সন্তান হারানো মা

মা ভোলে না। মা শুধু চুপ করে থাকে।

পর্ব ৯১ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

থালাটা রাখল আমেনা।

ভাত। ডাল। একটুকরো মাছ। পেঁয়াজ কুচি পাশে। ঠিক যেভাবে সোহেল খেত। সোহেল পেঁয়াজ ছাড়া খেত না। ভাতের সাথে পেঁয়াজ মাখিয়ে, ডাল ঢেলে, হাত দিয়ে মুঠো করে মুখে দিত। চার বছরের ছেলে। হাতটা এত ছোট যে মুঠোর অর্ধেক ভাত আবার থালায় পড়ে যেত। আমেনা বকত, "ঠিকমতো খা।" সোহেল হাসত। মুখভর্তি ভাত নিয়ে হাসত।

দশ বছর আগে।

আমেনা থালাটা টেবিলের কোণায় রাখল। খুরশিদের থালার পাশে। ফারহানার থালার পাশে। তিনটে থালা। তিনজন। কিন্তু খাবে দুজন।

খুরশিদ ঘরে ঢুকে দেখল। কিছু বলল না। কিছু বলে না অনেকদিন। আগে বলত। "আমেনা, থাক। ও নেই।" আমেনা তাকিয়ে থাকত। খুরশিদ আর বলত না। এখন আর বলার চেষ্টাও করে না।

ফারহানা বলে। মাঝে মাঝে। "আম্মা, ভাইয়ের থালা কেন?" ফারহানা আট বছরের। সোহেলের পরে জন্ম। সোহেল চলে যাওয়ার দুই বছর পর। ফারহানা সোহেলকে দেখেনি। ফারহানা সোহেলকে চেনে ছবিতে। দেয়ালে একটা ছবি, সোহেল হাসছে, কোলে একটা প্লাস্টিকের গাড়ি।

"ভাইয়ের থালা কেন?" ফারহানাকে জিজ্ঞেস করতে শুনলে আমেনার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে যায়। প্রতিবার। একই জায়গায়। একই ভাবে। ভাঙা জিনিস আবার ভাঙে। এটা আমেনা জানে।

"ওর জন্য রাখি।"

"ও তো খাবে না।"

"রাখি।"

ফারহানা আর কিছু বলে না। ফারহানা বুঝেছে, এই প্রশ্নের উত্তর নেই। উত্তর আছে, কিন্তু সেটা যুক্তির উত্তর না। সেটা অন্য কিছুর উত্তর। ফারহানা সেটা বোঝার মতো বড় হয়নি এখনো।

পুকুরটা বাড়ির পেছনে।

এখনো আছে। কেউ ভরাট করেনি। আমেনা বলেছিল ভরাট করতে। খুরশিদ বলেছিল, "পুকুর ভরাট করলে পানি কোথায় পাবি? গোসল, কাপড় ধোয়া, সব তো পুকুরে।" আমেনা বলেছিল, "টিউবওয়েল আছে।" খুরশিদ বলেছিল, "পুকুর ভরাট করলে সোহেল ফিরে আসবে?"

সেদিন আমেনা প্রথমবার খুরশিদকে মেরেছিল। হাত দিয়ে। বুকে। একবার। খুরশিদ কিছু বলেনি। আমেনাও কিছু বলেনি। দুজন দুদিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ।

পুকুরটা আছে।

আমেনা পুকুরের ধারে যায় না। দশ বছর। একবারও যায়নি। কাপড় ধোয়ার দরকার হলে ফারহানাকে পাঠায়। গোসলের পানি টিউবওয়েল থেকে আনে। পুকুরের দিকে তাকায় না। জানালা দিয়ে পুকুর দেখা যায়, সেই জানালায় আমেনা পর্দা লাগিয়ে দিয়েছে। পুরনো শাড়ি। নীল রঙের। সোহেলের জন্মের সময় পরেছিল ওই শাড়ি।

সোহেল জানালায় উঠে দাঁড়াত। ছোট ছোট আঙুল দিয়ে শিক ধরত। বাইরে তাকাত। পুকুরে হাঁস দেখত। "আম্মা, হাঁস! হাঁস!" আমেনা বলত, "হ্যাঁ, হাঁস।" সোহেল বলত, "আমি হাঁস ধরব।" আমেনা বলত, "পানিতে যাবি না।"

সোহেল পানিতে গেছিল।

বিকেল চারটা। আমেনা রান্নাঘরে। পেঁয়াজ কাটছিল। চোখে পানি। পেঁয়াজের জন্য। সোহেল উঠোনে খেলছিল। প্লাস্টিকের গাড়ি নিয়ে। আমেনা শুনতে পাচ্ছিল গাড়ির শব্দ, মাটির ওপর ঘষা। তারপর শব্দ থেমে গেল।

শব্দ থেমে গেলেই আমেনার মনে হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হয়নি। পেঁয়াজ কাটছিল। চোখে পানি।

কতক্ষণ? পাঁচ মিনিট? দশ মিনিট? আমেনা জানে না। এই সময়টা সে কোনোদিন মাপতে পারেনি। কখনো পাঁচ মিনিট মনে হয়। কখনো পাঁচ ঘণ্টা।

উঠোনে গিয়ে দেখল, সোহেল নেই। গাড়িটা পড়ে আছে। মাটিতে। চাকা ওপরে।

আমেনা দৌড়ল।

পুকুরের পাড়ে গিয়ে দেখল।

পানি স্থির। প্রায় স্থির। মাঝখানে একটু ঢেউ। ছোট ঢেউ। যেন কিছু একটা পড়েছে। বা কেউ একটু আগে পানিতে ছিল।

সোহেল।

আমেনা পানিতে নেমেছিল। শাড়ি ভিজে গেছিল। পানি কোমর পর্যন্ত। হাত দিয়ে হাতড়েছিল। পানি ঘোলা ছিল। কিছু দেখা যাচ্ছিল না। হাত ঠেকেছিল কিছু একটায়। নরম। ছোট। সোহেলের শরীর।

চিৎকার করেছিল আমেনা। এমন চিৎকার যে পাশের বাড়ির মানুষ ছুটে এসেছিল। কেউ একজন সোহেলকে তুলেছিল। মুখ নীল। চোখ বন্ধ। প্লাস্টিকের গাড়ির চাকার মতো স্থির।

মানুষ বলে, ভুলে যাও।

মানুষ অনেক কিছু বলে। মানুষ বলে, "আল্লাহর ইচ্ছা।" মানুষ বলে, "আরেকটা বাচ্চা হবে।" মানুষ বলে, "সময় ওষুধ।" মানুষ বলে, "কান্না থামাও।"

আমেনা কান্না থামিয়েছে। বাইরে। ভেতরে থামেনি। ভেতরে কান্না নদীর মতো। বর্ষায় ভরে যায়, শীতে শুকিয়ে আসে, কিন্তু নদী মরে না। নদীর তলায় পানি থাকে। সবসময়। শুকনো নদীও নদী।

মানুষ বলে, ভুলে যাও।

মা ভোলে না। মা শুধু চুপ করে থাকে।

আমেনা চুপ করে থাকে। সকালে উঠে রান্না করে। খুরশিদের টিফিন বানায়। ফারহানাকে স্কুলে পাঠায়। ঘর ঝাড়ু দেয়। উঠোন ধোয়। কাপড় ধোয়। রান্না করে। ঘুমায়। আবার ওঠে। চক্র। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর।

কিন্তু সন্ধ্যায়, যখন ভাত বাড়ে, তখন তিনটে থালা বের করে। তৃতীয় থালাটা রাখে। ভাত দেয়। ডাল দেয়। মাছ দেয়। পেঁয়াজ কুচি দেয়।

এটা পাগলামি? হতে পারে। আমেনা জানে না। আমেনা জানে, এটা না করলে সন্ধ্যাটা পার হয় না। এটা করলে একটু হালকা লাগে। যেন সোহেল আছে। ঘরের কোথাও আছে। হয়তো উঠোনে খেলছে। হয়তো জানালায় দাঁড়িয়ে হাঁস দেখছে। খিদে পেলে আসবে। আসলে থালা পাবে।

রাতে ভাত ফেলে দেয়। কখনো গরুকে দেয়। কখনো বিড়ালে খায়। আমেনা ফেলতে ফেলতে ভাবে, আজও এলো না।

দশ বছর ধরে আজও এলো না।

ফারহানাকে আমেনা ভালোবাসে।

এটা বলা দরকার। কারণ মানুষ ভাবে, আমেনা শুধু সোহেলকে নিয়ে আছে। মানুষ ভাবে, আমেনা ফারহানাকে কম ভালোবাসে। এটা সত্য না।

আমেনা ফারহানাকে ভালোবাসে। ফারহানার জন্য রান্না করে, চুল বেঁধে দেয়, স্কুলের খাতা কিনে দেয়, জ্বর হলে সারারাত জেগে থাকে। ফারহানার হাসি দেখলে আমেনার ভেতরে আলো জ্বলে। সত্যিকারের আলো। ঠান্ডা না, গরম।

কিন্তু।

প্রতিটা সন্তান আলাদা। একটা দিয়ে আরেকটার জায়গা ভরে না।

সোহেলের জায়গা সোহেলের। ফারহানার জায়গা ফারহানার। দুটো আলাদা ঘর। আলাদা দরজা। আলাদা চাবি। একটা ঘর ভরা। আরেকটা ঘর খালি। খালি ঘরে আসবাব নেই, কিন্তু দেয়ালে ছবি আছে, বাতাসে গন্ধ আছে, মেঝেতে পায়ের দাগ আছে।

একদিন ফারহানা জিজ্ঞেস করেছিল, "আম্মা, ভাইয়া কেমন ছিল?"

আমেনা অনেকক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলল, "তোর মতো।"

"আমার মতো?"

"হ্যাঁ। একগুঁয়ে। হাসলে দুটো দাঁত বের হতো। ওপরের দুটো। তোর মতো।"

ফারহানা হাসল। ওপরের দুটো দাঁত বের হলো।

আমেনা তাকিয়ে রইল। চোখ শুকনো। আমেনার চোখ এখন সবসময় শুকনো। পানি শেষ হয়ে গেছে। দশ বছরে যে পরিমাণ পানি বের হওয়ার ছিল, বের হয়ে গেছে। এখন শুধু শুকনো চোখে দেখে। শুকনো চোখে দেখা বেশি কষ্টের। পানি থাকলে ঝাপসা হয়, দেখা যায় না ভালো করে। পানি না থাকলে সব পরিষ্কার দেখা যায়। প্রতিটা বিস্তারিত। প্রতিটা রেখা।

আজ সোহেলের জন্মদিন।

চৌদ্দ বছর হতো। ক্লাস নাইনে পড়ত হয়তো। লম্বা হতো। খুরশিদের মতো লম্বা, নাকি আমেনার মতো মাঝারি? আমেনা জানে না। জানার উপায় নেই। এটাই সবচেয়ে কঠিন, না-জানাটা। মারা যাওয়া কঠিন। কিন্তু না-জানা আরো কঠিন। কেমন হতো তার গলার স্বর? কেমন হতো তার হাতের লেখা? সে কি ক্রিকেট খেলত নাকি ফুটবল? সে কি লাজুক হতো নাকি চঞ্চল?

চার বছরে একটা বাচ্চা অনেক কিছু হতে পারে। কিন্তু চার বছরে একটা বাচ্চা সব কিছু হয়ে ওঠে না। সোহেল অসম্পূর্ণ। একটা বাক্য যেন মাঝপথে থেমে গেছে। দাঁড়ি পড়েনি। পূর্ণবিরতি হয়নি।

আমেনা আজ একটু বেশি ভাত দিল সোহেলের থালায়। জন্মদিনে ছেলে বেশি খাবে।

খুরশিদ দেখল। কিছু বলল না।

ফারহানা দেখল। বলল, "আম্মা, আজ ভাইয়ার জন্মদিন?"

"হ্যাঁ।"

"কেক আনব?"

আমেনা তাকাল ফারহানার দিকে। ফারহানা সত্যি বলছে। ফারহানার চোখে কৌতুক নেই, কৌতূহল আছে। আট বছরের মেয়ে। সে-ও ভাইকে মনে রাখতে চায়। যে ভাইকে সে দেখেনি, সেই ভাইকে।

"আন।"

ফারহানা দোকানে গেল। ছোট একটা কেক নিয়ে এলো। দশ টাকার। প্লাস্টিকের প্যাকেটে। আমেনা কেকটা সোহেলের থালার পাশে রাখল।

তিনজন বসে আছে। তিনটে থালা। একটা কেক। একটা খালি চেয়ার।

আমেনা চোখ বন্ধ করল। মনে মনে বলল, "জন্মদিন হোক, বাবা।"

খুরশিদ মাথা নিচু করে খাচ্ছে। খুরশিদের চোখ লাল। খুরশিদও মনে রাখে। খুরশিদও ভোলেনি। কিন্তু খুরশিদের শোক আলাদা। পুরুষের শোক ভেতরে যায়, পাথরের মতো বসে থাকে, নড়ে না, গলে না। আমেনার শোক বাইরেও আসে, থালায়, পেঁয়াজ কুচিতে, কেকে। দুজনের শোক দুরকম। কিন্তু শোক একটাই।

তারপর চোখ খুলল। ফারহানার দিকে তাকাল। ফারহানা ভাত খাচ্ছে। মুখভর্তি ভাত নিয়ে। অর্ধেক থালায় পড়ে যাচ্ছে।

"ঠিকমতো খা," আমেনা বলল।

ফারহানা হাসল।

রাতে ঘুমানোর আগে আমেনা সোহেলের থালা থেকে ভাত সরাল। কেকটা রাখল। কেক রাখবে কিছুদিন। শুকিয়ে যাবে। শক্ত হয়ে যাবে। তারপর ফেলে দেবে। কিন্তু আপাতত রাখবে।

বাইরে সন্ধ্যা নামছে। পুকুরের ওপর প্রথম তারা উঠেছে। আমেনা দেখতে পায় না। পর্দা টানা। কিন্তু জানে। তারা ওঠে। প্রতিদিন ওঠে। পুকুর আছে। তারা আছে। সোহেল নেই। আমেনা আছে।

থালাটা আছে।