাতা, কলম, একটা টিফিন বক্স, একটা আয়না, একটু সিঁদুর, একটা চিরুনি। সবকিছু মেশামেশি। সীমানা নেই। কারণ জায়গা এত কম যে সীমানা আঁকলে কেউ থাকতে পারবে না।
পাঁচজন মেয়ে। পাঁচটা জেলা। পাঁচটা গল্প।
সুমি, বাইশ, নরসিংদী। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনার্স তৃতীয় বর্ষ, বাংলা বিভাগ। সুমির বাবা কৃষক। তিন বিঘা জমি আছে, তাতে ধান হয়, কিন্তু পুরো বছরের খরচ হয় না। সুমি ঢাকায় এসেছে পড়তে। বাবা বলেছিল, "পড়, কিন্তু টাকা বেশি পাঠাতে পারব না।" সুমি পারে। কম টাকায় পারে। চালের দাম জানে, ডালের দাম জানে, সবজির মৌসুম জানে। কোন সময় লাউ সস্তা, কোন সময় পটল সস্তা, এটা সুমি হিসাব করে।
নাহিদা, চব্বিশ, বরিশাল। এমবিএ করছে। চাকরি খুঁজছে পাশাপাশি। প্রতি সপ্তাহে দুটো তিনটা ইন্টারভিউ দেয়। প্রতিটা ইন্টারভিউর জন্য একটা নতুন শার্ট দরকার, কিন্তু শার্ট একটাই। সেই শার্ট ধুয়ে, ইস্ত্রি করে, প্রতিবার পরে। নাহিদা জানে ইন্টারভিউয়াররা জামা দেখে না, যোগ্যতা দেখে। কিন্তু জামা পরিষ্কার না থাকলে যোগ্যতা দেখার আগেই চোখ ফেরে।
তাসলিমা, উনিশ, রংপুর। প্রথম বর্ষ, অর্থনীতি। গ্রাম থেকে প্রথমবার ঢাকায় এসেছে। সবকিছু নতুন। রাস্তা নতুন, শব্দ নতুন, মানুষ নতুন। তাসলিমা ভয় পায়। ঢাকার বাস ভয়, ঢাকার মানুষ ভয়, ঢাকার দাম ভয়। সবকিছু দামি। একটা চায়ের দাম পনেরো টাকা। রংপুরে পাঁচ।
ফারজানা, ছাব্বিশ, কুমিল্লা। নার্সিং ট্রেনিং করছে। শিফট ডিউটি। রাতে হাসপাতালে, দিনে হোস্টেলে ঘুমায়। ফারজানার চোখে সবসময় ক্লান্তি। ঘুমের অভাব। কিন্তু হাসে। সবসময় হাসে। "হাসি না দিলে মানুষ ভাবে কিছু হয়েছে। তারপর জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞেস করলে বলতে হয়। বলতে গেলে কাঁদতে হয়। তাই হাসাই সহজ।"
রিতা, ত্রিশ, খুলনা। চাকরি করে। একটা গার্মেন্টসে কোয়ালিটি কন্ট্রোলার। পাঁচজনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। সবচেয়ে বেশি উপার্জন করে। মাসে আঠারো হাজার। এই আঠারো হাজার থেকে হোস্টেল ভাড়া, খাবার, বাসভাড়া, আর বাকিটা খুলনায় পাঠায়। মা আর ছোট ভাইয়ের জন্য। ভাই পড়ে। রিতা ভাইয়ের পড়ার খরচ দেয়। "আমি পড়তে পারিনি। ও পড়ুক।"
২
সন্ধ্যায় পাঁচজন একসাথে রান্না করে।
রান্নাঘর বলতে করিডোরের শেষে একটা চুলা। গ্যাসের চুলা। একটা। পুরো ফ্লোরের জন্য একটা। লাইন দিতে হয়। কিন্তু পাঁচজন একসাথে রান্না করে বলে লাইন একবারই দিতে হয়। সুমি চাল ধোয়। নাহিদা তরকারি কাটে। তাসলিমা পানি আনে। ফারজানা মসলা বাটে। রিতা রান্না করে, কারণ রিতার হাত সবচেয়ে ভালো।
চালটা ভাগ করে কেনে। মাসের শুরুতে। দশ কেজি চাল, পাঁচজন মিলে। ডাল, তেল, পেঁয়াজ, সব ভাগাভাগি। কেউ বেশি খায়, কেউ কম। কিন্তু হিসাব হয় না। হিসাব করলে সম্পর্ক নষ্ট হয়। হিসাব পরিবারে চলে না। আর এই পাঁচজন পরিবার। রক্তের পরিবার নয়। পছন্দের পরিবার।
রিতা ভাত বেড়ে দেয়। পাঁচটা প্লেটে। কিন্তু প্লেট পাঁচটা নেই। তিনটা প্লেট, একটা বাটি, একটা টিফিন বক্সের ঢাকনা। এটাই যথেষ্ট। পাত্র কী, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভেতরে কী আছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
খেতে খেতে কথা হয়। দিনের কথা। ক্লাসের কথা। ইন্টারভিউয়ের কথা। হাসপাতালের কথা। ফ্যাক্টরির কথা। পাঁচটা আলাদা জগৎ, কিন্তু সন্ধ্যায় একটা টেবিলে মেশে।
তাসলিমা বলে, "আজকে ক্লাসে স্যার বললেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে।" সুমি হাসে, "আমাদের মাথায় তো পৌঁছায়নি।" সবাই হাসে। এই হাসি দুঃখের হাসি নয়। এই হাসি সত্যের হাসি। যেটা জানে, সেটা নিয়ে হাসে। জানাটাই তাদের শক্তি।
৩
রাতে ঘুমের আগে গল্প হয়।
অন্ধকারে। লাইট নেভানোর পরে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে। ছাদের দিকে তাকিয়ে। এই সময়টা সবচেয়ে সত্যি সময়। দিনে মানুষ মুখোশ পরে। রাতে, অন্ধকারে, মুখোশ খোলে। কারণ কেউ দেখে না। কারণ কান শুধু শোনে, চোখ বিচার করে না।
নাহিদা বলে, "আজকে ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করল, বিয়ে হয়েছে কিনা। বিয়ে না হলে হবে কবে। বাচ্চা নেওয়ার প্ল্যান আছে কিনা।"
চুপ। তারপর ফারজানা বলে, "ওরা ডাক্তারের কাছে যায় না এই প্রশ্ন করতে। ইন্টারভিউতে করে।"
সুমি বলে, "কারণ মেয়ে মানে সম্ভাব্য মা। আর সম্ভাব্য মা মানে সম্ভাব্য ছুটি। আর সম্ভাব্য ছুটি মানে সম্ভাব্য সমস্যা।"
রিতা বলে, "গার্মেন্টসে প্রেগন্যান্ট হলে বের করে দেয়। আইনে নিষেধ। কিন্তু আইন কারখানার ভেতরে ঢোকে না।"
তাসলিমা চুপ করে শোনে। তাসলিমা সবচেয়ে ছোট। উনিশ বছর। এই কথাগুলো তার জন্য নতুন। রংপুরে এসব শোনেনি। রংপুরে মেয়েদের সমস্যা ছিল বিয়ে, যৌতুক, পড়ালেখা বন্ধ করে দেওয়া। ঢাকায় নতুন সমস্যা: চাকরি, ইন্টারভিউ, মাতৃত্বকালীন ছুটি, বেতন বৈষম্য। সমস্যা বদলায়, কিন্তু শেষ হয় না।
"আমি যদি ছেলে হতাম," নাহিদা বলে, "এই প্রশ্ন আসত না।"
"তুমি ছেলে হতে চাও?" ফারজানা জিজ্ঞেস করে।
"না। আমি চাই প্রশ্নটা না আসুক।"
৪
মাসের শেষ সপ্তাহ সবচেয়ে কঠিন।
টাকা ফুরিয়ে যায়। ভাতের চাল আছে, কিন্তু তরকারি নেই। ডাল দিয়ে খায়। শুধু ডাল। কখনো কখনো শুধু ভাত আর লবণ। সুমি এটাকে বলে "দারিদ্র্যের রেসিপি।" রিতা বলে, "দারিদ্র্যের রেসিপি সবচেয়ে সৃজনশীল। কারণ কিছু নেই থেকে কিছু বানাতে হয়।"
স্যানিটারি প্যাড ভাগ করে কেনে। একটা প্যাকেট, পাঁচজনে ভাগ। কে কটা লাগবে, হিসাব করে। এটা লজ্জার কথা নয়। এটা বেঁচে থাকার কথা। লজ্জা সেই বিলাসিতা যেটা টাকা থাকলে বহন করা যায়। টাকা না থাকলে লজ্জা ঝেড়ে ফেলতে হয়।
তাসলিমার পিরিয়ড হলে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। ফারজানা গরম পানির বোতল বানিয়ে দেয়। সুমি মাথায় হাত বোলায়। রিতা আদা চা করে আনে। নাহিদা বলে, "শুয়ে থাক, আমি তোর ক্লাসের নোট করে দেব।" পাঁচজন মিলে একজনকে সামলায়। এটা পরিবার। এটা সেই পরিবার যেটা রক্তে আসেনি, যত্নে এসেছে।
ফারজানার নাইট শিফটের পরে সকালে ফিরলে রিতা ভাত গরম করে রাখে। সুমির পরীক্ষার আগে সবাই চুপ থাকে, লাইট জ্বালায় না, ফোনের আওয়াজ বন্ধ করে। নাহিদার ইন্টারভিউয়ের দিন রিতা নিজের লিপস্টিক দেয়, সুমি জুতো পালিশ করে, ফারজানা দোয়া পড়ে।
আমরা পাঁচজন। পাঁচটা জেলা। পাঁচটা স্বপ্ন। একটা ঘর।
৫
রাত গভীর হয়। পাঁচজন শোয়।
ঘরে পাঁচটা শ্বাসের শব্দ। পাঁচটা আলাদা ছন্দ। সুমির শ্বাস ধীর, গভীর ঘুম। নাহিদা মাঝে মাঝে ফিরে, ইন্টারভিউয়ের চিন্তায়। তাসলিমা শান্ত, কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ জেগে ওঠে, বাড়ির কথা মনে পড়ে। ফারজানা ঘুমায় না, সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, হাসপাতালের রোগীদের মুখ ভাসে। রিতা সবচেয়ে আগে ঘুমায়, সবচেয়ে আগে ওঠে, কারণ ফ্যাক্টরিতে দেরি হলে বেতন কাটে।
পাঁচটা মেয়ে। পাঁচটা ভবিষ্যৎ। কেউ জানে না কী হবে।
সুমি হয়তো স্কুলে শিক্ষক হবে। বাংলা পড়াবে। নরসিংদীতে ফিরে যাবে কিনা জানে না। নাহিদা চাকরি পাবে। পাবেই। কারণ না পেলে আর কোনো অপশন নেই। তাসলিমা পড়বে। চার বছর। তারপর কী, তারপরের কথা তারপর। ফারজানা নার্স হবে। হাসপাতালে দাঁড়াবে, রোগীর পাশে, রাতের পর রাত। রিতা কাজ করবে। ভাইয়ের পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাজ করবে। তারপর? তারপর নিজের জন্য কিছু করবে। কী করবে জানে না। কিন্তু "নিজের জন্য" শব্দটাই যথেষ্ট।
এই হোস্টেল ঘর অস্থায়ী। কেউ চিরদিন থাকবে না। একদিন সবাই চলে যাবে। নিজের নিজের পথে। সুমি একদিকে, নাহিদা আরেকদিকে, তাসলিমা আরেকদিকে। ঘরটা খালি হবে। নতুন পাঁচজন আসবে। নতুন পাঁচটা জেলা। নতুন পাঁচটা গল্প। একই ঘর। একই দশ বাই বারো। একই দড়িতে কাপড়। একই চুলায় ভাত।
কিন্তু এই পাঁচজন একে অপরকে ভুলবে না। এই ঘর ভুলবে না। এই ভাত ভুলবে না। এই রাতগুলো ভুলবে না যেখানে অন্ধকারে শুয়ে সত্য বলেছে। যেখানে কেঁদেছে কেউ দেখেনি। যেখানে হেসেছে কেউ বিচার করেনি।
রক্তের পরিবার দূরে। পছন্দের পরিবার এখানে।
সুমি ঘুমের মধ্যে কাঁথা ফেলে দেয়। তাসলিমা নিচের বাংকে ঘুমাচ্ছে, ঠান্ডা লাগছে, কিন্তু কিছু বলে না। রিতা জেগে ওঠে। পানি খেতে। যেতে যেতে সুমির গায়ে কাঁথা তুলে দেয়। তাসলিমার গায়েও। কিছু বলে না। শব্দ করে না। ফিরে যায়। শোয়।
এটা মাতৃত্ব নয়। এটা বোনত্ব। এটা সেই বন্ধন যেটা না দেখলেও থাকে। না বললেও বোঝা যায়। এটা দশ বাই বারো ঘরের ভেতরে তৈরি হয়েছে। চাল ভাগ করে, প্যাড ভাগ করে, স্বপ্ন ভাগ করে।
ভোর হয়। রিতার অ্যালার্ম বাজে। পাঁচটা। রিতা ওঠে। নিঃশব্দে। অন্ধকারে কাপড় পরে। দরজা খোলে। পেছনে চারজন ঘুমায়। রিতা একবার ঘুরে তাকায়। চারটা মুখ। চারটা ভিন্ন দেশ থেকে আসা মুখ। চারটা স্বপ্ন দেখা মুখ।
রিতা দরজা বন্ধ করে। বেরিয়ে যায়। ভোরের ঢাকা। ঠান্ডা বাতাস। ফ্যাক্টরির দিকে হাঁটে। পেছনে, হোস্টেলের তিনতলায়, একটা ছোট ঘরে, চারজন মেয়ে ঘুমায়। তাদের শ্বাস মেশে। তাদের স্বপ্ন মেশে। তাদের দারিদ্র্য মেশে। তাদের আশা মেশে।
পাঁচটা মেয়ে। একটা ঘর। একটা শহর। একটা দেশ যেটা তাদের কিছু দেয়নি, কিন্তু তারা নিজেদের সব দিয়েছে একে অপরকে।