নারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা
আমাকে একবার শুনলেই হয়। কিন্তু সেই একবার শোনানোর জন্য ১০ বার যেতে হয়।
১
মাঠটা সবুজ। ধান উঠেছে। বোরো মৌসুম। চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে তালগাছ, দূরে বাঁশঝাড়। ভোরের আলো তেরছা হয়ে পড়েছে ধানের ডগায়। সুন্দর। নিলুফার সৌন্দর্য দেখতে আসেনি। কাজে এসেছে।
সাইকেলটা আলের ওপর রাখল। ব্যাগ থেকে ফাইল বের করল। কলম। নোটবুক। মাটি পরীক্ষার কিট। পিএইচ মিটার। রেইনগেজের রিডিং নেওয়ার চার্ট।
নিলুফার ইসলাম। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা। উপজেলা কৃষি অফিস, ফুলবাড়ী, দিনাজপুর। পদমর্যাদা: উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। বেতন: গ্রেড ১৩। বয়স: ত্রিশ। বিএসসি কৃষি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। ব্যাচে প্রথম।
এগুলো কাগজের কথা। মাঠে কাগজ কাজে আসে না।
মাঠে কাজে আসে ধৈর্য।
নিলুফার মাঠের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল। জুতায় কাদা। শাড়ির আঁচল কোমরে গোঁজা। মাথায় টুপি নেই, রোদ পড়ছে কপালে। কৃষকের বাড়ি। আকবর আলীর বাড়ি। দুই বিঘা জমি। বোরো ধান। গত মৌসুমে ফলন ভালো হয়নি। নিলুফার এসেছে দেখতে, কী করা যায়।
আকবর আলী উঠোনে বসে হুঁকো টানছে। নিলুফারকে দেখে উঠল না। তাকাল। ওপর থেকে নিচে। নিচ থেকে ওপরে।
"আসসালামু আলাইকুম।"
"ওয়ালাইকুম। কী চাই?"
"আমি কৃষি অফিস থেকে এসেছি। নিলুফার ইসলাম। আপনার জমির ব্যাপারে কথা বলতে।"
আকবর আলী হুঁকোয় টান দিল। ধোঁয়া ছাড়ল। "কৃষি অফিস মেয়ে পাঠায় এখন?"
"পাঠায়।"
"মেয়ে কৃষি কী বোঝে?"
নিলুফার মুখে হাসি ধরে রাখল। ভেতরে কিছু একটা চেপে ধরল। রাগ? হতাশা? অভ্যাস? তিনটাই হয়তো।
২
মেয়ে কৃষি কী বোঝে।
এটা প্রথমবার শুনছে না নিলুফার। এটা শুনেছে ফুলবাড়ীতে। শুনেছে বীরগঞ্জে, যেখানে আগে পোস্টিং ছিল। শুনেছে হাকিমপুরে, যেখানে ট্রেনিং হয়েছিল। শুনেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে, যেখানে এক প্রফেসর বলেছিলেন, "মেয়েরা মাঠপর্যায়ে কাজ করতে পারবে না। রোদে পুড়বে। কৃষকরা কথা শুনবে না।"
নিলুফার রোদে পুড়েছে। গায়ের রঙ তিন শেড গাঢ় হয়েছে। মা বলে, "তুই কালো হয়ে যাচ্ছিস।" নিলুফার বলে, "হচ্ছি।" মা বলে, "বিয়ে হবে না।" নিলুফার বলে, "হবে না তো হবে না।"
বিয়ে হয়নি। ত্রিশ বছর। গ্রামে এটা বড় কথা। "মেয়েটার বিয়ে হয় না কেন?" মানুষ ফিসফিস করে। নিলুফার শোনে। শোনে কিন্তু উত্তর দেয় না। উত্তর দেওয়ার সময় নেই। সকাল আটটায় অফিস। নয়টায় মাঠ। দুপুরে আরেকটা মাঠ। বিকেলে রিপোর্ট। সন্ধ্যায় পরের দিনের প্ল্যান। কখন বিয়ের কথা ভাববে?
আকবর আলীর সামনে নিলুফার বসল। মাটিতে। আলের ওপর। আকবর আলী চেয়ারে। নিলুফার জানে, কৃষকের চোখের লেভেলে না বসলে কথা হয় না। ওপরে দাঁড়িয়ে কথা বললে কৃষক শোনে না। সরকারি অফিসার ওপর থেকে কথা বলে। নিলুফার সরকারি অফিসার। কিন্তু মাটিতে বসে।
"আকবর ভাই, গত মৌসুমে কত ফলন হয়েছিল?"
"কম। বিঘায় দশ মণ।"
"দশ মণ কম। এই জমিতে ষোলো মণ হওয়ার কথা।"
আকবর আলী তাকাল। "কে বলেছে?"
"মাটি বলেছে। আমি মাটি পরীক্ষা করেছি। গত মাসে। আপনার জমির পিএইচ ৫.২। অম্লীয়। চুন দিতে হবে। আর সার দিচ্ছেন ভুল অনুপাতে। ইউরিয়া বেশি, পটাশ কম।"
আকবর আলী চুপ। হুঁকোয় টান।
"ব্রি ধান ৮৯ লাগান। এই এলাকার জন্য ভালো। ঠান্ডা সহ্য করতে পারে। পোকার আক্রমণ কম। আমি বীজ দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।"
"মেয়েমানুষের কথায় ধান লাগাব?"
নিলুফার কিছু বলল না। উঠল। ব্যাগ গোছাল। বলল, "আবার আসব।"
আকবর আলী বলল, "আসার দরকার নাই।"
নিলুফার হাসল। "আসব।"
৩
নিলুফার দশবার গেছে।
প্রথমবার আকবর আলী কথা শোনেনি। দ্বিতীয়বার চা দিয়েছে, কিন্তু কথা শোনেনি। তৃতীয়বার নিলুফার মাটি পরীক্ষার ফলাফল দেখিয়েছে, কাগজে, সংখ্যা দিয়ে, আকবর আলী বলেছে, "কাগজে কৃষি হয় না।" চতুর্থবার নিলুফার পাশের গ্রামের রহমত আলীকে নিয়ে গেছে। রহমত আলী নিলুফারের পরামর্শ মেনেছিল। গত মৌসুমে রহমত আলীর ফলন বিঘায় পনেরো মণ। আকবর আলী শুনেছে, কিন্তু বিশ্বাস করেনি। "রহমত অন্য জমি। তার মাটি আলাদা।"
পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম। নিলুফার গেছে। প্রতিবার একটু নতুন তথ্য নিয়ে। ফসলের ছবি। আবহাওয়ার ডেটা। সারের হিসাব। ধৈর্য ধরে বসেছে, কথা বলেছে, শুনেছে।
অষ্টমবার আকবর আলীর স্ত্রী বের হয়ে এসেছিল। বলেছিল, "আপা, আমি শুনেছি। আপনি ঠিকই বলেন। কিন্তু উনি শোনেন না।" নিলুফার বলেছিল, "শুনবেন। সময় লাগবে।"
নবমবার আকবর আলী বলেছিল, "তোমার এত আসার ভাড়া কে দেয়?" নিলুফার বলেছিল, "সরকার। মানে, আপনার ট্যাক্সের টাকা।" আকবর আলী একটু হেসেছিল। প্রথমবার।
দশমবার। আকবর আলী বলল, "ঠিক আছে। একটু চুন দিয়ে দেখি। তোমার ব্রি ধান ৮৯ দাও। এক বিঘায় লাগাব। বাকিটায় আমার পুরনো বীজ।"
এক বিঘা। পুরো দুই বিঘা না। কিন্তু নিলুফার জানে, এক বিঘাই যথেষ্ট। ফলন যদি ভালো হয়, বাকি এক বিঘা এমনিতেই হবে।
৪
ফলন হলো।
এক বিঘায় ষোলো মণ। বাকি এক বিঘায় এগারো মণ। ব্যবধান পাঁচ মণ। ত্রিশ শতাংশ বেশি।
আকবর আলী ফোন করল। নিলুফারকে। "ম্যাডাম, আসেন একটু।"
ম্যাডাম। আগে নাম ধরে ডাকত না। "মেয়েমানুষ" বলত। এখন ম্যাডাম।
নিলুফার গেল। আকবর আলী ধান দেখাল। স্তূপ করে রাখা। ঝকঝকে। "এইদিকে দেখেন। এইটা আপনার ধান। ওইদিকে আমার পুরনো ধান। দেখেন তফাৎ।"
নিলুফার দেখল। তফাৎ স্পষ্ট। দানা মোটা, ভরাট, সোনালি।
"ম্যাডাম, আগামী মৌসুমে পুরো দুই বিঘায় দেব।"
"দেবেন।"
"আবার আসবেন তো?"
নিলুফার হাসল। "আসব।"
আকবর আলীর স্ত্রী ভেতর থেকে চা নিয়ে এলো। দুটো কাপ। এবার চেয়ারে বসতে বলল। নিলুফার চেয়ারে বসল।
চা খেতে খেতে আকবর আলী বলল, "আপনাকে একটা কথা বলি। প্রথম যেদিন আসছিলেন, আমি ভাবছিলাম, অফিস থেকে মেয়ে পাঠাইছে, কিছু জানে না, গিয়া বলব পাঠান না।"
নিলুফার চা-তে চুমুক দিল। "জানি।"
"কিন্তু আপনি আবার আসলেন। আবার আসলেন। বার বার আসলেন। একটা পুরুষ অফিসারও এত আসে না।"
"আসে না।"
"কেন আসলেন এত বার?"
নিলুফার কাপটা নামাল। "কারণ আপনার জমিতে পাঁচ মণ ধান কম হচ্ছিল। পাঁচ মণ মানে প্রায় কুড়ি হাজার টাকা। বছরে। দশ বছরে দুই লাখ। এই দুই লাখ আপনার, আকবর ভাই। আমি না এলে এটা মাটিতে থেকে যেত।"
৫
অফিসে ফিরে নিলুফার রিপোর্ট লেখে।
কৃষক আকবর আলী। গ্রাম: চকবাড়ী। জমি: ২ বিঘা। আগের ফলন: ১০ মণ/বিঘা। বর্তমান ফলন: ১৬ মণ/বিঘা। বৃদ্ধি: ৩০%। ব্যবহৃত প্রযুক্তি: মাটি পরীক্ষা, সুষম সার, ব্রি ধান ৮৯। পরিদর্শন সংখ্যা: ১০।
দশ।
সংখ্যাটা রিপোর্টে লেখে।
ওপরওয়ালা জিজ্ঞেস করবেন, "এক কৃষকের জন্য দশবার গেছ? সময় নষ্ট।"
নিলুফার জানে উত্তর।
আমাকে একবার শুনলেই হয়। কিন্তু সেই একবার শোনানোর জন্য দশবার যেতে হয়।
দশবার। কারণ প্রথমবার একজন নারী কৃষি কর্মকর্তাকে কেউ বিশ্বাস করে না। দ্বিতীয়বারও না। পঞ্চমবারও না। একজন পুরুষ কর্মকর্তা এলে হয়তো তিনবারে হতো। নিলুফারের দশবার লাগে। তিনগুণ বেশি সময়। তিনগুণ বেশি পথ। তিনগুণ বেশি রোদ।
কিন্তু ফলন একই। ত্রিশ শতাংশ বেশি। ধান জানে না কে পরামর্শ দিয়েছে, পুরুষ নাকি নারী। ধান শুধু মাটি জানে, পানি জানে, সার জানে, আলো জানে।
নিলুফার রিপোর্ট শেষ করল। ফাইল বন্ধ। ব্যাগে রাখল। সাইকেলের চাবি নিল।
কাল আরেকটা গ্রাম। আরেকজন কৃষক। আরেকবার সেই একই প্রশ্ন: "মেয়ে কৃষি কী বোঝে?"
নিলুফার সাইকেলে উঠল। প্যাডেল মারল। রাস্তা সোজা। দুপাশে ধানক্ষেত। বাতাসে ধানের গন্ধ।
সাইকেল চালাতে চালাতে নিলুফার ভাবল আকবর আলীর কথা। আগামী মৌসুমে পুরো দুই বিঘায় নতুন ধান দেবে। সেটা হলে আকবর আলী অন্য কৃষকদের বলবে। মুখে মুখে। একজন থেকে দুজন। দুজন থেকে চারজন। এভাবেই ছড়ায়। প্রযুক্তি কাগজে ছড়ায় না। মুখে ছড়ায়। বিশ্বাসে ছড়ায়। আকবর আলী যখন বলবে, "ম্যাডামের কথা শুনে ভালো ফলন পেয়েছি," তখন অন্যরা শুনবে। কারণ আকবর আলী তাদের মানুষ। নিলুফার বাইরের মানুষ।
বাইরের মানুষ হয়েও ভেতরে ঢোকা। এটাই নিলুফারের কাজ। এটাই সবচেয়ে কঠিন অংশ।
নিলুফার গন্ধটা নিল। এই গন্ধের জন্যই সে এই চাকরি করে। কাগজের জন্য না। পদবীর জন্য না। এই গন্ধ। মাটির। ফসলের। ঘামের।
রোদ পড়ছে নিলুফারের কপালে। গায়ের রঙ আরো একটু গাঢ় হবে আজ। হোক।