কিশোরী মা

আমার বাচ্চা ঘুমালে আমি পড়ি। আমার বাচ্চা জেগে উঠলে আমি মা হই।

পর্ব ৯২ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রাত দুইটা বাজে।

বাচ্চাটা ঘুমিয়েছে। অবশেষে।

রুবি উঠে বসল। আস্তে। বিছানা যেন না নড়ে। বাচ্চা জেগে গেলে আবার ঘণ্টাখানেক লাগবে ঘুম পাড়াতে। আয়ান, এগারো মাস, ঘুমের মধ্যে একটু নড়ল। রুবি থামল। শ্বাস আটকে রাখল। আয়ান আবার স্থির হলো।

রুবি মেঝেতে নামল। পা টিপে টিপে। বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করল। চার্জ কম। উনিশ পার্সেন্ট। উনিশ পার্সেন্টে কতটুকু পড়া যায় রুবি জানে। প্রায় দেড় ঘণ্টা, যদি স্ক্রিনের আলো একদম কমিয়ে রাখে।

টেবিলের নিচে বসল। টেবিল বলতে টিনের একটা বাক্স, ওপরে কাঠের তক্তা। এটা রুবির পড়ার টেবিল। রাত দুইটায়।

বইটা খুলল। বাংলা দ্বিতীয় পত্র। ওপেন ইউনিভার্সিটির পাঠ্যসূচি। রুবি এইচএসসি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছে। ছয় মাস আগে। কেউ বলেনি ভর্তি হতে। নিজে খুঁজে বের করেছে। ফোনে। ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখেছিল, একটা মেয়ে বলছিল, "আমি তিনটা বাচ্চা নিয়ে এইচএসসি পাস করেছি, ওপেন ইউনিভার্সিটিতে।" রুবি ভিডিওটা তিনবার দেখেছিল। তারপর ফোন নম্বর খুঁজেছিল। পেয়েছিল। ফোন করেছিল। ভর্তি হয়েছিল।

ভর্তি ফি আটশো টাকা। কোথা থেকে এনেছিল? মুরগির ডিম বেচে। তিন সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন চারটা করে ডিম জমিয়ে। শাশুড়িকে বলেছিল মুরগি ডিম দিচ্ছে না। মিথ্যা বলেছিল। রুবি মিথ্যা বলতে পারে না ভালো করে। কিন্তু এই মিথ্যাটা বলতে পেরেছিল।

আটশো টাকা। একটা ভবিষ্যতের দাম আটশো টাকা। চুরাশিটা ডিম। রুবি গুনেছিল। প্রতিটা ডিমের জন্য একটু অপরাধবোধ, কারণ সংসারের ডিম সে নিজের জন্য বিক্রি করেছে। কিন্তু অপরাধবোধের চেয়ে বড় ছিল অন্য একটা অনুভূতি। সেটার নাম রুবি জানে না। হয়তো আশা। হয়তো একগুঁয়েমি। হয়তো দুটো মিলে একটা।

বই এসেছিল ডাকে। মোটা। ভারী। রুবি প্যাকেট খুলে বইটা হাতে নিয়েছিল। নতুন বইয়ের গন্ধ। ক্লাস এইটের পর এই প্রথম নতুন বই। দুই বছরের ব্যবধান। দুই বছরে রুবির জীবন উলটে গেছে। কিন্তু বইয়ের গন্ধ একই আছে।

রুবির বিয়ে হয়েছিল চৌদ্দ বছর বয়সে।

ক্লাস এইটে পড়ত। গণিতে ভালো ছিল। স্যার বলতেন, "রুবি, তুই অনেক দূর যাবি।" কত দূর? সেটা আর জানা হলো না। বাবা একদিন বাড়ি এসে বলল, "পাশের গ্রামের ফারুকের ছেলে। রাজমিস্ত্রি। ভালো কামাই। বিয়ে ঠিক করেছি।"

রুবি বলেছিল, "আমি পড়ব।"

বাবা বলেছিল, "মেয়েরা চিরকাল পড়ে না।"

মা কিছু বলেনি। মা কিছু বলে না। মা রান্নাঘরে ঢুকে গিয়েছিল। রুবি মায়ের পিঠের দিকে তাকিয়েছিল। মায়ের পিঠ একটু ঝুঁকে আছে। ঝুঁকে আছে কারণ মাও একদিন পড়তে চেয়েছিল। মাও একদিন থেমে গেছিল। মা জানে রুবি কী অনুভব করছে। জানে কিন্তু কিছু করার নেই। মা নিজেই তো পারেনি।

বিয়ে হলো। ফারুকের ছেলে সোহাগ। বাইশ বছর। রুবি চৌদ্দ। সোহাগ খারাপ মানুষ না। মারে না। গালি দেয় না। কিন্তু বোঝে না। বোঝার কিছু নেই বলে মনে করে। বিয়ে হয়েছে, সংসার হবে, বাচ্চা হবে, বড় হবে, এটাই জীবন। সোহাগের জীবন এরকম। সোহাগের মায়ের জীবন এরকম ছিল। সোহাগের দাদির জীবন এরকম ছিল।

শ্বশুরবাড়িতে রুবির একটা বই ছিল। গণিতের বই। ক্লাস এইটের। লুকিয়ে রেখেছিল। ব্যাগের তলায়। কাপড়ের নিচে। রাতে কখনো কখনো বের করত। পাতা উলটাত। অংক করত না, শুধু দেখত। সংখ্যাগুলো দেখত। সূত্রগুলো দেখত। পরিচিত মুখের মতো। পুরনো বন্ধুর মতো।

রুবির মা হওয়ার কথা ছিল না এত তাড়াতাড়ি। কিন্তু হলো। পনেরো বছর বয়সে। আয়ান।

আয়ান এসেছে। পৃথিবীতে। ছোট্ট। লাল। কুঁচকানো মুখ। প্রথম যখন কোলে নিল, রুবির মনে হয়েছিল, এই জিনিসটা আমার ভেতর থেকে এসেছে? এত ছোট? এত নরম? হাসপাতালে জন্ম হয়নি। বাড়িতে। দাই এসেছিল। রুবির শরীর ছিঁড়ে যাচ্ছিল। পনেরো বছরের শরীর। এই শরীর মা হওয়ার জন্য তৈরি ছিল না। কিন্তু হয়েছে।

রুবি মা হলো।

ষোলো বছরে রুবি অনেক কিছু।

মা।

বউ।

গৃহিণী।

কিন্তু রুবি আরেকটা কিছু। সেটা কেউ দেখে না।

রুবি ছাত্রী।

এখনো।

ভেতরে ভেতরে। যেখানে কেউ দেখে না, সেখানে রুবি এখনো ক্লাস এইটের মেয়ে, গণিত বইয়ের ওপর ঝুঁকে পড়া, স্যারের কথা মনে রাখা মেয়ে।

ওপেন ইউনিভার্সিটি মানে কোনো ক্লাসরুম নেই।

বই আছে। মডিউল আছে। পরীক্ষা আছে। টিউটোরিয়াল ক্লাস মাসে একবার, উপজেলা সদরে। রুবি যায়। আয়ানকে কোলে নিয়ে। বাসে। এক ঘণ্টার পথ। আয়ান কাঁদে বাসে। মানুষ তাকায়। একজন বলেছিল, "এত ছোট বাচ্চা নিয়ে কই যাও?" রুবি বলেছিল, "পড়তে।" লোকটা তাকিয়েছিল। কিছু বলেনি। মুখে একটা ভাব ছিল। করুণা? বিস্ময়? রুবি ভাবটা পড়তে পারেনি। পড়ার দরকারও মনে করেনি।

টিউটোরিয়াল ক্লাসে রুবি সামনের সারিতে বসে। আয়ান কোলে। এক হাতে আয়ান, এক হাতে কলম। স্যার বোর্ডে লেখেন, রুবি খাতায় লেখে। আয়ান কলমটা ধরতে চায়। রুবি অন্য হাতে একটা খেলনা দেয়। আয়ান খেলনা নেয়। দশ মিনিট শান্ত। তারপর আবার কলম চায়।

একবার আয়ান ক্লাসের মাঝখানে কেঁদে উঠেছিল। জোরে। স্যার থেমে গেছিলেন। পুরো ক্লাস তাকিয়েছিল। রুবি উঠে বাইরে গিয়েছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আয়ানকে চুপ করিয়েছিল। দশ মিনিট লেগেছিল। দশ মিনিটের ক্লাস মিস হয়েছিল। রুবি ফিরে এসে পাশের জনের খাতা থেকে নোট টুকে নিয়েছিল। দশ মিনিট মিস হলে পুরো বিষয়টা ধরতে পারে না। তাই রাতে আবার পড়তে হয়। বাড়তি সময়।

একদিন ক্লাসে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, "বাচ্চা কার?"

"আমার।"

"তুমি কত বড়?"

"ষোলো।"

চুপ। ওই মানুষটা আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। চুপের ভেতরে অনেক কিছু ছিল। রুবি শুনতে পেয়েছিল। ষোলো বছরে মা। ষোলো বছরে ক্লাসে। কোলে বাচ্চা, হাতে কলম। এটা কী? পাগলামি? সাহস? জেদ? রুবি জানে না এটা কী। রুবি জানে এটা তার জীবন।

রুবি পড়ে। রাত দুইটায়। তিনটায়। চারটায়।

ফজরের আজান হলে বই বন্ধ করে। নামাজ পড়ে। তারপর সোহাগের জন্য নাশতা বানায়। সোহাগ সকাল ছয়টায় বেরোয়। কাজে। ইট গাঁথতে।

রুবি আয়ানকে খাওয়ায়। ঘর গোছায়। রান্না করে। শাশুড়ির সাথে কথা বলে।

বিকেলে আয়ানকে নিয়ে উঠোনে বসে। আয়ান মাটি নিয়ে খেলে। রুবি দেখে। ভালোবাসে। ক্লান্ত হয়।

সন্ধ্যায় সোহাগ ফেরে। খায়। ঘুমায়। রুবি আয়ানকে ঘুম পাড়ায়। তারপর অপেক্ষা করে। দুইটা বাজার অপেক্ষায়।

অপেক্ষা। রুবির জীবনে অনেক অপেক্ষা। আয়ানের ঘুমানোর অপেক্ষা। পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা। সোহাগের বোঝার অপেক্ষা। শাশুড়ির ঘুমানোর অপেক্ষা। কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা: নিজের জীবন শুরু হওয়ার অপেক্ষা। কবে রুবি শুধু রুবি হবে? কবে?

আমার বাচ্চা ঘুমালে আমি পড়ি। আমার বাচ্চা জেগে উঠলে আমি মা হই। দুটোই আমি।

এই কথাটা রুবি কাউকে বলেনি। মনে মনে বলে। রাত দুইটায় বই খোলার সময় বলে। আয়ান কাঁদলে বই বন্ধ করার সময় বলে। দুটো জীবন। একটা শরীরে। একটা সময়ে। পালা করে। সুইচের মতো। অন-অফ।

সোহাগ জানে রুবি পড়ে। জানে কিন্তু বোঝে না। বলে, "পড়ে কী হবে? চাকরি করবি?" রুবি বলে, "হ্যাঁ।" সোহাগ হাসে। বিশ্বাস করে না। রুবি বিশ্বাস করে।

একদিন সোহাগ বলেছিল, "আমি কি তোরে খাওয়াই না? কষ্ট দিই?" রুবি বলেছিল, "না। কষ্ট দাও না।" সোহাগ বলেছিল, "তাহলে পড়া কেন? কী দরকার?" রুবি চুপ ছিল। কিছু বলতে পারেনি। কারণ উত্তরটা সোহাগের ভাষায় নেই। উত্তরটা হলো: খাওয়ানো যথেষ্ট না। বাঁচানো যথেষ্ট না। বাঁচতে চাই। বাঁচা আর বেঁচে থাকা আলাদা।

শাশুড়ি বলে, "বইপত্র ফেলে বাচ্চা দেখ।" রুবি বাচ্চা দেখে। বইও দেখে। কিন্তু শাশুড়ির সামনে বই রাখে না। বই থাকে বালিশের নিচে। মোবাইল থাকে কাপড়ের ভাঁজে। খাতা থাকে ব্যাগের তলায়। লুকিয়ে রাখতে হয়। পড়া যেন অপরাধ। পড়া যেন চুরি।

রাত দুইটায় কেউ দেখে না। রাত দুইটায় রুবি শুধু রুবি। মা না, বউ না, ছেলের বধূ না। শুধু রুবি। ষোলো বছরের একটা মেয়ে। পড়ছে। গণিত। বাংলা। ইংরেজি। পড়ছে কারণ পড়তে চায়। পড়ছে কারণ স্যার বলেছিলেন, "তুই অনেক দূর যাবি।"

কত দূর?

রুবি জানে না। জানে না কিন্তু যাচ্ছে। রাত দুইটায়। একটু একটু করে। একটা পাতা। আরেকটা পাতা। একটা অধ্যায়। আরেকটা অধ্যায়। একদিন এইচএসসি পাস হবে। তারপর? তারপর কী? রুবি এত দূর ভাবে না। এত দূর ভাবলে ভয় লাগে। এখন শুধু পরের পাতা। পরের অধ্যায়। পরের পরীক্ষা। এটুকুই।

গত পরীক্ষায় রুবি বাংলায় ৭২ পেয়েছে। গণিতে ৮১।

রেজাল্ট দেখে রুবি কাঁদেনি। হাসেনি। ফোনের স্ক্রিনে সংখ্যাগুলো দেখেছে। অনেকক্ষণ। তারপর ফোন রেখে আয়ানকে কোলে তুলে নিয়েছে।

আয়ান মুখে হাত দিচ্ছিল। লালা ঝরছিল। রুবি মুছে দিয়েছিল।

সোহাগকে বলেছিল রাতে। "পরীক্ষায় ভালো হয়েছে।" সোহাগ বলেছিল, "ও। ভালো।" তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিল।

রুবি জেগে ছিল। আয়ান ঘুমিয়েছিল রাত এগারোটায়। রুবি এগারোটা পনেরোয় বই খুলেছিল। আজ একটু তাড়াতাড়ি পেয়েছে। বোনাস সময়। তিন ঘণ্টা।

পদার্থবিজ্ঞান।

বলবিদ্যা।

নিউটনের সূত্র।

বল সমান ভর গুণ ত্বরণ। এফ ইকুয়ালস এম এ।

রুবি মনে মনে ভাবল, আমার ভর কত? ষোলো বছরের একটা মেয়ে, কোলে একটা বাচ্চা, পিঠে একটা সংসার, পায়ের নিচে একটা মাটির ঘর। ভর অনেক। ত্বরণ কম। কিন্তু বল আছে। বল আছে বলেই এই ভর নিয়েও নড়ছে। আস্তে। কিন্তু নড়ছে।

নিউটনের প্রথম সূত্র: বাইরের বল না লাগলে স্থির বস্তু স্থির থাকে। রুবি স্থির ছিল। বিয়ের পর। সংসারে। স্থির হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভেতর থেকে একটা বল এসেছে। সেই ইউটিউব ভিডিওটা। সেই মেয়েটা। তিন বাচ্চা নিয়ে এইচএসসি পাস। সেই মেয়েটা রুবির ভেতরে বল প্রয়োগ করেছে। রুবি নড়তে শুরু করেছে।

নিউটনের তৃতীয় সূত্র: প্রতিটি ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। রুবি পড়ে, এটা ক্রিয়া। শাশুড়ি বকে, সোহাগ হাসে, ক্লান্তি আসে, চোখ জ্বলে, এটা প্রতিক্রিয়া। সমান। বিপরীত। কিন্তু ক্রিয়া থামেনি।

রাত তিনটা। আয়ান কোনো শব্দ করল। রুবি থামল। কান পাতল। আয়ান আবার চুপ।

রুবি পড়তে লাগল।

বাইরে অন্ধকার। গ্রাম ঘুমিয়ে আছে। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর। ফোনের আলো রুবির মুখে। চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু খোলা। বইয়ের পাতায়।

ফোনের চার্জ এখন সাত পার্সেন্ট। আর বেশিক্ষণ চলবে না। রুবি তাড়াতাড়ি পড়ছে। প্রতিটা শব্দ গিলছে। পেটে রাখছে। মাথায় রাখছে। চার্জ শেষ হওয়ার আগে যত পারা যায়।

ছয় পার্সেন্ট। পাঁচ। চার।

স্ক্রিন কালো হলো। ফোন মরে গেল।

রুবি অন্ধকারে বসে রইল। চোখ বন্ধ করল। মাথায় শেষ পাতাটা ঘুরছে। শব্দগুলো ঘুরছে। রুবি অন্ধকারেও পড়ছে। চোখ বন্ধ করেও পড়ছে।

আমার বাচ্চা ঘুমালে আমি পড়ি। আমার বাচ্চা জেগে উঠলে আমি মা হই।

দুটোই আমি।